Saturday, May 05, 2007

মৌসুমী ভৌমিক ও মুগ্ধ আমি


আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীলজল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো,
আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর-ধরে
বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছো
আমি কখনও যাইনি জলে,
কখনো ভাসিনি নীলে
কখনো রাখিনি চোখ ডানামেলা গাঙচিলে

এই গানের মাঝে নিভে যায় বাতি থেমে যায় মাইক। অন্ধকার হলঘর থেকে মৃদু গুঞ্জন ওঠে। ভেসে আসে শিশুর কান্না। মৃদু গুঞ্জনেই গমগম করে খচাখচ ভর্তি ইউনিভার্সিটি ইন্সটিউট হল। আর সেই মৃদু কিন্তু গমগমে গুঞ্জন ছাপিয়ে ভেসে আসে মৌসুমী ভৌমিকের নরম মোলায়েম আওয়াজ। জ্বলে ওঠে শ্রোতা-দর্শকের হাতের মোবাইল ফোনের বাতি। মাথার উপর তুলে ধরা এক হল মোবাইল ফোনের আলোতে মোহময় পরিবেশে মৌসুমী গাইতে থাকেন-

আবার যেদিন তুমি সমুদ্রস্নানে যাবে
আমাকেও সাথে নিও
বলো নেবে তো আমায়
আমি শুনেছি সেদিন নাকি তুমি তুমি তুমি মিলে
তোমরা সদলবলে সভা করেছিলে
আর সেদিন তোমরা নাকি অনেক জটিল ধাঁধা
না-বলা অনেক কথা, কথা তুলেছিলে
কেন শুধু ছুটে ছুটে চলা
একই একই কথা বলা
নিজের জন্যে বাঁচা নিজেকে নিয়ে?
যদি ভালবাসা না-ই থাকে
শুধু একা একা লাগেকোথায় শান্তি পাবো?
কোথায় গিয়ে বলো কোথায় গিয়ে?

ভীষণ কোমল গলায় কোন বাজনা ছাড়াই গাইতে থাকেন মৌসুমী। দুলে দুলে গান মৌসুমী। চোখ বন্ধ করে গান। মন দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, সমস্ত শরীর দিয়ে গান করতে থাকেন মৌসুমী। অন্ধকার হলে, মোবাইল ফোনের আলোয়, খালি গলায় মৌসুমী গাইতেই থাকেন-

আমি শুনেছি তোমরা নাকি এখনো স্বপ্ন দ্যাখো
এখনো গল্প লেখো, গান গাও প্রাণ ভরে
মানুষের বাঁচামরা এখনো ভাবিয়ে তোলে
তোমাদের ভালবাসা এখনো গোলাপে ফোটে!

হলভর্তি মানুষ গলা মেলায় মৌসুমীর সাথে। গমগম করতে থাকে এক হাজার মানুষের একসাথে মৃদু গলায় গাইতে থাকা গান। গলা মেলাই আমিও। তখন আর এই গানটি শুধু মৌসুমীর থাকে না। মৌসুমী তখন আর শুধু একজন নন। এক হাজার মানুষ তখন হয়ে ওঠে মৌসুমী ভৌমিক। দুলে দুলে গায়। মন দিয়ে, প্রাণ দিয়ে গায়। সমস্ত শরীর দিয়ে গায়-

আস্থা হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ
তোমাদের কাছে এসে দুহাত পেতেছি
আমি দুচোখের গহ্বরে শূণ্যতা দেখি শুধু
রাতঘুমে আমি কোন স্বপ্ন দেখি না
তাই স্বপ্ন দেখবো বলে আমি দুচোখ পেতেছি
তাই তোমার কাছে এসে আমি দুহাত পেতেছি।

বৃষ্টি পড়ে

জনলার বাইরে বৃষ্টি পড়ে
আকাশ টুথপেষ্টের আলোর মত মোলায়েম
তারে ঝোলা পাজামা
ভিজতে ভিজতে ঢুকে যায় আকাশে
ঘাসের মধ্যে চুপটি দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বালতি
জমছে জল, পানি, ভালবাসা।

