Sunday, December 30, 2007

চিত্রকর তুমি চিত্র আঁকো - ২য় পর্ব



জর্জ আর দীপালী আয়োজন করেছিল এই ক্যাম্পের। রামস্বামিকে জিজ্ঞেস করে পরে জেনেছি এই ছবি বিক্রির টাকা নাকি একটা চার্চে যাবে, আর শিল্পিরা যে সব ছবি এঁকে দিয়ে যাবেন তার নাকি একটা প্রদর্শনীও হবে, কবে কোথায় তার অবশ্য কিছুই ঠিক হয়নি এখনও। আর এক বন্ধুর কাছে পরে শুনেছি, ঐ দুজন নাকি আর্ট ব্রোকার। ওরা বিভিন্ন জায়গায় এরকম সব ক্যাম্পের আয়োজন করে, আর সেটাই ওদের কাজ-ব্যবসা। কিন্তু আমি রামস্বামির কাছে শুনেছি, চ্যারিটির জন্যেই নাকি এই কর্মশালা!!


মাহমুদুল হক স্যার গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়েই খানিক গল্প করলেন, আমি আর নার্গিস দুজনেই ফেরার জন্যে পা বাড়িয়েছি দেখে বললেন, থাকো না কিছুক্ষণ, আমরা দুটো প্রদর্শনী দেখব, চলো আমদের সাথে। দুজনেই কিন্তু কিন্তু করছিলাম, কিন্তু স্যার জোর দিয়ে বললেন, আরে চলো তো! সম্ভবত সাংকোচের কারণ অনুধাবন করেই বললেন, আরে, অতো ভাবো কেনো? বেশি ভাবলে মেয়েদের মুখে ভাঁজ পড়ে, সৌন্দর্য নষ্ট হয়, চলো তো! তারপর ওদিকে কার উদ্দেশ্যে যেন হাঁক দিলেন, আমার সাথে এই দুই সুন্দরী যাবে, গাড়িতে যায়গা না থাকলে ট্যাক্সি ভাড়া করো! ট্যাক্সি ভাড়া করতে হলো না, গাড়িতেই জায়গা হলো। বিশালাকারের দুই গাড়ির আয়োজন করে রেখেছিল দীপালীরা। প্রায় পনেরজন মানুষকে নিয়ে সেই দুই গাড়ি চললো গ্যালারি সংস্কৃত-র দিকে। গণেশ হালুই-এর ছবির প্রদর্শনী দেখতে। সন্ধে তখন ভালো মতনই ঘনিয়েছে। শীতের সন্ধে ৬'টাকেই রাত বলে ভুল হয়।



বলতে ভুলে গেছি, আমার কিছু প্রপ্তিযোগ হয়েছে। হাশেম খান আমাকে দিয়েছেন তাঁর একটি বই- নিরাবরণ কন্যার গল্প অল্প। ছোটগল্পের সংকলন। আমি লিখি সেটা তিনি আগেই শুনেছিলেন সেজন্যেই বইটা দিলেন, বললেনও সেটা আর ওঁর বই পড়বো কিনা সেটা জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলেন। আপ্লুতচিত্তে বই ব্যাগস্ত করে নিচে নেমে এসেছিলাম। হাশেম খানের ঘরেই দেখা হলো যোগেন চৌধুরীর সাথে, তিনি এসেছিলেন ওঁদের সাথে দেখা করতে। পরিচয় হলো কিন্তু কথা খুব একটা হয়নি, কারণ তিনিও বেরুচ্ছিলেন আর আমিও। গাড়িতে বসেই শুনলাম, রাতে খাওয়ার নেমন্তন্ন আছে শিল্পি শুভাপ্রসন্নর বাড়িতে আর সেখানেও হক স্যার আমাদের যেতে বলছেন। আবারও কিন্তু কিন্তু করার পালা। আমার যেতে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু ফিরতে রাত হয়ে যাবে আর আমি একলা, আর আরেকটা ব্যপার তো আছেই, আমি এঁদের কাওকেই চিনি না, নিমন্ত্রিতও নই কাজেই এবারের কিন্তু কিন্তুটা বেশ জোরালোই ছিল। হক স্যার কোন কথাই শুনতে রাজী নন, গাড়িতে বসেই অন্য গাড়িতে থাকা জর্জের উদ্দেশ্যে হাঁক দিলেন, আমার দুই বান্ধবী আছে, এদের নিয়া যাওয়া যাইব না তোমাদের শুভাপ্রসন্নর বাড়িতে? জর্জ জানায়, কোন সমস্যা নেই, চলুন!



গ্যালারি সংস্কৃতে ছবি দেখতে গিয়ে আলাপ হল গ্যালারির অবাঙালি মালকিনের সাথে। তদারকিতে ব্যস্ত থাকলেও সম্মানিত অতিথি সমাগম হয়েছে সেটা তাঁর চোখ এড়ায়নি। সম্ভবত জর্জ আগে থেকেই বলে রেখেছিল অতিথিদের কথা। এগিয়ে এসে আলাপ করলেন প্রত্যেক অতিথির সাথে, নিজেই সাথে সাথে ঘুরে ফিরে দেখালেন গ্যালারির এমাথা ওমাথ, এঘর ওঘর। সালোয়ার কুর্তা পরা মাড়োয়াড়ি মহিলা, বয়েস খুব বেশি নয়, কথায় বার্তায় দারুণ চৌখস আর তুখোড় ব্যবসাদার মানুষ। মিষ্টি কিন্তু মাপা হাসি সারাক্ষণ মুখে ধরে রেখে সাথে সাথে থাকলেন, নিজে হাতে বিশাল কাঠের ট্রেতে করে চায়ের কাপ নিয়ে ঘুরে ঘুরে চা দিলেন সবাইকে। বিশাল হলঘরের এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রচুর হ্যান্ডিক্রাফটের জিনিস পত্র, এমনভাবে রাখা, দেখলে মনে হয় যেন জাষ্ট ফেলে ছড়িয়ে অযতনে রেখে দেওয়া হয়েছে কিন্তু একটু নজর করলেই বোঝা যায় প্রতিটি জিনিসই ভীষণ যত্নে রাখা হয়েছে আর ইচ্ছে করেই ওভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেওয়ালের ধার ধরে সব চকচকে বাদামী কাঠের শেলফ, যাতে ছবি সংক্রান্ত সব বই, ম্যাগাজিন। বেরুনোর মুখে প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিলেন তাঁর নাম লেখা কার্ড, হাসিটি ধরে রেখে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন সবাইকে।



সল্টলেকে শুভাপ্রসন্নবাবুর বাড়ি যেতে রাজী হল না নার্গিস, গৌতমদা বাড়িতে একলা আছে আর ফিরতে সত্যিই রাত হয়ে যাবে বলে। গ্যালারি সংস্কৃত আর অ্যাকাডেমী অফ ফাইন আর্টস ঘুরে ৩টে প্রদর্শনী দেখে ওখান থেকেই বিদায় নিল নার্গিস, কাল আবার দেখা হবে বলে। সঙ্গীতের ছাত্রী নার্গিসের কাছ থেকে রনবী সুলুক সন্ধান নিলেন কোথায় কী গান পাওয়া যাবে। গাড়িতেই আলাপ হল শেখ আফজালের সাথে। তিনিও চারুকলায় পড়ান আর একসময় ছাত্র ছিলেন এঁদের, যাদের সঙ্গে তিনি এসেছেন। গানের ব্যপারে তিনিও আগ্রহী আর মিউজিক ওয়ার্ল্ডে তিনিও যাবেন গানের খোঁজে সেটা বলে রাখলেন।



রোকেয়া আর দীপালী বসেছিলেন গাড়ির সামনের সিটে, তাঁরা নিজেদের মধ্যেই কথায় মগ্ন রইলেন সারা পথ। সেই গাড়িতে আমি ছাড়াও ছিলেন আমিনুল ইসলাম, রনবী, হাশেন খান, শেখ আফজাল, মাহমুদুল হক আর আবু তাহের। আরও ছিলেন শান্তিনিকেতনের কলাভবনের শিক্ষক অশোক ভৌমিক, যিনি সারা পথ তুমুল আড্ডা দিলেন সকলের সাথে, বাঙাল ভাষায় কথা বলে নিজের প্রায় ভুলে যাওয়া মাতৃভাষাকে আবারও খানিকটা যেন ঝালিয়ে নিলেন এই ফাঁকে। আরও দুজন ছিলেন, যাঁদের সাথে আমার কথা হলেও পরিচয় হয়নি, আমি এমনকি তাঁদের নামও জানি না। শিল্পি শুভাপ্রসন্ন'র বাড়িতে গিয়ে সকলেই প্রসন্ন হয়ে ফিরে আসবেন, এই বলে হাসি তামাশাও করলেন সকলে মিলে। সবচাইতে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল এদেশীয় বাঙালিদের আতিথেয়তা। এ নিয়ে এক একজন আপন আপন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলে আর আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন, কী রকম আতিথেয়তা পাবেন যাত্রাপথের শেষে!



চলবে--

Sunday, December 23, 2007

চিত্রকর তুমি চিত্র আঁকো...



সেদিন বসেছিল এক তারার মেলা। না। শুধু সেদিন নয়, মেলা বসেই ছিল তিন দিন ধরে। ওল্ড কেনিলওয়ার্থ হোটেলের লনে সকাল থেকে সন্ধে অব্দি সেই মেলা চলেছিল তিনদিন ধরে। বাংলাদেশের চিত্রজগতের নামি-দামি সব চিত্রকর তারকারা ইংরেজ জমানার পুরনো ঐ হোটেলবাড়িটিকে আলোকিত করে রেখেছিলেন নিজেদের উপস্থিতি দিয়ে, অমূল্য সব শিল্পকর্ম তাঁরা সৃষ্টি করেছেন অযত্নে ফেলে রাখা বহুদিন না ছাটা ঘাসের ঐ লনে।



তারকাদের ঐ মেলায় আমার পৌঁছুনোর কোন কারণ ছিল না কিন্তু তবুও পৌঁছে গেলাম। বন্ধুবর রামস্বামী ফোন করে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের কিছু চিত্রকর আসছেন একটা আর্ট ক্যাম্পে, আমি যেন অবশ্যই যাই, আমার ভালো লাগবে আর হয়তো একটা ব্লগও লিখে ফেলতে পারবো ক্যাম্প ঘুরে এসে! শেষ লাইনটি উনি অবশ্য ঠাট্টা করেই বলেছিলেন। কে কে আসছেন জানতে চাইলে একটি পরিচিত নাম শুনতে পেলাম, শাকুর স্যারের নাম। আরো দুটি নাম বলতে পারলেন রামস্বামী, রোকেয়া সুলতানা ও নাসরিন বেগম। শেষোক্ত নাম দুটির সাথে আমি পরিচিত নই, আর প্রথম নামের সাথেই শুধু পরিচিত, মানুষটির সাথে নয়।


সুমেরু সেদিন নন্দীগ্রামে। মহাশ্বেতা দেবীর সাথে রিলিফ নিয়ে ওখানে গেছে আগের দিন। রবিবার ফেরার কথা বিকেল নাগাদ। বারে বারেই ফোন করি, ফোন থাকে নট রিচেবল। অবশেষে বিকেল প্রায় চারটে নাগাদ কুন্ঠিত পায়ে গিয়ে ঢুকি পুরনো কেনিলওয়ার্থ হোটেলের লনে। রামস্বামি দুটি নাম বলে দিয়েছিলেন, দীপালী আর জর্জ। যারা এই ক্যাম্পের উদ্যোক্তা। তাদের কাছে আমার কথা বলে এসেছিলেন, বিশিষ্ট এক বাংলাদেশী ব্লগার ও লেখক আসবেন, তাঁকে যেন খাতির করা হয় ও অতিথিদের সাথে আলাপ পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়! খাতির পাবো কিনা ভাবনা সেটা নয়, সম্পূর্ণ অচেনা এক জায়গায় অচেনা কিছু মানুষের সাথে আলাপ করতে যাচ্ছি যে কাজটিতে আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই। কিন্তু যাঁরা এসেছেন তাঁরা আমার দেশের মানুষ শুধু এই কথাটি মাথায় রেখে পায়ে পায়ে হাজির হই।


তখন শিল্পিরা সেদিনকার মতো কাজ সেরে নিজের নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকেছেন, খানিকটা জিরিয়ে নেবেন বলে। লনে শুধু একজন বয়স্ক মানুষ ক্যানভাসে তখনও দিয়ে যাচ্ছেন তুলির আঁচড়। দু-চারজন এদিক ওদিক ইত:স্তত ঘুরে বেড়ানো মানুষ দেখে বুঝতে পারি এরা হোটেলের লোক, জর্জের কথা জিজ্ঞেস করায় এক অবাঙালি মানুষের দিকে হাত ইশারায় দেখিয়ে দিলেন একজন। নিজের পরিচয় দিতে জর্জ বলে, ও ইয়েস! রামাস্বামি তোমার কথা বলেছে কিন্তু আজকের মত ওয়ার্কশপ তো শেষ! এখন এঁরা সব বেরিয়ে যাবেন, কেউ কেউ গেছেনও, তুমি বরং কাল এসো সকালে, সারাদিক থাকো, আমাদের সাথে লাঞ্চ করো। সবার সাথে আলাপ পরিচয়ও হয়ে যাবে! আমি লনের ওমাথায় ইশারা করে জানতে চাই, উনি? ও হাশেম খান আছেন এখনো! এসো আলাপ করিয়ে দেই। হাশেম খান! আমি চমকিত হই নামটি শুনেই। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাই কোমরে অ্যাপ্রন বাঁধা আঁকায় মগ্ন মানুষটির দিকে।


জর্জ আলাপ করিয়ে দেয় বাংলাদেশেরই মানুষ আর লেখক বলে। পাশেই প্লাষ্টিকের টেবলে রাখা তোয়ালেতে হাতের রং মুছে বললেন, এসো ঘরে গিয়ে বসবে, সেখানেই কথা বলা যাবে। লন পেরিয়ে তিনি এগুলেন হোটেলবাড়ির দিকে, একবার থেমে লনের কোণের টেবলে রাখা চায়ের সরঞ্জাম থেকে দুটি কাপ তুলে নিয়ে ফ্লাস্ক থেকে জল গরম জল নিয়ে দুধ চিনি মেশালেন আর তুলে নিলে চায়ের দুটি ব্যাগ। চায়ের একটা কাপ আমার হাতে দিয়ে এগুলেন ঘরের দিকে। হোটেলে ঢোকার মুখে তিনজন মহিলা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে এগুচ্ছিলেন বাইরের গেটের দিকে, খান সাহেব তাদের একজনের দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন, রোকেয়া, পরিচয় করো, ইনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে, আমার শ্বশুরের দেশের মানুষ! রোকেয়া একটি শুকনো হাসি দিয়ে বললেন, স্যার আমরা তো এখন বাইরে যাইতেছি, পরে কথা হবে! আন্দাজ করি, অপর দুজনের একজন বোধ হয় নাসরিন আর অন্যজন দীপালী। আমরা হোটেলের ঘরে গিয়ে ঢুকি। তিনতলার ঘরে যাওয়ার জন্যে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে খানিকটা হাঁপান শিল্পি। বলেন, পুরানো বাড়ি তো, এদের তিনতলা পাঁচতলার সমান!


একজন বয়স্ক মানুষ সেখানে আগে থেকেই ছিলেন। হাশেম খান আমার পরিচয় দিলেন নিজের শ্বশুরের দেশের লোক বলে, আর ওঁর পরিচয় দিলেন নবী স্যার বলে। তারপর আবার যোগ করলেন, রফিকুন্নবীর নাম শুনেছো তো? কার্টুন আঁকেন যে! র-ন-বী!! আমি সবে বসেইছিলাম সোফায়, এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ি। ইনি রনবী? মাই গুডনেস!! হাশেম খান হাসেন, তুমি তো চিনই তাইলে! আমি তাড়াতাড়ি বলি, চিনি বলতে উনার কার্টুন তো অনেক দেখেছি, ওঁকে আজকে দেখলাম! রনবী হাসেন। মানুষটির বয়স হয়েছে। গালে, চোখের নিচে কালচে ছোপ বলে দেয়, বয়েসের সাথে সাথে কিছু রোগও পুষছেন। আমি মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি আমার কল্পনার রনবীর সাথে সামনে বসে থাকা ঐ বয়স্ক মানুষটির সাথে। মেলাতে পারি না। মেলে না। মাথার অবশিষ্ট কয়েকগাছি পাঁকা চুল আর বেশ মোটা গোঁফের যে মানুষটি সামনে বসে আছেন তিনি প্রফেসর রফিকুন্নবী। সবাই যাঁকে নবী স্যার বলে ডাকে।


বিখ্যাত দুই শিল্পির সাথে খানিক গল্প করে রুমে বসেই আরেক কাপ চা খেয়ে নিচে নেমে আসি। গেটের মুখে একটি টাটা সুমো গাড়ি থেকে একজন মানুষ নামছেন, একনজর দেখে চেনা মনে হওয়াতে একটু থমকে দাঁড়াই, আর ততক্ষণে ঐ মানুষটিও আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, মনে করার চেষ্টা করছেন বোধ হয়, কোথায় দেখেছেন। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই হাসিমুখে। মাহমুদুল হক স্যার। সুমেরুর সাথে চারুকলায় গিয়ে আলাপ হয়েছিল, গল্পও হয়েছিল। ঢাকা ক্লাবের নেমন্তন্ন রাখা হয়নি যদিও। উনি একনজরেই চিনতে পারলেন, বললেন, আরে তুমি! সুমেরু কই? গাড়ি থেমে নেমেছিল একটি মেয়েও, সেলফোনে কথা বলছিল অন্যদিকে তাকিয়ে, তার দিকে চোখ পড়তে আবার চমকাই, নার্গিস! নার্গিস সুমেরু বড়ভাইসম শিল্পি বন্ধু গৌতমদার স্ত্রী। বাংলাদেশের মেয়ে, ক্লাসিক্যাল মিউজিকে পিএচডি করছে রবীন্দ্রভারতী থেকে। গৌতমদার সাথে এখানেই আলাপ,প্রেম আর বিয়ে। মাহমুদুল হক স্যারের সাথে ওকে দেখে চমকাই তো বটেই। ততক্ষণে নার্গিসেরও চোখ পড়েছে আমার দিকে, ছুট্টে এসে জাপটে ধরে নার্গিস, স্যার জিজ্ঞেস করেন, আরে তোমরা একজনে আরেকজনরে চিন নাকি!









