Saturday, April 21, 2007

আসলে কিছু ঝড়-বাতাসের কথা..

সে এক কালবৈশাখী ঝড়ের কথা। আসলে কিছু ঝড়-বাতাসের কথা।

মাঝরাতে শুরু হয় প্রচন্ড হাওয়াসোঁ সোঁ শব্দে ঘুম ভেঙে যায়বসে থাকি চুপচাপবাইরের উথাল পাথাল বাতাস আছড়ে পড়ছে জানালায়, পলকা জানালা বেচারারা কাঁপছে থরথর বিছানায় বসে আমিওকাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে উঠে গিয়ে দেখি খাওয়ার ঘরের জানালার কাঁচ ঘরময়বোধ হয় ছিটকিনি ঠিকঠাক আটকানো ছিল না! ভাঙা কাঁচ পরিষ্কারের চেষ্টায় না গিয়ে আবার এসে বসি বিছানায়এবার ঘুরে ঘুরে দেখে নিয়েছি, সব কটা জানালা বন্ধ তো!

এইরকম সব ঝড়ের দিনে আম্মা আজান দেয়। বেশ কয়েকবছর আগে অব্দি আমার দাদি আজান দিত। প্রচন্ড ভয় পেত দাদি ঝড়-বৃষ্টিকে। আকাশে মেঘ জমতে দেখলেই দরজা  জানালা সব দৌড়ে দৌড়ে বন্ধ করা, বন্ধ করা জানালা সব আবার টেনে দেখা, সত্যিই বন্ধ হয়েছে তো? ঝড়ের বাতাসে জানালা খুলে যাবে না তো? তারপর একছুটে গোয়ালঘর, সব কটা গরু গোয়ালেই আছে তো? দেখে নিয়ে আবার পুকুরপাড়,  মনের ভুলে রয়ে যায়নি তো কোনো গরু পুকুরের পারে, খুঁটিতে বাঁধা? হাঁস-মুরগী? তারাই বা সব কোথায়? ঝড় তো এসেই পড়ল, খোয়াড়ে আছে তো তো সব কটা মুরগী, হাঁস ছানা পোনা সহ?

দৌড়ে আবার ঘরে ঢুকে সক্কলের নাম ধরে ধরে ডাকতে শুরু করত, রিতিমত চেঁচিয়ে, এই তোরা আজান দে রে! ইতিমধ্যেই আজান দেওয়া শুরু হয়ে যায় মসজিদ থেকে কিন্তু দাদি তাতে স্বস্তি পেত নাওঘরে বড়কাকাকে গিয়ে বলতো, আজান দে রে! আজান দে! কিন্তু বড় কাকার আজান দেওয়ার অপেক্ষায় দাদি থাকতো নানিজেই আজান দিতে শুরু করে দিত। চারিদিক থেকে আজান দেওয়া শুরু হলে নাকি ঝড়-বাতাস শান্ত হয়, বিপদ কেটে যায়।  দাদা চুপ করে বসে থাকতো নিজের বিছানায়

কোন গাছের ডাল ভাঙলো, কোন কচি চারাটা উপড়ে গেল জড়সমেত, সব আম কী ঝরে গেল! বেড়াটাও পড়ে গেল, সেদিনকেই তো দেওয়া হল! অন্ধকার রাতে ঝড়ের পর দাদি বড়কাকাকে সাথে নিয়ে বেরোত, হাতে বড় টর্চযেন এই মাঝরাতেই দাদি সব ঠিক করে দেবে! ঘুরে ঘুরে দাদি দেখত ঝড়ের রেখে যাওয়া চিহ্ন। নিজের বাড়ি দেখা হয়ে গেলে আশে-পাশের বাড়িগুলোও ঘুরে দেখে আসত। ঝড় থামার পর প্রায় সকলেই যে যার ঘর ছেড়ে উঠোনে বা বাড়ির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছে, কার কি ক্ষয়-ক্ষতি হলো না হলো। পাড়ার সক্কলের খোঁজ-খবর নিয়ে নিয়ে তবেই দাদি ঘরে ঢুকত।

দাদি তাঁর এই ভয় সংক্রামিত করে দিয়ে গেছে আম্মার ভিতরেএখন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই আম্মা চেঁচামেচি শুরু করে দেয়কই রে তোরা, কে কী করছিস, আজান দে! আজান দেয় মসজিদের মুয়াজ্জিন, ওঘরে বড়কাকা আর আম্মাচারপাশ থেকে আজানের আওয়াজ আসতে থাকেঝড়ের শব্দকে দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাঝড়কে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টাএক সময় ঝড় থামেআম্মা স্বস্তি পায়, স্থির হয়ে বসে, বলে, ঐ দ্যাখ, সবাই মিলে আজান দিলে ঝড় থেমে যায়! আর আব্বা চুপ করে বসে থাকে বিছানায়, ঠিক যেমন করে দাদা বসে থাকত!