ঘরের মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে
জানালার ভাঙ্গা কাঁচের ভিতর দিয়ে
মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাঠের গুড়ো
থতমত, দাঁড়িয়ে পড়ছে
আর মিশে যাচ্ছে গানের ভিতর দিয়ে
মেঝেময় ছড়িয়ে থাকা রঙিন পাথরে।

আকাশ জুড়ে বৃষ্টি পড়ছে
সন্ধিহান সবুজেরা দেদার ভিজছে বটে
ক্লান্তির কোন ছাপ নেই, মুশকিল বড়
এভাবে ভিজতে থাকলে
আরো সবুজ হয়ে উঠবে চারপাশ
আর হাওয়া দিলে দুলে উঠবে তারা।

মনের ভিতর যখন বৃষ্টি পড়ে
সমস্ত পাথর সবুজ হয়ে ওঠে
কাঠগুড়ো জমতে জমতে হয়ে যায় মস্ত গাছ
বালতি উপচে জল কেবল পড়তেই থাকে
ভিজতে ভিজতে একদিন
এই মন আর থাকে না শরীরে।

নেশার মাধুরী


পরশু সন্ধ্যেয় আড্ডা দেওয়ার জন্যে এক বন্ধুর অফিসে জন্যে হাজির ছিলাম আমি আর সুমেরু। খানিকটা পান ভোজন হবে, আড্ডাও হবে। দেশে ফিরে আসার পর সুমেরুর সেদিন প্রথম বাড়ি থেকে বেরুনো। অফিসে আড্ডা এজন্যে, সন্ধ্যের পরে ওটা আর অফিস থাকে না, আড্ডাঘর হয়ে যায়। কখনও একা কখনো বন্ধু সহযোগে পান ভোজন চলে।

আমি একটু দেরী করেই পৌঁছে দেখি ওরা দুজনে প্রায় দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, মদ্য ও খাদ্য আনতে যাবে বলে। অফিসে আর কেউ নেই তাই আমার জন্যে অপেক্ষা। আমি ঢোকা মাত্র সুমেরু বলে ওঠে, শুভ আজকাল সাপের ছোবল নিচ্ছে! আমার অবিশ্বাস করার কোন কারণ ছিল না। শুভকে আমি যে পরিমাণে মদ খেতে দেখি, হতেই পারে একটা সময়ে মদে আর নেশা হয় না কিংবা বোর হয়ে গিয়ে নতুন নেশার খোঁজ করা। শুভ একটা ছোট্ট বেতের মুখ ঢাকা চুবড়ি নিয়ে এলো আমার দিকে, বললো, তুমি নেবে নাকি? সুমেরুও নিয়েছে! আমি এবারে বেশ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতেই সুমেরুর দিকে তাকালাম, সুমেরু তখন খ্যাক খ্যাক করে হাসছে। মুখ ঢাকা চুবড়ি হাতে নিয়ে শুভ তখন এগিয়ে এসেছে, সাপটাকে নাকি আমার সাথে আলাপ করিয়ে দেবে। আমি রিতিমত চেঁচাতে শুরু করেছি তখন, খুলো না শুভ খুলো না ওটা।

শুভ বলছে, আরে, সুমেরু নিল তো! খুব ভাল সাপ, কিচ্ছু করবে না, একবার দেখে রাখ, তাইলে তোমায় ও চিনে রাখবে নইলে ও যদি চুবড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে তাইলে কামড়ে দিতে পারে তো! আমার বারণ অগ্রাহ্য করে শুভ সাপের চুবড়ি খুলে ধরেছে একেবারে আমার মুখের সামনে, ও মাগোওওওওও বলে প্রচন্ড চেঁচিয়ে উঠেছি, আর সাথে থরথর কাঁপুনি। চুবড়ির ভেতর থেকে মুখ বাড়িয়েছে ছোট্ট এক সাপ, ছোট্টা ফণা বের করে তাকিয়ে আছে একেবারে আমার মুখের সামনে, যেন জায়গা খুঁজছে, কোথায় দেবে ছোবল!

