Saturday, February 17, 2007

পায়ের তলায় সর্ষে - ফ্রেজারগঞ্জ


ছেলের জন্মদিন ছিল, সারাদিনই প্রায় রান্নাঘরে কেটেছে, ক্লান্ত। ঘুম পাচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ প্রস্তাব, কোথাও একটা যাওয়া যাক, এক বা দুদিনের জন্যে, লোকাল ট্রেনে করে এবং এখুনি বেরিয়ে পড়া যাক! বেড়াতে যাওয়ার নাম শুনলেই তক্ষুণি বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে বটে তবে কিনা এই প্রায় শেষ নভেম্বরে, না ঠান্ডা না গরমে মৃদু মন্দে পাখা চালিয়ে নক্‌শীকাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর প্রবল বাসনা ত্যাগ করে এই প্রায় মাঝরাত্তিরে লোকাল ট্রেনে করে অজানার উদ্দেশ্যে বেরনো? বললাম, কাল ভোরে বেরুই৷ সেটাই ঠিক হলো। একটা ব্যাগ একদিনের মতো গুছিয়ে নিয়ে ভোরবেলায় বেরুবো,পরশু ফিরব।

মুঠোফোনে সাড়ে চারটের অ্যালার্ম সেট করে ঘুমাতে গেলাম যখন রাত তখন প্রায় একটা। অ্যালার্ম যখন বাজতে শুরু করলো তখন ভাবলাম, থাকগে, বাজুক ওটা, আমি বরং আরেকটু ঘুমাই! কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার লোভে ঘুমানো গেল না৷ উঠেই পড়লাম নক্‌শীকাঁথা সরিয়ে রেখে৷ এখানে ভোর সাড়ে ছ'টার আগে বাস পাবো না তাই হাঁটা শুরু বিদ্যাসাগর সেতুর টোলপ্লাজার উদ্দেশ্যে৷ সেখান থেকে বাসে করে ধর্মতলার বাস গুমটিতে৷ এবার প্রশ্ন হল যাব কোথায়? টিকিটঘরের দেওয়ালে সব নাম লেখা আছে, এখান থেকে কোথায় কোথায় বাস যাবে৷ জায়গার নাম দেখে নিয়ে সে আমারে জিগাইলো, ফ্রেজারগঞ্জ যাবে?
: সেটা কোথায়? সেখানে কি আছে?
: চলো না৷ তোমার ভাল লাগবে৷
: চলো তাহলে!
কাউন্টারে জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়া হল , এই বাস যাবে 'নামখানা' অব্দি, তিন ঘন্টা মত লাগবে, ফ্রেজারগঞ্জ যেতে হলে নদী পেরিয়ে আবার বাস, ঘন্টা খানেকের রাস্তা৷ মনে মনে হিসেব করে নিলাম, 'টা নাগাদ পৌঁছুব, কতক্ষণ সময় থাকবে হাতে বেড়ানোর জন্যে। এর আগে একবার এই বাসগুমটির কাউন্টারের বুড়ো দাদুর কথা শুনে জব্বর ফেঁসেছিলাম কাজেই আর রিস্ক নিতে রাজী নই।

কাউন্টার থেকে দেওয়া টিকিটের সময় মেনে ঠিক পৌনে সাতটায় বাস ছাড়ল। যেখানে বসলাম তার সামনে একটিমাত্র সিট, যাতে কন্ডাক্টর এর বসার কথা। তার ঠিক পেছনে জানালার পাশের আসনে আমি বসে বুঝতে পারলাম, আটকে গেছি! বাঁদিকে জানালা, ডানদিকে তিনি আর সামনের ঐ সিটে আমার হাঁটু ঠেকে আছে যাতে করে আমার নট নড়ন চড়ন অবস্থা। এইসব তুচ্ছ জাগতিক জিনিসকে আমল না দিয়ে যেটুকু সম্ভব গুছিয়ে বসে কিছু অকারণ কথা আর জানালা দিয়ে বাইরে দেখা। বাসে উঠে বসার খানিক পরেই প্রশ্ন, তোমার কাছে ঐ গানটা আছে 'কি ঘর বানাইলাম আমি শূন্যেরও মাঝার?
- বোধ হয় নেই৷ কম্প্যুটারে আছে কিনা খুঁজে দেখতে হবে৷
-ফিরে এসে খুঁজে দেখো না, আছে নিশ্চয়ই! আর না থাকলে অক্ষ'কে বলো, ও ঠিক পাঠিয়ে দেবে!

বাস কলকাতা শহর ছাড়িয়ে এগুচ্ছে ডায়মন্ড হারবারের দিকে। পথ প্রদর্শক দেখিয়ে দিচ্ছেন এদিকে রায়চক। সামনেই ডায়মন্ড হারবার, আমরা নদীর পাশ ধরে এগিয়ে যাবো।

আমি বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম না আমি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কোথাও যাচ্ছি নাকি ভারতবর্ষের? দুপাশের দৃশ্যাবলী যে খুব চেনা! যেন বেনাপোল বর্ডার পেরিয়ে বাস এগোচ্ছে ঢাকার দিকে! রাস্তার পাশের ফলকে নামগুলো শুধু অন্য নইলে সেই এক পরিচিত দৃশ্য। ছোট ছোট গঞ্জের মত সব জায়গা পেরিয়ে বাস চলছে। কখনও গ্রামের ভেতর দিয়ে তো কখনও বা দু'পাশে ফসলের মাঠ। কোথাও খানিকটা জল জমে আছে তো সেখানে, ঐটুকু জলে বিছিয়ে আছে শাপলার পাতারা। ছোট্ট ছোট্ট পুকুর গাছের ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে আর সেইসব পুকুরেও অজস্র শাপলা। আমি বারে বারেই যেন অনেকটা করে পথ পিছিয়ে গিয়ে চলে যাচ্ছিলাম ছেলেবেলায়। শাপলা বিলে৷ কিন্তু এখানে কোন বিলে নয়, হাঁটু অব্দি জমা জলেই যেন বিছিয়ে আছে শাপলা। এখনও সেভাবে ফোটেনি, কোথাও বা কলি মেলছে তো কোথাও আধফোটা।