সময় চলে গেছেযুগ কেটে গেছেপুরনো মুখেরা সব কবরে শুয়েযাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা নিজেদের রেখে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মে কেমন করে জানি না কিন্তু দাদা আর দাদি ভীষণভাবে রয়ে গেছেন আব্বা আর আম্মার ভেতরে..

মন ভাল হলে আমি নদীর ধারে যাই


কবেকার এক ছোট্ট বার্তা ভেসে ওঠে চোখের সামনে, সেলফোন না খুলেই, 'প্রজাপতি হয়ে ওঠো!'


আর সত্যি সত্যিই আমি প্রজাপতি হয়ে উঠি! উড়ে উড়ে বেড়াই এঘর থেকে ওঘরে। আয়নায় নিজেকে না দেখেও বুঝতে পারি, আমাকে কী সুন্দর লাগছে আজ!

গোছানো ছিমছাম হয়ে ওঠে আমার অগোছালো ঘর দোর। হাতে উঠে আসে তাকে তুলে রাখা প্রিয় বই।


গেয়ে ওঠেন ফিরোজা বেগম- 
মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম
যুগলরূপে এসেছি গো আবার মাটির পরে
মোরা আর জনমে হংসমিথুন ছিলাম।


আর গাইতেই থাকেন একের পর এক গান। আমার জন্যে।
শুধু আমারই জন্যে।


খানিকটা কী মন খারাপ হয় গোলাম আলীর! তা বোধ হয় হয় না! কী জানি! এখন আমার মন ভাল। আমি তাই উড়ে উড়ে বেড়াই। এই ঘরময়। বারে বারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নেট সংযোগের চেষ্টা করেই যাই, অক্লান্ত।


বাইরে ঝকঝকে রোদ্দুর। ন্যাড়া ডালে ডালে টকটকে লাল পলাশ। জামগাছ জুড়ে মুকুল। পাতা দেখা যায় না। ডাল দেখা যায় না। শুধু জামের মুকুল। যেন ফুলেরা ফুটে আছে থরে থরে.. জামগাছময়...


নদীর ধার ধরে জেগে থাকে এক চর। বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে নদীর তীর ধরে। বহুদূর। রাস্তা আর চরের মাঝেও নদী, খালের মত দেখতে। হাঁটুজল সেই খালের মত দেখতে নদীতে। গরুরা দিব্যি হেঁটে, সাঁতার কেটে পেরিয়ে যায় খালের মত দেখতে এই নদী। চলে যায় চরে। কচি সবুজ ঘাসেরা যেখানে বিছিয়ে আছে চর জুড়ে। মানুষেরা পারে না। জলে নামলে যে কাপড় ভিজে যাবে! মানুষেরা রাস্তার ধারে বসে নদী দেখে। নদীর ধারের চর দেখে। আর দেখে খালের মত দেখতে সেই নদীকে।


আমিও বসে থাকি রাস্তার ধারে, খালের মত দেখতে নদীর পার ঘেঁষে। তারপর উঠে নেমে যাই জলে। খালের মত দেখতে নদীর জলে। হেঁটে, সাঁতরে পেরিয়ে যাই ছোট্ট এই নদী। যাকে দেখতে একদম খালের মত। উঠে যাই চরে। চওড়া ফিতের মত চরে বিছিয়ে আছে সবুজ ঘাসেরা। কোমল স্পর্শ পাই পায়ের পাতায়। আমার পায়ের পাতায় হাত বুলিয়ে দেয় প্রকৃতি। এগিয়ে যাই চরের শেষ মাথায়, নদীর পারে। বসে থাকি চুপচাপ।


গেয়ে ওঠেন ফিরোজা বেগম- তুমি কী এখন দেখিছ স্বপন/ আমারে। আমারে। আমারে/ আধোরাতে সেথায় উঠেছে কী চাঁদ/  আধারে...


