Sunday, September 10, 2006

যা হারিয়ে যায়

যা হারিয়ে গেছে? বরং বলতে পারি সবই হারিয়ে গেছে৷ সব, সব কটা বই, ছেলেবেলা, ছেলেবেলা থেকে জমানো সমস্ত কিছু, বই আমার৷ হারিয়ে গেছে৷ কি যে ছিল আর কি ছিল না, হারিয়েছে সেই স্মৃতিও৷ হারিয়েছে প্রায় সব নাম৷ চরিত্র৷
পড়তাম দস্যু বনহুর সিরিজের বই৷ সুদর্শন সুপুরুষ বনহুর৷ যাকে দস্যু বলে কেউ বুঝতেই পারতনা৷ থাকে সে কান্দাইয়ের জঙ্গলে৷ অসংখ্য ঘোড়া তার আস্তাবলে৷ রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে সে শহরে আসে তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে৷ তার সেই প্রেমিকার নামও হারিয়েছে৷ মাকে লুকিয়ে পড়তে হত সে সব বই৷ মা একবার দেখল কি বাজেয়াপ্ত৷ হারিয়েছে সব কটি বনহুর৷ বনহুরের বই প্রথম হাতে আসে দাদার মারফত৷ প্রথম বইটি সে পায় তার কোন এক বন্ধুর কাছ থেকে, আর তারপরের বইটি সে কিনে আনে৷ আমি তখন বেশ ছোট, বই কেনার মত বড় হইনি তখনও কিন্তু পড়া শুরু হয়ে গেছে দাদার কল্যাণে৷ অপেক্ষা করে থাকতাম কখন তার পড়া হলে আমি হাতে পাব বইটি৷ আর বইয়ের জন্য দাদাকে বেশ খোসামোদি করতে হত৷ পড়া হয়ে গেলেই সে বইয়ের আর কোন মুল্য থাকেনা তার কাছে, কিন্তু যেই আমি পড়ব বলে নিতাম অমনি হয়ে যেত সেই বইটা মহামুল্যবান৷ কোন কারণে তার রাগ হলেই কেড়ে নিত সে বইটি৷ আর সেই রাগ তার হরবখতই হত৷

কুয়াশা, যে ছিল এক গোয়েন্দা৷ দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াত সে৷ রাতের অন্ধকারে কালো আলখাল্লা পরে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের কাজ করত সে৷ সমাধান করত নানা সমস্যার৷ সেই বয়সে বেশ হিরো হিরো একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল৷ পেপার ব্যাক এর পাতলা পাতলা বই৷ একশর উপর বই ছিল কুয়াশা সিরিজের৷ সব কটা তো ছিলনা, তবে ছিল বেশ কিছু৷ হারিয়েছে সব৷ তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি৷ স্কুলের লাইব্রেরী থেকে এনে পড়ি আমলকীর মৌ, স্তব্ধতার কানে কানে৷ দিলারা হাশেমের বই৷ বই দেওয়ার আগে লাইব্রেরী স্যার জানতে চাইতেন অত মোটা বই নিয়ে তো যাচ্ছ, পড়বে তো? স্যারকে অনুরোধ করতাম যেন দুটি বই দেন, কিন্তু একটির বেশি বই পেতাম না হাতে৷ লাইব্রেরী ক্লাসে যাওয়া ছিল বাধ্যতামুলক৷ ক্লাসের অনেক মেয়েই ছিল যাদের অনিচ্ছা সত্বেও যেতে হত, সেরকমই দুটি মেয়ে ছিল আমার বন্ধু, তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল তারা বই নিয়ে আমায় দিয়ে দেবে৷ এভাবে একদিনে তিনটি বই পেয়ে যেতাম৷ এক সপ্তাহের জন্য৷ বাড়ি ফিরে সেদিন আর খেলতে না গিয়ে সেই বই নিয়ে সোজা পড়ার টেবিলে৷ উপরে পড়ার বই নিচে গল্পের বই৷ এই চালাকিটুকু করতে হত মায়ের জন্য৷

আমলকীর মৌ বইটি আমি পরে কিনেছিলাম৷ ঐ সময়টাতে আমি এমন সব আত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে বেশি যেতাম যাদের বাড়িতে বই আছে৷ একবার বই আনা আবার ফেরত দেওয়া৷ প্রায় প্রতিবারই একটা করে বই রেখে দিতাম৷ পরে খোঁজ হলে অবশ্য ফেরত দিতে হত৷ সে বড় দু:খের ব্যাপার হত৷ ঈদ সংখ্যা বিচিত্রায় প্রকাশিত উপন্যাস মিউরাল এর শুধু নামটুকুই আছে৷ হারিয়েছে গল্প,চরিত্ররা৷ ইমদাদুল হক মিলনের হে প্রেম৷ চরিত্রের নাম চেষ্টা করেও মনে পড়ছেনা৷ তখন, সেই ৮০ সালে বেশ অভিনব ষ্টাইলে লেখা হে প্রেম মুগ্ধ করেছিল৷ হারিয়েছে সেটি এবংপরপর কিনে ফেলা মিলনের সবকটি বই৷

