Monday, September 04, 2006

বিসর্জন জন্ম

ABORTION DIALOGUES
==================


বেশ কিছুকাল আগের কথা।
এক বিশাল হলঘর টিউবলাইটের সাদাটে আলোয় ফ্যাকাসে হয়ে আছে, ঘরের মাঝামাঝি সার সার ঝুলছে কতগুলো সাদাকালো ছবি, শুধু মুখের ছবি। প্রথম দেখে মনে হবে যেন শূন্যে ঝুলছে, ভালো করে দেখলে বোঝা যায় রুপোলি সুতোয় ঝুলছে ছবিগুলো, এক অদ্ভুত অনুভূতি হল ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে, অদ্ভুত এক গা ছমছমে অনুভূতি, বলে বোঝাতে পারব না ঠিক কেমন। সবকটা ছবিতে একটি করে মেয়ের মুখ, কোনও কোনও ছবিতে মেয়েটি পেছন ঘুরে দাড়িয়ে আছে, শুধু তার মাথার চুলের ছবি, একদৃষ্টিতেই মনে হল, পৃথিবীর মুখ দেখতে চায় না বলে সে পেছন ফিরে দাড়িয়ে আছে, কিংবা উল্টোটও হতে পারে, সার সার মুখের ছবি, মাথার ছবি ৷

দেওয়ালের দিকে চোখ পড়তে দেখলাম হাতে লেখা কতগুলো কাগজ সাঁটানো আছে, কাছে গিয়ে পড়ে দেখলাম, বিভিন্ন হাতের লেখায় একটি করে গল্প, অ্যাবরশনের গল্প, ছবির ওই মুখগুলোর গল্প, পুরো দেওয়াল জুড়ে এরকম পঁচিশ-তিরিশটি মেয়ের গল্প, ছবির ওই মুখগুলোর গল্প, তাদেরই হাতের লেখায় তাদেরই গল্প ৷

এই ছবিগুলো যাঁর তোলা তাঁর নাম কোলেট কোপল্যান্ড। আমেরিকার মেয়ে, নিজের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন, ওই ঝুলন্ত ছবিগুলোর একটা ছবির মুখ কোলেটের নিজের৷ কোলেট পনেরো বছর বয়েসে ধর্ষিতা হয়ে গর্ভবতী হন, মা বাবা তাকে নিয়ে যান গর্ভপাত করাতে, গর্ভস্থ সন্তানের সাথে সাথে কোলেট হারান আবার মা হবার ক্ষমতা, কোলেট আর মা হতে পারেননি৷ দেওয়ালে সাঁটানো একটি কাগজে লেখা আছে  কোলেটেরও গল্প ৷

সুতোয় ঝোলানো ওই ছবিগুলো এরকমই সব মেয়ের, যাদের কেউ কেউ ধর্ষণের পর গর্ভপাতের শিকার, কেউ বা নিজের আর্থিক অক্ষমতার জন্যে গর্ভপাত করাতে বাধ্য হন, তো কারও প্রেমিক প্রেম তো করেন কিন্তু সন্তানের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন যার ফলে গর্ভপাত ৷


কোলেট, ছোটখাটো দেখতে মিষ্টি এক মেয়ে, এক অসম্ভব মিষ্টি হাসি তার মুখে সারাক্ষণ, শুধু চোখদুটি ছলছল করে ওঠে যখন সে তার নিজের মা হতে না পারার দুঃখ প্রকাশ করে, গভীর এক বেদনার ছাপ তার নীল চোখে, পনেরো বছর বয়েসে পাওয়া আঘাতকে আজও সে বয়ে বেড়াচ্ছে৷ যে সব মায়েরা নিজের অনিচ্ছা সত্বেও সন্তান বিসর্জন দিয়েছেন জন্ম দেওয়ার আগেই, তেমনই কিছু মায়ের কথা, তাঁদের ছবি নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন কোলেট ৷

ঠিক একই রকম না হলেও অনেকটা একই রকম এখানকার এক মেয়ের গল্প ৷ সুবর্ণা, বাইশ বছর বয়েসে যে দুই সন্তানের মা, তৃতীয়বার সন্তান সম্ভাবনা হয় যখন তার ছোট ছেলের বয়স মাত্র আট মাস, আগের দুই সন্তানেরই জন্ম হয়েছিল সিজারিয়ান অপারেশনে, সুবর্ণা তৃতীয়বার গর্ভবতী হয় তার নিজের স্বামীর দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে
ধর্ষিতা সে নিয়মিতই হত, সেই প্রথম দিনটি থেকেই। সুবর্ণার স্বামীর মত ছিল না গর্ভপাতে, আরও একটি পুত্রের বাসনা ছিল তার, কিন্তু সুবর্ণা নিজের ও দুই সন্তানের কথা ভেবে নিজেই যায় গর্ভপাত করাতে, স্বামীটিও ছিলেন সঙ্গে অবশ্য। শারিরীক কিছু জটিলতা ছিলই, কিছুটা হয়তো ডাক্তারের অসাবধানতাও ছিল, ডাক্তার ব্যর্থ হন, প্রাণসংশয় হয় সুবর্ণার, প্রাণ বাঁচানোর জন্যে আবার অপারেশন হয়, কেটে বাদ দেওয়া হয় সুবর্ণার জরায়ু, তার অজ্ঞাতে। পরে তাকে জানানো হয়, কিছুটা জটিলতা দেখা দেওয়াতে একটা ছোট অপারেশন করতে হয়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসার মাস দুই পরে সুবর্ণা জানতে পারে তার অঙ্গহানির কথা, মানসিক ভারসাম্য হারায় সুবর্ণা৷ সুবর্ণার বয়স তখন বাইশ৷