এর আগেও আমি বহুবার এসেছি এই চরে। জল ভেঙ্গে যেতে হয় সেই চরে। তবে কখনও একা আসিনি। তুমি ছিলে সবসময়েই সাথে। এখানে, এই নদীর ধারে এলেই তুমি বড় চুপ হয়ে যাও। তোমার কি মন খারাপ হয়! মনে কী পড়ে ছেলেবেলার কথা!


আমার মন ভাল হলে আমি তোমার সাথে নদীর ধারে আসি। বর্ষায়। শীতে। আর বসন্তে। বসে থাকি রাস্তার ধার ঘেঁষে। নদীর ধারে।

সে প্রেমের ঘাটে ঘাটে বাঁশি বাজায়...এ পদ্মা নয়। খানিকদূর এগিয়ে গিয়েই যদিও পদ্মা হয়ে যায়।
তবে কী এও পদ্মাই!

মন ভাল হলে গঙ্গা আর পদ্মা এক হয়ে যায়।

রাস্তার ধার ধরে চুপ করে বসে থেকেও আমি হেঁটে সাঁতরে পেরিয়ে যাই খালের মত দেখতে ছোট্ট নদী। কচি সবুজ ঘাসের কোমল স্পর্শ নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই চরের শেষ মাথায়। বসে পড়ি জলের ধার ঘেঁষে।
বসেই থাকি...

Sunday, April 15, 2007

ছাদের কথা


রাতের বেলায় চাঁদের আলোয়
লোকজনের ভীড়
গানে গল্পে ছড়া আর
কবিতাতে উন্নত মম শির।
বিড়ালখানা ল্যাজ গুটিয়ে
কোলের পরে এসে,
চাঁদের আলো খেলছে ভালো
একলা হেসে হেসে।
শ্যাওলা রঙে আঁকা ছিল
হরেক দেশের ম্যাপ,
সুরের গুতোয় হুড়মুড়িয়ে
চাইছিল ড্যাবড্যাব।
গাছের ডালে বাঁধা ছিল
ছোটবেলার ঘুড়ি,
কথায় কথায় গরম চা
তেলেভাজা আর মুড়ি।
কাজের কথা নৌকো হয়ে
পুকুরঘাটে দোলে,
ফিরবো বাড়ি
সবাই এখন
ছাদের কথা ফুরোলে। ।

এমনি এমনি



আজ সকাল থেকেই ভীষণ আলস্য।


কিছুই ভাল লাগছে না।


একটা লেখা পড়ে আছে আধ খামচা হয়ে। শেষ করতেও ইচ্ছে করছে না। থাক না পড়ে... কী হবে...


ঝুমুরের গল্পটারও একই অবস্থা, দুটো প্যারাগ্রাফের পরে আর এগুলোই না! ইচ্ছে করে না...


ইচ্ছে করে না...


এই দু-তিন দিন বেশ স্ফুর্তিতে ঘুরে বেড়ালাম। ছুটে ছুটে করলাম জমে ডাই হয়ে থাকা কাজ- কম্মো সব। আজকে হঠাৎই আবার পেয়ে বসল এই আলস্য। ভাল না লাগা।


মাঝরাতে ক্রীং ক্রীং...


ভালো লাগে না...


ভালো লাগে না...


ভালো লাগে না...


আমি ভালো নেই তুই কি জানিস?!


আজকে অরন্ধন। খানিক বসে কমেন্টালাম। তারপর মনে হল এই এলোমেলো দুটি কথাই নাহয় লিখে দিই! বেশ ক্ষিদে ক্ষিদে পাচ্ছে বটে! নাহ... এই ডায়েটিং আর আমার দ্বারা হল না। কিন্তু অরন্ধন যে! দেখি। ফ্রীজে কিছু না কিছু তো নিশ্চয়ই পেয়েই যাব!


একটা ছোট প্রেশার কুকার কিনতে হবে। টানা দুদিন ধরে গরু সেদ্ধ করাটা কোন কাজের কথা নয়! কবে যে একটু সাংসারিক বুদ্ধি হবে! কবে?


মনমোহন কয় পাগল পাগল
পাগলামী কি গাছেরও ফল...
ভোরবেলায় ভিক্টোরিয়ায় চলে গেলেও হত। কিন্তু ঐ আলস্য! সারারাতের আধ-খামচা ঘুমের পরে সকালবেলায় চোখের পাতা কিছুতেই খুলতে চায় না যে মাঝে মাঝে শুধু চোখ পিটপিট করে ঘড়ি দেখা, সাতটা কি বেজে গেলো?


কাল ঠিক যাবো...
নাহ এবার উঠতেই হচ্ছে...

চিঠি আসে কেন?