বাসগুমটির কাউন্টারের কাকুর কথামত ঠিক তিন ঘন্টাতেই বাস এসে পৌঁছালো নামখানায়৷ একটা গঞ্জ মত জায়গা, নদীর পারের গঞ্জ। অনেকটা মেঘনাপারের ভৈরববাজারের মত। এই নদীটির নাম হাতানিয়া দোয়ানিয়া। দেখে আশ্চর্য হলাম, নদীতে সেতু নেই। কলকাতার এত কাছে এই রকম একটা জায়গা আছে, যার এপার-ওপার দুপারেই বাস চলে কিন্তু নদী পেরুতে হয় নৌকায় করে! ভাবতে পারিনি সত্যিই। শুনলাম, রাজনৈতীক ডামাডোলে সরকার বাহাদুর হার মেনে এখানে নৌকোর ব্যবস্থা করে দিয়ে দায় সেরেছেন। পঁচিশ পয়সা করে টোল দাও আর তারপর নৌকোয় চড়ে ওপারে চলে যাও। এর মাঝেই মাঝি এসে বলে, প্রাইভেটে যাবেন? রিজার্ভ? সেটা কি সিস্টেম জিজ্ঞেস করে জানা গেল, দশ টাকা নেবে মাঝি, সেই নৌকোয় আর কাউকে তুলবে না, নদী পার করে দেবে। আর ঐ টোলের নৌকোয় গেলে একটা নৌকোতে পয়তাল্লিশজন লোক হবে তবে নৌকো ছাড়বে আর ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। দেখে শুনে প্রাইভেট যাওয়াই সাব্যস্ত হল আর বেশ ফুরফুরে মন নিয়ে ওপারে পৌঁছে গেলাম দেখতেই দেখতে। ও হ্যাঁ৷ বলতে ভুলে গেছি বাস থেকে নেমেই সুলভ শৌচাগার থেকে প্রাকৃতিক কাজ-কম্ম সেরে পাশের রেষ্টুর‍্যান্ট থেকে ছেঁড়া পরোটা আলু মটরের তরকারি সহযোগে ভরপেট জলযোগ সেরে নিয়েছি, শেষপাতে জিলিপি! আর অবশ্যই চা।
যে বাসটিতে উঠে বসলাম সেটি যাবে বকখালি। আমাদের যাত্রাপথের শেষে বকখালি পড়বে তা আমার জানা ছিল না। আমরা তো যাচ্ছি ফ্রেজারগঞ্জ! জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম, বাস আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে বকখালি। সকালবেলায় যখন বাসের টিকিট কাটা হচ্ছিল তখন দীঘার বাসের কাউন্টারও চোখে পড়েছিল, আমার মন ওদিকেই টানছিল কিন্তু একদিনের জন্যে গিয়ে পোষাবে না ভেবে কিছু বলিনি। তো সামনে বকখালি আছে জেনে মন আরও খানিকটা ফুরফুরে হয়ে গেল। ফ্রেজারগঞ্জে কি আছে সকালে জিজ্ঞেস করে জবাব পেয়েছিলাম, চল না, ভাল লাগবে! বাসে আরেকবার জিজ্ঞেস করে জেনেছি ওখানে মোহনা ৷ ভাল লাগবে শুনে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম, এখন আরেকটু উৎফুল্ল হলাম ৷

যে বাসটিতে উঠেছি সেটি এক মজার বাস! ষ্ট্যান্ডে আসামাত্রই চোখে পড়েছে একটি সাদা অ্যাম্বাসেডর দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের দেখেই তার চালক এগিয়ে এসেছিলেন, যাবেন দাদা, বকখালি , চলুন। তো সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বাসের কাছে এগোতে দেখা গেল বাসে শুধু দাঁড়ানোর জায়গা বাকি আছে, কন্ডাক্টর তাও বলছে, উঠে পড়ুন, সামনেই খালি হয়ে যাবে! আমি দাঁড়িয়ে যেতে কিছুতেই রাজী নই তাই সে বাসটি ছেড়ে দিয়ে পরের বাসে এসে উঠে জুত করে বসেছি৷ বসেই স্বস্তি বোধ করলাম, যে এই বাসে অন্তত সিটের পেছনটা এতখানি উঁচু যাতে মাথা রেখে আরাম করা যাবে! এতক্ষণ যে বাসে এসেছি তাতে এই সুবিধেটুকু ছিল না ফলে ঠায় ঘাঁড় সোজা করে বসে থাকতে হয়েছে। বাসখানি কাডইল্যা বোঝাই না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে আর তারপর হেলতে দুলতে শুরু করেছে চলা। সে এক মজার চলা। প্রতি দু মিনিট অন্তর সে থামে, লোক নামে ধীরে সুস্থে, নামার কিংবা ওঠার কারোরই কোন তাড়া নেই একেবারেই! বাড়ির উঠোন থেকে লোকে হাত দেখায়, বাস থামে, রাস্তা পেরিয়ে তাঁরা এসে ওঠেন বাসে! স্ট্যান্ড থেকে বাস ছাড়ার পর চালক পাঁচ মিনিট অন্তর থেমে থেমে তিন জায়গা থেকে তিনবারে তিনখানি টিফিন ক্যারিয়ার সংগ্রহ করলেন আর তারপর মন দিলেন গাড়ি চালানোয়, গজগামিনী চালে! মাঝে মাঝে হাঁক দিলেন, এই তোমরা ওঠা-নামার জন্যে এত চিন্তাভাবনা করলে পড়ে যাবে যে, ধীরে সুস্থে ওঠো!

যেখানে বাস আমাদের নামিয়ে দিল সেটি এক ধুঁ ধুঁ রাস্তা। আমি ভেবেছিলাম ছোটখাট কোন গঞ্জে নিশ্চয়ই যাচ্ছি। কিন্তু যেখানে নামলাম সেখানে রাস্তার পাশে শুধু একটা নামফলক ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। রোদ বেশ চড়া, ঘাম না হলেও খুব একটা সহনীয় নয় এই রোদ আর এমন একটা জায়গায় নেমেছি যেখানে দোকানপাট, বাড়ি ঘর তো দূরের কথা দূর দূর অব্দি কোন মানুষ পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। রাস্তার বাঁদিকে কিছু কুড়েঘর চোখে পড়ল আর ডানদিকে দূরে দুটি পাকাবাড়ি ৷ সেদিকেই এগোতে চোখে পড়ল সেগুলো আসলে হোটেল। দুটি বাড়ির মাঝে এক বিশাল ফাঁকা মাঠ যাতে গরু চরছে। দুটোর মধ্যে একটি বেছে নিয়ে সেখানে নিশ্চিন্তে ঢুকে গেলাম ঘর পাওয়া যাবেই ধরে নিয়ে! এখানে যে লোকে ভুল করেও আসে না আমার সেই ধারণা ততক্ষণে বদ্ধমূল৷ কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ভুলটা ভেঙে গেল, প্রায় প্রতিটি ঘরেই লোক আছে দেখা গেল, কোন ঘরের দরজা খোলা তো কোন ঘর থেকে আসছে টিভির আওয়াজ ! ঘর পাওয়া গেল, দোতলায়। দোতলার ঘরই চেয়েছিলাম, পাওয়া গেল। বেশ বড় ঘর, পাশাপাশি দুটো দরজা দেখে এগিয়ে গিয়ে একটা খুলে দেখা গেল ছোট্ট একফালি বারান্দা, যার ওপাশে সেই খোলা মাঠ, সেই মাঠ, বাস থেকে নেমেই যেদিকে চোখ গিয়েছিল, যাতে গরু চরছে। মাঠের ওপাশে আরেকটা পাকা বাড়ি, সেটিও একটি হোটেল ৷ দ্বিতীয় দরজাটি খুলতে দেখা গেল ওটি বাথরুম, বেশ ঝকঝকে, পরিস্কার। ডানদিকের দেওয়াল জোড়া আয়না, মাঝঘরে এক খাট, মাথাটা দেওয়ালে ঠেকানো। ঘরে ঢোকার দরজার বাঁ পাশের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা আছে এক আলমিরা আর এক টেবিল, যার মাথায় এক ছোট্ট রঙীন টিভি।

ঝটপট স্নান সেরে তৈরী হয়ে বেরুনোর প্ল্যান, নদী দেখতে যাব। কোথায় খাব সেই ভাবনাও মাথায় ছিল, বেড়াতে গেলে বোধ হয় খিদে একটু বেশিই পায় নইলে নামখানায় যে পরিমাণ ছেঁড়া পরোটা আর আলু-মটরের তরকারি খেয়েছি তাতে করে বিকেল অব্দি আর খিদেই পাওয়ার কথা নয় অথচ আমি এখনই খাওয়ার কথা ভাবছি! তখন বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি খাবেন এখানে? যদি খান তাহলে রেঁধে দেওয়া হবে! ফ্রীজে পমফ্রেট আর পার্শে মাছ আছে। তিনি আমার দিকে তাকালেন, রেঁধে দেবে মনে তো দু ঘন্টার গল্প! দিনের আধবেলা তো পার পৌঁছুতেই ৷ বেয়ারা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়া হল, খানিক এগিয়ে গেলেই একটা খাওয়ার হোটেল চোখে পড়বে আর তা নইলে যেতে হবে বকখালি !

