Monday, September 04, 2006

'কাঁটাতার'


বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায়ের সিনেমা 'কাঁটাতার'৷ সিনেমাটি দেখে এসে অব্দি মাথায় ঘুরছে, হাওয়া অফিস৷ সুধা৷ রেহানা ৷ পিরানী ৷ একদিনে তিনটি জীবনের কাহিনী৷ কাঁটাতার৷ বেড়া৷ আর বেড়া ডিঙানোর গল্পো তো নতুন নয়৷ নদী, শাখা বিস্তারের ডালপালা তাদের কাছে এই অতিক্রম কত অনায়েস আর প্রাচীন৷ এক ভূখন্ডকে ভাগ করে কে দুই দেশ বানায়? মাথার উপরে একই আকাশ ৷ পায়ের তলার মাটিও এক ৷ মাঝখানে কাঁটাতার ৷ দুপাশে দুই দেশ৷ কাঁটাতার পেরিয়ে ওপারের মানুষ এপারে আসে, এপারের মানুষ ওপারে যায়৷ জীবিকার সন্ধানে ৷ নামের সন্ধানে ৷ পরিচয়ের সন্ধানে ৷ আশ্রয়ের সন্ধানে ৷

গ্রামের একপাশে নদী৷ সেখানে এক হাওয়া অফিস ৷ অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য ৷ তার উপর যেন অপারেশনের দাগের মত পড়ে আছে কয়েক ছড়া কাঁটা তার ৷ কত কষ্টে এই জীবনযাপন সীমান্তবর্তী পটাশপুরের৷ গাছেরা সব দাঁড়িয়ে বুকজলে ৷ চলাচলের রাস্তাটি যেন সরু সিঁথিটির মত পড়ে থাকে প্লাবনের জলে ৷ হাওয়ার দিক নির্ণয়ের কাজ করে বিনোদ ৷ আছে এক সহকারী ৷ যে বেলুনে গ্যাস ভরে আর উড়িয়ে দেয় আকাশে ৷ বিনোদ কাগজে লিখে দেয় সেদিনকার বাতাসের গতিবেগ, ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস ৷ সহকারীটি সেই কাগজ নিয়ে পোষ্ট অফিসে গিয়ে টেলিগ্রাম করে আসে শহরে ৷ আসা যাওয়ার পথে সে দেখে জীবন ৷কোর্ট ৷ সেখানে ঠিকানা বিহীন ছিন্নমূল নারী অনুনয় করে উকিলবাবুকে ৷ উকিলবাবু উচ্চমূল্যে তাকে পরামর্শ দান করেন, সে যেন আগে নাম ঠিকানা যোগাড় করে আনে৷ ধর্ম ও ৷ রোকসানা খাতুনের বদলে কোন হিন্দু নাম ৷ যাতে করে রীশন কার্ড বানানো সহজ হবে ৷ ভোটের ছবি তোলা যাবে৷ ওগুলো ছাড়া করে প্রমাণ হবে সে কে ? ঝড় ওঠে ৷ তামাম পৃথিবীর দস্তাবেজ উড়ে বেড়ায় কোর্ট চত্ত্বরে ৷ মুহুর্তের ঝড়ে সব একাকার ৷

গ্রামের রাস্তায় মিলিটারি ট্রাকের কনভয় চলাচল করতে থাকে ৷ ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা চাই ৷ পাথর ফাটিয়ে, বোল্ডার ভেঙে কর্কশ শব্দে তৈরী হতে থাকে রাস্তা ৷ এক প্রবীন গ্রামবাসী তার অতি পূরাতন বন্দুকটির লাইসেন্স নবীকরণের জন্যে একের পর এক চিঠি লিখিয়ে যান পোষ্ট অফিসের সামনের টাইপিষ্টকে দিয়ে ৷ টাইপিষ্ট বিরক্ত ৷ কত চিঠি সে টাইপ করবে? কিন্তু বন্দুকের মালিকটি বিরক্ত নন৷ তিনি কি পারিশ্রমিক দেন না? সব পুষিয়ে দেবেন তিনি ৷তার কাছে বরং কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা অনেক জরুরী হয়ে পড়েছে ৷ তিনি একের পর এক চিঠি টাইপ করিয়ে যান বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ৷ অক্লান্ত ৷

