Saturday, October 07, 2006

এ ও আমার গোপনকথা

এবারের গল্পের ও দুই দুস্কৃতির একজন হচ্ছেন আমার মেজদি ৷ আমাদের দুজনের ই মেয়ে দুটি তখন সবে স্কুল যেতে শুরু করেছে। মেজদির মেয়ে আর আমার মেয়ে প্রায় একই বয়েসি ৷ দুজনে মহা উত্সাহে তাদের স্কুলে দিতে যাই, আনতে যাই৷ স্কুলের প্রয়োজনীয় যে কোনো জিনিস কিনতে দুজনে প্রায় রোজই নিউ মার্কেটে যাই ৷ সে প্রয়োজন যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন ৷ স্কুল থেকে ফিরে দুটি ক্ষুদেই খেয়ে দেয়ে ঘুমায়, আমরা সেই ফাঁকে বাইরের কাজটা সেরে আসতাম ৷ তেমনি এক বিকেলে বাড়ির সামনে থেকে দুজনে রিক্সায় চেপেছি, হেঁটে গেলে বড়জোর দশ মিনিট লাগে, কিন্তু আমি তখনো হাঁটাতে ততটা অভ্যস্ত নই, তাই রিক্সা  ৷

রিক্সা এই গলি ঐ ঘুঁজি দিয়ে ঘুরে চলেছে, একটা ছোট্ট লেন পেরিয়ে রিক্সা সদর স্ট্রিট এ ঢুকবে ৷ লেন এর শেষ মাথায় রাস্তারপাশে একটা ছোট্ট শিবমন্দির, ওখানটায় পৌছুতে সামনে থেকে একটা ট্যাক্সি এসে সোজা ঠুকে দিলো আমাদের রিক্সাকে ৷ট্যাক্সিটি সদর স্ট্রিট থেকে ঐ লেনে ঢুকছিল, আমাদের বেচারা রিক্সাওয়ালা অনেক চেষ্টা করে সোজা উল্টে না দিয়ে বাম দিকেপাশ ফিরিয়ে রিক্সাটিকে ফেললো !!


আমি বসেছিলাম বাঁয়ে, কাজেই আমি পড়লাম আগে, আমার ওপরে মেজদি৷ ফুটপাথ এর নীচে জমা ছিলো কিছু নোংরা জল, সেই জলের ওপরে আমি,আমার ওপরে মেজদি, আর আমাদের দুজনেরওপরে রিক্সা ! মেজদি চটপট আমার ওপর কনুই আর হাঁটু চেপে উঠে পড়েছে, কিন্তু আমি চেষ্টা করেও উঠতে পারছি না, মেজদি আমার হাত ধরে টানাটানি করছে, কিন্তু ঐ ঢালমত জায়গায় তোবড়ানো রিক্সায় আমি আটকে গেছি৷ সাহায্যের জন্যে চারপাশ থেকে ততক্ষনে বেশ কিছু হাত এগিয়ে এসেছে ৷ মেজদি আমায় ধমাকচ্ছে, চেষ্টা তো কর উঠে আসার ! শেষমেষ আমি উঠে এলাম ! রিক্সাওয়ালা তখন বিষম ব্যস্ত, তার যে কোনো দোষ নেই এটা চারপাশের লোকজনকে বোঝানোতে ৷ মেজদি ততক্ষণে আমার হাত ধরে আমাকে প্রায় হিঁচড়ে বাড়ির ফিরতি পথ ধরেছে, লোকজনের সাহায্যের হাত উপেক্ষা করে৷ আমি তখনো কথা বলার মত অবস্থায় নেই, কিন্তু মেজদির শাসানিগুলো কানের ভেতর গরম সীসের মত ঢুকছে, ম্যাডাম হাঁটতে পারেন না, রিক্সা চাই, বাড়িতে গিয়ে যদি কাওকে কিচ্ছুটি বলেছিস, তো জীবনে তোকে নিয়ে আর কোত্থাও যাবো না !


বাড়ি গিয়ে কাওকে কিছু বলার মনোবাসনা আমারো ছিলো না ৷ তাই বলিওনি কাওকে৷ হাতের ২/৩ জায়গায় বিভিন্ন রঙের উপস্থিতি দেখে কর্তা জিজ্ঞেস করেছেন, তুমি কি রানী'র- মেজদির নাম রানী, সাথে
পাঞ্জা লড়েছিলে নাকি ? লাগলো কি করে ? মেজদির আবার পাঞ্জা লড়ার সখ ছিল, সকলের সাথেই পাঞ্জা লড়ে বেড়াতো,  আমি প্রবল প্রতিবাদ করেছি, যে আমি মোটেও পাঞ্জা  লড়িনি, রাতে অন্ধকারে দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছিলাম, তাই লেগে গিয়েছে ! বলা বাহুল্য যে কথাটি তিনি বিশ্বাস করেননি ৷