খাওয়ার ভাবনা আপাতত বাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নদীর উদ্দেশ্যে। কোথাও কোন মানুষ নেই, অদ্ভুত এক নীরবতা চারিদিকে! ভীষণ ভালো লাগায় ভরে গেল মন। হোটেল থেকে খানিকটা এগিয়েই পিচ রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে একটা ইটের রাস্তা ধরে এগোতেই চোখে পড়ল ডাঁনদিকে একটা ছোট্ট জলা। যে হোটেলে আমরা উঠেছি এটা হোটেলের ঠিক পেছনে। রাস্তার পাশেই জলা আর তাতে বসে আছে অজস্র বক! ছোট, বড় সব রকমের বক। এদিক ওদিকে দেখতে গিয়ে দেখলাম ঠিক রাস্তার পাশেই যেখানে জলাটা শুরু হয়েছে সেখানে বসে আছে দুটো বালিহাঁস! এখানে বোধ হয় কেউ পাখিদের বিরক্ত করে না তাই তারা মানুষকে ভয় পায় না। নিশ্চিন্ত মনে বালিহাঁস দুটো বসে আছে পাশাপাশি। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম সেখানেই। আরও দূরে দেখলাম এরকম বেশ কিছু হাঁস বসে আছে জোড়ায় জোড়ায়। এই জলাতেও আছে শাপলা, কিছু ফুটে আছে কিছু শুধু লম্বা ডাঁটি উপর দিকে উঠছে। পাখি দেখে নিয়ে আবার এগোলাম। আমার খুব দুঃখ হচ্ছিল সঙ্গে ক্যামেরা নিয়ে যাইনি বলে! রাস্তার একদিকে কিছু মাটির বাড়ি, খড়ের চালের। আর একদিকে জলা, দুপাশেই আছে প্রচুর ফনিমনস।

খানিক এগিয়ে যেখানে পৌঁছুলাম সেটা এক জেলেপাড়া। শুকনো মাছের ঝাঁঝালো গন্ধ চারপাশে। দূরে সমুদ্র চোখে পড়ছে এখান থেকেই। জেলেপাড়াটা খুব বড় নয়, অল্প কয়েকঘর লোকের বাস। ডাঙায় ভাঙা নৌকো চোখে পড়ছে আর দেখলাম প্রচুর শুটকি। বালির উপরে মাছ জাষ্ট বিছিয়ে শুকানো হচ্ছে। চিংড়ি আর লটেই প্রধানত, অন্য মাছও আছে তবে খুব কম। দু একটা চায়ের দোকানও চোখে পড়ল যাতে ছোট্ট কাঁচের শোকেসে কিছু চিপসের প্যাকেট কিছু বিস্কুটের প্যাকেট আর নিচে রাখা আছে কিছু ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। প্রতিটি দোকানেই আছে কাঁচা মাছ, ঝাঁকায় রাখা। সকালেই হয়ত সমুদ্র থেকে ধরে আনা হয়েছিল, বিক্রীর পরে যা রয়ে গেছে৷ অপেক্ষা, যদি এগুলো ও বিক্রী হয়ে যায়। একান্তই যা পড়ে থাকে সেগুলো শুকিয়ে শুটকি করা হবে। যে মাছগুলো ঝাঁকায় আছে সেগুলো দেখলেই বোঝা যায়, মাছগুলো খুব একটা টাটকা নেই আর, হয়ত আগের দিন রাতের মাছ। ব্যপারী তার পছন্দের মাছ তুলে নিয়ে যাওয়ার পর এগুলো পড়ে আছে। পাশেই প্লাষ্টিকের লাল, নীল বক্স দেখতে পেলাম, যাতে করে বরফ দিয়ে মাছ রাখা হয়। এখন মাছে বরফ দেওয়া নেই। হলদে তপসে, লাল চিংড়ি, রুপোলী পার্শেরা সব মিইয়ে পড়ে আছে ঝাঁকায়, খদ্দেরের আসার আশায়৷ কোথাও কোথাও মহিলারা বসে মাছ বাছছেন, আলাদা করছেন একটু ভাল মাছগুলো, হয়তো বা রান্নার জন্যে, বাদবাকি সব শুকিয়ে ফেলা হবে। একটাই ঘরের সামনের দিকটায় দোকান আর ভেতরের দিকটায় তাঁর গেরস্থালী। একমনে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন সবাই। বাইরের লোক সম্পর্কে এঁদের আগ্রহ খুব কম মনে হল, সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত, কে এলো কে গেলো তাকানোর ফুরসত কিংবা ইচ্ছা দেখলাম না কারোরই। শুটকি কেনার প্রবল বাসনা মনেই চেপে রেখে আপাতত আমি সামনে তাকাই।

পেছনে ঐ জেলেপাড়া পেরিয়ে আসার সময় চোখে পড়েছে ইয়া উঁচু থামের উপর বিশাল বিশাল তিন ব্লেডের ফ্যান! উঁচু টাওয়ারের মত দেখতে, কিন্তু টাওয়ার নয় ওগুলো। সে জানাল, ওগুলো বাতাসিয়া বিদ্যুৎ প্রকল্প! বাতাস এলেই ওগুলো ঘুরতে আরম্ভ করে, পাশেই ছোট ঘর আছে, মেশিন ঘর। সাধারণ বিদুৎএর খুটি যেমন পাশাপাশি পরপর থাকে, এও ঠিক তেমনি আছে। পাশাপাশি, একের পর এক। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, আমার দেখার আর জানার জগৎ কত ছোট! আমি যেদিকেই তাকাই, যা দেখি তাই যেন ভাল লাগে। এক আশ্চর্য ভাল লাগায় ভরে আছে মন।

০২
জেলেপাড়ার ডানদিকে এক পুরনো ভাঙা বাড়ি। ছাল-চামড়া ছাড়ানো ইটের দেওয়াল আর ছাদই শুধু আছে অবশিষ্ট, দরজা-জানালা কিছুই নেই। চারপাশে বেশ বড় বড় ঝাউগাছ, অনেকটা যেন ঘিরে রেখেছে বাড়িটাকে সে জানাল, এখানে ওরা শ্যুটিং করতে এসেছিল, ঐ বাড়িটাতে। আরও জানাল, এটা ফ্রেজার সাহেবের বাড়ি, যার নামে এই জায়গার নাম ফ্রেজারগঞ্জ। এই বাড়িতেই নাকি সাহেব থাকত, নারায়ণীকে নিয়ে। নারায়ণী জেলেদের মেয়ে, বছর পনেরোর এক কিশোরী। সাগরতীরে ঝাঁকা থেকে তুলে তুলে মাছ শুকোতে দিচ্ছিল একদিন তখন জাহাজ থেকে সাহেব তাকে দেখতে পায় সাগরপথে সাহেব যাচ্ছিল কলকাতার দিকে। নারায়ণীকে দেখে থমকে যায় সাহেব। অপরূপ রূপসী এক মেয়ে, মাছ শুকোতে দিচ্ছে বালিতে, যেন এক মৎসকন্যা। সাহেবের ছোট্ট জাহাজ তীরের দিকে এগোতেই নারায়ণী দেখতে পায় আর মাছের ঝাঁকা, মাছ সব ওখানেই ফেলে রেখে ত্বরিৎ গতিতে উঠে দৌড়ে পালিয়ে যায় সাহেব এসে বসে মাছের কাছে, নারায়ণীর অসমাপ্ত কাজ সাহেব শেষ করে, একটা একটা করে মাছ শুকোতে দেয় বালিতে। তারপর অপেক্ষা করতে থাকে নারায়ণীর, কখন ফিরবে নারায়ণী।