রাত্রি হলে সব থিতিয়ে পড়ত, কিন্তু এখন রাত্রি নয়।

খাতা নিয়ে বসে আছি।তুমি নেই।
তুমি কোথায় যে থাকো আজকাল।

সারা ওলিপাব জুড়ে আঁশটে গন্ধ, চোখ কচলালে মনে হয় রাত্রি নেমেছে, কিন্তু এখন রাত না।
অনেক রাতে তুমি থাকো না, মনে মনে চিঠি লিখি। কখনো বা দীর্ঘএস এম এস।
এপাশ করতে করতে টিলোস রেডিও বা হিরোস্কোয়ারের শান্তি মিছিলে, মোমবাতি কত আর জ্বলবে?

উলোই উৎসা থেকে হলুদ মেট্রোতে হিরোস্কোয়ার। এখন সেখানে স্কেটিঙ নেই। ঝকঝকে রোদ।

আমার জন্যে আর কত দিন বসে থাকবেন ভ্যান গফ!

আমি বসে আছি।

আমি বসে আছি।

এক ছোট্ট আলাপ জিকোর সাথে


কলকাতায় ফেরার আগের দিন দুপুরবেলায় চলমান দূরভাষে এক অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন। কে হতে পারে ভাবতে ভাবতে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, ......বৌদি কথা বলছেন কী? বৌদি শুনে প্রথমে ভাবলাম রঙ নাম্বার কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল হল, বৌদির আগে যে নামটি ইনি উচ্চারন করেছেন সেটি আমারই! কে বলছেন জানতে চাইলে জবাব এলো, আমি জিকো বলছি। সাথে সাথেই চিনতে পারলাম, ইনি ইশতিয়াক জিকো! আরও বললেন, আমাকে দাদা মেল করে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন!

এই 'জিকো' নামটির সাথে আমার পরিচয় অর্কুটের সুত্রে। আমার বরের স্ক্র্যাপবইয়ে জিকোর স্ক্র্যাপ দেখেছি বেশ কিছু। আর ওকেও দেখেছি জিকোর স্ক্র্যাপের উত্তর দিতে মহা উৎসাহে! আমার তিনি স হজে কারও ভক্ত হন না। কথা হয়তো সবার সাথেই বলেন, কিন্তু সেগুলো শুধু বলতে হয় বলেই বলা। কাজেই তিনি যখন কারও সাথে মহা উৎসাহে কথা বলেন, ভক্ত হন, আমার সমীহ জাগে সেই মানুষটির সম্পর্কে। জিকোর সম্পর্কেও তাই হয়েছিল। আমি ব হুবার জিকোর প্রোফাইলে গেছি, ওর স্ক্র্যাপ পড়েছি, ওর ব্লগও পড়েছি কিন্তু কখনও কথা হয়নি জিকোর সাথে। সেই জিকোর ফোন পেয়ে আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই রোমাঞ্চিত!

জিকো জানালো, আমার বর মেল করে কিছু ডিভিডি ও অডিওর খোঁজ চায়, যেগুলো আমি খুঁজে পাইনি। আমি পরদিনই চলে আসছি শুনে জিকো জানায়, সন্ধ্যের মধ্যে ও আমাকে ফোন করে জানাবে, কিছু পেল কীনা। বিকেলটা আমার ব্যস্ত কাটলো গোছগাছ করা আর বোনকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসায়। আমি জিকোর ফোনের অপেক্ষা করি। জিকো ফোন করে জানায়, ডিভিডি একদিনে খুঁজে পাওয়া গেল না তবে ময়মনসিংহগীতিকা একটা ওর কাছে আছে যেটা ও দিয়ে দিতে চায়। আমি নিজে গিয়ে ওটা নিয়ে আসতে পারবো না বলে জিকো আসে আমার বোনের বাসার সামনে। তখন পাওয়ার ছিলো না। শুধু মেন রোডে আলো জ্বলছে। অনধকার গলিতে ও কোথায় বাসা খুঁজে বেড়াবে ভেবে আমি ওকে মেন রোডেই অপেক্ষা করতে বলি। মোবাইল ফোনের আলোতে রাস্তা দেখে পৌঁছে যাই মেন রোডে আর দূর থেকে দেখেই কখনোও না দেখা জিকোকে চিনতে পারি।