ক্রমশ--

Thursday, November 29, 2007

যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি ডাকে

এমুপরী,
দেখলে তো,এ' ক'দিন কেমন কেটে গেল? সবেতেই অগ্রাধিকার তোমার টিভি সিরিয়ালের। তোমার গুটিসুটি মারা চেহারাটা বেশ দেখতে পাচ্ছি, না গো তুমি কেবল বাংলাদেশ হয়ে কিভাবে থাকবে? বেশ তো পশ্চিমবঙ্গের নকশা হয়ে যাচ্ছ।



বাহ , বাহ বেশ উটপাখি মার্কা চেহারা দাঁড়াল একটা!


হলদিরামসের অমন নিয়ন ধাঁধানো দোকানে তুমি বসে। হুস হাস বেরিয়ে যায় সব গাড়ি। কিছু আলো ছিটিয়ে যায় শোরুমের মধ্যে।


একুশে ডিসেম্বর


এই প্রথম আমি কোন দীর্ঘ যাত্রায় বই ছাড়া। গল্পের বই। এমন একা ঘরে ভনভনাচ্ছে টিভি। আমি বালিশ লেপ ও মোবাইলে। আসলে সবই তো পালটে যাওয়ার গল্প। দীর্ঘদিন যাত্রায়, প্রবাসকালে চিঠি লিখি না এখন। আগে প্রতি যাত্রায়, গুছিয়ে নিয়ে যেতাম আমার লেখার প্যাডগুলি। যার একপিঠে আঁকিবুকি কাটা। রং বেরং। শীতের পোষাকে পিকনিক, চিড়িয়াখানা। সেই রংটানা কাগজে, হাবিজাবি লেখ, তারপর এলোমেলো করে দাও দাও তোমার জীবনলিপি। 2,5,7 পাঠিয়ে দাও একে, 3,8,1 ওকে। বেশ মজা। কিছু দেখি আর দেখতে পাই না। মৌসুমীর গান।


তোমার সাথে অনেকক্ষণ স্কুলের কথা বল্লাম, কাল রাতে। অনেকক্ষণ। স্কুল জীবন কি শেষ হয়, অত তারহাতাড়ি। আস্তে আস্তে আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে কৃষণচুড়ায়। জানো, সবচেয়ে মজার দিন সরস্বতী পুজোর সময়। বাঁধনছাড়া উল্লাস। বিশেষত পার্শস্ত স্কুল, বালিকা বানিমন্দির। বিশাল লম্বা টিচার্সরুম জুড়ে আর্ট একজিবিশন। সেখানে আমার ছবি আছে ছরহিয়ে। আমি মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়াই। লক্ষ্য করি জনতার চোখ মুখ। তেজপাতার মত ভেসে বেড়ানো নারীদের। নিচের তলায় সায়েন্স একজিবিশন। সুতরাং কর্তাত্তি মারতে সেখানেও আমি । তখন তো নেহাতই নাবালক। ক্লাস এইট। পাশের নদী দিয়ে নৌকা যায়। কিন্তু গান ভেসে আসে না। বাঈজীরা যায় না, যেমনটা দেখেছি টেলিভিশনের পর্দায়। সুতরাং, ওপারে তুমি শ্যাম এপারে আমি, মাঝে নদী বহে রে। আরও টেলিভিশনটা সাদা কালো হওয়ায়, নদীর প্রস্থ যেন বেশি বেশি ঠেকে। উলটো দিকের বেনচে বসে ঝিনুকদি সোজা একটা তেষ্ট টিউব আমার গায়ে ঢেলে দিল।সাদা জামায় ফুটে উঠছে তীব্র ম্যাজেন্টা রং। ইস। আজ আর বাড়ি যাওয়া হয়ে গেল। ওদিকে দ6রবনের হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড দংশন করছে শরীর জুড়ে। ঝিনুকদি হেসেই চলেছে। আমি তাকাতে পারছি না। লাল, স্কুল ইউনিফর্ম স্কার্টের তলা দিয়ে দীর্ঘ সাদা পা। সুতরাং আমার মাথা নিচু। সেই পায়ে আটকে গেল স্কুল জীবন, স্কুলের বাইরে নৌকার বেহিসেবি চলাচল। বাঈজি না যাওয়ার আপসোস।


বাইশে ডিসেম্বর-


কোচবিহারযে খাতাটায় লিখছি, চোখে পড়ল তার সর্বশেষ লাইনটি: This is a machine maid product তা দেখে আমার কেনইবা মন খারাপ হবে। হল। তবু হল। প্রতি বাংলা সিনেমাতেই যে দেখতে পাব, ঋণ স্ব ীকারে, ষ্টেটসম্যান পত্রিকা, ঘটাং ঘট, ঘটাং ঘট, ঘট ঘটাং করে বেরিয়ে আসছে সংবাদপত্রগুলি। তখন বিশেষতই মধ্যরাত। মানুষ অচেতন, মানুষের ষড়যন্ত্রে মেশিনগুলি উৎপন্ন করে চলেছে একরাশ নিউজপেপার প্রজাতি। পুরুলিয়ার বলরামপুরের সেই গালা শ্রমিকদের। বৃদ্ধ বাবা পাশে বসে, বালকটি গালা সেঁকে সামনের লম্ফতে আর অল্প অল্প ফুঁয়ে তৈরী করতে চায় উপরিতলের কারুকার্য। বৃদ্ধ বাবা মাথা নাড়িয়ে চলেছেন মেশিনের মত, হচ্ছে না, হচ্ছে না, ভেঙ্গেঁ ফেল ভেঙ্গেঁ ফেল, বেশ মজার না। সংক্রমণ কখন যে কিভাবে ঘটে। বেশ তো, গুড়িয়ে গেল সেন্টমেরী টাওয়ারদ্্বয়। মানুষ তো মিছরির ডেলা। যত পার গুড়াও, গলে গেলে তবেই তো মিষ্টি!


বাইশে ডিসেম্বর দুই হাজার পাঁচ

Wednesday, November 28, 2007

একা একা

গানটা উড়িয়ে দিলে তুমি 

কেন জানি না

এমন করে তো তুমি রাগ করো না
বরফের নদীতে একা শুয়ে থাকো
বরফ গলা জলে ছায়া পড়ে দুজনার

কোকিলটা আবার ফিরে এসেছে
সেদিন প্রথম তার ডাক শুনতে পেলাম
বিনিদ্র রাত তখন ভোরের দিকে এগিয়েছে। ব্যাকুল অন্তর আরও ব্যাকুল করে কোকিলটা ডেকেই চলে।

সেবার বড্ড জ্বালাতন করেছে। মাঝরাত থেকে শুরু হত তার ডাকাডাকি। কাকে ডাকত কে জানে। যাকে ডাকত সে কী শুনতে পেত? জানি না!


একা একা আমি হেঁটে যাই,
ভিক্টোরিয়ার চত্তর ধরে,
গোল গোল হাঁটি,
এমাথা ওমাথা,
গোল গোল,
ক্লান্ত হলে বসে পড়ি জলের ধারে..
বেঞ্চগুলো ভেঙে দিয়েছে সব। কেন কে জানে। শীত চলে গিয়েও আবার ফিরে এল বৃষ্টির হাত ধরে। ফিরিয়ে নিয়ে এল ঠান্ডাকে, যাওয়ার আগে। আমি ঘামি, কুল কুল কুলকুল..
বসে থাকি রেলিং এর ধারে,
জলে ছায়া পড়ে,
দুজনার..
আমি এখানে একা..


মোবাইলের স্ক্রিনে তোমার ফটো,
হাসিমুখ ভেসে ওঠে ফ্ল্যাপ খুললেই,
আমি তাকিয়ে থাকি নিষ্পলক,
নি:শ্বাষ ভারী হয়,
বাষ্প জমে চোখে ,
গড়ায় না
উড়ে যায় পায়রা হয়ে
কাঠালীচাপার সুগন্ধে ম ম করে চত্তর..
ফেরার পথ ফুলে ফুলে ঢাকা
আমি ফিরে আসি,


একা একা..



১২-২-২০০৭

এমনি এমনি

ইংরেজীতে ডিক্টেশন চলে মাথার পিছনে। মাথা ভোঁ ভোঁ।
সারাদিন ছুতোরের খুটখুট। র‍্যাদা চলে কাঠে, মাথায়। স্পিরিটের ঝাঁঝালো গন্ধ। এলোমেলো এলোমেলো। ঘরদোর। মাথার ভিতর। এলোমেলো এলোমেলো।

নিউমার্কেট ঘুরে ঘুরে কিছুই না কেনা। স্মৃতির সরনি বেয়ে কলেঙ্গা বাজার। চেনা দোকানের পছন্দের চা। গরুর মাংস, কাফ মাসল। সিনার হাড়। ক্ষিরি গুর্দা। আন্ডার কাটের টুকরো। হাতের ভার বেড়ে চলে। প্লাষ্টিকের ব্যাগ ছেঁড়ে ছেঁড়ে। ক্লান্তি গরমের। সারাদিনের নানা হ্যাপার। ফোলা পা টেনে টেনে উঠে বসি ট্যাক্সিতে। হিমেশ রেশমিয়া গেয়ে ওঠেন, এ হুজুররররররর... তেরা তেরা তেরা সুরুরররররররর... 

বিনীত নিবেদন, গানটা বন্ধ করুন। হিমেশের ভক্ত হিন্দুস্তানি ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ি দাঁড় করায় রাস্তার ধার ধরে।
আমি নেমে আসে অন্ধকার রাস্তায়। অন্য ট্যাক্সির খোঁজে। এবং কোন ট্যাক্সিই না পেয়ে অগত্যা বাসের জন্যে আধঘন্টা বেজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকি রাস্তায়। ফোনে পরামর্শ পাই, ট্যাক্সির নম্বর নিয়ে পুলিশে কমপ্লেন কর! হায়! পুলিশে কমপ্লেন! দুইহাতভর্তি গরুর গোশত, মাথার ভিতরে ঝনঝন ঝনঝন। পুলিশে কমপ্লেন!
ডিক্টেশনের সাথে চলে লেহার কুড়কুড়ে। অ্যাকোয়াগার্ড জল দেয় টুং টাং টুং টাং শব্দে। শাকিরা একমনে গেয়ে চলে ল্যাপিতে।


আমার আঙুলগুলো কি-বোর্ডে ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক...






১২-৫-২০০৭


Tuesday, November 27, 2007

পুকুর চুরি

আমার বাড়ির পিছনের পুকুরটি
চুরি হয়ে গেছে । একটু একটু করে
হয়ত কিছুদিন ধরেই হচ্ছিল
আমারই চোখে পড়েনি, আজ
সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই
চোখে পড়ল, পুকুরটা চুরি হয়ে গেছে ।


জানালার পাশেই, এই চারতলা বাড়িটির
সমান উচ্চতার ছিল একটি গাছ ।
নাম না জানা একটি গাছ। ছোট ছোট
মুশুর ডালের মত দানায় ভরে
গোটা গাছ, কিছুদিন পরেই তাতে
ফুটত হলুদে কমলায় মেশানো ফুল ।


এই ফুলগুলো যখন ফুটত তখন
ছাদের উপর থেকে গাছটিকে দেখলে
মনে হত যেন গাছে কোন পাতা নেই,
গোটা গাছ ছেয়ে আছে হলুদে কমলায়
এক না জানা ফুলে । সকাল বেলায়
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই -
প্রথমে দৃষ্টি থমকে যায়, গাছটা নেই ।


আর তার পরেই চোখে পড়ে পুকুরে-
অর্ধেকটা নেই! চুরি হয়ে গেছে
বাড়ির পিছনের পুকুরের অর্ধেকটা
আর তার আশে পাশের ঝোপ-ঝাড় আর
এই বড় চারতলা সমান উচ্চতার গাছটি ।


দাঁড়িয়ে পড়ি জানালার সামনে,
কাল সন্ধ্যেবেলায়ও তো এখানে
গাছটা ছিল, রাতের অন্ধকারে
কেটে ফেলে দিল একটা এত বড় গাছ!
কেউ দেখল না, কিচ্ছুটি বলল না?


গাছের আড়ালে কিছুদিন ধরেই
ঠুক-ঠাক শোনা যাচ্ছিল বটে,
দূরে খানিকটা ঝোপ পরিস্কার
করে তাতে এনে রাখা ইঁটের স্তুপ-
চোখে পড়েছিল কিন্তু পুকুরের
ঠিক মাঝামাঝি দেওয়াল তুলে
একপাশের অর্ধেক পুকুর বুজিয়ে
ভাগাভাগি হচ্ছে বুঝতেই পারিনি ।
ঝোপ কেটে পরিস্কার করা জায়গায়
হেঁটে বেড়াচ্ছে কয়েকটা পাখি,
এই গাছটিতে বুঝি এদের বাসা ছিল ।


কাটা গাছটা পড়ে আছে পাশেই,
সে এখনো মরেনি। খানিকটা প্রাণ
এখনো রয়ে গেছে সবুজ পাতায়,
গাছ জুড়ে বেরোনো ছোট ছোট
দানায়, আর কিছুদিন পরেই যারা
ফুল হয়ে ফুটত। দেওয়ালের এপাশে,
যেখানটায় পুকুর বোজানো হয়েছে
মাটি ফেলে, সেখানকার মাটি ভেজা
ভেজা কাদা কাদা । যেখানটায় ঝোপ
কেটে পরিস্কার করা হয়েছে অন্ধকারে
সেখানে আছে কয়েকটা ছড়ানো ছিটানো
কচু গাছ। কচুবনের অবশিষ্টাংশ ।


এই গাছটাতে এসে বসত একটা ধনেশ ।
রোজ আসত না, মাঝে মাঝে এসে বসত ।
মাছরাঙাটা পুকুর থেকে মাছ ঠোঁটে করে
তুলে এনে বসত এই গাছটায়। শালিখ
আর টুনটুনিরা রাতদিন কিচির মিচির
কিচির মিচির। আর গোটা বসন্ত
তারপরেও গোটা গৃষ্মকালটা জুড়ে
এই গাছে বসে কান ঝালাপালা করেছে
একটা কোকিল। মাঝরাত্তির থেকে
শুরু করতো সে কুউউউ ....কুউউউউ ....
মাঝে মাঝে ডাকতে ডাকতেই উড়ে যেত
দূরে কোথাও, খানিক পরেই ফিরে এসে
আবার সেই কুউউউ .... কুউউউউউ ....
সন্ধ্যের পরেও শোনা যেত তার ডাক।
এমনকি অসহ্য রাতের অন্ধকারেও -


পেছনের এই ঝোপঝাড় কেটে
পরিস্কার করা হয়েছে, ওখানে
বাড়ি উঠবে বলে । প্রমোটারের হাত
অনেক লম্বা, সরকারি আইনের
ফাঁক-ফোকর সে মুঠো মুঠো
মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়-
এই ভাবে চুরি হয়ে যায় গৃষ্ম;
বসন্তের কোকিল, হলুদ ফুলের
গাছের তলায় হারিয়ে থাকা কচুবন
আর আমার লেখালিখির অর্ধেক পুকুর ।

Monday, November 26, 2007

এখানে এখন ঘনঘোর বর্ষা


এখানে এখন ঘনঘোর বর্ষা। আকাশের কোণে কালো মেঘ জমেই আছে, যখন খুশি গোটা আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে আর ঝমঝম বৃষ্টি নামিয়ে দিচ্ছে গাছের পাতায়, পুকুরের জলে, বাড়ির ছাদে, জামডালে বসে থাকা কালো কোকিলের পরে। ভিজে কাক, কোকিল মাঝে মাঝেই কুউ উ উ বলে ডাক ছাড়ছে তারপর আবার বসে ভিজছে... লালরঙা চোখ মেলে তাকিয়ে এদিক ওদিক পানে কি যেন খোঁজে আর ঝিমোয়...
ভিজে জামা কাপড় ডাই হয় ঘরের একোণে, ওকোণে। মাঝে মাঝে একটুশখানি রোদ ঝিকমিকিয়ে ওঠে, আমি ঝটপট জামা কাপড় শুকোতে দিই, জানালা দিয়ে আকাশ দেখি আর দিনদুপুরে গান শুনি, শাওনও রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে...
এখন এই ভরসন্ধ্যেবেলা পশ্চিমের আকাশটা লালে লাল। দূরে দূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেঘেরাও গায়ে মেখেছে সূর্যাস্তের এই লাল। কাছের মেঘেরা মুখ কালো করেই আছে আর কি জানি কি এক অজানা কারণে তারা কালো করে দিতে চাইছে দূরের ঐ লাল মেঘেদেরও! সোঁ সোঁ উতল হাওয়ায় যেন নেচে বেড়াচ্ছে কাছে-দূরের উঁচু নারকোল গাছেরা। মাঝে মাঝে জোর বাতাস এলে এমন নুয়ে পড়ছে যে দেখলে ভয় হয়, মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল বলে..
পানকৌড়িদের বেশ মজা এই বর্ষায়। তারা বেশ এপুকুর ওপুকুরে করে বেড়ায় উড়ে উড়ে। মাঝে মাঝেই ডুবসাঁতার দেয় দুটিতে, খানিক পর ভেসে ওঠে ইতিউতি তাকায় আর আবার ডুবকি। পাশের জমিতে কাজ করতে থাকা রাজমিস্ত্রিদের থোড়াই কেয়ার করে তারা!
পেছনের তিনখানা পুকুরই টইটুম্বুর হয়ে যায় খানিক বৃষ্টির জলে। আর টানা বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, এই পুকুরের জল পাড় ডিঙিয়ে মিতালী পাতায় ঐ পুকুরের জলের সাথে। পাথর ফেলে করা ঐ ঘাট ডুবে যায়। জল থইথই পাশের এই খালি পড়ে থাকা এক চিলতে জমি। 
বর্ষার চাঁদ কী ভীষণ উজ্জল। বৃষ্টি কমতেই সে দেখা দেয় মেঘের ফাঁক দিয়ে। একটু দূরেই জ্বলজ্বল করে সন্ধ্যেতারা, যেন সঙ্গ দেয় চাঁদকে। মেঘেরা ঘুরে বেড়ায় ইতিউতি। হয়তো এখুনি ঢেকে যাবে এই চাঁদ সন্ধেতারাকে সঙ্গে নিয়ে তবু যতক্ষণ সে আছে, ঝকমকিয়ে আছে... ঝলমলিয়ে আছে...