নারায়ণী ফেরে না। বেলা বয়ে যায়, মাছ নিয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে সাহবে তার লোক লস্করকে হুকুম করে, ঐ জেলেনীকে খুঁজে আন! মাছগুলো যে সব নষ্ট হয়ে যাবে! সাহেবের কথা কিছু বুঝে কিছু না বুঝে তার লস্কর ছোটে নারায়ণীকে ধরে আনতে। খুঁজতে খুঁজতে গ্রামে গিয়ে হাজির হয়, 'বাড়ি ও'বাড়ি খুঁজে ঠিক তারা নারায়ণীকেও খুঁজে বের করে। নারায়ণীকে তারা বলে, চলো, সাহেব তোমাকে চেয়েছে! নারায়ণীর বাড়িতে ততক্ষণে জড় হয়েছে গ্রামের সব লোক। মাতব্বরে এসে জিজ্ঞেস করে, কে সাহেব? তোমরাই বা কে? তারা জবাব দেয়, ঐ গোরা সাহেব, এই মেয়েটাকে চেয়েছে, আমাদের বলেছে, ওকে নিয়ে যেতে! ততক্ষণে গ্রামের লোকেদের হাতে উঠে এসেছে লাঠি-সড়কি৷ তারা আক্রমণ করে সাহবের লস্করকে, আচমকা আক্রমণে ভড়কে যায় সাহেবের লস্কর, প্রতিরোধের চেষ্টাও করে না তারা, নিজেদের বাঁচানোর জন্যে পালিয়ে যায় এদিক ওদিক। গ্রামের লোক এবার এগোয় সাগরের দিকে, সাহেবের খোঁজে। তখন সন্ধ্যে ঘনিয়েছে, নারায়ণীর জন্যে অপেক্ষা করে করে সাহেব অবশেষে নিজেই শুকোতে দেওয়া মাছ আবার ঝাঁকায় তুলে রাখে, রাতে হিম পড়লে মাছ খারাপ হয়ে যাবে বলে। গ্রামের লোক এসে সাহেবকে আক্রমণ করে, মেরে অজ্ঞান করে দেয় সাহেবকে। মরে গেছে ধরে নিয়ে গ্রামের লোক চলে গেলে সাহেব পড়ে থাকে ওখানেই, অচেতন। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে নারায়ণীর মাছ। প্রাণ বাঁচাতে লস্করেরাও ভেসে পড়েছে সমুদ্রে।

মাছের খোঁজে সাগরতীরে এলে নারায়ণী দেখতে পায় ছড়ানো ছিটানো আধশুকনো সব মাছের মাঝখানে সাহেব পড়ে আছে, অজ্ঞান। নারায়ণী সাহেবকে টেনে নিয়ে আসে গ্রামের বাইরের এক কুড়েঘরে। সেবায় শুশ্রুষায় ধীরে ধীরে সেরে ওঠে সাহেব। দুজনের মধ্যে জন্ম নেয় এক গভীর ভালবাসা, সে এক মস্ত গল্প। নারায়ণী সাহেবের কাছেই থেকে যায় সাগরতীরের ঐ কুড়েতে। সাহেব সেখানে এক বাড়ি বানায়, ইঁটের বাড়ি। চারপাশে ঝাউবন, মাঝে মাঝেই ফনিমনসার ঝোঁপ ৷ সামনে বিস্তৃত বালুরাশির ওপারে খোলা সমুদ্র। সাহেব আর নারায়ণী দুজনে থাকে সাগরতীরের ঐ ছোট্ট একতলা বাড়িতে। ফ্রেজার সাহেব শুরু করেন মাছের ব্যবসা। আরও সব পাকা বাড়ি হয়, সংসার হয় এইভাবে একসময় তৈরি হয়ে যায় ফ্রেজারগঞ্জ।

আমি বাড়ির দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকালাম, সমুদ্রের দিকে। সামনে বিস্তৃত বালুকারাশি। ভাটার টানে সমুদ্র অনেকটা দূরে, তার এমনকি গর্জনও শোনা যায় না অথচ আমি দাঁড়িয়ে আছি সমুদ্রেরই সামনে। এত শান্ত সমুদ্র! কথাটা বলতেই সে বলল, এ ঠিক সমুদ্র নয়তো, মোহনা। একটু ডাঁনদিকে এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবে নদী! আমি সেদিকে কান না দিয়ে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে। কি অসম্ভব নীরব চারদিক, বাতাসও নেই যে শব্দ হবে। পেছনের ঐ জেলেপাড়ায় এমনকি একটা রেডিও ও চালায় না কেউ! সৈকতে আমরা ছাড়া আর কোন মানুষ নেই। ধু ধু বালুর রাশিতে পা ডুবে যায়। মৃদু একটা আওয়াজ এতক্ষণে কানে এল৷ জলের শব্দ।

০৩
ফ্রেজারগঞ্জ বিচ থেকে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় আসতেই চোখে পড়ল একটা বাস আসছে, যাচ্ছে বকখালি। পেটে যদিও ক্ষিদে নেই, সকালের ঐ ছেঁড়া পরোটা আর আলু মটরের তরকারিতে পেট তখন অব্দি ঠান্ডাই আছে তবুও আগে বকখালি গিয়ে কিছু খেয়ে নেওয়াই সাব্যস্ত হল। ফ্রেজারগঞ্জে খাওয়ার জায়গা নেই সে তো দেখাই যাচ্ছে আর একটিমাত্র খাবার দোকানের কথা যা শুনলাম সেখানেও নাকি বসিয়ে রেখেই রান্না করে দেবে। বসে থাকাটা বাঞ্ছনীয় নয় মোটেই, চল রে মন বকখালি! তো আমরা হাত দেখানোর আগেই বাস থেমে পড়ল ঠিক সামনেটায় এসে! দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বাসে উঠে পড়লাম। বেশ মিষ্টি একটা আবহাওয়া। না গরম না ঠান্ডা। ফুরফুরে মনে চারপাশ দেখতে দেখতেই বাসের কন্ডাক্টর ভাই হাঁক দিলেন, বকখালি! ওমা! এত কাছে বকখালি! নেমে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে চোখে পড়ল রাস্তার দুপাশে বেশ কিছু হোটেল শুধু। ও হ্যাঁ৷ বাসে থাকতেই চোখে পড়েছে, খানিক দূরে দূরে একটি করে হোটেল। বকখালি সম্পর্কে শোনা সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। জোর করেই মনটাকে অন্য দিকে সরিয়ে দিলাম।