স্ট্র ীট লাইটের আলোতে দাঁড়িয়ে জিকোর সাথে কথা বলি আধঘন্টারও বেশি। কথা হয় লেখালেখি নিয়ে, সিনেমা নিয়ে। আমি কি নিয়ে লিখতে পছন্দ করি, কার উৎসাহে এই লেখালেখি জানতে চায় জিকো। এবং উত্তরটাও জিকোই দেয়, নিশ্চয়ই দাদা! আমি হেসে ফেলি। খুব অল্প কথা হয় ওর সাথে কিন্তু ঐ অল্প সময়েই অনেক বিষয়ে কথা হয়। একটু একটু করে। যেন বুড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া।

আমি বেশ অবাক হই জিকোকে দেখে। ও যে একদম পুচকে একটা ছেলে এ আমার ধারণাই ছিলো না। আর মজার ব্যপার হল, জিকোকে দেখে, ওর সাথে কথা বলে আমার সমীহ নয়, বন্ধুত্ব নয়, বড়বোন সুলভ এক অনুভূতি হল!! খুব আপসোস হল, আগে কেন ওর সাথে দেখা হয়নি ভেবে। বলেও ফেললাম সেকথা। জিকো বললো, পরেরবার দেখা হবে! বারে বারেই জিকো বলছিলো, আরেকটা দিন সময় পেলে ও ঠিক খুঁজে বের করতে পারত আমার বরের দেওয়া লিষ্টের অন্তত কিছু সিনেমা-গান। রাত প্রায় সাড়ে নটায় আমি বিদায় নিলাম জিকোর কাছ থেকে। ওরও অবশ্যই দেরী হচ্ছিল। এত দূর থেকে এই রাতেরবেলা সে ছুটে এসেছে নিজের সংগ্রহের এক বই দিতে এক অজানা-অচেনা (?) বন্ধুর স্ত্র ীকে। আমার বারে বারেই মনে হচ্ছিল এ শুধু আমার দেশের মানুষই পারে!


ঐ ছোট্ট এক দেখা - আলাপ এখনও পর্যন্ত আমার মন জুড়ে আছে।

এবার দেশে গিয়ে অনেক বন্ধুপ্রাপ্তি হয়েছে। এই ব্লগের সুত্রে। যাদের প্রত্যেকের কথাই একে একে লেখার ইচ্ছে রইল।


ধন্যবাদ কনফুকে।

Saturday, April 14, 2007

এই পুচকেটা আমার বোনের


এই পুচকেটা আমার বোনের।

রবিবার সন্ধ্যেয় সে পৃথিবীর আলো দেখে।

ওর আসার কথা ছিল আরও একমাস পরে কিন্তু ওর বোধ হয় ভীষণ তাড়া ছিল পৃথিবীর আলো দেখার যার জন্যে সে এক মাস আগেই চলে আসে।

আমার বোন বলে, ওর নাকি খালামণিকে দেখার তাড়া ছিল। একমাস পরে এলে সে খালামণিকে দেখতে পেত না তাই একমাস আগেই...

সেদিন সন্ধ্যেয় যখন ওটি থেকে বেরিয়ে ডাক্তার আমার হাতে ওকে দিলেন, আমি ওকে দেখে একেবারে অভিভূত! কী মিষ্টি কী মিষ্টি! মায়ের গায়ের ওড়নাতে জড়ানো এক দেবশিশু আমার দু হাতের মধ্যে।

কোন এক জরুরী কাজে এই পুচকের বাবা তখন হাসপাতালের অন্য ফ্লোরে। ওটির সামনে শুধু আমি! জরুরী ভিত্তিতে বোনকে হাসপাতালে ভর্তি করায় কেউই তখনও পর্যন্ত হাসপাতালে এসে পৌঁছুতে পারেনি। বোন ভালো আছে ডাক্তারের এই আশ্বাসবাণীতে একটুও আশ্বস্ত না হয়ে পুচকেকে কোলে নিয়ে ওটির সামনে বসে পড়ি একটা চেয়ার চেয়ে নিয়ে রিতিমত ধর্না দিয়ে। বোনকে না দেখে এখান থেকে নড়ছি না !

সময়ের আগেই পৃথিবীতে চলে আসার দরুন হয়ত ও একটু চুপচাপ ছিল। নো কান্নাকাটি। আধফোটা চোখ দিয়ে মাঝে মাঝে শুধুপিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল, কোথায় এলো!!