চেঁচানো শুনে শুভ ঝটপট চুবড়ি বন্ধ করেছে, মুখে অভিযোগ, তুমি অত ভয় পেলে কেন? ও কী কামড়ে দিত নাকি! আর সুমেরু তো বেশ পছন্দ করেছে সাপের বিষ, কী হবে? আমি অবিশ্বাসে তাকাই সুমেরুর দিকে, বলি, সুমেরু কখখনো সাপের ছোবল নিতে পারে না। ও সাপকে খুব ভয় পায়! শুভ ততক্ষণে সাপকে আবার তার জায়গায় রেখে হাতে বাজারের থলে নিয়ে মদের দোকানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে, যেতে যেতে বলে গেল, ও কিন্তু খুব ভাল সাপ! তুমি কী সত্যি ভয় পেলে না ভয়ের ভাব দেখালে?

একটি স্যুটকেস আর...

আমার তিনি দেশে ফিরেছেন আঠাশ তারিখে। আমি ও শ্বশুর মশাই দুজনেই চিন্তিত ছিলাম, সে তার জিনিসপত্র ঠিকঠাক নিয়ে ফিরবে কিনা। বিশেষ চিন্তা ছিল কাগজপত্র নিয়ে। বারে বারে ফোনে সেটাই বলে দিচ্ছিলাম, কাগজপত্র ঠিকঠাক গুছিয়ে নিও! প্যাকিং হয়েছে কী! শুনলাম প্যাকিং হয়েছে, জামা কাপড় সব ঢিল মেরে মেরে স্যুটকেসের ভেতরে ফেলে দেওয়া হয়েছে, স্যুটকেসে বন্ধ করতে গিয়ে ঝামেলা। কিছুতেই বন্ধ হয় না! তো, সেটারও সমাধান হয়েছে। সহকর্মী ভদ্রলোক স্যুটকেসের উপর বসে পড়েছেন আর ইনি সেটাকে টেনে টুনে কোনরকমে বন্ধ করেছেন! 


নেমেছেন এসে দিল্লি এয়ারপোর্টে। ভোরবেলায় কলকাতার ফ্লাইট। রাতের কয়েক ঘন্টা এয়ারপোর্টে পায়চারি করেই কাটিয়ে দিয়ে ভোরবেলায় প্লেনে উঠেই ঘুম। সকাল ন'টায় কলকাতায় প্লেন ল্যান্ড করার কথা, আমি সেইমত এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে। ন'টা বাজল, দশটা বাজল, এগারটাও বেজে গেল। এয়ারপোর্টের বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে যখন মাথা ঘুরতে শুরু করেছে তখন মনিটরে দেখলাম প্লেন এসেছে। লোকজন বেরোতে শুরু করেছে সাড়ে এগারটা থেকে। একে একে প্রায় সবাই বেরিয়ে গেল, সে আর বেরোয় না। ওর স হকর্মী ভদ্রলোকও দেখলাম বেরিয়ে এলেন। একখান স্মাইল দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। এবার বেরিয়ে এল সহকর্মী দুটি মেয়ে, তাদের দেখে আমি নিজেই স্মাইল দিলাম। এরাও পাল্টা স্মাইল দিয়ে বেরিয়ে যাবেই ধরে নিয়ে। একটি মেয়ে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে টানল, বলল, দিদি শোনো, একটা সমস্যা হয়েছে দাদাভাইয়ের, লাগেজটা আসেনি! তো দাদাভাইকে এখন অপেক্ষা করতে হবে লাগেজের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত!