কয়েক পা এগোতেই চোখে পড়ল  এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ২-৪টে ভ্যান রিকশা আর তাদের চালকেরা এক জায়গায় জটলা করছে কেউ দাঁড়িয়ে তো কেউ বালিতে বসে। আমাদের দেখেই এগিয়ে এলো, সাইট সিইংএ যাবেন? চলুন না। এখানে কি দেখার আছে আর ওরা কোথায় কোথায় নিয়ে যাবে সেগুলো শুনে নিয়ে ঘুরে আসছি বলে সামনের দিকে এগোলাম খাওয়ার দোকানের সন্ধানে। বকখালিতে খাওয়ার ভালো জায়গা আছে হোটেল থেকেই শুনে এসেছিলাম কিন্তু আমি শুধু কিছু ঝাঁপতোলা দোকান ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। কোন দোকানে ঝুলছে ঝিনুক দিয়ে তৈরি নানা জিনিসপত্র আর কোন দোকানের সামনে বোর্ড দাঁড়িয়ে আছে কাঠের ঠ্যাঙে ভর করে, কয়েক পরত মরচের নীচে যাতে ভাত ডাল মাছ সব্জির নাম লেখা। তেমনই এক দোকানে ঢুকে রাস্তার দিকে মুখ করে দুজনে বসে খাবারের অর্ডার দিলাম। ভাত ডাল আর সব্জিটা কমন মাছের অপশন আছে, পমফ্রেট কিংবা ভেটকি। আমি পমফ্রেট বললাম। সবজির ভেতর আরেকটা জিনিস কমন- চিংড়িমাছ সে পালংএর ঝোলই হোক বা লাউ-এর তরকারি, তখনও জানি না এর দুটোই আসবে আর সাথে একদম স্টাইলিশ ক্যাটারারের হাতফেরতা আলুর ঝুরিভাজা।

যে দোকানটিতে ঢুকে বসেছি তাতে চারখানা লাল, নীল প্লাষ্টিকের টেবল আর টেবলের একপাশে কাঠের একখানা করে বেঞ্চ অন্যপাশে দুখানা করে বাদামী রঙের প্লাষ্টিকের চেয়ার৷ দেওয়ালে দেখলাম কালো বোর্ডে সাদা খড়ি দিয়ে পুরো খাবারের তালিকা লেখা আছে সেখানে পাশে মূল্যতালিকা। যিনি খাবারের অর্ডার নিয়েছিলেন তিনি ভেতরে গিয়ে বলে এলেন আর তারপরে দোকানের মাঝখানে রাখা একটি টেবলের পাশের একমাত্র চেয়ারটিতে বসে গপ্প জুড়লেন অন্যপাশে বসে আহারে রত চারজনের এক দলের সাথে। ততক্ষণে আমাদেরও খাবার এসে গেছে। যিনি খাবার সার্ভ করলেন তিনি এই দোকানের মালকীন। ক্ষয়াটে চেহারা। কপালে লাল টিপ আর সিঁথিতে মোটা করে পরা সিঁদুর। কুচিয়ে পরা ছাপা শাড়ির ঝুল গোড়ালির উপর অব্দি। হাতে শাঁখা পলা লোহা ছাড়াও কয়েকগাছা করে কাঁচের চুড়ি। মুখে একটা হাসি লেগেই আছে যাতে করে তাঁকে দোকানমালিক কম বাড়ির গিন্নিই বেশি মনে হয়। পর্দার ওপাশে যে ঘরের আভাস পাচ্ছি ওখানে তাঁর গেরস্থালী। খাবারে মন দিলাম। মাঝারি আকারের একখানা পমফ্রেটকে দু টুকরো রান্না করেছেন ঐ গিন্নিটি। যে প্লেটে করে মাছ দিয়েছেন তাতে ঐ পমফ্রেট বেশ ভালমতন সাঁতার কাটছে। দেখে একেবারেই পছন্দ হয়নি বলাই বাহুল্য কিন্তু মাছের কোণা ভেঙে মুখে দেওয়া মাত্রই মত পাল্টাতে বাধ্য হলাম।

রান্না ভাল কি মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর মনে হল। একদম তাজ মাছ, সকালেই সমুদ্র থেকে ধরা হয়েছে। এত সুস্বাদু পমফ্রেট আগে কখনও খাইনি সে ব্যপারে আমরা দুজনেই একমত হলাম। কথা বলছি, খাচ্ছি। মাঝে মাঝেই কান চলে যাচ্ছে ওদিকের কথা বার্তায়। এরই মধ্যে গিন্নিটি ভেতর থেকে নিয়ে এলেন একটি বোল, বেশ বড় সাইজের আর আমি একটু চোখ টেরিয়ে দেখতে পেলাম তাতে কাঁকড়া! খাওয়ায় ব্যস্ত তাঁকে দেখালাম ইশারায়, ঐ দ্যাখো, কাঁকড়া! সাথে সাথেই দোকানমালিকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন গেল, ও দাদা, কাঁকড়া হবে নাকি! দাদাটি চটজলদি উত্তর দিলেন, নাগো দাদা, এতো অর্ডারি রান্না! শহর থেকে এঁরা সব বন্ধুরা এসেছে, এঁদের জন্যে স্পেশালি আনা হয়েছিল আজ, আর তো হবে না! ওদিকের টেবল থেকে তখন কাঁকড়ার স্বাদ সম্পর্কে আলোচনা কানে আসছে। মন:ক্ষুন্ন তিনি পমফ্রেটেই মন দিলেন আবার! দোকানি ভাইটি বললেন, রাতে যদি আপনারা আসবেন বলে যান, তবে বিকেলে দেখব কাঁকড়ার ব্যবস্থা করতে পারি কিনা, আর আপনারা যদি কোন মাছ খেতে চান তো কিনে এনে দিলে আমরা রেঁধেও দিতে পারি। এই সাথেই শোনালেন, ওপাশে যাঁরা বসে আছেন তাঁরা গতকাল সব মিলিয়ে সাড়ে চার কিলো মাছ কিনে এনেছিলেন আর চারজনে মিলে সেটা এক বসাতেই শেষ করেছেন! যাঁদের সম্পর্কে বলা হল তাঁদেরই একজন বললেন, ঐ ফ্রেজারগঞ্জ বন্দর থেকে কিনে এনেছিলাম, আপনারা যাবেন তো ওদিকে? মাছ নিয়ে আসতে পারেন, বৌদি রান্না করে দেবে! তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে দোকানি ভাইকে বলা হল, রাতে কাঁকড়া যদি হয় তো খুব ভাল হয়, রাতে আমরা আপনার এখানেই খাব! ও পাশ থেকে কাঁকড়া শেষ করার পর হুকুম উড়ে আসছে ভেটকি আর পমফ্রেটের, যা বাকি মাছ ছিল তা সব তাদের দিয়ে দোকানি ঝাঁপ বন্ধ করতে উদ্যোগী হলেন।

বলতে ভুলে গেছি, খেতে বসেই আমার মনে হল, ফ্রেজারগঞ্জ বিচে শুটকি দেখে এলাম আর এখানেও দোকানে ঝিনুকের জিনিসপত্রের সাথেই প্যাকেটে রাখা লটে শুটকি চোখে পড়েছে তার মানে এঁরা শুটকি নিশ্চয়ই রান্না করেন! জানতে চাইলাম দোকানমালকীনের কাছে, এখানে শুটকি রান্না হয় বৌদি? তো বৌদি জানালেন, মাঝে সাঝে হয়। সকলে খায় না বলে রোজ হয় না আর খেতে চাইলে রাতে ইনি করে রাখবেন। কিন্তু রাতে শুটকি খাওয়া আমার পোষাবে না বলে আমি আর খাওয়ার বায়না করলাম না! খাবো না বলেই শুটকি আলোচনা থেমে থাকলো না, কচু এল, কাঁঠালের বিচি এল আরো কত্ত সব এখন আর সব মনে নেই৷

