Saturday, April 21, 2007

আসলে কিছু ঝড়-বাতাসের কথা..

সে এক কালবৈশাখী ঝড়ের কথা। আসলে কিছু ঝড়-বাতাসের কথা।

মাঝরাতে শুরু হয় প্রচন্ড হাওয়াসোঁ সোঁ শব্দে ঘুম ভেঙে যায়বসে থাকি চুপচাপবাইরের উথাল পাথাল বাতাস আছড়ে পড়ছে জানালায়, পলকা জানালা বেচারারা কাঁপছে থরথর বিছানায় বসে আমিওকাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে উঠে গিয়ে দেখি খাওয়ার ঘরের জানালার কাঁচ ঘরময়বোধ হয় ছিটকিনি ঠিকঠাক আটকানো ছিল না! ভাঙা কাঁচ পরিষ্কারের চেষ্টায় না গিয়ে আবার এসে বসি বিছানায়এবার ঘুরে ঘুরে দেখে নিয়েছি, সব কটা জানালা বন্ধ তো!

এইরকম সব ঝড়ের দিনে আম্মা আজান দেয়। বেশ কয়েকবছর আগে অব্দি আমার দাদি আজান দিত। প্রচন্ড ভয় পেত দাদি ঝড়-বৃষ্টিকে। আকাশে মেঘ জমতে দেখলেই দরজা  জানালা সব দৌড়ে দৌড়ে বন্ধ করা, বন্ধ করা জানালা সব আবার টেনে দেখা, সত্যিই বন্ধ হয়েছে তো? ঝড়ের বাতাসে জানালা খুলে যাবে না তো? তারপর একছুটে গোয়ালঘর, সব কটা গরু গোয়ালেই আছে তো? দেখে নিয়ে আবার পুকুরপাড়,  মনের ভুলে রয়ে যায়নি তো কোনো গরু পুকুরের পারে, খুঁটিতে বাঁধা? হাঁস-মুরগী? তারাই বা সব কোথায়? ঝড় তো এসেই পড়ল, খোয়াড়ে আছে তো তো সব কটা মুরগী, হাঁস ছানা পোনা সহ?

দৌড়ে আবার ঘরে ঢুকে সক্কলের নাম ধরে ধরে ডাকতে শুরু করত, রিতিমত চেঁচিয়ে, এই তোরা আজান দে রে! ইতিমধ্যেই আজান দেওয়া শুরু হয়ে যায় মসজিদ থেকে কিন্তু দাদি তাতে স্বস্তি পেত নাওঘরে বড়কাকাকে গিয়ে বলতো, আজান দে রে! আজান দে! কিন্তু বড় কাকার আজান দেওয়ার অপেক্ষায় দাদি থাকতো নানিজেই আজান দিতে শুরু করে দিত। চারিদিক থেকে আজান দেওয়া শুরু হলে নাকি ঝড়-বাতাস শান্ত হয়, বিপদ কেটে যায়।  দাদা চুপ করে বসে থাকতো নিজের বিছানায়

কোন গাছের ডাল ভাঙলো, কোন কচি চারাটা উপড়ে গেল জড়সমেত, সব আম কী ঝরে গেল! বেড়াটাও পড়ে গেল, সেদিনকেই তো দেওয়া হল! অন্ধকার রাতে ঝড়ের পর দাদি বড়কাকাকে সাথে নিয়ে বেরোত, হাতে বড় টর্চযেন এই মাঝরাতেই দাদি সব ঠিক করে দেবে! ঘুরে ঘুরে দাদি দেখত ঝড়ের রেখে যাওয়া চিহ্ন। নিজের বাড়ি দেখা হয়ে গেলে আশে-পাশের বাড়িগুলোও ঘুরে দেখে আসত। ঝড় থামার পর প্রায় সকলেই যে যার ঘর ছেড়ে উঠোনে বা বাড়ির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছে, কার কি ক্ষয়-ক্ষতি হলো না হলো। পাড়ার সক্কলের খোঁজ-খবর নিয়ে নিয়ে তবেই দাদি ঘরে ঢুকত।

দাদি তাঁর এই ভয় সংক্রামিত করে দিয়ে গেছে আম্মার ভিতরেএখন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই আম্মা চেঁচামেচি শুরু করে দেয়কই রে তোরা, কে কী করছিস, আজান দে! আজান দেয় মসজিদের মুয়াজ্জিন, ওঘরে বড়কাকা আর আম্মাচারপাশ থেকে আজানের আওয়াজ আসতে থাকেঝড়ের শব্দকে দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাঝড়কে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টাএক সময় ঝড় থামেআম্মা স্বস্তি পায়, স্থির হয়ে বসে, বলে, ঐ দ্যাখ, সবাই মিলে আজান দিলে ঝড় থেমে যায়! আর আব্বা চুপ করে বসে থাকে বিছানায়, ঠিক যেমন করে দাদা বসে থাকত!


সময় চলে গেছেযুগ কেটে গেছেপুরনো মুখেরা সব কবরে শুয়েযাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা নিজেদের রেখে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মে কেমন করে জানি না কিন্তু দাদা আর দাদি ভীষণভাবে রয়ে গেছেন আব্বা আর আম্মার ভেতরে..

No comments:

Post a Comment