Monday, September 04, 2006

দ্বীপের মধ্যে দাড়িয়ে


আমাদের গ্রামের বাড়িটা এমন একটা জায়গায় যে বর্ষার জল এলে বাড়িটা একটা দ্বীপের মধ্যে দাড়িয়ে আছে বলে মনে হয় ৷

বাড়ির তিনপাশে জল ৷

যেমন পৃথিবীর চারপাশে থেকেও ভাগের হিসেবে তিনভাগ ৷

সে এক অদ্ভুত সুন্দর ৷

বছরের মোটামুটি চার মাস ঐ জল থাকে ৷

ইউনিয়ন বোর্ডের কাঁচা রাস্তার সাথে যে সাঁকোটি আমাদের বাড়ির যোগসুত্র রক্ষা করে, আমার ছেলেবেলায় সেই সাঁকোটি ছিল না, যদিও সাঁকো অনেকগুলি ছিল সারা ছেলেবেলা জুড়ে ৷

তখন ' সুদিন 'এ  খাল পেরিয়ে রাস্তায় উঠতে হত আর বর্ষায় নৌকো করে সেই খাল পেরুনো ৷ যে বছর বন্যা হয়-
যদিও প্রতিবারই হয়, সে বছর ইউনিয়ন বোর্ডের ঐ রাস্তাটিও ডুবে যেত, তখন প্রায় এক কিলোমিটার মত রাস্তা নৌকোতেই যাওয়া, তারপর বড় রাস্তা৷ সি এন্ড বি'র পাকা সড়ক৷ এশিয়ান হাইওয়ে৷ যত বন্যাই হোক, ঐ রাস্তার বেশ নিচেই থাকত জল ৷

প্রতি সপ্তায় বাবার বাড়ি যাওয়া বাঁধা ছিল, প্রায়শই সঙ্গে থাকতাম আমি, বন্যাই হোক আর বর্ষার জলই জমুক, বাবার বাড়ি যাওয়া আটকাত না আমার ও না ৷

তেমনই এক বন্যার সময়৷আমরা তখন সিলেটে, বাবা বাড়ি এসেছেন সপ্তাহান্তে সাথে আমি আর ভাইয়া৷ ছোটফুপুকে নিয়ে আমরা ফিরে যাব সিলেটে৷ সিলেট থেকে আমাদের গ্রামের দুরত্ব একশ পাঁচ মাইল, সবচেয়ে কাছের রেলষ্টেশনটি গ্রাম থেকে
ঠেরো মাইল দুরে৷ ট্রেন থেকে নেমে আমাদের এক আত্বীয়ের বাড়িতে দুপুরের খাওয়া সারার পর খোঁজ নিয়ে জানা গেল রাস্তা অর্ধেকেরও বেশি জলে ডুবে, কোন গাড়ি চলছে না, নৌকো করে যেতে হবে ঐ আঠেরো মাইল৷ বাবা বেরিয়ে নৌকোর ব্যবস্থা করে এসে আমাদের দুই ভাই-বোনকে নিয়ে নৌকোয় বসলেন৷ গ্রামের ভেতর ভেতর দিয়ে মাঝি নৌকো চালাল, বাবা বারণ করে দিয়েছিলেন বিলের ওপর দিয়ে যেন না যায়, আগাই নামে এক বিল আছে, যাতে ঢেউ থাকে খুব, নৌকোয় উঠেই আমি ঘুম৷ বাবা যখন ডেকে ঘুম ভাঙালেন, তখন বাড়ির ঘাটে নৌকো৷ বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, তখনো  গ্রামে ইলেকট্রিসিটি পৌছয়নি, টিমটিমে হ্যারিকেন বাতি জ্বলে সবার ঘরে ঘরে৷ দাদু বেশ রাগ করলেন বাবার ওপর, এই বন্যায় কেন আমাদের নিয়ে এলেন ৷