খাওয়া সেরে বেরিয়ে আবার মন দিলাম চারপাশ দেখাতে। এত নীরব কেন এ জায়গাটা? এখানটায় বেশ দোকানপাট আছে দেখতে পাচ্ছি, রাস্তার দুধারে সারি সারি সব দোকান। যাঁরা আছেন তারা সবই দোকানি! কেনার মানুষ নেই একটিও! আরও একটা জিনিস খেয়াল হল, প্রতিটি দোকানেরই পেছনদিকে বসতবাড়ি। দোকানের ভেতর দিয়েই ভেতরবাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা। প্রায় সব দোকানেই কর্তা গিন্নি দুজনেই আছেন। একটু খেয়াল করলে আশে পাশে ছানাদেরও দেখা যায়। কিন্তু এখানে লোক নেই কেন? লোকে বেড়াতে আসে না? চিন্তাটা সজোরেই করছিলাম তো জবাব পেলাম, দিনের বেলা কে আর বেরোয়? সবাই হোটেলের ভেতরে আছে! বিকেলে বিচে ভিড় হবে, বেশিরভাগই তো হোটেলেই সময় কাটাতে আসে! আবারও অস্বস্তিটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগল।


০৪
এক নীরব শুনশান রাস্তা দিয়ে আমরা দুজনে হেঁটে এগোতে লাগলাম সাগরের দিকে। পিচের রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা মাঠমত জায়গা। বালির মাঠ। গোড়ালি অব্দি ডুবে যায় বালিতে। বেশ গরম লাগতে শুরু করেছে ততক্ষণে। সুর্য একদম মাথার উপরে। আমি একটু ক্লান্ত বোধ করছি, একটু গড়াতে পারলে ভাল হয়। কিন্তু মাত্র একদিনের জন্যে এসেছি আর কত কী দেখার আছে বলে সমানে হেঁকে গেছে ঐ ভ্যানরিকশা চালকেরা যার কিছুই এখনও অব্দি দেখা হয়নি।

ঘরবন্দী হয়ে একটুও সময় নষ্ট করবো না বলে ক্লান্তির কথা একবারটিও না বলে সামনে এগোলাম। বালির উপর দিয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে এই মাঠ পেরিয়ে দেখি আবার একটা পিচরাস্তা শুরু। যার দুপাশে আবার সব দোকান। তবে এখানে দোকানের সংখ্যা বেশি নয়। ঐ তো সামনেই এই রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে যাচ্ছে বিচে। এই রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা বাধানো চাতাল মত জায়গায়। যার ডানদিকে বেশ উঁচু করে বাঁধানো এক ফুটপাথ। হ্যাঁ। আমার এটাকে ফুটপাথই মনে হয়েছে। অনেকদূর চলে গেছে এই ফুটপাথ। যদ্দূর চোখ যায় শেষ দেখতে পাচ্ছি না। ফুটপাথে খানিক দূরে দূরে একটা করে লোহার বেঞ্চ। এই ফুটপাথের ডানধারে ঝাউবন আর বাঁদিকে বিস্তৃত বালুরাশির ওধারে সমুদ্র। ভাটার সমুদ্র এখন বহুদূরে। জলের শব্দ নেই। বাতাসের শনশনানি নেই। নিস্তব্ধ এক রোদেলা দুপুর।

আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছি এদিক ওদিক। যেদিকেই তাকাই, চোখ ফেরাতে পারি না। ফুটপাথে উপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি বিচের দিকে। বাঁধানো চাতালের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে বেশ কিছু রঙিন চেয়ার। কোথাও বা ছোট্ট নাগরদোলা, রঙিন। অনেকটা যেন মেলার মত। কিন্তু জনশূণ্য, রঙিন কাঠের ঘোড়ারা সার বেঁধে যেন জল খেতে নেমে আসছে সাগরে। চাতাল যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে এক বোর্ডে দেখলাম বড় বড় হরফে ইংরেজী ও বাংলায় লেখা আছে, বিচে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ। ঠিক এই জায়গাটায় বেশ কিছু চায়ের দোকান দেখলাম। প্রতিটা দোকানের সামনেই বেশ কিছু চেয়ার পাতা। সবই লাল রঙের। এই দুপুরে কোন দোকানেই কোন খদ্দের নেই। মনে মনে আমি চায়ের দোকানই খুঁজছিলাম, খাওয়ার পরে চা না খেলে আমার চলে না। একটি দোকানের দিকে এগিয়ে গিয়ে দোকানি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, দিদি, এখন কি চা হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ হবে, আপনি বসুন। বছর পনের-ষোলর একটি ছেলে দোকানের ভেতর ঢুকে চা করতে গেল। আমি চেয়ারে বসে তাকালাম বিচের দিকে। বারে বারে একটা কথাই শুধু মনে হচ্ছে, এত সুন্দর মায়াময় বিচ অথচ কি ভীষণ নীরব! হোক না দুপুর, তাই বলে এত নীরব? দূরে ফ্রেজারগঞ্জ বিচের সেই তিন ব্লেডের বিশালাকার পাখা এখানে থেকেও আবছা নজরে আসছে।

ফ্রেজারগঞ্জে বেনফিশের মৎস বন্দর দেখব বলে এগোলাম ভ্যানরিক্সার দিকে। এখান থেকে যেতে হলে ভ্যান ছাড়া গতি নেই। ভ্যানরিক্সার চালকেরা এক জায়গায় জটলা করছিল কেউ বসে কেউ বা দাঁড়িয়ে। দু-তিনজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে। সাইটসিইং এ তারা কোথায় কোথায় নিয়ে যাবে সে শুনিয়ে রেখেছিল আগেই। দর-দস্তুর করে একজনকে ঠিক করা হল। সাইটসিইং এর জন্যে নয়, সে শুধু আমাদের ঐ মৎসবন্দরে নিয়ে যাবে আর তারপর আবার এখানেই ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। ভ্যানচালক মশায় বহু ভ্যানতারা করছিলেন, কি কি দেখার আছে এখানে, যা না দেখলে এই বকখালি আসার কোন মানেই হয় না। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য স্থির, আমরা যাব মৎসবন্দরেই! 

অগত্যা ভ্যানচালক মন দিলেন ভ্যান চালানোতে। আমাদের চেহারা-সুরত দেখে নিয়ে ভ্যানচালকের পরামর্শ, দুজন দুমাথায় বসুন! সেভাবেই বসলাম। তিনি সামনের দিকে মুখ করে আর আমি পেছনের দিকে। আমি দেখছি ফেলে আসা রাস্তা তো তিনি দেখছেন সামনের রাস্তা, বেশ রোমান্টিক যাত্রা। নীরব শুনশান রাজপথ। দুপাশে কোথাও বিস্তৃত ফসলের মাঠ তো কোথাও দূরে গ্রাম। জনপ্রাণী নেই কোথাও। পড়ন্ত দুপুরের নিষ্প্রাণ রোদ। কারও মুখে কথা নেই এমনকি ভ্যানচালকেরও নয়। ভ্যানরিক্সার চলার শব্দ শুধু।