২৯-৬-২০০৭

Thursday, November 22, 2007

মজার খেলা অংক

আমার শ্বশুর-শাশুড়ি থাকেন কলকাতা থেকে ৩৫কিলোমিটার দূরে গঙ্গাতীরবর্তী ছোট্ট শহর চুঁচুড়ায়। শ্বশুরমশায় অবসরপ্রাপ্ত সরকারী চাকুরে। একমাত্র ছেলে স্কুলজীবনের পরে স্থায়ীভাবে আর মা বাবার সাথে থাকেনি। প্রথমে পড়াশুনো পরে কর্মসুত্র আর বোহেমিয়ান স্বভাবে ঘুরে বেড়ায় হেথায় হোথায়। কর্তা-গিন্নি দুজনের টোনা-টুনির সংসার। বই পড়ে, টিভি দেখে খানিকটা সংসার সংসার খেলা করে সময় কাটান। কিছুটা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আর খানিকটা ব্যক্তিগত অসুবিধের কারণে সেখানে গিয়ে আমার খুব একটা থাকা হয় না। মাসে একবার-দু'বার যাই কখনো বা দু'মাসে একবার। দু-এক দিন থাকি কখনো বা এ'বেলা গিয়ে ও'বেলা ফিরে আসি।

চুঁচুড়ায় গেলে বেশিরভাগ গল্প আমার শ্বশুরমশায়ের সাথেই হয়। শাশুড়িমা ব্যস্ত থাকেন রান্নাঘরে। আমি মাঝে মাঝে একটু এটা সেটা এগিয়ে টেগিয়ে দিই কিন্তু শ্বশুরমশায় সেখানেও গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বলে শাশুড়িমা বলেন, যাও যাও, তোমার বাবার সাথে বসে গল্প করোগে, এখানে সবাই মিলে ভিড় কোর না! তো আমি বসে বসে গল্পই করি। বয়েসের কারণে বাবা অনেক কিছুই ভুলে যান বা একই কথা বারবার বলেন। প্রতিবারই আমার সখের কথা জিজ্ঞেস করেন, কী ভালবাসি, কী করে সময় কাটাই ইত্যাদি ইত্যাদি... সেদিন হঠাত্ বললেন, আমার সখ কী জানো? বিশাল বিশাল বইয়ের আলমারী আর সেই আলমারী ভর্তি সব বইয়ের দিকে নিজের অজান্তেই চোখ চলে যায়। আমি বাবাকে কোন জবাব না দিয়ে ঘরের এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে আবার বাবার মুখের দিকেই তাকাই।


বাবা বলেন, শোনো! তুমি বইয়ের আলমারীর দিকে তাকালে বটে, তবে বই আমার সখ নয়, বই আমি ভালবাসি! আমার সখ হলো অংক। তোমরা কম্পিউটারে বসে নানান কিছু করো, লেখালেখি করো, বাবুল (সুমেরু) ছবি আঁকে, আর আমি অংক করি। তোমরা যেমন ম্যাগাজিন পড়ো আমি তেমনি অংকের ম্যাগাজিন রাখি, পড়ি,অংক করি। দেশ-বিদেশের নানা রকমের ম্যাগাজিন। বলে উঠে গিয়ে আলমারী খুলে একটা বই আর একটা ম্যাগাজিন বের করে আনলেন। বইটি বহু পাঠে জীর্ণ কিন্তু ম্যগাজিনটি নতুন। সাথেই টেবিলের উপর থেকে তুলে আনলেন কিছু নোটখাতা। বইটি আমার হাটে দিয়ে বললেন, দ্যাখো! আমি ঐ বিদেশী অংকের বই নিয়ে বেশ খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েই বইয়ের পাতা ওল্টালাম। বাবা ততক্ষণে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে বের করেছেন কয়েকটা তখনো সলভ না করা অংক। একগাল হাসি মুখে নিয়ে বললেন, এগুলো এখনো আমার করা হয়নি!


নোটখাতা খুলে একটা অংক দেখালেন, যেটি করতে তাঁর লেগেছে ছাব্বিশ পাতা। পাতার পর পাতা উল্টে দেখালেন, কোথায় কোথায় তাঁর আটকাচ্ছিল, কোথায় ভুল হচ্ছিল, তবে শেষ অব্দি সলভ হয়ে গিয়েছে আমি তাড়াতাড়ি বইটা টেবিলে রেখে খাতা হাতে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, কী অংক আর কিভাবে সলভ হলো। বাবা আবার বইটা হাতে নিয়ে প্রব্লেমটা বের করেছেন বইয়ের মাঝামাঝি অংশ থেকে আর আমাকে বললেন, পড়ো! আমি পড়লাম, প্রব্লেমটা ছিল-


পাঁচজন বন্ধু সাথে একটা বানর নিয়ে দেশভ্রমণে বেরিয়েছে। সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে তারা সন্ধেবেলায় যেখানে এসে থামল সেখানে কোন লোকালয় নেই। একটা খোলা মাঠমত জায়গা, কিছু গাছ আছে এখানে ওখানে। বানরটাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে তারা রাতের খাওয়া সেরে বিশ্রাম নেবে ভাবলো। তাদের কাছে খাবার বলতে আছে কিছু বাদাম। গাছতলায় শোওয়া মাত্রই প্রত্যেকেই ঘুমিয়ে পড়লো, সারাদিনের অবিশ্রাম চলার ক্লান্তিতে। খানিক বাদে একজনের ঘুম ভাঙলে সে উঠে বাদামের থলি থেকে বাদামগুলোকে বের করে ৬ভাগে ভাগ করলো। সাথীদের কাওকে ডাকলো না, তারা ক্লান্ত আছে, ঘুমোক, যখন উঠবে খেয়ে নেবে এই ভেবে। নিজের ভাগের বাদামগুলো খেয়ে নিয়ে সে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। খানিক বাদে আরেকজন উঠলো, আর সেও একইভাবে বাদামগুলোকে ৬ ভাগে ভাগ করে একভাগ খেয়ে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো অন্যেরা যে যখন জাগবে খেয়ে নেবে এই ভেবে। এভাবে প্রত্যেকেই উঠলো আর বাদাম খেয়ে শুয়ে পড়লো।


সকাল হতে সবাই যখন একসাথে ঘুম থেকে উঠলো, কেউই নিজের বাদাম খাওয়ার কথা বললো না এই ভেবে, ওরা সব ঘুমোচ্ছিল আমি একা উঠে বাদাম খেয়ে নিয়েছি জানতে পারলে ওরা কি ভাবে! প্রত্যেকেই একই কথা ভেবে নিজের নিজের খাওয়ার কথা কেউ কাওকে বললো না। ঝোলার বাদামগুলোকে বের করে ৬ভাগে ভাগ করে একভাগ বাদাম বানরকে দিয়ে বাদবাকি বাদাম পাঁচজনে মিলে খেল। কারোরই পেট ভরলো না কিন্তু চুপচাপ সবাই উঠে আবার হাঁটা দিল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। যদিও কেউ কিছু বললো না কিন্তু এই সন্দেহটা সবার মনেই জাগলো, বাদাম তো এত কম ছিলো না, কেউ কী রাতে উঠে বাদাম খেল?

প্রশ্নটা হচ্ছে সব মিলিয়ে কত বাদাম ছিল ঝোলায়?

২৬পাতা খরচ করে তিনি অংকটা শেষ করেছেন, যার উত্তর; ঝোলায় বাদাম ছিল ২৫হাজার ২শো ২৩টা!

আমি টুক করে বইয়ের পেছনদিকে পাতা উল্টে উত্তর মিলিয়ে নিচ্ছি দেখে আবারও একগাল হেসে বললেন, মিলিয়ে নাও, আমি অবশ্য উত্তর মেলাই না...

লজ্জ্বায় তাড়াতাড়ি কিছু একটা বলতে গেলাম দেখে হাত নেড়ে বারণ করলেন বললেন, ঠিক আছে ঠিক আছে লজ্জ্বা পাওয়ার কোন কারণ নেই...

Monday, November 19, 2007

আমি হেঁটে যাই চাঁদের সাথে...

স্মৃতির সরণি বেয়ে হেঁটে বেড়াই সারাদিনমান...
হাত ডোবাই পাঁকে, খোঁজ করি পদ্মের
মেলে না...
মেলে না...
কাঁদা ঘাটাই সার হয়
ক্লান্তি আসে, তবু থামি না
ঘেঁটেই চলি ঘেঁটেই চলি..
একসময় গড়িয়ে পড়ি খড়ের গাদায়
আমার ছেলেবেলার খড়ের গাদায়...
কী হবে পদ্ম তুলে..
বরং এইখানে শুয়ে থাকি খানিক চুপটি করে
কেউ দেখতে পাবে না আমায়...


একসময় আমি চাঁদের সাথে হেঁটে বেড়াতাম, সরু চাঁদ, মোটা চাঁদ, আধখানা চাঁদ, পূর্ণচন্দ্র। সন্ধেবেলায় আকাশে চাঁদ উঠলেই আমার পাগল পাগল লাগত, চাঁদ যেন আমায় ডাকছে। কতদিন আমি একা একা কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে পড়েছি চাঁদের সাথে, আমিও হাঁটি চাঁদও হাঁটে. আমি থামলে চাঁদও থামে, একসময় বাড়ির কথা মনে পড়ত, পরদিনের স্কুলের পড়া, বাড়ি ফিরে মা'য়ের বকুনি কখনোবা মৃদু উত্তম মধ্যম, ফিরে আসতাম ঘরে, ওমা, চাঁদও ফিরছে! হ্যাঁ, চাঁদও ফিরত আমার সাথে, এসে জনালার কোণটিতে চুপটি করে দাড়িয়ে পড়ত, আমার ঘুম আসত আর চাঁদও কখন যেন চলে যেত আমার জানালা থেকে...


স্বধীনতার ষাট বছর, সিক্সটি ইয়ারস অফ বিইং ফ্রী।আকাশে ঘুড়িদের মেলা, সাদা ঘুড়ি, লাল ঘুড়ি, সাদায় কালোয় ছোট ছোট দাগ কাটা ঘুড়ি, সবুজ কমলা আর সাদায় তেরঙা ঘুড়ি, রাণীরঙা ঘুড়িরা সব উড়ে বেড়াচ্ছে ছাদের মাথা থেকে, সামনের ছোট মাঠ থেকে, টালির চালের নিচের একচিলতে পা রাখার জায়গা থেকে। ঘুড়িদের রঙে ধূসর আকাশে রঙের মেলা, স্বাধীন বলেই গলা সমান উঁচু দেয়াল টপকে পাশের বাড়িতে ঢুকে পড়েন বাবাটি, উড়ে গিয়ে পড়ে যাওয়া ঘুড়িটি কুড়োতে। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি হাফ প্যান্ট আর কিটোস পরা শিশুটি অপেক্ষা করে দেওয়ালে এধারে, ঘুড়িটির অপেক্ষায়...


পথশিশুটি সুতোর প্রান্তটি হাতে নিয়ে দৌড়য় ঘুড়ির পেছন পেছন, উড়ে আসা একটি ঘুড়ি কেটে দেয় তার ঘুড়িটিকে, ঘ্যাচাং! ঘুড়ি তবু উড়ে, বাতাসের ডানায় ভর করে ঘুড়ি উড়ে চলে, একসময় আর পারে না, পানাভর্তি ডোবায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ে, ঘুড়ির পেছন পেছন দৌড়ুতে দৌড়ুতে পথশিশুটি এসে দাঁড়ায় ডোবার ধারে, মলিন মুখ, আরেকটি ঘুড়ি কেনার স্বাধীনতা তার যে নেই...


আমি এখনও চাঁদের সাথে হাঁটি। জানালা পেরিয়ে নেমে পড়ি পাশের বাড়ির ছাদে, সেখান থেকে এ'ছাদ ও'ছাদ পেরিয়ে সোজা উঠে পড়ি ফ্লাইওভারে. হেঁটে হেঁটে বিদ্যাসাগর সেতু, ওপারে আলো ঝলমল কলকাতা, চাঁদের আলো ম্লান হয়ে যায় সে আলোতে, প্রায় দেখাই যায় না, মরা, ফ্যাকাশে সাদা নিয়নের আলোয় ভেসে যায় বিদ্যাসাগর সেতুও, তবু আমি ঠিক দেখতে পাই চাঁদকে, ঐ তো, আমার সাথেই হাঁটছে সেও...


ভরা গঙ্গা উপচে উপচে পড়ে দুপাশে, ঘোলা জলও চিক চিক করে চাঁদের আলোতে। আমার বড় সাধ হয় আমি নৌকোয় করে খানিক বেড়িয়ে আসি গঙ্গায়, কিন্তু না, আজ থাক, আরেকদিন হবে, অন্য কোনদিন...


15-08-07

Saturday, November 17, 2007

প্রাণের বান্ধব রে...

এই ক'দিন পাগলের মত শুধু সিনেমা দেখলাম। শুধু সিনেমা। ন'টার ফার্ষ্ট শো দেখতে হলে বাসা থেকে বেরোতে হয় আটটায়, আরেকটু আগে বেরুলে ভালো হয় কিন্তু আটটা ঠিকাছে। একটু তাড়াতাড়ি পা চালাতে হয়, খানিকটা দৌঁড়ুতেও হয় কখনো বাস বা শেয়ারের গাড়ির জন্যে তো কখনো হলে ঢোকার লাইনের জন্যে। সকালের ঐ সময়ে কোন গাড়িতে যাব সেটা নিয়ে পছন্দের কোন ব্যপার নেই। সামনে যা পাও জাষ্ট উঠে পড়ো!

এখানে নন্দীগ্রাম নিয়ে গোটা পশ্চিমবাংলা উত্তাল। বনধ, মিছিল। বিক্ষোভ। পাল্টা মিছিল। পুলিশ। লাঠি। লকআপ। নন্দীগ্রাম গণহত্যা কেন, যে কোন প্রকারের অত্যাচারই নিন্দনীয়। কাওকে হত্যা করার কোন অধিকারই কারোর নেই। তবুও মানুষ মানুষকে মারে নির্বিচারে। গণধর্ষণ হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। প্রতিবাদের ভাষা এক একজনের এক একরকম। কেউ মোমবাতি জ্বালান, কেউ মিছিলে হাঁটেন, কেউ বা বনধ ডাকেন।


আমি কোনদিন কোন মিছিলে যাইনি। নন্দীগ্রামে গণহত্যা, শাসকদলের অত্যাচারের প্রতিবাদে লাখো মানুষের ঐ নীরব মিছিলেও আমার যাওয়া হয়নি। অথচ মন পড়েছিল ওখানেই। মিছিলে গেছেন এমন বন্ধুর ফোনে বারবার ফোন করে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাব বলে তৈরি হয়েও যাওয়া হয়নি। ঠিক সাহস করতে পারিনি। বরাবরের কূপমুন্ডুক আমি তাই সম্পূর্ণ অরাজনৈতীক প্রতিবাদ মিছিলেও যাইনি। বাড়িতে থেকেই চোখ রেখেছি টিভির পর্দায়, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি এদিক ওদিক। ব্যস। ওটুকু...


অনেকে চলচ্চিত্র উৎসব বয়কট করেছেন নন্দীগ্রামের প্রতিবাদে। অনেক বড় বড় নামী দামী নাম সে লিষ্টে। আমার চেনা একজনও বললেন, বয়কট করেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, আমার তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না বা হয়নি। বছরে এই একবারই এভাবে সিনেমা দেখার সুযোগ আসে আর এবছর তো আমার হাতে ডেলিগেট পাস! কিন্তু তবু ভাবছিলাম, সত্যি কি সিনেমা দেখব? অন্তত এটুকু করি, এই সরকারের আয়োজিত এই উৎসবে না যাই...


রবিবার ১১তারিখে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসএর সামনে থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বেরুনোর কথা। কারা আসবেন সেই মিছিলে সেসব কিছুই জানি না। শুভজিত শুধু বলেছিল, বেলা দুটোর মধ্যে অ্যাকাডেমির সামনে চলে এসো। শুভজিত নিজে বয়কট করেছে এই ফেষ্টিভ্যাল (আমার জানামতে)। মিছিলে যাব নাকি সিনেমা দেখব এই নিয়ে দোলাচলে আমি দোদুল্যমান মন নিয়ে বেলা দুটোর মধ্যেই অ্যাকাডেমির সামনে গিয়ে হাজির হই। সেখানে পরিচিত একজনের সাথে দেখা হয়। আমি তাঁকে চিনি আমার বরের সহকর্মী হিসেবে, মিছিলে যাচ্ছ কী জানতে চেয়ে শুনলাম, সকালের শোয়ে সিনেমা দেখে এখন বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছি, মিছিল শেষে আবার টুক করে ঢুকে পড়ব সিনেমা দেখতে! শুনে আমি নিশ্চিন্ত মনে সিনেমা দেখতে ঢুকে যাই নন্দন চত্বরে। যাই মন দিয়ে সিনেমা দেখি গে..


খানিকক্ষণের জন্যে দুপুরবেলা সেদিন ইয়াহু মেসেঞ্জারে লগইন করতেই চট্টগ্রামের অর্কুট বন্ধু জাভেদ নক করলো, এখানে তো সাইক্লোন আসছে, তোমাদের ওদিকে কী খবর? এখানে সেদিন খটখটে রোদ। জাভেদ বললো, কী হবে জানি না তবে পূর্বাভাস যা দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে অবস্থা খারাপ হবে। পরদিন সকালে আব্বাকে ফোন করি ততক্ষণে কালো হয়েছে কলকাতার আকাশও। সাইক্লোনের পূর্বাভাস এখানকার কাগজেও। আব্বা বলেন, ঝড় আসছে, বিকেলের দিকে বা তারও পরে ভাঙবে, এখনো শুধু সাজছে। তবে এবার বোধ হয় চিটাগাং বেঁচে গেল! শুনে আমি স্বার্থপরের মত নিশ্চিন্ত হই। সবার খোঁজ খবর নিয়ে ফোন রেখে মন দিই নিজের কাজে। সন্ধের ঝড়ো বাতাস আর শিরশিরে ঠান্ডায় ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দেশের কথা ভাবি। বন্ধ জানালার কপাট কাঁপে বাতাসে, বারে বারেই মনে হয় এই বুঝি খুলে গেল বন্ধ ছিটকিনি...মন খারাপ হয়, চিন্তা হয়। কে জানে কী অবস্থায় আছে দেশের মানুষ...


একলা একলা নন্দন চত্বরের এ'হল ঐ হল ঘুরে ঘুরে সিনেমা দেখলাম এই ক'দিন। প্রথম দু'দিন অবশ্য আমার বরও ছিলেন ঐ চত্বরেই কিন্তু এক হলে নয়। আমি নন্দন ১এ তো উনি শিশির মঞ্চে। সিনেমা শেষ হলে বেরিয়ে এসে পরের সিনেমা শুরু হওয়ার মাঝের খানিকটা সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ফোঁকা, কী দেখলে কেমন দেখলে জাতীয় দু-চারটে কথা। দুপুরের খাওয়াটা ঐ দু-তিনদিন একসাথেই হয়েছে ৩টের শো শুরু হওয়ার আগে বেশ খানিকটা সময় হাতে থাকে বলে। একা একা একটানা অনেকগুলো সিনেমা দেখাটা নিজের কাছেই কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিল। মন খারাপও যে হত না তা নয়। সব সিনেমাই যে খুব ভালো লেগেছে বা খুব মন দিয়ে দেখেছি তা তো নয়। মন এদিক ওদিক ছোটাছুটি তো করেই বা করবেই। চোখ সিনেমার পর্দায় মন চলে যায় কোথায় কোথায়...


নন্দন ২য়ে সিনেমা দেখতে গেলেই মনে পড়ে নাসরীনের কথা। উড়ে যায় নিশিপক্ষী নামের একটা সিনেমা এসেছিল দু বছর আগের ফেষ্টিভ্যালে। সেখানেই নাসরীনের সাথে আলাপ। ওর কোন এক উপন্যাসের চিত্ররূপ বলে নাসরীন আমন্ত্রিত ছিল ফেষ্টিভ্যালে। নাসরীনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হওয়ার কোন কারন ছিল না কিন্তু তবু হয়েছিল। ওর ছেলেমানুষি ওর পাগলামো ওর প্যাশনআমার ভীষণভাবে মনে পড়ে। আমার নিজের এক খুব ব্যক্তিগত এক কারনেও ওকে খুব মনে পড়ে আমার। প্রায়শই। এই উৎসবে বারে বারেই নাসরীনকে মনে পড়েছে... অজান্তেই নন্দন চত্বরের এদিক ওদিক চোখ গেছে... 


ও কী আছে এখানেই?




Monday, November 12, 2007

১৩তম চলচ্চিত্র উত্ সব ও আমার সিনেমা দেখা

তিনমাস আগে থেকে শুভজিতকে বলে রেখেছিলাম, ও যখন ওর ফিল্ম ফেষ্টের পাস পাবে তখন যেন আমার জন্যেও একটা পাস যোগাড় করে রাখে অতি অবশ্যি। দেখা হলেই রিমাইন্ডার দিয়েছি এমনকি ফোন করেও মনে করিয়ে দিয়েছি পাসের কথা। যা হয়। করে দেব বলেও শেষ অব্দি করে দেওয়া আর হয়ে ওঠে না। শেষে শুভ নিজের পিঠ বাঁচায় এই বলে, কত্তাকে বল না বাবা, ফিল্মের লোক ঘরে রেখে পাসের জন্যে চিন্তা করছ! কত্তার আবার ব্যপার আছে, নিজের পাসটা পেয়ে যান, কিন্তু অন্য কারোর জন্যে পাসের ব্যবস্থা করতে গেলে অনুরোধ করার ব্যপার আছে বলে সেদিকে যেতে চান না। গতকাল ফেষ্টিভ্যাল উদ্ভদোনের দিন অব্দি পাসের কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় মন বেশ খারাপ ই ছিল। গতবছরের উত্সবের সিনেমা দেখার জন্যে কলকাতার এমাথা ওমাথা দৌঁড় করেছি তাতে পয়সা তো পয়সা পরিশ্রমও যথেষ্টও হয়েছে। সান্ধ্যকালীন ভ্রমণে গিয়ে নন্দনের একজনের কাছ থেকে একটা ফর্মের ব্যবস্থা শেষ অব্দি হয়, ফর্মের চারশো প্লাস অলিপাবে ৬০০টাকার বিল দিয়ে। আমার হাতে ফর্ম আসে রাত সারে বারোটায়, শাহজাদী খুশ ফর্ম হাতে পেয়ে এখন এক হপ্তা শুধু সিনেমা ...


সিনেমা দেখলাম আজকে ৬টা যার মধ্যে ২টো শর্ট। ডার্ক নাইট আর টু অন ব্রীজ। প্রথমটি খুবই ভালো লেগেছে, দ্বিতীয়টি বেশ মজার। ( পরে এই লেখাতেই সিনেমাগুলির একটু ডিটেল যোগ করে দেব) ।


ফার্নান্ডো ই সোলানাসের দ্য ক্লাউড, জাফার পানাহির অফসাইড, ব্রাজিলের সিনেমা আই রিমেম্বার, আমাস গিতাইয়ের প্রমিসড ল্যান্ড।খুব ভালো লেগেছে অফ সাইড। সিনেমা দেখতে গিয়ে কোন চাপ নেই। আমাস গিতাইয়ের সিনেমা আমি পুরোটা দেখতে পারিনি, হল ছেড়ে পালিয়ে এসছি শেষের খানিকটা বাকি থাকতে। গরু ছাগলের মত নিলামে কিনে নিয়ে একদল মেয়েকে পাচার করার গল্প।


সিনেমার গল্প সময় নিয়ে লেখার ইচ্ছে রইল।

Saturday, November 10, 2007

কি লিখি আমি...

হামানদিস্তায় রশুন থেতো করতে গিয়ে হামানদিস্তার ঠুক ঠাক আওয়াজের মাঝে কানে আসে আব্বার গলা, বলছেন, আম্মা'র হামানদিস্তাটা কই আছে কে জানে, থাকলে ওটা দিয়ে পান ছেঁচে খেতে পারতাম। মাঝে মাঝে বড় ইচ্ছা করে!

-পান আপনি হামানদিস্তাতেই কেন ছেঁচে খাবেন? ইচ্ছা করলে এমনিই তো খেতে পারেন! দাদুর তো চাপার দাঁত ছিল না তাই ছেঁচে খেত, আপনি কেন ছেঁচতে যাবেন?
-নাহ.. এমনি খেতে ইচ্ছা করে না। আম্মা যেরকম হামানদিস্তায় ছেঁচে খেতো, ঐরকম খেতে ইচ্ছা করে।
-তাইলে একটা হামানদিস্তা কিনে আনলেই তো পারেন। 
-তা পারি কিন্তু ইচ্ছা করে না। তোমার দাদুর হামানদিস্তাটা কই আছে, কার কাছে আছে কে জানে!


আটষট্টি বছর বয়েসের আব্বা আমার এখনো আকুল হয় মায়ের হামানদিস্তার জন্য। সেটায় করে মায়েরই মতন করে পান ছেঁচে খাওয়ার জন্য। আমার গলা বুজে আসে। কথা সরে না। আব্বাকে বলি,পরেরবার আমি হামানদিস্তা নিয়ে আসব আপনার জন্য, আপনি সেটায় দাদুর মতন করে পান ছেঁচে খাবেন।


হাসি তবুও ম্লান। মনে মনে তখনও খোঁজ সেই হামানদিস্তার।


ঝটিতি ঘুরে আসা এবাড়ি, ওবাড়ি। টেবিলভর্তি খাবারে ইলিশ হাজির এবেলা ওবেলা। তবু কে জানে কেন লাগে শূন্য  শূন্য। মন পড়ে থাকে ভাপ ওড়া চিতই আর হাঁসের ভুনা গোশতে।

পতেঙ্গার সমুদ্রে আমি আমার কৈশোরকে খুঁজে পাই না। যদিও প্রতিবার চট্টগ্রামে গিয়ে আমি একবার পতেঙ্গায় অবশ্যই যাই। প্রতিবারই দেখি একটু একটু করে বদলে যাওয়া এই ছোট্ট সমুদ্রতট। জোয়ারে যার সৈকত বলে কিছু থাকে না। নোনা পানি এসে আছড়ায় বাধানো পারে, ফেলে রাখা বোল্ডারে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হুটোপাটি করে তৈরী হয়ে চলে যাই পতেঙ্গায়। ভোরবেলাকার সূর্য ওঠা দেখি বোল্ডারের উপরে বসে থেকে। ভাটা থাকলে হাঁটি সৈকতের এমাথা ওমাথা। অনেকক্ষণ থাকি। বেলা মাথার উপরে ওঠা পর্যন্ত। এবারে অনেকদিন পরে বিকেলে পতেঙ্গা গেলাম। বহুবছর পরে। এই বিকেলবেলার পতেঙ্গা যে এত বদলেছে ধারণা ছিল না। সমুদ্রের ধার ধরে বোল্ডারের এপারে যেন বাজার বসেছে। অনেকটা মেলার মতন কিন্তু মেলা নয়। আবার ঠিক বাজারও নয়। ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতা বালতিতে করে রকমারী সব বোতল নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই না বাজার না মেলাময়। রকমারী সব পানীয়ের নামের শেষে আসে বীয়ার এমনকি বাংলা মদেরও নাম। তবে এই নামগুলো এরা উচ্চারণ করে আস্তে। অন্য লোকের কান বাঁচিয়ে।

এই পতেঙ্গা আমার চেনা নয়। এর সাথে আমার আলাপ হয়নি কখনও। সারাদিনের টিপটিপ বর্ষণের পরে এই বিকেলে বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা। ভরা জোয়ারের সমুদ্র যেন ফুঁসছে। সোঁ সোঁ গর্জনে আছড়ে আছড়ে ঢেউ এসে ভাঙছে বোল্ডারে। কয়েকটি ছেলে হাত ধরাধরি করে বোল্ডারের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্নানের চেষ্টায় মগ্ন। জোয়ারের সময় সৈকত বলে কিছু থাকে না এখানে কিন্তু তাই বলে কী স্নান হবে না! হাত ধরাধরি করে বোল্ডারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সমুদ্রস্নান করে ওরা। দুলে দুলে গান গায়। সাবধানী নজর রাখে ঢেউএর দিকে। জোরে ঢেউ এলেই শক্ত করে ধরে একে অন্যের হাত। সমুদ্র দেখতে আসা মানুষেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে ওদের স্নান করা দেখে। উচ্ছাস বাড়ে ওদের। গান গায় দুলে দুলে। যদিও সমুদ্রের গর্জন ভেদ করে বেশিদূর যেতে পারে না ওদের আওয়াজ। মেঘলা আকাশের বুক চিরে সাঁ করে উড়ে যায় ফাইটার প্লেন। নিমেষেই হারায় দিগন্তে। ফাইটার প্লেনের ছেড়ে যাওয়া ধোঁয়াও মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে।

কর্ণফুলীকে তবু খানিকটা চেনা যায়। যদিও তার চেহারাও অনেক বদলেছে। একধারের পার বাধানো আগেও ছিল তবে এমন ঝা চকচকে ভাবটা ছিল না। এই জায়গাটা আমার বেশ লাগে। জলের ধারে গেলে এমনিতেও আমার কথা বলতে ভালো লাগে না। চুপ করে বসে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। এই নদীর একটা গল্প আছে না? মনে করার চেষ্টা করি। পাহাড়ী রাজার মেয়ে কানফুল হারিয়েছিল এখানে, যার থেকে নদীর নাম কর্ণফুলী। এরকমই কিছু একটা গল্প শুনেছিলাম ছোটবেলায়। কি নাম ছিল সেই রাজার মেয়ের? রাজার নামই বা কি ছিল? মনে পড়ছে না। এখন এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সেই গল্পটাও আর কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কাওকে প্রশ্ন করে জেনে নেব ভেবেও হয়ে ওঠে না। খানিক পরেই ভুলে যাই। মনে মনে ঢেউ গুনি। এক, দুই, তিন। খানিক পরেই আর ঢেউ গোনার ইচ্ছেটাও থাকে না। বসে থাকি রেলিং এর পরে। ঘোলা জলে কোন রঙের ছায়া নেই। ঘন,  প্রসুতি মেঘে ঢাকা আকাশের কোথাও কোথাও উঁকি দেয় হালকা নীল। নদীর ওপারে যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে, বেলার দিকে তাকিয়ে জেগে ওঠা ইচ্ছে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

এবারে আমার আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হলো না। দেশে যাওয়া তাই অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেল। একটু ঘুরে তাকালেই দেখতে পাই বর্ষার জল থইথই করছে পুকুরের পার ধরে। ভোরবেলাতে মাছওয়ালাদের হেঁকে যাওয়া, কৃষকবধুর হাতে বিক্রী করতে নিয়ে আসা ডিমপাড়া মুর্গীটি। কান পাতলেই শুনতে পাই, পনিইইইইর নিবেন, অষ্টগ্রামের পনির। বাঁশের ঝাঁকায় লাল কাপড়ে মুড়ে রাখা ঘিয়ে রঙের পনির এসে হাজির হয় টক টক গন্ধ নিয়ে। জানলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মেয়ে একছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পনিরওয়ালার কাছে গিয়ে। চিতইয়ের মাঝে ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দেওয়া পনির যে তার খুব পছন্দ!


ঘুরে ঘুরে সিডি, ডিভিডি কিনি সারা দিনমান। এ দোকান ও দোকান। এই মার্কেট ঐ মার্কেট। পাগলের মত ঘুরে ঘুরে লিষ্ট মিলিয়ে ডিভিডি খুঁজতে খুঁজতে একসময় সব অর্থহীন হয়ে যায়। বসে থাকি চুপচাপ। দোকানীর দেওয়া মগভর্তি কফি খেতে থাকি যতক্ষণ পর্যন্ত সবটুকু কফি শেষ না হয়। বিস্বাদ লাগে তবুও খাই। ব্যস্ত হই ঘরে ফেরার তরে।


চলমান দূরভাষের ওধারে আম্মা। খানিক কথা বলে, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। আমি বুঝতে পারি নীরব কান্নায় হাতের ফোন ভেজাচ্ছে আম্মা। আমার মা। থেমে থেমে কথা বলে, অনেকক্ষণ কথা বলে আবারও চুপ করে যায়। নাড়ী ছেঁড়ার তীব্র ব্যথায় নি:শব্দে কাঁদি আমি। একটুও শব্দ করি না। কোথাও যেতে দিই না কোন শব্দকে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি । রক্তক্ষরণে ক্ষয়ে যেতে যেতে প্রবল শীতে আক্রান্ত হই আমি।

ক্রিং ক্রিং টেলিফোন হ্যালো হ্যালো ...

ক্রিং ক্রিং বেজে ওঠে সেলফোন। ডাক আসে বহুদূরের সেই ছেলেবেলা থেকে। বিস্মৃতির ওপার থেকে। অচেনা কন্ঠ জানতে চায়, সামরানের সাথে কথা বলছি কি? আমি আনোয়ার! আনোয়ার? আমি চিনতে পারি না। আরে, মনে নেই, আমরা একসাথে মাঠে খেলতাম! আমি সিলেটের আনোয়ার!

আমি একছুট্টে চলে যাই ছেলেবেলায়, খুঁজতে থাকি চেনা মুখগুলো। বিস্মরণের গলিগুলোতেও ঘুরে আসি একপাক। আতিপাতি করে খুঁজি সব ঘিঞ্জি গলি। কিন্তু কোথাও আমি খুঁজে পাই না আনোয়ারকে।



আমি সত্যিই চিনতে পারি না। তবে একটা আবছা অবয়ব ফুটে ওঠে আর মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে যায়, আনোয়ার! রোগা ঢ্যাঙ্গা আর কালো? ওপাশ থেকে জোরালো হাসির শব্দ আসে, হ্যাঁ হ্যাঁ! সেই রোগা ঢ্যাঙ্গা কালো আনোয়ার! এই তো মনে আছে! ব্যস, ঐটুকুই! আর কিছু মনে পড়ে না। আইএসডি ফোন কানে নিয়ে বেশি চিন্তাও করা যায় না। ওদিকে ফোন হাতবদল হয়েছে বুঝতে পারি। এবারে নারীকন্ঠ ভেসে আসে। আমি আনোয়ারের মিসেস। আপনি তো সামরান। ওর ছেলেবেলার বন্ধু! আপনার কথা আমার সাহেবের কাছে এতো শুনেছি এতো শুনেছি যে আপনাকে কোনদিনও না দেখেও আপনাকে ভীষণ চেনা মনে হয় আর খুব আপন মনে হয়। আপনি ভালো আছেন তো?