মাঝে একদিন থেকে তার পরদিন ফেরা, এবার সাথে ফুপু৷ বাবা আগের দিন গিয়ে নৌকো ঠিক করে এলেন তিতাস থেকে, সেখানে পানসিরা সব অপেক্ষা করে দূরে যাওয়ার জন্য৷ ভোর ভোর উঠে চাচি
ম্মা ভুনা খিচুড়ি আর ভুনা মুর্গী রেঁধে দিল দুপুরে খাওয়ার জন্যে৷ আমি ছোটফুপুকে বললাম, কেন চাচিম্মা রান্না করে দিচ্ছে? তুমি তো যাচ্ছ সাথে, মাঝিরা যেমন নৌকোয় রেঁধে খায়, তেমন করে আমরা কেন খাব না? ফুপু বোঝাল, ওরা নৌকোতেই থাকে তাই রাঁধে, আমরা একবেলার জন্য নৌকোয় রাঁধব? খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে নৌকোয় রেঁধে খাওয়ার বায়না ছাড়তে হয়েছিল কিন্তু পরক্ষণেই আবার খুশি, রান্না হবে না তো কি হয়েছে? খাওয়া তো হবে! ফুপু একটা ঝুড়িতে খাওয়ার জল, থালা, বাটি গেলাস নিয়ে নিল আর টিফিন ক্যারিয়ারে চাচিম্মার দেওয়া খাবার৷ আমরা বেশ পিকনিক পিকনিক মুডে নৌকোয় চাপলাম৷ দাদু বড়কাকাকে বললেন আমাদেরকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসতে৷ দাদু, দাদী, চাচিম্মা ও আর সবাই বেশ চিন্তিত, উদ্বিগ্ন মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বাড়ির ঘাটে ৷ যতদুর দেখা যায় ওরা দাঁড়িয়েই ছিল ৷

আমি আর ভাইয়া ফুপুকে বললাম গল্প শোনাও, ফুপু গল্প শোনাল বেশ কয়েকটা, এরই মাঝে কানে আসছিল মাঝির সাথে বাবা, কাকার কথা-বার্তা৷ নৌকো আগাই বিলের পথ ধরে যাচ্ছিল, আমাদের বিকেলের ট্রেন ধরার কথা৷ আমরা শুধু বাবার কাছে গল্প শুনেছি এই বিলের, বর্ষায় যা নাকি সমুদ্রের চেহারা নেয়৷ প্রতি বছরই বেশ কিছু নৌকাডুবি হয়, বাতাস ছিল না সেদিন, আকাশের কোথাও মেঘের কোন চিহ্ন ও ছিল না, তবু বাবা বেশ চিন্তিত মুখে বসেছিল ৷ আমরা ছই এর ভেতরে মাঝিদের পেতে দেওয়া বিছানায় শুয়ে বসে গল্প করছিলাম, হাল্কা ঢেউএর দুলুনি বেশ সুন্দর এক আমেজ তৈরি করেছে৷ বাইরে তাকালে দূর দূর পর্যন্ত কোথাও কোন গ্রাম কিংবা গাছপালার চিহ্ন ও চোখে পড়ছে না, মাঝি জানান দিল আগাইয়ের কাছে এসে পড়েছি, আপনারা খাওয়া দাওয়া সেরে নিন তার আগে৷ মাঝি এ ও জানান দিল বেশ হাওয়া উঠেছে ৷ ততক্ষণে বাবার মুখ থমথমে হয়ে উঠছে ৷

আমরা ও চুপ করে গেছি, ঢেউ এর দুলুনি বাড়ছে, এতক্ষণে ভয় করতে শুরু করল, নৌকোতে পাল ছিল, বাবা মাঝিকে বলল পাল নামিয়ে দিতে, নৌকো যত এগুচ্ছে, ঢেউ তত বাড়ছে, আকাশ তখনও পরিষ্কার কিন্তু জোর হবাতাস! , প্রচন্ড ঢেউয়ে নৌকো ততক্ষণে একটা খেলনা ৷ ফুপু সজোরে দরুদ পড়ছে, কাকা ভেতরে এসে আমাকে কোলে নিয়ে বসেছে, কারণ আমি কান্না আরম্ভ করেছি, ভাইয়া
ফুপুকে জড়িয়ে ধরে ফুপুর কোলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে ৷

আমাদের যেদিকে যাওয়ার কথা, ঢেউটা আসছিল সেদিক থেকেই, যে কোন মুহুর্তে নৌকো উল্টানোর সম্ভাবনা ৷ বাবা মাঝিকে বলল, উল্টোদিকে নৌকো ঘুরিয়ে দিতে, মাঝি তখনও বলছে, তাহলে আজকে আর পৌছুতে পারবেন না, বাবা চেঁচিয়ে উঠে বলল বচ্চাদুটো আছে সাথে, তুমি নাউ ঘোরাও ৷ বাবা গিয়ে হাল ধরে বসল, আর প্রাণপণে সেই হাল ধরে বসে রইল ৷ দুই ঘন্টা ধরে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ চলল, আমরা ভেতরে মৃতবৎ৷ অনেকক্ষণ নাকি অনন্তকাল পর শুধু অনুভব করলাম ঢেউয়ের ঐ উন্মাদনা একটু যেন কমল ৷ মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম, জল একটু শান্ত, আর এই দুঘন্টায় বাবা এই প্রথম কথা বলল, এমু, আমরা আগাই পার করে এসেছি, আর কাঁদে না ৷