দীর্ঘকালের চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে সুবর্ণা, হয়তো বেঁচে থাকার প্রবল আকাঙ্খায় কিংবা সন্তানের মায়ায়- ঠিক জানি না। চেতনে অবচেতনে আজও সে বয়ে বেড়ায় সেই কষ্টকে, নিজের স্বামী কতৃক নিয়মিত ধর্ষিতা হওয়ার কষ্ট, গর্ভস্থ সন্তানকে জন্ম দেওয়ার আগেই মেরে ফেলার কষ্ট, নিজের অঙ্গহানির কষ্ট। প্রায়শই স্বপ্নে আসে আসে একটি শিশু, একটা অপারেশনের টেবিল আর নিরন্তর বয়ে যাওয়া এক রক্তের ধারা।

রুহিনা, ছোটবেলা থেকেই মায়ের হাত ধরে কাজ করতে আসত পাশের বড়বাড়িতে, ওই বাড়িতে কাজ করেই সে বড় হয়, একদিন তার বিয়েও হয়ে যায়, কিন্তু ছ'মাসের মাথায়ই সে ফিরে আসে তার মায়ের কাছে, তার বর তাকে ফেলে পালিয়ে যায়। রুহিনা আবার কাজ করতে থাকে এই বড়বাড়িতেই। সেই বাড়ির মেয়ে সুবর্ণা যখন তৃতীয়বারের মতো তার সন্তানসম্ভাবনা বুঝতে পেরে মনে মনে একটি বিশ্বস্ত মানুষের খোজ করে
যার হাতে ছোট ছোট দুটি সন্তানকে রেখে সে হাসপাতালে যাবে তখন তার রুহিনার কথা মনে পড়ে। রুহিনা আসে সুবর্ণার শশুরবাড়িতে। দুজনে প্রায় একই বয়েসী, একসঙ্গেই খেলাধুলো করে বড় হয়েছে, দু'জনে ভাবও খুব। সুবর্ণা দু'মাসের গর্ভস্থ সন্তানকে বিসর্জন দিতে হাসপাতালে যায়। ডাক্তার বলেছিলেন সকালে এসে বিকেলে বাড়ি ফিরে যাবে সুবর্ণা। কিন্ত সুবর্ণার দুর্ভাগ্যেই হোক আর ডাক্তারের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে কোনওরকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা না করে অপারেশন টেবিলে তোলার কারণেই হোক টানা বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হয় সুবর্ণাকে। সপ্তা দুয়েক পরে সুবর্ণা যখন বাড়ি ফিরে আসে, তখনও তার ক্যাথিটার লাগানো, সঙ্গে আসে নার্স। এই পুরো সময়টা সুবর্ণার বাচ্চাদের আর সংসারের দেখাশোনা করে রুহিনা। দিন যায়, মাস যায়, ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে সুবর্ণা। মাস দুই পরে সুবর্ণা বুঝতে পারে রুহিনা সন্তানসম্ভবা ৷ বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর সন্দেহের দোলাচলে দুলতে থাকা সুবর্ণা তার স্বামীকেই বলে, রুহিনার বোধ হয় বাচ্চা হবে! ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন, রুহিনার পেটে তিন মাসের বাচ্চা! 

রুহিনা মুখ বুজে থাকে, সুবর্ণার শশুরবাড়ির লোকেরা সুবর্ণাকে বোঝান, এ তোমার বাপের বাড়ির লোক, কি মুখ দেখাবে বাপের বাড়ি গিয়ে? শশুরবাড়ির বদনাম হবে! আঙুল উঠবে তোমার স্বামী-ভাশুরের দিকে, কাজেই অ্যাবর্শন করিয়ে দাও! সুবর্ণা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না এই সব কথা, ঘটনা। চেপে থাকা, চেপে রাখা অশান্তি এবার প্রকাশ্যে আসে। সর্ব বিষয়ে মুখ বুজে থাকা সুবর্ণা প্রথমবারের মতো চীৎকার করে ঝগড়া করে বরের সঙ্গে। রুহিনাকে নিয়ে সুবর্ণার স্বামী নিজেই হাসপাতালে যায়। অনুগত, বাধ্য মেয়েটির মতো একটিও কথা না বলে গর্ভস্থ সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে আসে রুহিনা। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর রুহিনা রাজকীয় আতিথেয়াতা পায় সুবর্ণার শশুরবাড়ির সবার কাছ থেকে। জোড়া বেনারসি, সোনা-রুপোর গয়না আসে রুহিনার জন্যে। বোঝার কিছু বাকি থাকে না। বোঝার কিছু ছিল না আসলে। সুবর্ণা আবার চুপ করে যায় আগের মতো। রুহিনা কখনোই তাকে বলেনি কে ছিল তার বাচ্চার বাবা, সুবর্ণাও আর জানতে চায়নি। কি হবে জেনে... 

এর পরের ঘটনা আমার জানা নেই, কারণ সুবর্ণার সঙ্গে এর পর আমার আর দেখা হয়নি।


2 comments:

  1. ছবি তুলে দিলাম। ঠিকাছে?

    ReplyDelete
  2. naa raater ondhokaar chabitaa seshe jaabe. disembarTaa phankaa thaakabe.

    ReplyDelete