আমাকে চিন্তা করতে বারণ করে মেয়ে দুটি চিন্তিত মুখে এগিয়ে গেল যার যার বাড়ির পথে। চলমান দূরভাষে তিনি, জানালেন একটু ঝামেলা হয়েছে, বেরোতে দেরী হবে, আমি যেন অপেক্ষা করি। খোঁজ নিয়ে জানলাম টিকিট কেটে এয়ারপোর্টে ঢোকা যায়, ঢুকে পড়লাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম, চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে। এগিয়ে গিয়ে ঘটনা শুনলাম, লাগেজটা আসেইনি এই বিমানে, খোঁজ চলছে, ওটা কি দিল্লি এয়ারপোর্টেই আছে না বম্বে চলে গেছে! খোঁজ পাওয়া গেল, দিল্লিতেই আছেন স্যুটকেস মহাশয়, রাতের বিমানে কলকাতা চলে আসবে আশা করা যায়, উপযুক্ত প্রমাণাদি দেখিয়ে রাতে এসে স্যুটকেস নিয়ে যেতে হবে। এয়ারলাইন্সের কাউন্টয়ারের সুন্দরী মেয়েগুলি মিষ্টি হেসে স্যার স্যার করে জানিয়ে দিল এবার আপনারা বাড়ি যেতে পারেন! একটা ফোন নম্বরও দিল এই নম্বরে খোঁজ নিলেই জানতে পারা যাবে, কি স্ট্যাটাস! হাতে চামড়ার জ্যাকেট ঝুলিয়ে ঠা ঠা রোদে বেরিয়ে এসে ও জানতে চাইল, আমরা বাড়ি যাব কি করে?! 


পোচ্চুর লম্বা হয়ে যাচ্ছে গল্পটা। শেষ করি এবারে। সন্ধ্যের পরে ফোন করে জানা গেল, স্যুটকেস উঠেছে বিমানে, বিমান কতৃপক্ষ সেটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন, কোন চিন্তা যেন না করা হয়! চিন্তা কতটুকু হচ্ছিল কে জানে তবে খানিক পরেই পরেই ও বলে উঠছিল কী অদ্ভুত না! স্যুটকেসটা একা একা বাড়ি ফিরছে! রাত এগারটায় চলমান দূরভাষে ঘন্টা বেজে ওঠে, স্যুটকেস বাড়ি পৌঁছে গেছে, নিচে গিয়ে সেটি যেন নিয়ে আসা হয়। সারাদিনের উদ্বেগের পরে বাড়ির দরজা থেকে ধন্যবাদ সহযোগে গৃহীত হয় হারিয়ে যাওয়া স্যুটকেস।

আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি

আজ দু'দিন সারাদিন এই গানটা শুনছিলাম...

আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি
তার তিন দেওয়াল যেন স্বপ্ন বেলোয়ারী
তার কাঁচ দেওয়াল যেন স্বপ্ন বেলোয়ারী
আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি

চিলেকোঠায় বসা বাদামী বেড়াল
বোনে শূণ্যে মায়াজাল
ছাইরঙা প্যাঁচা সে চোখ টিপে বসে আছে কত না বছরকাল

কালো দরজা খুলে বাইরে তুমি এলে
বাগানের গাছে হাসি ছড়াবে বনফুলে
এই বাড়ির নেই ঠিকানা
শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূণ্যে দেয় পাড়ি
সেই বাড়ির নেই ঠিকানা
শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূণ্যে দেয় পাড়ি
বাঁকানো সিঁড়ির পথে সেখানে নেমে আসে চাঁদের আলো
কাওকে চেনো না তুমি তোমাকে চেনে না কেউ সেই তো ভালো
সেথা একলা তুমি গান গেয়ে ঘুরে ফিরে
তোমার এলোচুল ঐ বাতাসে শুধু ওড়ে

সেই বাড়ির নেই ঠিকানা
শুধু অজানা লাল সুরকির পথ শূণ্যে দেয় পাড়ি
আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি ৷