এই শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে থাকাকালীন আমার একবারও মনে হয়নি যে ও একটি  ছেলেসন্তান। ও শুধুই এক শিশু। এক মানবশিশু। যাকে দেখার জন্যে আমার ছোট্ট বোনটা হয়ত অজ্ঞান অবস্থায়ও ছটফট করছে। ওকে কোলে নিয়ে আমি ভুলে যাই, ছেলে সন্তানের জন্যে কী ভীষণ আকাঙ্খা নিয়ে এই আট মাস অপেক্ষা করেছে আমার বোনের স্বামী । আমি ভুলে যাই, মেয়ে হলে তাহলে তার স্বামীর প্রতিক্রিয়া কী হবে তাই নিয়ে আমার বোনের দুঃশ্চিন্তা। আমার একবারও মনে হয় না, ছেলে হওয়াতে আমার বোন নিশ্চিন্ত হবে। তার স্বামী খুশি হবে। আমি শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম এই দেবশিশুকে দেখার পর আমার বোনের মুখে ফুটে উঠবে পবিত্র এক স্বর্গীয় হাসি। এক মায়ের হাসি।

এই পুচকে, 
তুই যেন তোর মায়ের ছেলে হোস এই খালামণির শুধু এটাই প্রার্থনা।

ভালো থাকিস..

মায়ের কোল জুড়ে থাকিস..

জ্বরবুড়ির জন্য ছোট্ট চিঠি


এখন দেশে ও দেশান্তরে অনেক রাত।


এমন রাতে আমি অবশ্য ঘুরে বেড়াই।


৪ বা ৬নম্বর  ট্রাম ধরে পেস্টে চলে যাই, দানিয়ুব পেরোলেই কিছু শব্দ। এখানকার জায়গাগুলো চেনা নামে ছকে নিয়েছি নিজের মত করে। নুগ্যতিটার কে গৌহাটি বললে সকলেই দেখেছি বুঝতে পারে। আমি আসছি দিল্লি থেকে, স্টপের নাম দেল প্যালিদুযার। যার পরের স্টপ মস্কো, বোর্ডে নাম ফুটে ওঠে, মস্ক ভাটিয়ের। আর একটা শব্দ চিনি, ভিগালমস, দিল্লি বা মস্কো সব যায়গায়, ভিগালমস,  ট্রাম বা বাস খালি করে দাও।


এমন না বোঝা আর এক ঝাঁক নিজের শব্দের ভিতের দাঁড়িয়ে জোনাকিদের বড় চেনা লাগে, কিন্তু কারুরই তো নাম জানি না। ওক্তোগান, ব্লাহা টের, আর আমাদের কলেজ স্ট্রিট রাকোসি উত পেরিয়ে ডেরেকটের। হুঁ হুঁ বাওয়া রাত এখানে বাচ্চা। ঠান্ডা বাড়ছে চোঁ চোঁ করে, আর ভিড়।


সম্ভবত উইক এন্ড। বার পাব জমজমাট। ঘসা কাঁচের ওপাশে স্ট্রিপটিজ চলছে। বদলে যাওয়া রঙের ভিতর নারী শরীর স্পষ্ট। মোবাইলে তাই ধরার চেস্টা করি আর সে ফসকে ফসকে যায়। দুপাশ থেকে দুজন মহিলা এসে টানতে শুরু করে হাত। নেম নেম বলাতে বদলে যায় হাবভাব, চেঁচায়, পাপারাতজি পাপারাতজি বলে।


হিরো স্কোয়ারে বাচ্চারা স্কিয়ং করছে, আর দুপাশে দুটো মিউজিয়াম, একটাতে হাত কামড়ানো ভ্যান গফ, অন্যটায় সেই ল্যাম্প শেড। ফোরেন্ট যা আছে তার জন্য রাস্তাই বেশ।


রবিনের কাছে বসে তার গত তিন বছরে প্রেমের অক্লান্ত ইতিহাস। গীর্জার ঘন্টা বাজে মাহিদুল ইসলাম রবিন ঘন্টার হিসাব পেয়ে নামাজ পড়তে উঠে পড়ে। তার ঘরের দেওয়ালে চন্দ্র মাসের ক্যালেন্ডার, দেশের সময় তার ঘরের দেওয়ালে, যা দেখে রোজই হাসি, তিন বছর তো হল', ও হ্যাঁ এই তিন বছরে রবিন দেশে যায়নি একবারও।


মনে হয়, নান্নীএম্মুরর কথা। ও নিশ্চয় নামাজ পরছে, অন্য ফোনটা থেকে নম্বর নিয়ে মিস কল দেওয়ার চেস্টা করি। পায় কি পায না, কে জানে, ঘোত ঘোত আওয়াজ।


তুমি যদি না ঘুমিয়ে থাক? নাহ এখন ফোন বাজানো ঠিক হবে না। ক'দিন যা ভুগলে। কাল দোল, নিশ্চয় রঙ খেলবে না। লুকিয়ে চুরিয়ে একটু সময় করে ছবি বন্দোপাধ্যায়ের হোরিখেলা শুনো, আমিও এখানে শোনার চেস্টা করছি। নাহ পাই না। এখানে বসন্ত এখনো আসেনি। রোজই জল ঝরছে। কিন্তু আমারো একটা অন্য ঘড়ি আছে, যতই রবিনের উপর হাসি। তাই কাল দোল এটা মাথায় নড়ে। ছবি বন্দোর কীর্তন শুনতে ইচ্ছে করে।


আমি কীরকম একটা জবুথবু বাঙালি হয়ে পড়ছি দিনদিন।

মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা


আজ হঠাৎ করেই বেশ ভিজে গেলাম।


মন খারাপের বৃষ্টিতে।


বছর পয়লার বৃষ্টিতে।


এই বৃষ্টি আমার ভালোবাসার।


এই বৃষ্টি তার জন্যে আমার মন কেমন করার।


গতরাতে শোনা - 'মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা।'


গুন গুন সুরের অনুরণন কানে-মনে-প্রাণে ।


না! আজ তো প্রথম বৃষ্টি হয়নি! আগেও তো হয়েছে বোধ হয়। মনে পড়ছে না। আমি আজ ভিজে গেলাম। এই বৃষ্টিতে সে ভিজলো না এই ভেবে আমার চোখ ভিজে গেল। ভেতর থেকে উঠে আসা বৃষ্টিতে।


হুঁ। কাল রাতেই তো বৃষ্টি হয়েছিল! আজকাল বড্ড ভুলে ভুলে যাই।


আর কাল রাতেই তো ভাবছিলাম, আমার মন খারাপ হলেই কি বৃষ্টি হয়!


কিছুটা কাজ আর বেশ কিছু অকাজ নিয়ে বেরিয়েছিলাম দুপুরে। ফেব্রুয়ারীর পয়লা সপ্তাহেই শীত গায়েব এই শহর থেকে। হালকা একটু পাখাও চালাতে হচ্ছে। তো কোন গরম জামা কিংবা চাদর না নিয়েই বেরিয়েছি। সন্ধ্যেতেই ফিরব ভেবেছিলাম। ছোটখাট দুটো অকাজ সেরে আরেকটা কাজ সারতে রাস্তায় নামার আগেই দেখতে পেলাম গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে! আর আকাশও বেশ সেজেছে! বেশ ঘাবড়ে গেলাম। ছাতা নিয়ে তো ঘোর বর্ষাতেও বেরুই না আর এখন নাকী বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। বাসের জন্যে দাড়িয়ে থাকতে থাকতেই ভিজে কাকিনির  অবস্থা। ভিড়ে ঠাসা বাসে কোনমতে উঠে জড়সড় দঁড়িয়ে দুটো ষ্টপ পরেই গন্তব্যে পৌঁছুলাম যখন, তখন মুষলাধার বৃষ্টি!


ছুট্টে বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশের দোকানের শেডের তলায়! যেখানে যাচ্ছি সে মিনিক পাঁচেকের হাঁটা পথ এখনও! বৃষ্টি থাম এবার ! বৃষ্টি থাম এবার! এই থামল এতক্ষণে! পায়ে পায়ে গুটিসুটি আমি এক বন্ধুর অফিসের দরজায়!


অল্প একটুখানি কাজ আর অনেকখানি গল্প সেরে বাড়ি ফেরার জন্যে যখন উঠে দাঁড়াই ততক্ষণে জামা কাপড় শুকিয়ে খানিকটা ভদ্রস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছি । রীতিমত কাঁপছি ঠান্ডায়। যেন কান পাতলেই শুনতে পাব ঠকঠক ঠকঠক। খানিকটা ঠান্ডা আর অনেকখানি মনখারাপের।




মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয় ব্যাকুল হলে তিস্তা
মন খারাপের খবর আসে বনপাহাড়ের দেশে।
চৌকোণো সব বাক্সে।
যেথায় যে মন থাক সে ।
মন খারাপের খবর পড়ে দারুন ভালোবেসে।
মেঘের ব্যাগের ভিতর ম্যাপ রয়েছে মেঘ পিওনের পাড়ি
পাকদন্ডি পথ বেয়ে তার বাগান ঘেরা বাড়ি ।
বাগান শেষে সদর দুয়ার বারান্দাতে আরামচেয়ার
গালচে পাতা বিছানাতে ছোট্ট রোদের থালি
সেথায় এসে মেঘপিওনের সমস্ত ব্যাগ খালি ।
মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয় ব্যাকুল হলে তিস্তা ।