সাইটসিইংএর যে গল্পটা ওরা করছিল তাতে তাতে একটা খেজুরগাছের গল্প ছিল। চৌদ্দ না ষোল মাথার এক খেজুর গাছ নাকি আছে এখানে, যা দেখতে ট্যুরিষ্টেরা খুব ভিড় করে! তো আমি রিক্সাচালককে জানিয়ে রাখলাম ফেরার পথে ঐ খেজুরগাছ যেন দেখিয়ে দেয় আমাদের। রিক্সাচালক সম্মত হয়ে মন দিল রাস্তার দিকে। বড় রাস্তা ছেড়ে রিক্সা পড়ল এক সরু রাস্তায়। বড় ফলকে দেখলাম লেখা আছে বেনফিশ মৎস বন্দ৷ ভ্যান থামল এক ইঁটপাতা এবড়ো খেবড়ো রাস্তার মুখে। এই পর্যন্তই ছিল ভ্যানের যাত্রা। সামনেই নদীর পাড়। ওটুকু হেঁটে যেতে হবে। ভ্যান চালক এখানেই অপেক্ষা করবে আমাদের জন্যে। আমরা ফিরলে বকখালি পৌঁছে দিয়ে তবে তার ছুটি।

এখানে এক পেট্রল পাম্প দেখলাম যার তৈলাধার মাটির উপরে। বিশাল পেটমোটা ডিম্বাকৃতি এক তৈলাধার যার দুটি মাথাই কাটা। এই প্রথম এক পেট্রল পাম্প দেখলাম যার তৈলাধার মাটির উপরে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ইঞ্জিনের নৌকোরা সব এখান থেকেই তেল নিয়ে যায় আর যে সমস্ত যানবাহন আসে এখান থেকে মাছ নিয়ে যেতে তাদেরও তেলের যোগান এখান থেকেই যায়। উঁচু বাঁধানো পার ধরে আমরা এগোলাম নদীর দিকে। প্রথমেই যা চোখে পড়ল, সারসার রং-বেরঙের নৌকো দাঁড়িয়ে আছে মাটিতে। ভাটার নদী সরে গেছে বহুদূরে। সরু এক ফিতের মতো পড়ে আছে সামনে। আর বালুমাটিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নৌকোরা সব। জোয়ারের অপেক্ষায়।

একথাক বাঁধানো সিড়ি বেয়ে নেমে গেলাম এক লম্বা সিমেন্টের চাতালে। নদীর পারে খানিকটা জায়গা বাঁধিয়ে তৈরী হয়েছে এই বন্দর। বেনফিশের মৎস বন্দর। শেষ রাতের অন্ধকারে নৌকোরা সব এখান থেকে বেরিয়ে যায় সমুদ্রে। মাছ নিয়ে আবার এখানেই ফেরে দুপুরের শেষভাগে। তিনটে বাজতেই ফেরা শুরু হয় নৌকোদের। একে একে নৌকোরা সব ফেরে। সবই ইঞ্জিনের নৌকো। যেখানটাই ছই থাকার কথা সেখানে এই নৌকোগুলোতে আছে এক কাঠের কেবিন। কোন কোন নৌকোর কেবিন আবার দোতলা। রঙবাহারি সব কেবিন।

প্রায় সব নৌকোরই কেবিনের উপর সরু দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা আছে সারসার লটে মাছ, শুকিয়ে শুটকি করা হচ্ছে। নৌকোরা যেসময় ফিরতে শুরু করে, সেই সময় ধরে ওখানে হাজির হয় মাছের খরিদ্দারেরা। দু চারজন বেড়াতে আসা মানুষ ছাড়া আর যারা এখানে আছে সবাই মাছের সাথেই যুক্ত। কেউ কিনতে আসে তো কেউ সমুদ্র থেকে মাছ ধরে বিক্রি করতে। খদ্দেরও মিশ্র, কিছু স্থানীয় মানুষও আসে একটু কম দামে ভাল মাছ কিনতে আর আসে সব পাইকার, এখান থেকে সস্তায় কিনে নিয়ে একটু বেশি দামে বাজারে বিক্রী করতে। এই বাঁধানো চাতাল থেকে একটু দূরে ঐ তৈলধারের পাশেই বসে এক নিলামের বাজার। নৌকো থেকে মাছ নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ঐ মাঠে৷ নিলাম হয় সব মাছ আর তারপরেই সব লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ প্লাষ্টিকের প্যাকিং বাক্সে উপরে নিচে বরফ বিছিয়ে দিয়ে বাক্সবন্দী হয় সব মাছে। অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বড় মাঝারি সব ট্রাক আর লরী৷ মাছের বাক্স পিঠে চাপিয়ে এখুনি সব ছুটবে গঞ্জ-শহরের উদ্দেশ্যে।

০৫
নদীর পারে বানানো এই চাতাল নদী থেকে প্রায় দু মানুষ সমান উঁচু। এই চাতাল ঠিক নদীর পারে নয় বলা চলে নদীর উপরেই বানানো হয়েছে৷ ভাটার নদী সরে যেখানে এসে দাঁড়ায় সেখানে এই বাঁধানো চাতাল। আমার বড় ইচ্ছে হচ্ছিল জোয়ারের নদী দেখার, জোয়ারে এই বন্দর কেমন দেখায় তা দেখার কিন্তু সে উপায় নেই। এখুনি ফিরতে হবে আর জোয়ার আসতে আসতে সেই সন্ধ্যে পার! চাতালের ডানপাশে নদীর শান্ত জল আর বাঁপাশে জল সরে যাওয়া নদীতট৷ যেখানে ইতস্তত: দাঁড়িয়ে রং-বেরঙের সব নৌকো। আচ্ছা এই নৌকোগুলো কি জোয়ার এলে জালে ভাসে রোজ? কাকে জিজ্ঞেস করি? থাক! কি হবে জেনে 

নদীর ওপার কালচে সবুজে ছাওয়া দৃষ্টি চলে না ঐ সবুজের ভেতর দিয়ে। যতদূর চোখ যায় এক কালচে গাঢ় সবুজ বিস্তৃত নদীতীর ধরে। ওখানে কি কোন গ্রাম আছে? আছে জনবসতি? আছে নিশ্চয়ই! কিন্তু এখান থেকে এই মৎসবন্দরে দাঁড়িয়ে তার আভাসটুকুও পাওয়া গেল না। চোখ গেল পশ্চিমে, যেখানে সূর্য ঢলে পড়েছে নদীর বুকে। নদীর জলে আরেকটা সূর্য দেখতে পেলাম। সূর্যের দিকে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও চোখে লাগল না। এতটা নিষ্প্রাণ সূর্য! সরু রোগাভোগা নিস্তরঙ্গ নদীর বুকে এক নিষ্প্রাণ সূর্য ঢলে পড়েছে। এক মরা আলো শুধু চিকচিক করছে জলের ভেতর!

দুপুরে খেতে বসে মাছের গল্প শুনে আর এখানে এসে এই নৌকো থেকে মাছ নামানো দেখে মনে হল, কিছু মাছ কিনে নিলে কেমন হয়! রান্না তো সেই দোকানি বৌদি করে দেবেই বলেছে। তো যেই ভাবা সেই কাজ। মাছ কেনার উদ্দেশ্যে এবার শুরু হল এই নৌকো ঐ নৌকোতে চোখ দিয়ে খোঁজার পালা। কোন নৌকো থেকে কি মাছ নামছে সে দেখে নিয়ে সেইমত কেনা হবে। দেখলাম আরও বেশ কিছু বেড়াতে আসা মানুষও এভাবেই মাছ কেনার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছেন। এর মধ্যেই একটি নৌকো থেকে একজন জিগ্যেস করল, আপনারা কি জম্বুদ্বীপে যাবেন? চলুন না, বেড়িয়ে আসবেন! আমার তো নৌকোয় করে সাগরের উপর দিয়ে দ্বীপে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে ষোল আনা কিন্তু সময়! সময় কোথায়? এখন দ্বীপ দেখতে গেলে ফিরতেই তো সন্ধ্যে পার! তাহলে আর বকখালি বিচে বসা হবে না বিকেলে! দ্বীপে বেড়াতে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিলাম। একদিনে আর কতটুকুই বা দেখা যায়! একটি নৌকো এসে বন্দরে ভিড়ছে দেখে ওদিকে তাকালাম, ভেতরে লোকজন বসে আছে দেখে বুঝলাম, এই নৌকোটি সেই জম্বুদ্বীপ থেকে ফিরল! চাতালের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলাম বলে চোখে পড়ল, ভেতরে একজন মহিলা বসে আছেন। সাথে আরও কিছু লোকজন চোখে পড়ল কিন্তু সেদিকে মন গেল না। আবারও চোখ ফেরালাম মাছের নৌকোর দিকে।