আমার অবাক হওয়ার পালা তো কেবল শুরু! কি বলব না বলব ঠিক যেন ভেবে না পেয়েই বলি, ভালো আছি, আপনাকে তো চিনি না, আপনার নামও জানি না কিন্তু আপনি আমার কথা শুনেছেন, আর আপন বলে ভেবেছেন। কি বলব বুঝতে পারছি না! শুনলাম আমার নাকি একটা ছবিও আছে আনোয়ারের কাছে। সাদায় কালোয় ফুলছাপ ফ্রক পরা এক ছোট্ট মেয়ের ছবি। ওপাশের নারীকন্ঠ আবার জানতে চায়, আপনি এখন কেমন হয়ছেন দেখতে?


কেমন হয়েছি দেখতে? যেদিক দিয়ে হেঁটে যাই, লাইন দিয়ে সব লাশ পড়ে। দুজনের সম্মিলিত হাসির শব্দে বুঝতে পারি, ওরা ফোন লাউডস্পিকারে রেখেছে! আনোয়ারের স্ত্রী বলে, আপনি কী এখনো আগের মতই অহংকারি? অহংকার? আমার? জবাব আসে, আপনি নাকি খুব অহংকারি ছিলেন। কাউরে পাত্তাই দিতেন না! আমি হেসে ফেলি। আর্জি আসে, ঢাকায় গেলে যেন একবার অবশ্যই অবশ্যই দেখা দেই। অনেকক্ষণ ধরে যে প্রশ্নটা ঠোঁটের ভেতরে আটকে ছিল, বেরিয়ে আসে, আমার ফোন নম্বর কোথায় পেলেন? ফোন নম্বর? চাইলে পাওয়া যায় না এমন কিছু কি এই দুনিয়ায় আছে? তুমি মনে রাখো নাই, ভুইলা গেসো, সেইটা অন্য কথা!


সত্যিই লজ্জ্বিত হই। এমন এক বন্ধু, যে সেই ছোটবেলার ছবি এখনো গুছিয়ে রেখেছে, আমাকে মনে রেখেছে, আর এত বছর পরে খুঁজেও বের করেছে তার কথা একটুও মনে না পড়ার জন্যে লজ্জ্বিত হই। ঢাকায় গেলে দেখা করব কথা দিই। ওরা ফোন ছাড়ে আন্তরিকতার উত্তাপ ছড়িয়ে। ভালো থাকার শুভাকাঙ্খা উড়ে আসে যেন সেই ছেলেবেলা থেকে। মন ভার হয়ে চোখে বাষ্প জমে অজান্তেই!

নাহ। আনোয়ারের শুধু নামটুকু আর একটা আবছা অবয়ব ছাড়া আমার আর কিছুই এখনো মনে পড়ে না। কাল রাত থেকে খুঁজেই চলেছি আনোয়ারকে...

Friday, November 09, 2007

ঘুম ভেঙে যায় আমার ঘুম ভেঙে যায়...

আজকাল আমি মঝে মঝেই স্বপ্নে দেখি, আমি মারা যাচ্ছি বা মারা গেছি. শুয়ে আছি কবরে, কাফনে গা ঢেকে হাত, পা নাড়তে পারছি না কথা বলতে চাইছি কিন্তু পারছি না মিষ্টিকে ডাকতে চাই,  মিষ্টি মিষ্টি মিষ্টি কিন্তু গলা থেকে কোন স্বর বেরোয় না ডাকতে পারি না ...আবার কখনো প্রচন্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠি, মিষ্টিইইইই...গলা থেকে স্বর বেরুনো মাত্র ঘুম ভেঙে যায়.. বিছানায় বসে কাঁপি থরথর থরথর ... একটানে খেয়ে ফেলি এক গ্লাস পানি কিন্তু তারপরেও যেন গলা শুকিয়েই থাকে...কখনো বা মিষ্টি ওঘর থেকে দৌঁড়ে আসে, জড়িয়ে ধরে বলে, এই তো আমি, কী হয়েছে? গ্লাসে পানি ঢেলে মুখের সামনে ধরে, পানি খাওয়ায়ধরে শুইয়ে দেয় বিছানায়...কখনও বা খানিক বসে থাকে পাশে, আবার ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, আর তারপর আস্তে করে উঠে যায় ...


আবার এমনও হয়, হঠাৎ করে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মনে হয় কেঊ যেন জানালা দিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছে, আর দাঁড়িয়েছে খুব কাছে এসে৷ তাকিয়ে আছে অপলক, নি:শ্বাস ফেলছে গায়ের পরে, আমি পাগলের মত দৌঁড়ুই, সোজা সামনের ঘরে, যেখানে মিষ্টি ঘুমিয়ে আছে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি দরজা ধরে, কাঁপি থরথর থরথর... খানিক দাঁড়িয়ে থেকে চেষ্টা করি ধাতস্থ হওয়ার৷ ফিরে আসি নিজের ঘরে, ঘরের বাতি জ্বালিয়ে জানালাগুলো টেনে বন্ধ করি, পর্দাগুলো টেনে দিই ভালো করে, একটুও ফাঁক-ফোকর যেন না থাকে৷ পাশ বালিশ টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ি গুটিসুটি মেরে, যতখানি গুটিয়ে শোওয়া যায়!


আমার ভীষণ ভয় করে, ভীষণ ভয়! স্বপ্নেরা অনবরত ভয় দেখায়৷কেউ যেন কাটা-ছেঁড়া করে আমায়, ছুরি কাঁচি চালায় যখন তখন, যত্র তত্র.. কোনো   ওষুধ দেয় না, দেয় না কোনো অ্যানেস্থেশিয়া। কিছু একটা অপারেশন চলছে, আমি সেটা দেখি, আমারই উপর চলছে কাটা-ছেঁড়া.. ব্যথার আশঙ্কায় আমি চীৎকারি করি, ব্যথাহীন ব্যথায় নীল হয়ে যাই... ঘুম ভেঙে যায় আমার ঘুম ভেঙে যায়...

Thursday, November 08, 2007

ছেলেবেলার ঈদ

ছেলেবেলার ঈদটাই আনন্দের ছিল ৷ এখন তো শুধু রকমারী রাঁধো-বাড়ো, খাওয়াও দাওয়াও আর সন্ধেবেলায় ক্লান্ত হয়ে ধপাস বিছানা পরে । ছেলেরা তবু ঈদগাহে-ময়দানে ঈদের নামাজে যায়৷ সেখানে চেনা অচেনা অনেকের সাথে দেখা হয়৷

তখন রোযার প্রথম দিন থেকেই শুরু হত ঈদের অপেক্ষা৷ খুব ছোট যখন ছিলাম ,রোযা রাখার মত বড় হইনি, তখনও বায়না করতাম রোযা রাখব বলে৷ দাদী শিখিয়ে দিয়েছিলেন, কল্সীতে হা দিয়ে তোমার রোযা কল্সীতে রেখে ঢাকা চাপা দাও, আর তারপরে তুমি খেয়ে নিয়ে কল্সীর মুখ থেকে নিজের রোযা আবার নিয়ে নাও৷ এই করে তোমার একদিনে তিনটে রোযা হয়ে যাবে! তো আমি প্রতিদিনই তিনটে করে রোযা রাখতাম৷ ঈদের কেনাকাটা শুরু হত রোযার প্রথম দিন থেকেই৷ আমাদের বিশাল যৌথ পরিবার৷ সক্কলের জন্যে জামা কাপড় কেনা হত, বাচ্চা থেকে বুড়ো৷ সবার জন্যে৷ আমাকে নিয়ে আব্বু যেতেন একেবারে চাঁদরাতে৷ আর প্রতিদিনই আব্বু ইফতারের জন্যে বাড়ি এলেই আমার ঘ্যানঘ্যানি শুরু হয়ে যেত: আব্বু, চল না! কবে জামা কেনা হবে? মার্কেটে তো সব শেষ হয়ে যাবে! কিছু কি আর থাকবে?

আর ঐ চাঁদরাত আসার আগেই আমার হয়ে যেত আট-দশখানা নতুন জামা৷ সাথে জুতো, ফিতে আর পুতুল৷ মামাবাড়ি থেকে আসতো, কাকারা দিতেন, ফুপরা দিতেন৷ আর সবার শেষে আব্বু৷ মা নিজের হাতে বানাতেন ফ্রক, নিজের হাতে ওতে কাজ করতেন৷
ঈদের আগে হাতে মেহেদি পরতাম৷ বাড়ির সব মেয়েরাই পরেন৷ এমনকি ছেলেরাও তবে তারা শুধু হাতের কড়ে আঙুলে রাতে মেহেদি পরে ঘুম দাও৷ যত বেশি সময় থাকবে তত লাল! বিছানায়, শরীরে সেই মেহেদি মাখামাখি ঘুমের মধ্যে৷


এখন যেমন কোণ দিয়ে লিকুইড মেহেদি পরা হয়, সেই মেহেদি তা ছিল না৷ গাছ থেকে মেহেদির পাতা তুলে শিলে মিহি বেটে নিয়ে সেই মেহেদি দিয়ে হাতে নানা ডিজাইন আঁকা হত৷ আমার দাদি হাতে মেহেদির ডিজাইন করতেন না৷ হাতের গোটা পাতায় মেহেদি লেপে দিতেন আঙুল সহ আর এদিকে হাত উল্টে নখগুলো ও মেহেদি দিয়ে ঢেকে দিতেন৷ তারপর দুই হাতের মাঝে একটা পানপাতা রেখে হাতদুটো একসাথে জোড় করে রাখতেন৷ সে এক দেখার মত জিনিস ছিল৷

আমরা রোযার পুরো একমাস ছুটি পেতাম৷ রোযা শুরু হওয়ার দু-চারদিন আগে স্কুল ছুটি হয়ে যেত, ঈদের ও আরও হপ্তা দশদিন পরে স্কুল খোলার একটা তারিখ দিয়ে৷ এই সোয়া মাস ছুটি মানে পড়াশোনা? একদমই নয়! সোয়া মাস ধরে উত্সব৷ আম্মার তাগিদে বই নিয়ে বসতে হলেও দাদি আম্মাকেই বকে দিত, সারা বছরই তো পড়ছে, এখন থাকতে দাও না কদিন শান্তিতে!! ভোর রাত্তির থেকেই শুরু হয়ে যেত হুল্লোড়৷ ভোর রাত্তির মানে সেই রাত তিনটে! আমার তো কল্সীতে হা দিয়ে রোযা, ভোরে উঠে সেহরী না খেলেও চলে কিন্তু আব্বু তুলবেই৷ আর দাদিও বলে, সেহরী খাওয়াও পুণ্যের কাজ! অতএব উঠে পড়ো রাত তিনটেয়! আম্মা এই ভোরবেলায় ডাকতে চাইতো না, কারন আমরা, এই পোলাপানেরা ভোরে আর ঘুমাতে চাইতাম না৷ সেহরী খেয়ে আম্মা যে একটু ঘুমুবে তার বারোটা বাজিয়ে দিতাম আমরা হই হুল্লোড় করে৷

আমার দাদু, দাদি দুজনেই দেশের বাড়িতে থাকতেন৷ আমরা তাই ঈদ করতে দেশের বাড়ি চলে যেতাম প্রায় প্রতি বছর৷ দেশের বাড়িতে যাওয়াটা এমনিতেই একটা উত্সব তায় আবার সে যদি হয় ঈদ তো সে এক বিরাট ব্যাপার৷

ঈদের কথা বলতে গেলেই মনে পড়ে যাকাতের কথা ৷ মোটামুটি রোযা হপ্তাখানেক হয়ে গেলেই শুরু হয়ে যেত এই যাকাত দেওয়া৷ আমার সেই ছেলেবেলায় যাকাত হিসেবে আমাদের বাড়ি থেকে কাপড় বিলি হত৷ বিশাল বড় বড় কাপড়ের গাট আসতো যাকাত দেওয়ার জন্যে৷ দু গাট শাড়ি হলে সম পরিমান লুঙ্গি-পাঞ্জাবি৷ দাদুর ঘরে রাখা থাকত সেই কাপড়ের গাটগুলো৷ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো সেই যাকাতের কাপড় নিতে৷ দাদু হয় তার বিছানায় নয় জানালার পাশে চেয়ারে বসে থাকতেন৷ চেনা-অচেনা নারী পুরুষেরা এসে জানালার পাশে দাঁড়ালেই দাদু উঠে এসে কাপড়ের গাট থেকে কাপড় বার করে জানালা দিয়ে বাড়িয়ে দিতেন৷ যে কাপড় নিতে এসেছে সে মহিলা হলে জিজ্ঞেস করতেন, ছাপা না চেক, নাকি সাদা নেবে? মানুষটি বুড়ো হলে সে চাইতো সাদা, অল্প বয়েসীরা চেয়ে নিত তার পছন্দের চেক কিংবা ছাপা শাড়িটি৷

যতদিন ঐ গাটগুলোতে কাপড় থাকতো তদ্দিন কোন সমস্যা হত না, সমস্যাটা হত কাপড় শেষ হয়ে গেলে৷ কাপড় শেষ হয়ে গেছে, এবছরের মত যাকাত দেওয়া শেষ বললেও কিছুতেই তারা মানতে চাইত না যে সত্যিই শেষ৷ দাঁড়িয়েই থাকতো৷ দাদি তখন নিজের আলমারি থেকে কাপড় বার করে দিয়ে দিতেন, বাড়ির মেয়েদের কাছ থেকে চেয়ে নিতেন পুরনো শাড়ি, দিয়ে দিতেন যাকাতের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে৷ প্রতি বছরই দাদুর উপরে চেঁচাতেন, এই কাপড় বিলি না করে কেন টাকা দিয়ে দেওয়া হয় না তা নিয়ে৷ দাদুর যুক্তি ছিল, টাকা দিয়ে দিলে ঝামেলা কম হয় বটে তবে তা দিয়ে এই মানুষগুলো তো কাপড় কিনবে না, খরচ করবে অন্য কাজে, ঈদে এদের কারোরই নতুন কাপড় হবে না তাহলে৷

দাদু চলে যাওয়ার পর এই কাজটা দাদি করেছেন৷ জানালার পাশে চেয়ারে বসে থেকে কাপড় বিলি করার কাজটা৷ এখন আব্বু করে৷ আমার সেই ছেলেবেলায় কোন বছর হয়ত আমরা দেশে যেতাম না৷ রোযার প্রথম সপ্তায় আব্বু বাড়ি গিয়ে যাকাতের কাপড়ের ব্যবস্থা করে আসত কিন্তু পরে, দাদু চলে যাওয়ার পর প্রতিটি ঈদেই আব্বু দেশে যায় সবাইকে নিয়ে৷ দাদু, দাদির শূণ্যস্থান এতে পুরণ হয় না কিন্তু যে কাজটা ওরা করতেন সেটা থেমে যায়নি৷

ঈদের সকালে বাড়ির পুরুষেরা ঈদের নামাজের জন্যে জন্যে বেরিয়ে গেলে বাড়ির মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত দুপুরের রান্নার আয়োজনে আর দাদি যেতেন পুকুরে স্নান করতে৷ দাদি বরাবর পুকুরেই স্নান সারেন৷ দাদির স্নান করাটাও বেশ মজার ছিল৷ পুকুরে নেমেই সাঁতার দিয়ে সোজা মাঝপুকুরে, তারপর পাক খেয়ে ঘুরে আবার ফিরে আসা ঘাটে৷ সিড়িতে উঠে বসে সাবান মাখা গায়ে, বাঁধানো সিড়িতে পা ঘষা আর তারপর নেমে দাঁড়িয়ে তিনখানা ডুব৷ স্নান শেষ৷ উঠে পুকুরের পাশেই কাপড় পাল্টনোর জায়গায় গিয়ে কাপড় পাল্টে চলে যেতেন বাড়ির ভেতর৷ যেতে যেতে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যাওয়া, কদ্দুর এগোলো কাজ৷ নামাজ থেকে সবাই ফিরলো বলে!

দাদি ঘরে এসে পরতেন তার ঈদের শাড়িটি৷ স্নানের জায়গায় দাঁড়িয়ে দাদি কখনও তার নতুন শাড়ি পরতেন না৷ পুরনো শাড়ি পরে ঘরে এসে তারপর নতুন শাড়ি পরা৷ আটপৌরে ভাবে পরা নতুন শাড়ির আঁচল আলতো করে মাথায় টানা, ফুলহাতা ব্লাউজে দাদি যেন শরত্চন্দ্রের নায়িকা৷ দু'হাত রাঙা মেহেদির গাড় লাল রঙে, চোখে গাঢ় করে টানা সুর্মা, নতুন চটি পায়ে দাদি এসে বসতেন বারান্দায় পেতে রাখা তার হাতলওয়ালা চেয়ারটিতে৷ দাদির ঘরে টেবিলে ততক্ষণে এসে গেছে বড় গামলায় করে সেমুইএর পায়েস আর পাশেই উপুড় করে রাখা আছে একথাক ছোটো বাটি৷ একটু পরেই পাড়ার সব ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে আসবে৷ আর আসবে অন্য সবাই নামাজ ফেরত দাদিকে সালাম করতে, ঈদ মুবারক জানাতে৷ দাদি সালাম নেবেন আর উঠে গিয়ে সবাইকে একবাটি করে দেবেন শির৷

ঈদের আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ঈদের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন৷ বিভিন্ন রকম পিঠে তৈরী হয়৷ মিষ্টি, নোনতা৷ কোরানো নারকোল চিনি জিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরী হয় সমোসার পুর৷ ময়দার রুটি বেলে পছন্দমত আকারে কেটে নিয়ে তাতে নারকোলের পুর দিয়ে তৈরী হয় সমোসা৷ বিভিন্ন আকারের৷ কোনটা তেকোণা, কোনটা পুলির মত তো কোনটা আবার দোকানের সিঙাড়ার মত দেখতে৷ ভাজা হয়ে গেলে ঘন করে জ্বাল দেওয়া চিনির রসে ডুবিয়ে তুলে রেখে দাও বড় গামলায়৷ ঈদের দিনে শরবত আর সেমুইএর সাথে এই সমোসাও দেওয়া হবে মেহমানদের৷ সাথেই ভেজে রাখা আছে খাস্তা নিমকি৷ যে মিষ্টি সমোসা খাবে না , তার জন্যে!

ভোরের আজানের সাথেই উঠে পড়েন আম্মা, চাচি আর ফুফুরা৷ ফজরের নামাজ সেরে অন্ধকার থাকতেই তারা ঢুকে পড়েন রান্নাঘরে৷ পুরুষেরা মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ সেরে এসে হাঁক-ডাক শুরু করেন, এই পোলাপান, এখনও ঘুমাইতেছস? শিগগির ওঠ! সকাল হইয়া গ্যাসে তো! গোসল কইরা রেডি হ সব, নামাজে যাবি না? মাঝরাত পার করে ঘুমুতে যাওয়া সব ছেলে-মেয়ে, আমরা, চোখমুখ কচলে সোজা পুকুরে৷ মুখ ধুয়ে ঘরে আসতে আসতে টেবিলে হাজির আগের দিনে তৈরী করে রাখা সব সমোসা, নিমকি আর এক্ষুনি রান্না করা সেমুই, সুজির হালুয়া৷ এই সুজির হালুয়াটা দাদুর ফেভারিট৷ ঘরে বানানো, কিনে আনা যত খাবারই থাকুক, দাদুর সুজির হালুয়া চাইই চাই৷ ফ্লাস্ক ভর্তি চা আর ট্রেতে রাখা সব কাপ ডিশ৷ আমরা পোলাপানেরা তখন চা পেতাম না৷ আমাদের জন্যে জাগে আছে গরম দুধ৷ দুধ আমি একদম পছন্দ করি না, আমি চা ই খেতে চাই, কিন্তু চাইলেও কি পাওয়া যায়? দাদি বলে, চা খেলে নাকি আমি আরও কালো হয়ে যাব! অগত্যা : দুধ!

ভেতরবাড়ির উঠোনে তখন কাকার তদারকিতে কসাই খাসির মাংস টুকরো করছে৷ ভোরেই জবাই হয়েছে খাসি৷ কাজের বুয়ারা ঘুরঘুর করছে আশে-পাশেই৷ খাসির কলিজা, দিল, মগজ এগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্যে৷ একটা ঝাল ঝাল কষা হবে লুচির সাথে খাওয়ার জন্যে৷সেটা আম্মা রাঁধবে৷ খাওয়ার ঘরে তিন-চারজন বসে বেলছে লুচি৷ মা মাঝে মাঝেই রান্নাঘর থেকে উঠে এসে দেখে যাচ্ছে লুচি বেলার কদ্দূর কি হল৷ কুলোতে খবরের কাগজ পেতে রাখা হচ্ছে বেলা লুচি, কুলো ভরে উঠলেই এক ছুট্টে আমি সেটা রান্নাঘরে নিয়ে যাচ্ছি ভাজার জন্যে, ( আমিও বসে লুচি বেলছি কি না! ) সেখানে চাচি লুচি ভাজছে৷ এই লুচিগুলো বেশ বড় বড়৷ আর ভাজাও হয় একটু কড়া করে৷ অত লোকের বাড়িতে সকলের নাশতার জন্যে ছোট ছোট লুচি বেলতে বেলতেই নাকি রাত হয়ে যাবে, তাই দাদির পরামর্শে লুচিগুলো আকারেও বড় আর ওজনেও ভারী!

চন্দ্রবত্সরের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছরই রোযা দশ দিন করে এগিয়ে আসে৷ ছেলেবেলায় রোযা হত পুরো গরমকালে৷ যদ্দূর মনে পড়ছে আগষ্ট -সেপ্টেম্বর মাস ছিল সেটা৷ কিংবা হয়ত আরেকটু আগের কথা বলছি৷ জুলাই-আগষ্ট৷ দিন তারিখগুলো বেশ ভালই গুলিয়েছে বুঝতে পারছি৷ তখন চাঁদ দেখা নিয়ে এত ঝামেলা ছিল না৷ সবাই আশা করতেন যে রোযা তিরিশ দিনেই শেষ হবে, আর বেশিরভাগ তাই হত৷ কোন বছর ২৯দিনেই চাঁদ দেখা যেত৷ মসজিদের ঘোষণার প্রয়োজন হত না আর চাঁদ দেখা কমিটিও তখন ছিল না৷ গরমকালের পরিস্কার আকাশে আমরা বারান্দা থেকেই দিব্যি চাঁদ দেখতে পেতাম৷ ছোট্ট একসুতো বাঁকা চাঁদ৷ আকাশের এক কোণে মুখ বাড়িয়েছে খানিকক্ষণের জন্যে৷ নিয়ে এসেছে খুশির ঈদের খবর৷ একমাসের সিয়াম সাধনা শেষ৷ কাল ঈদ৷ দাদি উঠে যেতেন ছাদে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে দু হাত তুলে রেখেছেন বুকের কাছে প্রার্থনার জন্যে৷ এটা নাকি চাঁদ দেখার দোয়া৷ দাদির দেখাদেখি আমরাও হাত দু হাত বুকের কাছে তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷ দাদি কি দোয়া পড়ছেন কিছুই জানি না, দাদির প্রার্থনা শেষ হলে হাত দুটো নিজের গোটা মুখে বুলিয়ে 'আমীন' বলে প্রার্থনা শেষ করেন, আমরাও তাই করি৷ নিচে তখন রেডিওতে বাজছে নজরুলের সেই অবিস্মরণীয় গান,
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
আপনাকে তুই বিলিয়ে দে , শোন আসমানী তাগিদ৷
তোরা সোনা-দানা, বালাখানা সব রহে ইল্লিল্লাহ
দে যাকাত , মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ৷
আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ৷
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ৷
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমণ, হত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরীদ৷
রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ৷
যারা জীবন ভরে রাখছে রোযা, নিত্য উপবাসী
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ
রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ৷
এলো খুশির ঈদ এলো, এলো খুশির ঈদ৷ এলো খুশির ঈদ,
ও মন রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ৷

বাংলাদেশের প্রাতিটি শহর, প্রতিটি গ্রামে ঈদগাহের মাঠ আছে, যেখানে ঈদের নামাজ পড়া হয়৷ বেশ বড় মাঠ দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া থাকে৷ যেখানটায় দাঁড়িয়ে ইমাম ঈদের নামাজ পড়ান, সেখানে বেশ কারুকাজও করা থাকে, যেমনটি মসজিদে থাকে৷ এই ঈদগাহের মাঠ আছে প্রায় প্রতি গ্রামে জেলা শহরে আর বড় শহরে৷ ঈদের নামাজ মানুষ বড় জমায়েতে পড়তে পছন্দ করেন বলে পাড়ার মসজিদে ছোটখাট জামাত হয় না৷ বড় বড় মসজিদগুলোতে ঈদের জামাত হয় কিন্তু গ্রামে সকলেই ঈদগাহে নামাজ পড়েন৷ দাদু, আব্বুরা ঈদগাহ থেকে ঈদের নামাজ সেরে ফেরার সময় চলে যান কবরস্থানে৷

যেখানে শুয়ে আছেন পূর্বপুরুষেরা সব৷ আত্মীয়-বন্ধু, পড়শী৷ কারও বা সন্তান৷ কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সমবেত নীরব প্রার্থনা করেন ঈদগাহ ফেরত সব মানুষ৷ কবরবাসী মানুষগুলোর জন্যে৷ তাদের আত্মার শান্তির জন্যে৷ নতুন পাঞ্জাবী লুঙ্গি আর টুপি পরিহিত সব পুরুষেরা, বাচ্চা ছেলেরা৷ সুগন্ধী আতরের সুবাস ছড়িয়ে যায় গোটা কবরস্থানে৷ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে কবরস্থানে৷ কারও হয়ত সদ্য হারানো কোন প্রিয়জন শুয়ে আছে এই কবরস্থানে, তার গাল বেয়ে নামে জলের ধারা৷ নি : শব্দ সব মানুষ বাড়িমুখো হন কবরস্থানকে পিছনে ফেলে৷

ঈদ-উল-ফিত্র৷ 'ফিত্র' শব্দটার মানে আমি অনেক খুঁজেও পেলাম না মানে আমার কাছে যা বই-পত্তর আছে 'ফিত্র' বা ফিত্রা নিয়ে আর সবই লেখা আছে ( মানে নিয়ম-কাকুন আর কি ), নেই যা তা হচ্ছে, শব্দটার অর্থ৷ গুগলি করলে হয়ত পাওয়া যাবে, তবে আমি বেশ একটু অলস আছি৷ এখন এই মানে খুঁজতে আর ভাল্লাগছে না৷ মোদ্দা ব্যপারটা হল , ঈদের দিনে একটা ছোট্ট দান করতে হয়৷ সেই দানেরই নাম 'ফিত্র' আমাদের মুখে মুখে যা এখন হয়ে গেছে 'ফিত্রা' বা ফেত্রা৷ আর সেই থেকেই এই ঈদের নাম ঈদ-উল-ফিত্র৷ রোযার ঈদ আমরা বলি বটে, তবে এর পোষাকী নাম হল এই৷ ও হ্যাঁ ফিত্র শব্দটার মানে খুঁজতে গিয়ে আরেকটা ব্যাপার জানলাম, তা হচ্ছে, রমযানের সাথে ফিত্র'এর কোনও যোগাযোগ নেই৷ 'ফিত্র' বা ফিত্রা একটি সম্পূর্ণ আলাদা ইবাদত ( পড়ুন , দানরূপে প্রার্থনা) ( বেহেশতী জেওর, প্রথম পর্ব, পৃষ্ঠা-ন : ৩৪৪)৷

ফিত্রা দেওয়া সবার জন্যে প্রযোজ্য নয়৷ মানে যাদের কাছে ঠিকঠাক পয়সা কড়ি আছে তাদের উপরেই এই 'ইবাদত' ( পড়ুন দান ) বাধ্যতামুলক৷ যারা যাকাত নেয় তারা ফিত্রাও নিতে পারে৷ একদমই যারা নিম্নবিত্ত মূলত তারাই এই দান নেন৷ একটু বুঝিয়ে বলি, মাথা গুনে দান করতে হয়, সোয়া দু কিলো সোনালী গম বা যব'এর দাম যা হয় সেই পরিমান টাকা একজনের নামে ফিত্রা হিসেবে দেওয়া হয়৷ যেমন এবছর সেটা ছিল ২৭টাকা (প্রতি বছরই গমের দামানুসারে এই টাকাটা বাড়ে)৷ গম বা যবএর বদলে চাল, ছোলা বা যবএর ছাতু ও দেওয়া যায় ফিত্রা হিসেবে, আর এই জিনিসগুলোর মূল্য অনুসারে কোনটা কতখানি দিতে হবে তাও বলে দেওয়া আছে ঐ বইয়ে৷ বাংলাদেশে কিংবা এখানে, এই কোলকাতায়, সোয়া দু কিলো গমের মূল্যই দেওয়া হয় ফিত্রা হিসেবে৷ একজনের ফিত্রা একজনকেই দেওয়া হয়৷ ঈদের দিন 'সুবেহ সাদিক'এর পরে যে শিশু ভূমিষ্ট হয়েছে তার ফিত্রাও দিতে হয়৷ আর এই সুবেহ সাদিকের আগে যিনি মারা গেছেন তার ফিত্রা মাফ৷

রচনা লিখছি বলে মনে হচ্ছে নিজেরই! তো ঈদের নামাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথেই পুরুষেরা ফিত্রা দিয়ে আসেন৷ ঈদাগহের ময়দানে ইমাম ঘোষণা করে দেন, এবছর ফিত্রা কত ঠিক হয়েছে৷ সেইমত দান সেরে বাড়িতে ঢোকা৷ অর্থাত্ কীনা যাঁর বাড়িতে আজ পোলাও মাংস, সেমুই হবে না তাঁদের ব্যবস্থাও হয়ে গেল৷

ঈদের জন্যে যে এতগুলো জামা-জুতো হল তা একদিন মানে ঐ শুধু ঈদের দিনে পরে তো শেষ করা যায় না! আমরা, এই পোলাপানেরা তাই ঈদের দু দিন আগে থেকেই নতুন জামা পরতে শুরু করি! আর পরীটি হয়ে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াই৷ কার ক'টা নতুন জামা হল সেই খোঁজও নিই, কিন্তু কেউই সহজে বলতে চাইতো না যে তার ক'টা জামা হল আর কে কে দিলো! আমি নিজেও অবশ্য কাওকে বলতাম না! তখন বন্ধু-সমবয়েসীদের উপর খুব রাগ হত, আমি দেখাচ্ছি না সে ঠিক আছে, কিন্তু ওরা কেন দেখাবে না? আম্মাকে এসে বললে আম্মা উল্টে বকে দিত, বলত, তুই দেখিয়েছিস? অগত্যা আমি চুপ! সকালে ঈদগাহ থেকে নামাজীরা ফেরার আগেই সবর স্নান সারা হয়ে নতুন জামা-জুতো ফিতে চুড়ি পরা সারা৷ দাদি তার রূপোর সুর্মাদানী থেকে চোখে সুর্মা টেনে দিতেন৷ সুর্মাদানী হাতে নিয়েই দাদি তার চেয়ারে বসে থাকতেন, সব নাতি নাতনিদের চোখে সুর্মা পরিয়ে দেবেন বলে৷ আর পাশেই রাখা থাকত বেশ কয়েক রকম আতরের শিশি(দাদির ভাষায় এগুলো সব বিলিতী আতর!)৷ যেগুলো বেরিয়েছে তাঁর কাঠের সাজবাক্স থেকে৷ সব্বার গায়ে একটু করে আতর ছড়িয়ে দিতেন দাদি৷

দাদির এই সাজবাক্সটা এক অদ্ভুত সুন্দর আর মজার জিনিস৷ বেশ বড়, একটা ছোট স্যুটকেসের মাপের, ডালাটা পেছনে কব্জা দিয়ে লাগানো৷ এই বাক্সে কোন হাতল নেই আর কোন তালা চাবিরও ব্যবস্থা নেই৷ ভেতরে ছোট-বড় সব খোপ কাটা৷ ভেতরে একের উপরে এক দুটো ভাগ৷ খোপগুলোয় ধরে উপরের দিকে টানলে আরেকটা ডালা উঠে আসে আর তার নিচে আরও বেশ কিছু খোপ৷ এই দ্বিতীয় ডালাটি আলগা, পুরো উঠে হাতে চলে আসে৷ প্রথম ডালায় থাকে দাদির প্রসাধনী সামগ্রী, যেমন- রকমারী সুগন্ধী আতর, চন্দনের টুকরো, টুকরো সুর্মা, (যেগুলো দাদি হামানদিস্তায় গুড়ো করে সুর্মাদানীতে ভরে রাখে ) আর থাকত ছোট ছোট সব কৌটোয় ভরা ক্রীম৷ দাদির ভাষায় বিলিতি ক্রীম! আর ঐ যে নিচের ঐ গোপন চেম্বার, তাতে দাদির সব গয়না৷ গলার তক্তি, মাদুলিছড়া, মাথার সিতাপাটি ( টায়রা ) বিনুনিছড়া, খোঁপার কাটা আর আরও সব হাবিজাবি৷ ঈদের দিনে দাদি তার এই সাজের বাক্স খুলে বসত, আর এক এক ঈদে এক এক নাতনি সুজোগ পেত দাদির ঐ গয়না পরার৷ সে এক অদ্ভুত সুন্দর৷ বাচ্চা একটা মেয়ে, আধুনিক সব জামা-জুতোর সাথে পরে আছে তার দাদির যুবতী বয়েসের গয়না৷ মাথায় সিতাপাটি, হাতে বাজু, গলায় তক্তি আর পায়ে তোড়া৷ দাদির এই তোড়াটা শুধুই গয়না ছিলো, নুপুর ছিলো না কারণ এতে ঘুঙরু ছিল না৷ ছম ছম শব্দে বাড়ির বৌ ঘুরে বেড়াবে সেটা নাকি দাদির দাদি শাশুড়ির পছন্দ ছিল না, তাই ঘুঙরু ছাড়া তোড়া! এক বছর আমি পরলাম দাদির গয়না সব৷ আর মায়ের সে কি চিন্তা! কোথায় কোনটা আমি খুলে ফেলে দিয়ে আসব! আর আমি? সোনায়, রুপোয় নিজেকে জড়িয়ে ফোঁকলা দাঁত সব বের করে দাদির চেয়ারের পাশে আরেক চেয়ার পেতে দুপুর অব্দি বসা!

আমার মা আর চাচি? ঈদ তো তাদেরও ! যেখানে বাড়ির পুরুষেরা সক্কাল বেলাতেই দু প্রস্ত নাশতা সেরে ঈদগাহ থেকে ঘুরে চলে এলেন, আমরা , সব পোলাপানেরা স্নান সেরে জামা কাপড় পরে দাদির হাতে প্রসাধন সেরে পরীটি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, মা আর চাচি তখনও রান্নাঘরে৷ কাজের বুয়াদের সাথে নিয়ে কাঠের আগুনে রেঁধে চলেছেন একের পর এক সুস্বাদু সব খাবার৷ খাসির রেজালা, মুর্গীর রোষ্ট, শামি কাবাব আর পোলাও৷ একফাঁকে বেরিয়ে এসে যাঁর যাঁর ছানা-পোনাকে স্নানও করিয়ে দিয়ে গেছেন৷ দুপুর গড়িয়ে যায় মায়েদের স্নান সারতে৷ দাদি মাঝে মাঝেই এসে বলে যাচ্ছেন, তুমরা গোসলডা কইরা তারপরে বাকি কাম সারো না! মা আর চাচি বলে, এইতো আম্মা, হইয়া গেসে, যাইতেসি! কিন্তু তখনও বাকি কাবাব ভাজা, স্যালাড কাটা৷ স্নান সেরে নতুন শাড়ি পরে আবার রান্নাঘরে যাবেন? তাই একেবারে কাজ সেরে বেরুবেন সব!