চিঠি



ব্যাঙ্কের লকারে রাখা বড় গয়নার বাক্‌সোটা সব সময় খোলা হয় না।
তিন তাকের এই গয়নার বক্স যদিও বা মাঝে সাঝে খুলি ওর নিচের তাক অব্দি যাই না অনেককাল। কারণ আমি জানি, ঐ নিচের তাকে কোন গয়না রাখা নেই। আছে কিছু চিঠি। প্রেমপত্র বলাই ভাল।

গতকাল হঠাৎ করে উপরের তাক দুটি নামিয়ে নিচের তাকে চোখ রাখলাম। নীল, গোলাপি সব খাম। আমার নাম লেখা সেই খামে। ভেতরে সব চিঠি। একের পর এক তারিখ অনুযায়ী রাখা সব চিঠি। ব্যাঙ্কের ভল্টে বেশিক্ষণ বসে থাকার নিয়ম নেই তবুও বেশ অনেকক্ষণ বসে রইলাম সেই চিঠিগুলো হাতে নিয়ে। আর আশ্চর্য হয়ে গেলাম, আমার ভেতরে কোনো অনুভুতি জাগল না দেখে!

না। কো্নো অনুভুতিই জাগলো না। সেই আশ্চর্য ভাব নিয়েই বেশ খানিকটা সময় বসে রইলাম। কিছু স্মৃতি যেন খুঁজে পেতে বের করলাম। এই  সেই চিঠির গোছা। এক সময় যারা আমার কাছে এত মূল্যবান ছিল যে আমি তাদেরকে ব্যাঙ্কের লকারের নিরাপত্তা দিতে চেয়েছিলাম। গয়নার বাক্সের সবচেয়ে গোপনতম জয়গাটি নির্দিষ্ট করেছিলাম তাদের জন্যে। মাঝে মাঝেই অকারণেই ব্যাঙ্কের ভল্টে গিয়ে লকার খুলে চিঠির গোছা হাতে নিয়ে বসে থাকতাম। খুলে খুলে পড়তাম। লোহার দরজার বাইরে থেকে আওয়াজ আসতো, ম্যাম, দেরী হবে আপনার? না না। এই তো হয়ে গেছে বলে ঝটপট আবার সব বাক্সবন্দী করে চোখ মুছে হাসিমুখে বেরিয়ে আসতাম লকার রুম থেকে।

কানে বাজতো গুন গুনিয়ে -
তেরে খুশবু মে বসা খত ম্যায় জ্বালাউ ক্যায়সে
তেরে হাথো সে লিখা খত ম্যায় জ্বালাউ ক্যায়সে ...

সে কবেকার কথা? মনেও পড়ে না। বহুকাল পরে আজ আবার সেই চিঠির গোছা আমার হাতে। কিন্তু কি আশ্চর্য রকমের নিরাসক্ত আমি। এই চিঠির গোছা আজ আমার চোখে জল এনে দেয় না। নিজের মনেই হেসে ফেলি আমি, কী ভীষণ বোকা আমি! গয়নার বক্সের সবচেয়ে গোপনতম স্থানে আমি চিঠি রেখে দিয়েছিলাম! নিজেকেই প্রশ্ন করি, এই যে চিঠির প্রতি সেই টানটা আর রইল না, তার মানে কী মিথ্যে ছিল সেই অনুভুতি? সেই গোপনীয়তার প্রয়োজন আজ এমন করে ফুরিয়ে গেল কিভাবে?

নাকি আমিই বদলে গেছি? সেদিনকার সেই আমাতে আর আজকের আমাতে কত তফাৎ? এক সময় যা ছিল রাত্রি-দিনের ভাবনা আজ সেসব সত্যি বলতে কী, সব সময় মনেও পড়েও না। হয়ত
কোনো কোনো অলস দুপুরে কিংবা ঘুম না আসা কোনো একলা রাতে মনে পড়ে , কিন্তু সে নিয়ে কোনো ভাবের উদ্রেক আর হয় না। আমি এক নিরপেক্ষ দর্শক আজ। এই চিঠির গোছার। সেই সময়ের..