একটা কোলাহল কানে আসতে আবার চোখ গেল ঐ বেড়িয়ে ফেরা নৌকোটিতে, এক ভদ্রলোক চেঁচামেচি করছেন। কথা শুনে বোঝা গেল, তিনি বসে থাকা ভদ্রমহিলাটির স্বামী আর চেঁচামেচি করছেন নৌকোর ভেতরে বসে থাকা পাঁচ-ছটি ছেলের উদ্দেশ্যে। একটি ছেলে তার স্ত্রীর সাথে অসভ্যতা করার চেষ্টা করেছিল নৌকোর ভেতর। নৌকোটি জলে থাকা অবস্থায় তিনি কিছুই বলেননি, তীরে ভেড়া মাত্রই কান ধরে হিড়হিড় করে ছেলেটিকে টেনে নামিয়েছেন আর মুখে বলছেন, কি করবি এবার কর, নৌকোতে বসে কি করতে চাইছিলি আমার বৌকে, এবার কর, এখানে কর৷ ছেলেটি প্রতিবাদ করতে চাইছিল, সে কিছুই করেনি বলে আর তার সাথীরাও সেকথাই বলছিল, কিন্তু ততক্ষণে তার কানের দফারফা আর চড় চাপড়ও পড়ছিল মুষলধারে। 

আকাশনীল স্কার্ট আর ম্যাজেন্টা রঙের কুর্তি পরা তার সুন্দরী স্ত্রী এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সবাই একবার তাঁর দিকে তাকায় তো পরবর্তী মুহুর্তেই আবার তাকায় তার স্বামীর দিকে। যিনি একহাতে ছেলেটির কান ধরে রেখে সমানে মেরে যাচ্ছেন অন্যহাতে। দাঁড়িয়ে তামাশা দেখা লোকেরা এবার এগিয়ে গেল ছাড়ানোর চেষ্টায়, বেগতিক দেখে মার খেতে থাকা ছেলেটির বন্ধুরা এগিয়ে এসে এবার ক্ষমা চাইতে লাগল বন্ধুর হয়ে কিন্তু যার স্ত্রীর সাথে অশালীন ব্যবহার করা হয়েছে তিনি ছাড়তে নারাজ। শেষমেষ ছাড়তে রাজী হলেন কিন্তু ছেলেটিকে তাঁর স্ত্রীর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে এই শর্তে। এবং শুধু বেয়াদবী করা ছেলেটিই নয়, তার বন্ধুদেরও ক্ষমা চাইতে হবে ঐ একই ভাবে, কারণ তারা এই অসভ্য ছেলেটির বন্ধু এবং তার সঙ্গে আছে। ছেলেটি মুক্তির রাস্তা পেয়ে সাথে সাথেই ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে বসে পড়ে ক্ষমা চাইল, জীবনে আর কারও সাথে এরকম করবে না সেই অঙ্গীকারও করল। তার সাথীদের একজন ক্ষমা চাইতে রাজী ছিল না যেহেতু সে অপরাধ করেনি তখন মার খাওয়া ছেলেটি তাকে বলল শিগগীর ক্ষমা চেয়ে নে আর এখান থেকে চল! 

একে একে ছজনের দলটি ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে বসে ক্ষমা চাইল আর ঝটপট এগিয়ে গেল ফেরার পথে! একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লোক এতক্ষণে সামনে এগিয়ে এল যার হাতে এই বেড়াতে আসা দম্পতির জলের ক্যান, রুকস্যাক। এগিয়ে এসে বলল, বাবু, গাড়িতে যাই এবার? বাবু বললেন, যা, বস গিয়ে, আসছি৷ স্বামী স্ত্রী ধীরপায়ে এগোলেন ফেরার পথে, ভদ্রলোক তখনও গজগজ করে যাচ্ছেন আর তাঁর স্ত্রী তখনও চুপ, চেহারায় বিরক্তির ছাপ। আমার সঙ্গী তখন বন্দরের আরেক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন ফোন কানে, এই কোলাহল থেকে দূরে।

একভাবে নদীর বুকের এই বন্দরে জলের ধার ঘেঁষে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠল! একেবারে যাকে বলে উপর থেকে নিচে আর নিচে থেকে উপরে দুই-তিনবার যেন পাক খেয়ে উঠল। রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলাম বলে সামলে নিলাম কিন্তু আর দাঁড়াতে সাহস না পেয়ে জলের ধার ছেড়ে চাতালের অন্যদিকে এসে বসে পড়লাম একটু সিঁড়িমত জায়গায়। পেছনে শুকনো নদী আর সামনে মাছের বন্দর যেখানে এখন নৌক থেকে মাছ তুলে বেছে আলাদা করা হচ্ছে। এক একটি নৌকো থেকে এক এক রকমের মাছ। কোন নৌকো থেকে শুধুই পার্শে তো কোনটি থেকে পাঁচমেশালী। লটে দেখা গেল প্রায় সব নৌকো থেকেই নামছে। দেখলাম চকচকে রুপোলী ছুরি মাছ, সোনালী তোপসেরা সব শুয়ে আছে একের পরে এক ঢিবি হয়ে। 

হঠাৎ চোখে পড়ল এক হাঁসের উপর! হাঁস! এখানে কোত্থেকে এল! বেশ বড় একটি বুনোহাঁস। মাছ নিয়ে ফেরা একটি নৌকো একে তুলে এনেছে জম্বুদ্বীপ থেকে। হাঁসটি উড়তে পারছে না, ডানায় নাকি বাত ভর করেছে, ফুলে আছে ডানা! আমি প্রথমে ভাবলাম এ বোধ হয় বিক্রী করার জন্যে ধরে এনেছে কিন্তু দেখলাম না, তা নয়। পাখিটাকে শুশ্রুষা করবে বলেই জেলেরা এটিকে ধরে নিয়ে এসেছে সাথে করে। কিছু কুচো মাছ রাখা আছে পাখিটার সামনে, কিন্তু তার খাওয়ার কোন ইচ্ছে দেখা যাচ্ছে না। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে হয়ত, কোথায় এল! আগ্রহী মানুষদের আগ্রহ মিইয়ে গেল খানিক পরেই এই পাখিটিকে নিয়ে, সবাই সরে গেল যার যার জায়গায়, কাজে৷ ফাঁকা দেখে পাখিটা ধীর পায়ে, প্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে জলের ধারে গিয়ে ঝাঁপ দিল জলে। খুব ধীরে অসুস্থ ডানায় সাঁতার কেটে এগোতে লাগল অন্যপারের দিকে, সেবা করতে চাওয়া মানুষগুলোকে ছেড়ে, এই বন্দরকে ছেড়ে সে এগিয়ে যেতে লাগল তার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে...

-অসমাপ্ত

No comments:

Post a Comment