Saturday, February 17, 2007

কলকাতা বইমেলা ২০০৭


গতকাল বইমেলা ঘুরে এলাম।

এতদূরের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যাওয়া ও আসার হ্যাপা পুষিয়ে গেল বইমেলাকে বইমেলারই মত দেখে। দুপুর দুপুর গেছি, তখনও মেলা অতটা জমেনি, কিছু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইতঃস্তত, এদিক-সেদিক ।

মাঝ ফেব্রুয়ারীতে বৃষ্টির হাত ধরে ফিরে আসা শীতের শেষ দুপুরে হাল্কা রোদের ওম গায়ে গায়ে মেখে এগোই ষ্টেডিয়ামের গা ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়া সরু পীচের রাস্তা ধরে। বইএর দোকানগুলো বেশ ফাঁকা ফাঁকা, বৃষ্টির হাত থেকে বইকে বাঁচানোর চেষ্টায় যতটা ডিসপ্লেতে না রাখলেই ন্য ততটাই আছে ডিসপ্লেতে বাদবাকি বই বেশিরভাগই এখনও বাক্সবন্দী । কিছু মানুষ, যাঁরা সব রকমের মেলাতেই হাজির থাকেন, তাঁরা এই মেলাতেও আছেন। মেলার একদিকের অল্প কিছু চা-কফি, চপ কাটলেটের দোকানে তাঁদের ভীড় আর উল্লেখযোগ্য ভীড় ষ্টেডিয়ামের থাক থাক সিঁড়িতে। সেখানে যুগলেরাই সংখ্যায় বেশি, বিলম্বিত ভ্যালেন্টাইন উদযাপনে ব্যস্ত।

৯ই ফেব্রুয়ারী বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্ভোদন হয়ে গেলেও মেলা কার্যত শুরু হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারী, অন্তত টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে এইদিন থেকে। আমি যদিও মেলায় ঘুরে গেছিলাম উদ্ভোদনের পরদিন, তখন এমনকি বইএর ষ্টলও রেডি হয়নি। চারদিকে বাঁশ, প্লাইউডের বড় বড় টুকরো, হাতুড়ি আর করাতের আওয়াজ। মেলা প্রাঙ্গন জুড়ে কিছু মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন সেদিনও । তখনও মন্ডপ সাজেনি, তখনও দেবীমুর্তির কাঁঠামো শুধুই বাঁশ আর খড়ের ।

দুপুর দুপুর মেলায় হাজির হয়েছিলাম, মেলায় তখনও অতটা ভীড় হয়নি । ফাঁকায় ফাঁকায় ঘুরে ফেললাম মেলার এমাথা থেকে ওমাথা । মাইকে মৃদু লয়ে বাজছে, গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা। মাঝে মাঝেই কিছু একটা ঘোষনা, আবার গান। বলতে ভুলে গেছি, যে গেট দিয়ে মেলায় ঢুকেছি, সেটি মেলার প্রথম গেট। বাস কন্ডাক্টার ভাই সাহেব ওখানেই নামিয়ে দিলেন বইমেলার যাত্রীদের, আমি যেহেতু ঐ এলাকার কিছুই চিনি না তাই প্রথম যে গেটটি চোখে পড়ল, সেটি দিয়ে ঢুকে পড়লাম, ফাঁকা এক মাঠ পেরিয়ে প্রথম যা চখে পড়ল, সে বইমেলার ঠিক বাইরে, চিত্রশিল্পী গ্রাম। বইমেলারই অঙ্গ, কিন্তু বইমেলার ভীড় থেকে একটু দূরে, একটু বাইরে। বাঁশ দিয়ে গোল করে ঘিরে বানানো হয়েছে এই আংশটুকু, বাঁশের বেড়ার ধার ধরে সব শিল্পীরা বসেছেন নিজেদের আঁকার সম্ভার নিয়ে, অনেকেই তখনও বসে আঁকছেন। এই ছবি-গ্রামের একধারে ছোট্ট এক টুকরো ষ্টেজ, যাতে তখনো কেউ এসে বসেননি। গান হবে সন্ধ্যের দিকে বুঝে নিয়ে পা বাড়ালাম মেলার ভিতর দিকে।

পায়ে পায়ে ঘুরছিলাম মেলায়, মনে মনে খুঁজছিলাম বাংলাদেশের ষ্টল, পেয়েও গেলাম। গতবারের মতই আছে এবারেও বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। বেশ বড় একটা বাড়ির মত দেখতে আকারে, গেটের ঊপর বড় বড় হরফে লেখা বাংলাদেশ। ঢুকে পড়লাম ভিতরে, একটুও বদলায়নি এই প্যাভিলিয়ন, গতবছর যা দেখেচিলাম, ঠিক তাই আছে! কলকাতা বইমেলার ভিতরে আরেক বইমেলা, বাংলাদেশের। ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশ। ঢুকেই হাতের ডানদিকে বাংলা একাডেমির ষ্টল। মেলার ভিতরের আরেক মেলার এটিই সবচাইতে বড় ষ্টল। কাজী নজরুল ইসলামের রচনাবলী দেখলাম এদের কাছে, আর দেখলাম বেগম রোকেয়ার রচনাবলী। প্রশ্ন করে জেনে নিলাম, এরা বইয়ে ছাপানো মূল্যের তিরিশ শতাংশ বাদ দিয়ে মূল্য নেবেন। পাশাপাশি তিন সারিতে ছোট ছোট সব ষ্টল, খুঁজে বের করলাম মওলা ব্রাদার্সের ষ্টল, গতবছর এদের কাছ থেকে নির্মলেন্দু গুন'এর বই কিনেছিলাম। এরা বইএর দাম কুঁড়ি শতাংশ বাদ দিচ্ছেন শুনে বললাম, বাংলা একাডেমী তো তিরিশ শতাংশ বাদ দিয়ে বই বিক্রী করছে? উত্তর শুনলাম, ওরা সরকারী প্রতিষ্ঠান ওরা পারে, আমরা পারি না এতখানি ডিসকাউন্ট দিতে!

প্রথম দিনে আমি মেলায় শুধুই ঘুরতে যাই, কোন বই কিনি না। শুধুই দেখি, বই, মানুষ, মেলা। কাল কিনবো না কিনবো না করেও কিনে ফেললাম সঞচিতা ( বানানটা কিছুতেই লিখতে পারছি না, মাফ করবেন ) । এবার একা একা মেলায় ঘুরতে বেশ খারাপই লাগছিল, মান খারাপ কাটানোর জন্যে এই বইটা কিনে নিজেকে দিলাম। সেই কবে হারিয়ে যাওয়া একটা বই নিজেকে গিফট করে মুন ভাল হয়ে গেল। দু পাক ঘুরে এলাম গোটা প্যাভিলিয়ন। আবার আসব নিজেকেই একথা শুনিয়ে বেরিয়ে এলাম মেলা প্রাঙ্গনে।

No comments:

Post a Comment