ঈদের সকালের প্রতীক্ষায় রাত যেন আর ভোর হয় না! চোখ বন্ধ করতেও ভয় লাগে, ঘুমিয়ে পড়লে যদি সকল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়? সকালবেলাতেই তো সব ঈদের সালামী দেবে৷ আব্বু, চাচু, দাদু, দাদি, চাচি৷ সবাই হাতের মুঠোয় টাকা লুকিয়ে রেখে দেয় আগে থেকেই৷ সালাম করলেই সালামী! সব্বাইকে পা ছুঁয়ে একটা করে সালাম আর তারপরেই কড়কড়ে দশ টাকার একটা করে নোট! যতগুলো সালাম ততগুলো নোট! মামা তো খামের মুখ বন্ধ করে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে, জামা-কাপড়ের সাথে৷ মাকে চিঠি লিখে দিয়েছে প্রতিবারের মত এবারেও, মামার সালামটা আমি যেন মা'কে করি আর তারপরেই মা যেন আমাকে খামটা দেয়! টপাটপ আম্মাকে দু'বার সালাম আর তারপরেই খাম হাতে! ভেতরে একটা কার্ড, ঈদ মুবারক লেখা, একটা চিঠি আর একটা নতুন পঞ্চাশ টাকার নোট! আমি কার্ড চিঠি আর টাকা হাতে নিয়ে সারা বাড়ি একপাক ঘুরে আসি ছুট্টে, জনে জনে কার্ড চিঠি আর টাকা দেখিয়ে৷ মা বলে, চিঠিটা তো পড়! কিন্তু আমি তো জানি, মামা চিঠিতে কি লিখেছে! মামা যে প্রতিবছর একই কথা লেখে! মামা লিখেছে,মা আমার ,ঈদ মুবারক৷ লক্ষ্মী হয়ে থাকিস, একদম দুষ্টুমি করিস না!ইতি, বেটা৷মামা যে আমার বেটা ছিল আর আমি মামার 'মা'৷ আমি অপেক্ষায় থাকি, কালকের৷ মামা যে কাল আসবে৷

সালামী আম্মা আর চাচিও পায়৷ রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে স্নান সেরে নতুন শাড়িতে দুজনে দাদুকে যখন সালাম করতে আসে তখন প্রায় দুপুর৷ দাদু তাঁর হাতবাক্স থেকে দুখানা একশ টাকার নোট বার করে দুজনকে দেয়৷ আমি বুঝতে পারি না, সালামী পেয়েও আম্মা কিংবা চাচি কেন সেটা নিতে চায় না, বারে বারেই বলে, থাক না আব্বা কি দরকার! একপাটি দাঁতহীন দাদু আমার হেসে বলেন, রাখ না সোনা ( দাদু আম্মাকে 'সোনা' বলে ডকতেন) , আমি যদ্দিন আছি, তদ্দিনই তো! এরপর তোমারে আর কে সালামী দেবে?


(আরও খানিকটা লেখার ছিল কিন্তু হয়ে ওঠেনি)

Wednesday, November 07, 2007

যেখানে আমরা আসলে কোনোদিনই যাইনি...

তখন আমার বিবাহপূর্ব প্রেমপর্ব চলছে। বেশিরভাগটাই টেলিফোনে। সারাদিন এখানে ওখানে টো টো করে ঘুরে বেড়িয়ে (পড়ুন শ্যুট করে) সন্ধের পর ভালমতন পান-ভোজন করে শরীফ মেজাজে রাত এগারটা-সাড়ে এগারটায় তিনি ফোন করতেন। আর ফোন ছাড়তেন সকালের আলো ফুটলে। আমি মাঝে মাঝেই ফোন কানে ঘুমিয়ে পড়তাম, এই যাহ... ঘুমিয়েই পড়ল! বলে তিনিও ঘুমুতে যেতেন।


বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি বলছিলেন কোথাও বাইরে বেড়াতে যেতে। বাইরে বলতে যে কোন একটা লোকাল ট্রেন ধরে উঠে বসা আর পছন্দমত একটা ষ্টেশন দেখে নেমে পড়া। রিকশা করে খানিক এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরত ট্রেন ধরে ফিরে আসা। আমি ঠিক সাহস করে উঠতে পারছিলাম না এধরণের অ্যাডভেঞ্চারে অভ্যস্ত নই বলে। কোথাও একটা গেলাম আর আটকে গেলাম তাইলে তো চিত্তির!


টেলিফোনের বিল প্রতিমাসেই উর্ধমুখী দেখে বিয়ের জন্যে বেশ সিরিয়াসলি ভাবনা চিন্তা চলছিল। বিয়েটা যখন করবই তো করে ফেললেই চুকে যায়! এভাবে ফোনওয়ালদের প্রতিমাসে ১২-১৪হাজার করে দেওয়ার কোন মানে নেই! তো আমরা ঠিক করলাম বিয়েটা করেই ফেলি! তো আমরা মোটামুটি বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে সেদিন বেরোলাম বিয়ের ব্যবস্থা করতে। মোল্লা মৌলভি, কোর্ট কাচারি ঘুরে ফিরে ব্যবস্থাদি করতে বেলা দুপুর । ক্ষিদেও পেয়েছে বেশ। ধর্মতলার এক রেষ্টুরেন্টে ঢুকে রুটি-মাংস খেয়ে বললাম, চল একটু বাজারের দিকে। একটু কেনাকাটা তো করতে হবে, বিয়ে বলে কথা! বাজারের দিকে এগিয়েও তিনি বললেন বাজার তো কালও করতে পারবে, আজকে চল না কোথাও একটু বাইরে! মুখের দিকে তাকিয়ে আমার আর না করতে মন সরল না। তবুও বললাম, বেলা দুটো বাজে, এখন গিয়ে ফিরতে পারব? ত্বরিত জবাব এল, হ্যাঁ হ্যাঁ। চল তো! এগোলাম বাসগুমটির দিকে । এই প্রায় বিকেলে লোকাল ট্রেনে প্রচন্ড ভীড় হবে বলে বাসে যাওয়াই সাব্যস্ত হল। সেটা নভেম্বরের শেষ। ছোট দিন, বেলা দ্রুত ফুরিয়ে যায় কিন্তু ঐ মুখের দিকে তাকিয়ে খুব বেশি ভাবনা চিন্তা করতে মন চাইল না সেদিন আর।


যাব কোথায়? বলল, গাদিয়াড়া যাবে? সেখানে গঙ্গা আছে! আমরা যেখানেই যাব সেখানে একটা নদী তো থাকতেই হবে। শহরের এই ভীড়, ধোঁয়া থেকে দূরে, কোথাও একটা খোলা জায়গায়, নদীর ধারে দু'দন্ড গিয়ে বসব এই আকাঙ্খায় চেপে বসলাম এক বাসে। গন্তব্য গাদিয়াড়া। গঙ্গাপারের এক গ্রাম। বাসগুমটির টিকিটবাবুর কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়েছে, যেতে ঘন্টা দেড় লাগবে। মনে মনে হিসেব করে নিলাম, এখন দুটোর একটু বেশি বাজে, মোটামুটি চারটে-সোয়া চারটে নাগাদও যদি পৌঁছুই তো ঘন্টাখানেক সেখানে ঘুরে-ফিরে সন্ধের আগেই ফেরত বাসে চেপে বসা। একটু রাত হয়ে যাবে হয়ত ফিরতে, ঠিক আছে! বাস ছাড়ল প্রায় তিনটে বাজিয়ে।


সকালে বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় একটা চাদর কাঁধে ফেলে নিয়েছিলাম, গলায় একটু ব্যথা ভাব আছে বলে। যদিও ঠান্ডা পড়েনি এই নভেম্বরে পড়েও না কিন্তু আমার আবার ঠান্ডা একটু বেশিই লাগে। তাই চাদর, যদি দরকার লাগে ভেবে। বাস শহর ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে এগোতেই হাল্কা ঠান্ডা বোঝা গেল। চাদর ভালমতন জড়িয়ে পাশের মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে কত কথা যে বলে গেলাম দুজনে। বাস চলছে তো চলছেই। ঘড়ির দিকে চোখ যায় অজান্তেই। পাঁচটা বেজে গেলো! 'হ্যাঁগো, এখানেই তো পাঁচটা বাজল, আমরা পৌঁছুব কখন আর ফিরব কখন?' 'কী জানি, ঐ ব্যাটা তো বলল, ঘন্টা দেড় লাগবে যেতে!' সামনে ছোট্ট এক নদী দেখা যায়, বললাম, এখানেই নেমে পড়ি, খানিক পরে এই রাস্তা থেকেই ফেরার বাস ধরে ফিরে যাব নাহয়! কিন্তু শুনশান জায়গা দেখে নামার সাহস হল না। আবার মগ্ন হই কথায়। বাস চলে। আর চলে।


শীত আসি আসি করছে। শেষ নভেম্বরের ছোট বেলা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সন্ধ্যা ঘনায়। গাদাগাদি ভিড়ের বাস ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ নেমে যেতে থাকে যার যার গন্তব্যে। আমাদের কথাও কমে যেতে থাকে ক্রমশ। শহর থেকে বহুদূরে কোন এক গাদিয়াড়ার উদ্দেশ্যে বাস এগিয়ে যেতে থাকে গ্রামের পরে গ্রাম পেরিয়ে। কখনো ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে যাওয়া রাস্তা বেয়ে তো কখনো ঘন বসতিপূর্ণ কোন গ্রামের ভিতর দিয়ে। টিমটিমে বাতি জ্বলে ছোট্ট দোকানঘরে। কৃষকের ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে বেরিয়ে আসে হলুদ আলোর ছিটে। রাস্তার পাশে হাত পা ছড়িয়ে কোথাও কোথাও পড়ে আছে খড়ের কাঠামো, দেবীমুর্তির। কোনটা দেবী সরস্বতী তো কোনটা দেবী দূর্গার। ছোট ছোট মন্দির দেখা যায়, কোনটা শিবের তো কোনটা কোন দেবীমায়ের। দ্রুত পেছনে সরে যায় দু'পাশের দৃশ্য। অন্ধকার ঘন হয়।


অবশেষে বাস এক রাস্তার শেষ মাথায় এসে থামল। ঘড়ির কাঁটা তখন ছ'টা ছুঁই ছুঁই। আমার মুখের কথা থেমেছে অনেকক্ষন। টিমটিমে বাতি জ্বলছে খুঁটির উপর শুধু চালের নিচে। দু-একজন যাত্রী, যারা এই শেষ অব্দি এসেছেন তাঁরা দ্রুতপায়ে বাস থেকে নেমে এগিয়ে গেছেন যার যার গন্তব্যে। গুটিগুটি পায়ে আমরা বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, কোথায় এলাম। বাস যেখানে এসে থেমেছে রাস্তার সেখানে শেষ। এখান থেকেই বাস আবার ঘুরবে কলকাতার দিকে। ফেরার টিকিট কাটা হোক আগে ভেবে বাসের কন্ডাক্টরের খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল পাশের চায়ের দোকানে সে গিয়ে বসেছে জুত করে। টিকিটের কথা বলতে জানা গেল এটা লাষ্ট বাস ছিলো, এখান থেকে কোন বাস আজ আর যাবে না। কাল সকাল ছ'টায় প্রথম বাস!

হাতের আঙুল তুলে ও দেখিয়ে দিল ঐ দ্যাখো, নদী! তাই তো! নদী দেখতেই তো এখানে আসা... কিন্তু নদী দেখা গেল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারকে যা খুশি তাই বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আমি তাই ধরে নিলাম সামনের ঐ অন্ধকারই গঙ্গা।


বাকিটুকু অপরজনের ভাষ্যে:-

...রুমাল তুমি হও না দ্রুতগামী বাস, সে রসিক মানুষ বসে হাসবেন কেবল, জালেতে মুখ লাগিয়ে, এই ভাবে দেখলেই আমার ছাগলের সিং ঘষার কথা মনে পড়ে, উপস্থিত বুদ্ধিবিহীন আমি তাকেই বাসের গতিবিধির কথা জিজ্ঞাসা করি, এই তো এই ঘন্টা দেড়, শীতকাল, যদিও সে হরপ্পা সভ্যতার কথা,আমার বান্ধবীটি সারা রাস্তা তার অলঙ্কার ছড়াতে ছড়াতে যায়, যেন রামচন্দ্র আলসেতে বসে দেখে চলেছেন আনাকারেনিনা,আরে আরে আমাদের জন্য মর্তে ধেয়ে আসছেন নদী, সুতরাং গন্তব্যের শেষে একটা নদী থাকবেই, থাকবেই, আরে সে সব টেলিভিশন মার্কা প্রচার নয়, এই তুলির আঁচড়ে পানেসারজি এঁকে দিচ্ছেন নদী...


... অমাবস্যার রাতে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে পীচের রাস্তাকেও নদী প্রমাণ করতে পারেন নীলস বোর,সুতরাং ফেরার বাস যে এই সাড়ে ছয়টায় পাওয়া যাবে না, জানা কথা, আরে বিধাতা তো সব জেনেই বসে আছেন কি না,আমরা একটা হোটেলে প্রবেশ করি, হ্যাঁ এখানেও কোন প্রাপ্ত বয়স্ক চিত্রমালা নেই,আপনারা উঠেপড়ুন ...


... এবং আমরা ফিরে আসি,কলকাতায়,এই ভাবে সেই ভাবে, 50 কিমি অটোতে ও খুলে যাওয়া শারীরিক যন্ত্রপাতি কুড়াতে কুড়াতে, যাক সে সব গুরুত্ত্বপূর্ণ নয়। আসলে আমার কিছু-কিছু জিনিস ভালো লাগে না, তা শতবার বলেও,লিখেও আপনি বোঝাতে পারবেন না, তখন বেরিয়ে পড়ুন, টাইটানিক চিরকালই ডুবে যায়, ভরসা রাখুন...
ও শ্রেয়াদি, এর চাইতে বেশী লেখা গেল না আজ, কিছুতেই না,বাইরে বেশ বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে, অন্ধকার রাস্তায় হু হু , আরে তোমার খেলা তুমি নিয়ে সাজাচ্ছো, বাতাসে বেশ পুজো পুজো ভাব, দোলনায় আরেকটু দুলে নিন মাধবী...
আমাদের গল্পটা-আমাদেরই থাক, তাই জায়গাটার নাম গাদিয়াড়া হোক, যেখানে আমরা আসলে কোনোদিনই যাইনি...

মৃদু মন্দে মন্দারমণি

মন্দারমণি ৷ এক কিশোরী, সমুদ্রতট৷ সদ্য সদ্য গজিয়ে ওঠা এই সৈকতে সবে লোকজন যেতে শুরু করেছে, নিয়মিত৷ সমুদ্র পাড়ের চেনা দৃশ্য ভ্যানিশ, না ট্রলার নৌকা, না শুটকির গন্ধ৷ স্নানাভিলষীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্নান করেন সমুদ্রে৷ ঢেউএর পরে ঢেউ এসে ভাঙে আর উচ্ছ্বাস বাড়ে স্নানরত ছেলে-মেয়েদের৷ নারী ও পুরুষদের৷ বাবার হাত ধরে সমুদ্রস্নান করতে আসা ছোট্ট শিশুটি তার হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে খেলা করে জল নিয়ে, তার খিলখিল হাসির শব্দ চাপা পড়ে সমুদ্রের গর্জনে৷ সৈকতময় ভাঙা, গোটা ঝিনুকদের মাঝে ইত : স্তত দাঁড়িয়ে দু-তিনটি ডাবওয়ালা৷ সাইকেলের পেছনে ঝোলানো কাঁদি কাঁদি ডাব আর সমনে ঝোলানো বাজারের থলেতে বিয়ার৷ একটি ডাব খেতে হলে খরচ করতে হবে দশটি টাকা আর বিয়ারের দাম জানা হয়নি৷ বেলা বারোটার জ্বলন্ত সূর্যের গনগনে তাপকে উপেক্ষা করে স্নানে মগ্ন কিছু মানুষ৷ সৈকত ধরে মাঝে মাঝেই ছুটে যাচ্ছে গাড়ি৷ টাটা সুমো, কোয়ালিস, সাফারি৷ এমাথা থেকে ওমাথায়৷ কলেজ পালিয়ে কলকাতা থেকে আসা এক দল ছেলে-মেয়ে জলে হুটোপাটি করতে করতে নিজেদের মধ্যেই তামাশা করে, এখন কোন ক্লাস চলছে? আজকে কি কি ক্লাস ছিল? বাড়ি গিয়ে সব ঠিকঠাক বলতে হবে তো! তাদের হাসির শব্দে চাপা পড়ে সমুদ্রের গর্জন৷

ছোট বড় নানা সাইজের নানা আকারের অজস্র অজস্র ঝিনুক ছড়িয়ে আছে সৈকতে৷ কুড়িয়ে নেওয়ার কেউ নেই৷ প্রতিটি ঢেউএর সাথেই আসছে আরও ঝিনুক৷ ছোট্ট নুড়ির মত দেখতে আস্ত ঝিনুকও দেখলাম কিছু কিন্তু অ্যাত্ত নরম! হাতে নেওয়ামাত্রই সেগুলো ভেঙে যায়৷ সৈকতে যদ্দূর ঢেউ আছড়ে পড়ছে, তদ্দূর অব্দি বালি ঠান্ডা, ভেজা ভেজা৷ আর তারপরেই শুকনো তপ্ত বালি৷ খালি পা রাখতেই মনে হল যেন ফোস্কা পড়ল পায়ে! এই তপ্ত বালিতেও কিছু মানুষ বসে আছেন৷ কেউ বা বেড়াতে এসেছেন, কেউ বা ওখানকারই লোক৷ দুজন মানুষকে দেখলাম খানিকটা বালি সরিয়ে তাতে প্লাষ্টিক বিছিয়ে জল ঢেলে দিয়েছেন দু-তিন গামলা৷ ছোট্ট, খুব ছোট্ট এক পুকুর যেন! তাতে কিলবিল কিলবিল করছে ভীষণ ছোট্ট সব মাছ, ইঞ্চিখানেক লম্বা সাপ৷ মানুষটি বসে বসে কিছু একটা বেছে আলাদা করছেন আর সেই আলাদা করে তুলে রাখা অতি ক্ষুদ্র মাছগুলি তুলে রাখছেন পাশেই রাখা প্লাস্টিকের গামলাভর্তি জলে৷ খানিক দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করব ভেবেও কিছু বললাম না, একাগ্র মানুষটির মনযোগ নষ্ট করতে মন চাইল না বলে৷ ডাবওয়ালারা ভিজে গামছা গায়ে মাথায় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গরম বালিতে৷ বিচের দিকে এগুনো যে কোন মানুষকে দেখেই এগিয়ে আসছে তারা সাইকেল নিয়ে, ডাব খান বাবু ডাব৷ ডাব খাবেন না? তবে বিয়ার খান! তোমরা বিয়ারও রাখো নাকি? জানতে চাইলে জবাব এলো, হ্যা ঁদিদি, রাখি৷ যা চান সবই পাবেন! কি চাই বলুন!