সাপ্তাহিক বিচিত্রা৷ প্রতিটি সংখ্যা কি যত্নে জমিয়ে রাখতাম৷ ঈদের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল ঈদসংখ্যাগুলো৷ জন্মদিনে পাওয়া রুশদেশের উপকথা৷ ইভানের ছেলেবেলা৷ কাকার কাছ থেকে পেয়েছিলাম শেষের কবিতা৷ রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের সবকটি খন্ড৷ শরত্ রচনাবলী৷ হারিয়েছে সব৷ তিনগুণ বেশি দাম দিয়ে কেনা সব পুজোসংখ্যা৷ ভারতীয় লেখকদের লেখা বইয়ের আকর্ষণ ছিল অন্যরকম৷ বেশি দাম দিয়ে কিনতে হত বলে বেশ অনেকদিন ধরে টাকা জমাতে হত আর তারপরে রাত জেগে সে বই পড়া৷ বিয়ের পরে বরের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম উপহার,বই৷ উত্তরাধিকার, সোনার হরিণ নেই, বাবলি৷ সেই প্রথম পড়ি বুদ্ধদেব গুহর লেখা৷ তারপর পরপর পড়েছি তার বেশ কিছু বই৷ ওর লেখা বেশ খানিকটা যেন মেলে আমাদের সেলিনা হোসেনের লেখার সাথে৷ উল্টোটাও হতে পারে৷ বইয়ের নাম,চরিত্রের নাম,গল্প কিছুই ঠিকঠাক মনে নেই তাই সঠিকভাবে বলতে পারছি না৷

ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কাকিমার বাপের বাড়ি থেকে এনেছিলাম অশনী সংকেত৷ বইটি পড়ে এমন মনে হচ্ছিল যেন আমিও আছি এক দুর্ভিক্ষের দেশে৷ খাবার দেখে ভেবেছি, খাবার? কোথা থেকে এলো? দুর্ভিক্ষ চলছেনা! পিসির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পেয়েছিলাম "এক রমনীর যুদ্ধ'৷ পিসতুতো ভাইয়ের ছিল সেটি৷ পড়ব বলে চেয়ে এনে আর ফেরত দেওয়া হয়নি৷

প্রথমবার কলেজ স্ট্রিট যাই বাংলাদেশ থেকে আসা এক আত্মীয়ের সাথে৷ তাদের কিছু বই কেনার ছিল,রঙ কেনার ছিল৷ মনে আছে আমার সেদিন, সারাটা দিন আমার কেটেছে ঐ বইপাড়ায়৷ এ দোকান, ও দোকান ঘুরে ঘুরে৷ বই দেখে৷ নতুন বই৷ পুরনো বই৷ বেশ কিছু বই কিনেছিলাম৷ বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা৷ মেয়ে তখন ছোট, তাকে তার জ্যাঠিমার কাছে রেখে সারাদিন বই দেখে বেড়ানো৷ হারিয়েছি সেই বই এমনকি বইয়ের নামও৷হারিয়েছে বিয়ের পরে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সব চিঠিপত্র৷ সেগুলো রাখা ছিল একটা বন্ধ আলমারীতে অন্য বেশ কিছু দরকারী কাগজ-পত্রের সাথে৷ বেশ কিছুদিন পর পরিষ্কার করার জন্যে আলমারী খুলতে দেখা গেল উইয়ে খেয়েছে ভেতরকার যাবতীয় কাগজ৷ চিঠি কি কেবলই চিঠি৷ চিঠি যায়, সঙ্গে নিয়ে যায় আরো অনেক কিছু৷

ধীরে ধীরে বই পড়া কমতে লাগল সময়ের সাথে সাথে৷ বাড়ি যখন যেতাম, প্রায় সব বই'ই নিয়ে যেতাম সাথে করে৷ রেখে আসতাম আমার অন্য সব বইয়ের সাথে৷ একটা সময় এমন এলো আমার পড়া বলতে শুধুই খবরের কাগজ৷ দেশে আলমারীতে সাজানো আমার সব বই,ম্যাগাজিন৷ বহু বছর তারা ছিল আমার অনুপস্থিতি সত্বেও৷ এখন আর নেই৷ প্রায় চার বছর বিবিধ কারণে দেশে যাওয়া হয়নি, যখন গেলাম, গিয়ে দেখি সবকিছুই তেমনি আছে নেই শুধু আমার বই৷ যে আলমারীতে আমার বই থাকত এখন সেখানে বিভিন্ন জিনিসপত্র৷

1 comment:

  1. Arijit Kumar9:35 AM

    Mon Kharap kora lekha.... jiboner kichhu kichhu mahamulabyan jinis je kibhabe ektu ektu kore, nijeder ajantei hariye jai....tar protichhobi....tar janne ektu khani chokh jhapsa hoye asa.. jamar khnute chosma muchhte giye ektukhani udas hoye jaoa....tarpor...tarpor...abar e muhurto ta bhule ..punor-mushiko-bhabo hoa...

    ReplyDelete