হাওয়া অফিসের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে একদিন এসে হাজির হয় সুধা ৷ রান্না করে দেয় বিনোদ ও তার সহকারীর জন্যে ৷ সহকারীটি ভয় পায়, রান্নার লোক রাখলে তো মাইনে দিতে হবে ৷ তারা মাইনে কোথা থেকে দেবে? সুধা মাইনে চায়না ৷ সুধা সুন্দরী ৷ যৌবনবতী৷ বিনোদ ক্রমশ জড়িয়ে যেতে থাকে সুধার সাথে শরীরী সম্পর্কে৷ সুধা নিশ্চিন্ত হয় ৷ সে গল্প করে, তার তিনটি জীবন ৷ সকালে একটি,দুপুরে একটি আর রাতে আরেকটি ৷ ধর্মও তাই ৷নদীর পারে বিনোদ হাওয়ার গতি দেখে যন্ত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে৷ সহকারী বেলুন ওড়ায় ৷ বিনোদ কাগজে লিখে দেয় হাওয়ার গতিবেগ ৷ সহকারী সাইকেলে চেপে গ্রামে যায় ৷ পোষ্ট অফিস, কোর্টচত্তর ঘুরে আসে৷ সেখানে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে মাঝে মাঝে কিছু উপরি মেলে তার ৷ বোরখাপরা এক মহিলাকে কোমরে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে আসে পুলিশ৷ তার কোলে শিশু৷ সে নাকি দেশের গোপন খবর পাচার করে কাঁটাতারের ওপারে ৷ প্রশ্ন জাগে মনে, ঐ শিশুটির কি হবে? সে কি করে জেলে থাকবে ?

ট্রাকে চেপে গণিকারা আসে গ্রামে৷ গ্রামে যে মিলিটারি এসেছে৷ তাদের শরীরের ক্ষিদে মেটাতে হলে যে মেয়ে চাই ৷ এত মেয়ে আসবে কোথা থেকে? হাস্যে লাস্যে শরীর প্রদর্শন করতে করতে গ্রামে ঢোকে গণিকারা ৷ হৈ চৈ এলাকা জুড়ে, সরগরম কোর্টরুম চত্ত্বর ৷ বোল্ডার - মেশিন এখন আরও দ্রুত চলে ৷ প্রবীন সেই গ্রামবাসী এবার টাইপিষ্টকে নিয়ে আসেন নদীতীরে ৷ যেখানে বসে নিশ্চিন্তে চিঠি লেখানো যাবে কখনো প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তো কখনো অর্থমন্ত্রীকে৷ টাইপিষ্ট যেহেতু টাকা পায় তাই অনিচ্ছা সত্বেও বসে বসে সকাল হতে সন্ধ্যে অব্দি চিঠি টাইপ করে৷ বিনোদ আর সুধার শরীরী প্রেম দেখে চঞ্চল হয় সহকারীটি ৷ রাতে সে যায় গণিকালয়ে৷ টাকার বিনিময়ে সে নারীসঙ্গ কিনতে যায়৷ কিন্তু মিলিটারি এসে পড়ায় তাকে ফিরে আসতে হয় ৷ রাতের অন্ধকারে মিলিটারি হানা দেয় গ্রামে ঘরে ৷ মেয়েরা দৌড়োয় সম্ভ্রম বাঁচাতে৷ পালিয়ে বাঁচতে চায় মিলিটারির হাত থেকে৷ বুটের শব্দে রাতের নিস্থব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে মিলিটারি তাড়া করে গ্রামের মেয়ে-বৌদেরকে৷ প্রবীন গ্রামবাসিটি তার অকেজো বন্দুক তাক করেন তার ঘুমন্ত বৌর মাথায় ৷ হানাদারের কবলে পড়ার আগে তিনি নিজেই মেরে ফেলতে চান বৌকে৷ কিন্তু বন্দুক যে অকেজো ৷ জং ধরানো ৷ আওয়াজ করে কিন্তু গুলি বেরোয়না ৷