চারিদিকে তাকিয়ে দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বেশ কিছু মানুষ৷ কেউ বসে আছেন একেবারে জলের ধারটি ঘেঁষে, কোলে একেবারেই ছোট বাচ্চা৷ কর্তা গিন্নি দুজনেই জলের ধারে বসে আছেন৷ ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলে যেটুকু স্নান হয় ওটুকুতেই তারা খুশি৷ স্কুলপড়ুয়া তিনটি ছেলে নেমে গেছে অনেকটা জলে৷ ঢেউএর সাথে সাথে ওরা ডুবছে ভাসছে৷ মাঝে মাঝে দেখাও যাচ্ছে না ওদের৷ আবার দেখা যায়, ঐ যে! ওরা লাফাচ্ছে! আমার মনে হল, এভাবেই তো সমুদ্রে স্নান করতে এসে ডুবে যায় অনেকে৷ মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে থাকে সেই সব খবর৷ কিন্তু ঐ বাচ্চাগুলোর কোনদিকে কোন খেয়াল নেই৷ বিশাল উঁচু উঁচু ঢেউএর মাথায় চেপে চেপে তার চলে যাচ্ছে দূরে আরও দূরে!একটু উঁচু জায়গায় চটি রেখে এগিয়ে যাই জলের দিকে৷ ঝিনুক কোড়োতে কুড়োতে৷ দু'হাত ভরে ওঠে নিমেষেই৷ এত ঝিনুক এতো এতো ঝিনুক! এক সময় মনে হয় থাক, কী হবে! ক'টা ঝিনুক আমি সাজিয়ে রাখব? থাক ওরা এখানেই৷ সমুদ্র এখানে খুব কাছে ডাঙা থেকে৷ খুব খুব কাছে৷ বিছিয়ে আছে এক সাগর জল নিয়ে৷ শুয়ে আছে৷ ঘোলাটে জল নিয়ে ধুসর সমুদ্র বিছিয়ে আছে দৃষ্টিসীমার বাইরে অব্দি৷ এই সমুদ্রকে, এই বিছিয়ে থাকা বিস্তীর্ণ জলরাশিকে এখানে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়৷ সত্যি সত্যিই ছোঁয়া যায়! হাতে নেওয়া যায় আঁজলাভর্তি জল৷ যদিও নিমেষেই আবার তা গড়িয়ে নেমে যায় সাগরেই! একমুঠো বালি তুলে আনি আমি জলের ভেতর থেকে, মুঠো খোলার আগেই বালি নেমে যায় জলের সাথে ৷ আমি দেখতে পাই আমার হাতে ছোট্ট এক নুড়ি আর একটা ছোট্ট ঝিনুক, জ্যান্ত! আমি ওকে আবার জলেই ফিরিয়ে দিই, নুড়িটিকেও ৷ এই সমুদ্র গায়ে মেখে জলপরী হওয়া যায়৷ ঢেউ ভেঙে ভেঙে যদিও খুব বেশিদূর এগুতে পারি না আমি৷ ঢেউ আমাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে ডাঙায়, যেন ফিরিয়ে দিয়ে যায় ৷ যেন বলে, ওরে কোথায় যাচ্ছিস, ডুবে যাবি যে! নোনা জলে জ্বালা করে ওঠে চোখ ৷

ছোট ছোট চারটি গ্রাম নিয়ে এই মন্দারমণি ৷ দাদনপাত্রবার, সোনামুই, মন্দারমণি ( চতুর্থ গ্রামের নামটি ভুলে গেছি)৷ পাশাপাশি ছোট্ট ছোট্ট সব গ্রাম, আগে সমুদ্রের কাছে ছিলনা বোধহয় এখন বেশীর্ভগ্টাই সমুদ্রে অল্প একটু অংশ পড়ে আছে বাইরে, তাও ক'দিন আছে বলা যায় না৷ সমুদ্রতীরবর্তী সব গ্রামে ছিল নোনা জলের ভেড়ি৷ "রোজভ্যালী'র মালিকেরা মন্দারমণিতে মাছের ব্যবসা করতে গেছিলেন বছর পাঁচেক আগে৷ সস্তার জমি কিনে মাছের ভেড়ি করলেন তারা৷ একটি দুটি ঘর তৈরী হল একটি গেষ্টহাউস মতন৷ যেখানে মাছ কিনতে আসা লোকজন এসে রাত্রিযাপন করতেন৷ সৈকতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরও নিয়ে আসতে লাগলেন৷ ঘর বাড়তে লাগল গেষ্টহাউসের আর কিছুদিনের মধ্যেই সেই গেষ্টহাউস রূপ নিল এক চারতারা হোটেলের৷ সমুদ্রের একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেই হোটেল৷ মাছের ব্যবসা করতে আসা রোজভ্যালী সেখানে শুরু করল হোটেলব্যবসা৷ দেখাদেখি সেখানে দাঁড়িয়ে গেল আরও কিছু হোটেল, কটেজ৷ রমরমা ব্যবসা৷ কোন হোটেলে, কটেজে একটি ঘরও খালি থাকে না সেখানে এখন জানাল গার্ডেন রিট্রিট নামের রঙচঙে কটেজের কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার বিশুবাবু৷পাঁচখানা ঘর নিয়ে পাঁচমাস আগে হয়েছে এই গার্ডেন রিট্রিট কটেজ৷ রাস্তার ধারে খনিকটা জায়গা গোল করে ঘিরে নিয়ে মাথায় খড়ের ছাউনি দিয়ে রিসেপশন কাম সিটিংপ্লেস৷ পাশেই একটা লম্বাটে ঘরমত জায়গা, তারও মাথায় খড়েরই ছউনি৷ চারপাশ আদ্ধেকটা ঘেরা৷ কাঠের খুঁটির উপরে দাঁড়িয়ে আছে এই খাওয়ার ঘরের ছাউনি৷ খাওয়ার ঘরের পাশেই ডানধার ধরে একের পর এক ছোট ছোট এক কামরার ঘর, কটেজ৷ সাথে একফালি বাথরুম৷ সারি দিয়ে একের পর এক ঘর, শেষমাথার ঘরখানিতে আমরা ঠাঁই নিয়েছিলাম একবেলার জন্যে৷ এই ঘরের পেছনে কাজ চলছে আরও পাঁচখানি ঘরের৷ তবে এই ঘরগুলি ইটের৷ কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, লাল ইটের ঘরগুলি প্রায় তৈরী ৷

গাঢ় লাল হাফ ইটের দেওয়ালের উপর গাঢ় সবুজ দরমার বেড়া আর মাথায় সাদা অ্যাসবেষ্টাসের চাল দেওয়া এই কটেজগুলির পোষাকী নাম গার্ডেন রিট্রিট ৷ কালো কাঁচের জানালাগুলোর ধারগুলো সবুজে রাঙানো ৷ কালো কাঁচের মাথা নিচু দরজা আর দুটো করে জানালা ৷ ঘরের ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল নীল আর সাদা চৌকো চৌকো খোপকাটা ছাপওয়ালা স্যাটিন কাপড়ের চাঁদোয়া টাঙানো অ্যাসবেষ্টাসের নিচে ৷ আধো আধো আলো আঁধারির খেলা সেখানে ৷ লাল, সবুজ, নীল আর সাদা র ংসাথে কালো কাচের দরজা জানালা৷ সব মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত রঙ্গ ৷ গরমটাকে উপেক্ষা করতে পারলে শুধু এই রংএর খেলা দেখেই হয়ত কাটিয়ে দেওয়া যেত একটি বেলা ৷ কিন্তু না ৷ এই গরমকে উপেক্ষা করা গেল না কিছুতেই৷ আসবাব বলতে এক প্রশস্ত বিছানা, ছোট একখানি সাইড টেবল, কাঁচের আর দু'খানি প্লাষ্টিকের চেয়ার ৷ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে চোখে পড়ে এক মরা বেগুনের বাগান ৷ এবড়ো-খেবড়ো শুকনো ধুলোময় বালুমাটিতে বাগানসুদ্ধু গাছগুলো মরা ৷ দাঁড়িয়ে আছে কে জানে কার, কিসের সাক্ষী হয়ে ৷ কাদের এই বাগান? এই কটেজ মালিকেরই কি? এখানকার এই কটেজের ব্যবসা দেখতে দেখতে কারও একটুও হয়ত সময় হয়নি ঐ গাছেদের গোড়ায় একটু জল দেওয়ার ৷ শুকিয়ে গেছে তাই এক বাগানভর্তি বেগুনগাছ! মরা বেগুনের বাগানের পাশেই সবুজ পত্রবহুল এক নিমগাছ৷ কী অদ্ভুত!

মন্দারমণিতে এখনও বিদ্যুত্ পৌঁছোয়নি ৷ তাতে কি? জেনারেটর আছে কী করতে৷ হোটেল, কটেজ সবই চলে জেনারটরে ৷ নামমাত্র খরচে যে যেভাবে পারে কটেজ তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে সেখানে ব্যবসা করতে৷ দরমার বেড়া, অ্যাসবেষ্টাসের চালের মাথা নিচু সেই সব কটেজে ঢুকলে জাহান্নামের আগুনের আঁচ খানিকটা টের পাওয়া যায় ৷ জেনারেটরে চলা পাখার বাতাস যেন আগুন ছড়ায় সেই কটেজে ৷ যারা চার অংকে বিল মেটাতে পারবেন তাঁরা ওঠেন রোজভ্যালীর চারতারা হোটেলে, সেখানে ঘরগুলো তাপানুকূল ৷ আমাদের মত পাতি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের সম্বল ঐ জাহান্নামসম কটেজ ৷সেখানে করে খাচ্ছেন এখন বেশ কিছু মানুষ ৷ কেউ বা দিয়েছেন বিস্কুট, সফট ড্রিংকস, চিপসের দোকান তো কেউ কিনেছেন গাড়ি৷ মারুতী ভ্যান, টাটাসুমো নিদেনপক্ষে একটি অ্যাম্বাসেডর ৷ গাড়ি কেনার টাকা এসেছে ফসলী জমি বিক্রী করে ৷ সেইসব জমি আবার কিনে সেখানে ঢালাও চলছে মাছের ব্যবসা ৷ তৈরিই হয়েছে সব ভেড়ি৷ বাগদা, পোনা, তেলাপিয়ারা সেখানে বড় হয় মানুষের দেওয়া খাবার খেয়ে ৷ জমি বিক্রী করে যাঁরা গাড়ি কিনেছেন তাঁরাও ভালই করে খাচ্ছেন৷ দশ কিলোমিটার মতন রাস্তা কলকাতা দীঘা মহাসড়ক থেকে৷ যেতে হয় চাউলখোলায় নেমে৷ ট্রেকার আর ইঞ্জিনচালিত ভ্যানরিক্সা ছাড়া যাতায়াতের একমাত্র সম্বল এই গাড়িগুলি ৷ চড়া ভাড়ায় দল বেঁধে মানুষ চাপেন এই গাড়িগুলোতে ৷ হোটেল, কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন গাড়ির মালিকেরা গাড়ি নিয়ে ৷ বেড়াতে আসা যাত্রীদের পৌঁছে দিয়ে আসেন এঁরা কাঁথি, জুনপুট, দীঘা ৷ দশ কিলোমিটার দূরের চাউলখোলায় যেতে একটি মারুতী ভ্যান ভাড়া নেয় দুশো পঞ্চাশ টাকা, কাঁথি নিয়ে গেলে নেয় সাড়ে চারশো টাকা ৷ যাঁরা ফোন করে হোটেল-কটেজ বুক করে আসেন, তাঁরা চাইলে এই সব গাড়িগুলো এসে তাঁদের নিয়ে যায় কাঁথি, জুনপুট কিংবা দীঘা থেকে৷ ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার ঝাঁকুনি কিংবা ধুলো থেকে অনেকটাই বাঁচিয়ে দেয় এই গাড়ি৷ গরমের কথা বলাই বাহুল্য ৷অনেকেই একবেলার জন্যে এসে ঘুরে যান এই মন্দারমণিতে ৷ গাড়ি করে সকাল সকাল এসে ঘুরে বেড়িয়ে, সমুদ্রস্নান করে আবার ফিরে যাওয়া জুনপুট, দীঘা কিংবা কলকাতায় ৷ চমত্কার দীর্ঘ সৈকত, প্রবল গর্জনে আছড়ে পড়া সমুদ্র আর দূরে বিস্তৃত নারকেল বন৷ একটু নীরবতা প্রার্থীদের বেড়াতে আসার জন্যে আদর্শ স্থান৷ সাথে গাড়ি থাকলে ঘুরে আসা যায় আঠেরো কিলোমিটার লম্বা এই বিচ, যার সাথে সাথেই এগিয়েছে নারকেলের বনও৷ গাড়ি না থাকলে চুপটি করে বসে পড়া যায় কোথাও একটা জায়গা দেখে নিয়ে ৷ তবে যাঁরা রাত্রিবাস করবেন না তাঁদের এখানে বেলা বেশি না করাটাই শ্রেয় ৷ নইলে মিস করতে হতে পারে কলকাতা ফেরার সাড়ে চারটের লাষ্ট বাসটি ৷ যেমন আমরা করেছিলাম ৷ তারপর? একটি বাসের অপেক্ষায় হা পিত্যেশ! মেচেদা, হলদিয়া৷ যাহোক কিছু একটা ! সময় বুঝে আকাশের কোণে জমে ওঠে ঘন মেঘ, ঘন কালো ৷ দেখতে দেখতেই তা ছড়িয়ে যায় গোটা আকাশে , দেয় গুরুগম্ভীর ডাক আর নেমে আসে অঝোর বৃষ্টি৷ রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকা, টিনের চাল ভেদ করে মাথায় বৃষ্টির ফোটারা এসে পড়ে টুপটাপ টুপটাপ৷ কিছুই না পেয়ে অগত্যা উল্টো দিকের বাস ধরে যেতে হবে দীঘায় আর যাওয়ার আগে অবশ্যই মনে মনে একটা হিসেব করে নিতে হবে, হাতে এক্সট্রা সময় আর পয়সাকড়ি আছে তো!

মফিজুল৷ মারুতী ভ্যানের মালিক ৷ নিজেই গাড়ি চালিয়ে পর্যটকদের নিয়া আসা যাওয়া করে, কাঁথি, জুনপুট, দীঘা ৷ আবার ফিরে আসে মন্দারমণি৷ মফিজুলের বাড়ি সোনামুই'তে৷ গ্রামের নামটি কি সোনামুখী? না না ৷ সোনামুখী নয়, সোনামুই! মফিজুলদের একসম বিঘা তিরিশ জমি ছিল ৷ সম্পন্ন চাষী পরিবার৷ কিন্তু এখন আর নেই সেই জমি ৷ সমুদ্র খেয়ে নিয়েছে ওদের চাষের জমি ৷ এখনও খানিকটা বেঁচে আছে৷ বিঘে দশ মতন৷ তবে এও যেতে পারে সাগরের পেটে যে কোন সময় ৷ সময় থাকতে মফিজুল তাই বেঁচে থাকা জমিটুকু বিক্রী করে দিয়েছে মাছের ব্যবসা করতে আসা একজনের কাছে, সেই টাকায় মফিজুল কিনেছে এই গাড়ি আর একটি ট্রাক্টর ৷ গাড়িটি সে নিজেই চালায় ৷ ট্রাক্টর ভাড়ায় খাটে৷ যাত্রীর আশায় মফিজুল যখন দাঁড়িয়ে থাকে কটেজের সামনে তখন পরম মমতায় পালকের ঝাড়ন দিয়ে ধুলো ঝাড়ে গাড়ির গা থেকে ৷ নরম কাপড় দিয়ে মুছে মুছে চকচকে করে তোলে সে তার গাড়ির শরীর৷ মফিজুলদের গ্রামে এখনও বিদ্যুত্ যায়নি ৷ মন্দারমণি থেকে মাইল পাঁচেক দূরে বিদ্যুত্এর শেষ খুঁটিটি দাঁড়িয়ে আছে ৷ এরপরে আর কবে এগোবে তা মফিজুল জানে না৷ তবে এগোবে এটুকু জানে৷ কারণ, যেভাবে বাইরের মানুষ মন্দারমণিতে আসছে, মাছের ব্যবসা, হোটেলব্যবসা করছে, তাদের নিজেদের তাগিদেই তারা বিদ্যুত্এর জন্যে দৌড়-ঝাঁপ করবে আর আলো নিয়ে আসবে এটা মফিজুলের বিশ্বাস ৷

-:-