এর পর বেশ কিছুদিন শুধু স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও যাইনি, আর সেই থেকে রিক্সা চাপাও বন্ধ! কিন্তু আমাদের গোপন কথাটি রহিলো না গোপন! প্রায় এক বছর পরে, সেই রিক্সাওয়ালা অভিযোগ করেছে মেয়ের বাবার কাছে, সেদিনকার সেই দুর্ঘটনায় তার নাকি কোন দোষ ছিলো না, ট্যাক্সি এসে বেমক্কা ধাকা মেরে রিক্সা উল্টে দিলো, কিন্তু তারপর থেকে ভাবীরা কেও আর তার রিক্সায় ওঠেন না ! একথা শুনে তিনি তো হা ! কবে ওল্টালো রিক্সা ? তখন জেরা করে জানতে পারলেন যে প্রায় বছরটাক আগেকার ঘটনা এটা ৷ রাতে দুই ভাই মিলে আমাদের দুজনের ক্লাস নিলেন ! আর কত এরকম ঘটনা আমরা লুকিয়ে রেখেছি ??? কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারিনি, যে আর কিচ্ছু লুকানো নেই!

গোপন কথাটি

আমি তখন সবে কলকাতা এসেছি এক বছর হল, মেয়ে খুব ছোট, তাই বাইরে খুব কম বেরুনো হত, ডিসেম্বরের শেষ সেটা, বড়দিন পেরিয়ে গেছে, এখানে বড়দিনের হল্লা আমি বাড়িতে বসেই টের পেয়েছি, মেজ জা, যাকে আমি মেজদি বলতাম, তার কাছে গল্প শুনি, পড়শী হিন্দুস্থানী মেয়েটা এসে নানা গল্প শোনায়, আমি তার আদ্ধেক বুঝি, আদ্ধেক বুঝি না, কিন্তু আমার মন চঞ্চল হয় বাইরে বেরুনোর জন্যে, দেখার জন্যে !

মেজদির কাছ থেকে শুনেছি, গোটা পার্ক স্ট্রিট নাকি খুব সুন্দর করে সাজে,আর ঐ সেন্ট পল চার্চ, সেও নাকি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়৷ দেখার ইচ্ছে তীব্র হতে থাকে, কিন্তু কারো সময় নেই, যে আমাকে নিয়ে একটু বেরোয়, মেজ ভাশুরকে বললাম, বায়না টায়না গুলো মেজ ভাশুরের কাছেই হত আমার,  আমি দেখতে যাব, সেন্ট পল চার্চ, চৌরঙ্গী, পার্ক স্ট্রীট! তখন মেজদা বললেন, খুব ভীড় হয় যে, আচ্ছা ঠিক আছে, সময় পেলে নিয়ে যাব, কিন্তু সময় আর হয়নি ৷

একত্রিশের রাত সেদিন, দুপুর বেলাতেই ভাশুর বলে গেছেন, ফিরতে রাত হবে, বাইরেই খেয়ে আসবেন, ছোট কর্তাও তাই জানিয়েছেন ৷ আমার ভীষণ মন খারাপ, মেজদিকে বললাম, তুমি তো নিয়ে চল... ! মেজদি বললে কিন্তু বাচ্চা দুটো ? শাশুড়ী বললেন, দু দুটো কাজের লোক আছে, অসুবিধে হবে না, তোমরা যাও ৷

পাশের বাড়ির এক ভাবী ও সঙ্গ নিলেন, আমরাও একটু সাহস পেলাম ! দুই এর থেকে তো তিন ভালো ! পাঁচ মিনিটের হাঁটা রাস্তা পার্ক স্ট্রিট, সেখানেই যাওয়া হবে, চৌরঙ্গী, চার্চ পরে কখনও! ঠিক হল হেঁটেই যাব৷ সন্ধ্যে সন্ধ্যে বেরুবো, খাব কিছু, আর সাড়ে আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরব৷ সাজগোজ করার জন্যে নীচতলায় মেজদির ঘরে গেলাম, মেজদি বলল, গয়নাগাটি পরে বেরোস না, ওগুলো খুলে ইমিটেশন গয়না পরে নে, আর দুজনের হাতে পার্স রাখার দরকার নেই, একজনের হাতে পার্স থাকলেই হবে ! তো যা গয়নাপত্র দুজনে পরেছিলাম, সবগুলো খুলে একটা পার্সের মধ্যে রেখে দিলাম, মেজদির পার্সে টাকা পয়সা ঢোকানো হল আর আমার পার্সে গয়না ! বেরুনোর সময় একটা পার্স মেজদি নিজের আলমারিতে ঢোকালেন, আর একটা হাতে নিলেন ৷ বলতে ভুলে গেছি, দুজনের হাতে ছিল একই রকমের একই রঙের পার্স ! ভাবী ও ততক্ষনে রেডি হয়ে দাঁড়িয়েই ছিলেন আমাদের জন্যে ৷ তিন জনে মিলে মহা আনন্দে পার্ক স্ট্রিট অভিযানে চললাম ৷

গল্প করতে করতে ঐ ঝলমলে রাস্তায় খানিক হেঁটে নিয়ে এবার খাওয়ার পালা, আমি বললাম, চাইনিজ খাব, মেজদি বলল,  এটা কী তোর বাংলাদেশ নাকি? সব জিনিস হালাল পাবি সব জায়গায়? এখানে চাইনিজ মানে চাইনিজ! মুরগী-শুয়োর সব একই হাঁড়িতে-কড়াইতে একের পর এক রান্না হয়, আর মুরগীও তো জবাই করা নয়, কোপানো, সব হারাম। কাজেই চাইনিজ খেতে হলে বাড়িতে বানিয়ে খাবি, এখানে নয়।  কিন্তু আমি জেদ ধরলাম, খাবই খাব !

এখানে এসে অবধি একবারও চাইনিজ খওয়া হয়নি ৷ অগত্যা মেজদি বলল, চ ! কিন্তু কোথাও টেবিল খালি নেই! সব নাকি বুক করা ! মহ ঝামেলা তো ! অবশেষে এক জায়গায় টেবিল পাওয়া গেল, কিন্তু আটটার মধ্যে খালি করে দিতে হবে৷ আটটা থেকে বুক করা আছে৷ তখন সবে ছ'টা বাজে৷ আমরা বসে পড়লাম৷ চারপাশে সবাই দেখলাম রঙিন শরবত খাচ্ছে । অদ্ভুত এক অচেনা উৎকট গন্ধ গোটা রেস্তোরা জুড়ে।  মেজদি জ্ঞান দিল, শরবত না রে হাঁদা, মদ খাচ্ছে সব!! আর জানান দিল, এখানে সব এরকমই !!

আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল ৷ মেজদি আরো বলল, এজন্যেই তোর ভাশুর বারণ করে ! মদ খেয়ে সব কে কেমন করে কোনো ঠিক আছে! মদ খেয়ে কে কেমন করে সে আমি জীবনে দেখিনি, কিন্তু বইতে তো পড়েছি আর সেই সব মনে পড়ে গিয়ে আমার ততক্ষণে হয়ে গিয়েছে ! কেউ বসে মদ খাচ্ছে, সেটা সেই প্রথম দেখা ৷ খাবারের অর্ডার গেলো, খাবার এলো৷ চুপচাপ খেলাম ৷ সমস্ত এক্সাইটমেন্ট শেষ ! এবার বিল দেবার পালা, বিল এলো, মেজদি দেখে নিয়ে পার্স খুলে পয়সা বার করতে গিয়ে দেখে, একটা একটা করে চুড়ী, বালা, গলার হার, কানের দুল বেরুচ্ছে পার্স থেকে !! নো পয়সা !! মেজদিকে দেখলাম চুপ করে পার্স নিয়ে বসে আছে, জানতে চাইলাম, কি হয়েছে ? তখন আমার হাতে দিলো পার্সটা,  দেখে তো আমার হাত পা ঠান্ডা ৷


ভুল করে টাকার ব্যাগ আলমারিতে রেখে গয়নার ব্যাগ নিয়ে এসেছে মেজদি ! মেজদি তখন আমার উপর রিতীমত ক্ষেপে গেছে, বারণ করলে শুনবে না, পার্ক স্ট্রিট ঘুরতে যাবে, চাইনিজ খাবে, এবারে সামলাও ! বিলক্ষণ ঘাবড়েছি ৷ হঠাৎ  সেই পড়শী ভাবী বলল, এই তো রাস্তার ঐ পারে আমাদের দোকান, আমি গিয়ে টাকা নিয়ে আসছি, তোমরা বসে গল্প কর ! বসে তখন এক নি:শ্বাষে আল্লাহর নাম জপে যাচ্ছি ৷ মেজদি গুম ! ঐ শীতের রাতেও ঘেমে সারা দুজনে ! কাঁচের দেয়াল দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ভাবী হেঁটে রাস্তা পার করল, দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, এবার টাকা নিয়ে ফিরে আসছে...

বাড়ি ফিরে কাউকে বলিনি ঐ ঘটনা বহুদিন, ভাশুর পরদিন জিজ্ঞেস করেছেন, কেমন হল তোমাদের বেড়ানো? বলেছি খুব ভাল! চাইনীজ খেয়েছি তাও বলেছি, ফেরার পথে মেজদি পান খাওয়ায়নি সেই অভিযোগ ও করেছি !! কিন্তু স্পিকটি নট about the bill...