দূরে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে, বাবাও জানে না যে ঐ বাতাস আর ঢেউ আমাদের নৌকোকে কোথায় নিয়ে এসেছে, মাঝিকে জিজ্ঞেস করে বাবা জানল, যে গ্রামটি দেখা যাচ্ছে তার নাম নর্‌হা৷ কাকা বলল এখানে আমাদের এক আত্মীয় বাড়ি আছে, সেখানে যাওয়া যেতে পারে ৷

দুজন মাঝি আর বাবার জামা কাপড় কিছুই শুকনো ছিল না, ফুপু তোয়ালে বের করে দিল বাবাকে, বাবা বলল, আগে নামি তারপর ৷ হাঁটুজলে নেমে বাবা একে একে আমাকে আর ভাইয়াকে কোলে করে নামাল ৷ ফুপু নিজেই নামল কাপড় ভিজিয়ে ৷

যে বাড়িটিতে আমরা গেলাম, সেটা কাকিমার এক দিদির বাড়ি, তারা আমাদেরকে দেখে ভীষণ অবাক, বাবা এই বাড়ির বড়দের কাছে আর একপ্রস্থ বকুনি খেল কেন এই ভরা বর্ষায় ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরুল আর সাথে সাথেই বাবা প্রচুর বাহবা ও পেল, ঐ বাতাস আর ঢেউ এর মাঝে নৌকো বাঁচিয়ে তীরে নিয়ে এসেছে বলে, মাঝিরা তো পরিষ্কার বলে দিল,  আজ সাহেব হাল না ধরলে তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না নাউ নিয়ে বেঁচে ফেরার ৷

ঐ বাড়িতে খানিক বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার বেরুলাম, গৃহকর্তা অনুরোধ করছিলেন আমরা যেন রাতটা থেকে পরদিন রওয়ানা হই৷বিকেলের ট্রেন ততক্ষণে চলে গেছে, উল্টোদিকে এসে পড়ার দরুন এখন বেশ অনেকটা পথ আবার নৌকোয় গিয়ে রাতের মেল ট্রেন ধরে সিলেট পৌছুতে পরদিন সকাল হবে ৷ তাই আর দেরী না করে আমরা আবার নৌকোয়৷ এবার আর নৌকোয় চাপতে চাইছিলাম না, বাবা বুঝিয়ে শুনিয়ে কোলে করে নৌকোয় তুলল ৷

  ভাইয়া তখন বাহাদুরি দেখাচ্ছে সে একটুও ভয় পায়নি এই বলে, ফুপু ও বলছে, সেও নাকি ভয় পায়নি কিন্তু আমি কান্নার ফাঁকে ঠিক দেখেছিলাম ফুপুও কাঁদছে ৷ সন্ধ্যে হয়ে গেল ষ্টেশনে পৌছুতে পৌছুতে ৷ ট্রেন আসবে রাত এগারটায়, ওয়েটিং রুমের বেঞ্চেবাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ঘুমচোখে আমি, পরের বার বাবা বাড়ি আসার সময় আমাকে সাথে করে নিয়ে আসবে কিনা মাথায় সেই চিন্তা ৷ কারণ বাবা দু বার বকুনি খেয়েছে আমাদের সাথে নিয়ে এসেছে বলে ৷ কানে কানে ফুপুকে জিজ্ঞেসও করে ফেললাম কথাটা৷ ফুপু তখন বলল, অত ঘাবড়াস না ৷ ঠিক নিয়ে আসবে তোকে ৷ নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়েই ঘুম ৷

ট্রেন কখন এসেছে, কখন বাবা কোলে করে ট্রেনে তুলে সিটে শুইয়ে দিয়েছে, কখন কাকা চলে গেছে কিছুই জানতে পারিনি৷ ঘুম ভেঙেছে সকালে বাবা যখন ডেকে তুলেছে, ট্রেন তখন সিলেট ষ্টেশনে ঢুকছে ৷

1 comment: