Sunday, September 17, 2006

সব কটা জানালা খুলে দাও না

সড়ক পথে ভারত থেকে বাংলাদেশ যাওয়াটা বেশ মনোরম৷ প্রচুর বাস হয়েছে, মাশুলও নগন্য, আর চারপাশ দেখতে দেখতে বেশ যাওয়া যায়৷ বর্ডারে আগে বেশ ঝামেলা করত কাষ্টমস কিন্তু এখন বাসওয়ালারাই সামলে নেয় সবকিছু,কিছু প্যাকেজ হয়ে থাকবে৷ সকালে এখানে বাসে উঠে পড়ো আর তারপর ওরাই সব দেখে-শুনে নেবে৷ ভোর ছটায় কোলকাতা থেকে বাস ছেড়েছে আনুমানিক সন্ধ্যে ছ'টায় ঢাকায় নামিয়ে দেবে, বাসে ওঠার আগে থাকতেই সেটা জানা৷ বেনাপোল বর্ডারে পৌঁছাতে যা সময় লাগে তার আধ ঘন্টা আগেই পৌঁছালো বাস, ইমিগ্রেশন কাষ্টমস সেরে নিয়ে বাস আবার চটপট ঢাকার পথ ধরলো দেড় ঘন্টার মাথায়৷ বাসে যিনি অ্যাটেন্ড্যান্ট, তিনি বললেন আজ সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি মিটে গেল, বিকেল পাঁচটার মধ্যেই ঢাকায় পৌঁছে যাব ইন্শাল্লাহ৷ আমি পেট্রাপোল থেকে চট্টগ্রামে বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম যে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাব, আর জানতে চাইলাম তারপরে কিভাবে চট্টগ্রামে যাওয়া হবে? বাবা বললেন বাসষ্টপে লোক থাকবে আর ওখান থেকেই বি আর টি সি'র বাস ধরে সোজা আবার বেরিয়ে যাবে দেশের বাড়ির পথে, তোমার মা ওখানে অপেক্ষা করছেন৷

সাভার অব্দি বাস ঠিকঠাক গেছে, সাভার মানে ঢাকা আর এক ঘন্টা দূর, জাতীয় স্মৃতিসৌধের জন্য খ্যাত, বি-টিভিতে প্রত্যেকটা খবরের আগে মুখ দেখায় যে স্মৃতিসৌধ, সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিনের সেই বিখ্যাত গান, সব কটা জানালা খুলে দাও না ৷ চমত্কার রাস্তা আর ফাঁকা, ভালো স্পিডে যাচ্ছে,বিদেশি ভলভো-গাড়ি,কাজেই সময়ের আগেই পৌঁছাচ্ছে৷ এটাই সবাই আলোচনা করছে,ক্রমশ ঢাকা এসে পড়ছে কলকাতার আরো কাছে৷ যাত্রীদের মোবাইল ফোন ঘনঘন বাজছে, কে কোথায় নামবেন, গাড়ি যেন থাকে অমুক জায়গায়, সেই মত সব নির্দেশ,অনুরোধ যাচ্ছে৷ আমিও "খোলা' মনে "জানালা' দিয়ে শোভা দেখছি৷ সাভারে রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিং , "শহীদ জিয়া আমরা তোমায় ভুলিনি ভুলবো না'৷ হঠাত্ খেয়াল হল আজ তো তিরিশে মে৷ জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী! রাস্তা দেখতে দেখতে যাচ্ছি, গাড়ির গতি ক্রমশ স্লো হচ্ছে৷ বিশাল বিশাল সব হোর্ডিং , ংযাতে মরহুম জিয়া আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি৷ ইতিমধ্যে বাসের অ্যাটেন্ড্যান্ট ভদ্রলোকের কাছে ফোন, বাস যেন রোজকার নিয়মিত পথ ধরে না যায়, কুলটি মহাসড়ক ধরে যেন ঢাকায় ঢোকেন, অর্থাত্ ঢাকা আরো একটু দূরে৷ ৷ আর যাত্রীদেরকে জানানো হ'ল, একটু দেরী হবে কারণ ঢাকায় ঢোকার পথে প্রচন্ড জ্যাম৷ যে রাস্তায় বাস চলতে আরম্ভ করল সেটি তখনও পুরো তৈরি হয় নি৷ কোথাও শুধু ইট বিছানো কোথাও বা পিচ ঢালা হচ্ছে৷ বেশ ভালমতন ঝাঁকুনি টের পাচ্ছি ভলভো বাসে বসে থেকেও৷ বড় রাস্তা ছেড়ে বাস চললো অলি-গলি ধরে৷ কিন্তু একটা সময়ে বাসকে বড় রাস্তায় পড়তেই হল আর তখন টের পাওয়া কাকে বলে যানজট৷ ঢাকার উপকন্ঠে বাস পৌঁছে গেছিলো সাড়ে চারটের সময় আর তারপর হাঁটি হাঁটি পা পা করতে করতে রাত সাড়ে আটটায় কমলাপুরে পোঁছালো বাস, ঘন্টা খানেকের পথ চার ঘন্টায়৷ কাছে মোবাইল ছিল না যে ফোন করে জানিয়ে দেব, এই দেরীর কথা৷ একে তো ভোর থেকে সারাদিন বাসে বসে থেকে বেশ অসুস্থ বোধ করছি, এদিকে রাতেই আবার আরও একশ কিলোমিটার জার্নি করে মায়ের কাছে যাওয়ার কথা৷ বি আর টি সির শেষ বাসটি ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় সাড়ে সাতটায়৷ প্রচন্ড অস্থিরতা ,অথচ কারও সাথে যোগাযোগ করব সেই উপায়ও নেই ৷ আশে পাশে অনেকের হাতেই মোবাইল আছে কিন্তু সংকোচ! ভাইয়া, একটা কল করব! বাস কমলাপুরে পৌঁছালে ষ্টপে ভাইকে দেখতে না পেয়ে বাবাকে ফোন করলাম পরিবহনের অফিস থেকে, বাবা বললেন ভাই তিন ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে এই মাত্র ঢাকায় আমার এক বোনের বাসায় গেছে৷ ছোট বোনের বাড়ি কাছেই, ভাইকে আবার ডাকবো ? তার থেকে নিজেই চলে যাই সি এন্ড জি নিয়ে৷ এই ভেবে সি এন্ড জির সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল ৫ মিনিটের দুরত্বে তারা যেতে রাজী নয় এই বিশাল যানজটের ভেতর৷ অগত্যা রিকশা নিয়ে সেই যান্জটের ভেতর, চেনা রাস্তা ছেড়ে গলি, তস্য গলি৷ যেটা বাকি ছিলো সেটা হলো, পথ হারালাম৷ ঐ গলি গলি তস্য গলির ভেতরে যানজট ঠেলে ঠেলে আধ ঘন্টা ঘুরে অবশেষে রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফোনে করে বোনকে জানালাম যে পথ হরিয়েছি! ভাই বেরিয়ে গিয়ে এক মাইক্রো বাস ভাড়া করে নিয়ে এল যে কিনা ৪ গুণ বেশি দক্ষিণা নিয়ে আমাদের দেশের বাড়ি পৌছে দেবে৷ কিন্তু ঢাকার যা অবস্থা,নিজেও বেশ কাহিল বেরিয়ে আবার কি চক্করে পড়ি এই ভেবে বেরোতে সাহস পাচ্ছিলাম না৷ কিন্তু মা অপেক্ষা করছে! বসে থেকেই সে রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরবেলায় উঠেই বাড়ির পথে৷ রাস্তা বিদেশী বন্ধুদের সহায়তায় বেগম জিয়া যা বানিয়েছেন, আর মেঘনার ব্রীজ হয়ে যাওয়াতে একশ কিলোমিটার রাস্তা দু ঘন্টায় পার করে বেলা আটটায় মায়ের কাছে৷

বাবা খবরের কাগজ দেখালেন, আগেরদিন দশ কোটি টাকা খরচ করে কাঙালী ভোজন করিয়েছেন বেগম জিয়া স্বামীর মৃত্যুদিবসে৷ যার মধ্যে চার কোটি টাকার গরু আর বাদবাকি ছ'কোটি টাকার চাল এব ংঅন্যান্য দ্রব্যাদি৷কাল ঢাকাতে সকলেরই দাওয়াত ছিল তাই এত যানজট! বেশ, দশ কোটি টাকা বেশ বড় সড় ব্যপার,বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় সেটা আরো আরো বড় ৷ প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতও তো বেশ বড় ব্যপার৷ সব কাগজই ফলাও করে লিখেছে,কত লোক এসেছিল, কত দীর্ঘকালীন যনাজট, বেশ গর্বের ব্যাপার, এমনটা আগে হয়নি৷ জানি না নিজের টাকায়, না চাঁদা তুলে, না জনগনের ট্যক্সের সরকারী টাকায়, না স্পনসরশিপের টাকায় একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী তার প্রয়াত স্বামীর পরকালীন মঙ্গলের জন্য কাঙালী ভোজন করান,কিন্তু এমনটা আগে হয়নি৷ প্রতিটা দৈনিকে শিরোনাম পেয়েছেন, রিপোর্টারা বড় বড় কপি লিখেছে, অনেকগুলো সাইড স্টোরি,চাল নিয়ে, গরু নিয়ে, যানজট নিয়ে, মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঢাকা এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন,"শহীদ জিয়া আমরা তোমায় ভুলিনি ভুলবো না'৷ অবিশ্যি কাগজের স্পেস আনেক দামী সব কথা লেখা যায় না ৷ আর সব কিছুর খোঁজ রাখাও সম্ভব নয়৷ আমাদের ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা আমরা মনে রাখি ব্যক্তিগত কারণেই,খবরের আগে দেখানো স্মৃতিসৌধের মত, আমার অসুস্থ মা ঐদিন সারারাত জেগে অপেক্ষা করেছিলেন মেয়ের জন্যে, আরো একটু অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্যে নয়৷

No comments:

Post a Comment