উকিলবাবু হাওয়া অফিসে আসেন বিনোদের সহকারীকে ডাকার জন্যে, তাকে দিয়ে কোর্টে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়াবেন তিনি ৷ সুধাকে দেখে তিনি চিনতে পারেন ৷ জিজ্ঞাসা করেন বিনোদ কোথায়? বিনোদকে না পেয়ে তিনি তার সহকারীকে বলে যান, ও সুধা নয়, ও রেহানা ৷ ও পিরানী ৷ ওর যতগুলো নাম ততগুলো ধর্ম ৷ ভীত, সন্ত্রস্ত সুধা বিনোদকে শোনায় তার তিনটি জীবনের গল্প ৷ এর পরের অংশ ফ্ল্যাশব্যাক ৷ কিন্তু বাপ্পাদিত্য কি দেখাবেন, সহস্র যুগের প্রেম ভালোভাসার দর্পণ? কাঁটাতার তো তার জন্যে নয় ৷ ছিল সে পিরানী ৷ ক্ষিদে, অভাব তাকে নিয়ে যায় কোলিয়ারীতে ৷ ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন পুরুষের লালসার আঁচ পাওয়া পিরানী কোলিয়ারীতে কাজ করতে এসেই নজরে পড়ে ঠিকাদারের৷ ঠিকাদার স্বপ্ন দেখায়৷ ঘর বাঁধার৷ নিজের ঘরনী ও তিন সন্তানকে ফেলে ঠিকাদার পিরানীকে নিয়ে পালায় ৷ এক পরিত্যাক্ত প্রাসাদের এক অংশে পিরানী তার গেরস্থালী সাজায় ৷ ডগমগ পিরানী মহানন্দে বৃষ্টিতে ভেজে ছাদবিহীন সেই ঘরে ৷ একদিন সেখানে আসে মজিদ৷ মতিবিবির খোঁজে৷ পিরানী জানায় মতিবিবিরা এখানে নেই, চলে গেছে অন্য কোথাও৷ মজিদ টাকার বিনিময়ে একটি কাগজে মোড়ানো প্যাকেট রাখতে দেয় পিরানীকে৷ অভাবের সংসার চালাতে গিয়ে ইতিমধ্যেই ঠিকাদারের সাথে মনোমালিন্যে ব্যাতিব্যস্ত পিরানী টাকার লোভে মজিদের চোরাচালানের সঙ্গী হয়ে পড়ে৷ ঠিকাদার যখন বাড়িতে থাকেনা তখন আসে মজিদ৷ নিজের কথা বলে৷ প্যাকেট রাখে, নিয়ে যায়৷ পিরানী টাকা পায় ৷ এভাবে বেশিদিন চললনা৷ পিরানী ধরা পড়ে যায় ঠিকাদারের হাতে৷ পিরানী পালায় তার পুঁটুলিটি হাতে করে৷ মজিদ তাকে সাথে করে নিয়ে যায়৷ সেও পিরানীর যৌবনে আকৃষ্ট ছিল ৷ পিরানী নতুন নাম পায় ৷ রেহানা ৷ সে এখন রেহানা৷ এক বোরখা পরা মুসলিম নারী ৷ মজিদ আর রেহানা দুজনে একসাথে কাজ করে৷ কাঁটাতারের ওপার থেকে প্যাকেট নিয়ে আসে ৷ নিয়ে আসে বিদেশী টাকা ৷ চড়াদামে বিক্রি কিরে এপারে ৷ একদিন ধরা পড়ে যায় মজিদ৷ বন্দি হয় জেলে ৷ রেহানা বহু চেষ্টা করেও মজিদকে ছাড়াতে পারেনা জেল থেকে, যদিও মজিদ রেহানাকে আগেই বলেছিল, কোন জেলেই নাকি তাকে দু/তিন দিনের বেশি থাকতে হয়না ৷ জামিন পেয়ে যায় ৷ কিন্তু এবারে আর জামিন পেলনা ৷ কারন মজিদের কেস কোর্টেই তুললনা থানার দারোগা ৷ সে টাকা খেল, রেহানার যৌবন খেল, কিন্তু মজিদকে ছাড়লনা ৷ একদিন মজিদকে কোথাও চালান করে দেওয়া হল কিন্তু থানার খাতায় মজিদের নাম এন্টি হ্লনা ৷ রেহানা আবার পথে ৷ আবার সে নিরাশ্রয় ৷ পথ চলতে গিয়ে সে বহু পুরুষের লালসার শিকার হল৷ কারও সাথে সে গেল, কারও সাথে গেলনা ৷ হাঁটতে হাঁটতে সে পৌছুলো নদীর ধারের ঐ হাওয়া অফিসে৷

এবার সে সুধা ৷ লাল শাড়ি কুঁচিয়ে পরা ৷ দু হাতে কাঁচের চুড়ি ৷ বিহ্বল বিনোদ সুধাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়৷ সুধা রাজী হয়না ৷ সেখানে যে রেহানা এসে পড়বে ৷ সুধার অতীত ৷ বিনোদ সুধাকে অনুরোধ করে সে যেন না যায় ৷ পরদিন সকালে মিলিটারি জিপ এসে দাঁড়ায় হাওয়া অফিসের পাশে ৷ উর্দিপরা একটি লোক এসে জিজ্ঞাসা করে ছড়ি উঁচিয়ে, এই মেয়েটি কে? বিনোদ জবাব দেয়, ও সুধা ৷ তাবুর ভেতর তল্লাশী চালিয়ে পাওয়া যায় একতাড়া বিদেশী টাকা৷ মিলিটারিরা নিশ্চিন্ত হয়, তাদের পাওয়া খবর সঠিক ছিল ৷ সুধাকে জিপে বসিয়ে নিয়ে যায় তারা ৷ যথারীতি বেলুন ওড়ে আকাশে, বিনোদের ইচ্ছের বাইরে ঘটে আবহাওয়ার সুক্ষ পরিবর্তন ৷

বোরখা পরা একটি মেয়ে হেঁটে আসে কাঁটাতারের ওপার হতে ৷ কাঁটাতার পেরিয়ে সে এপারে আসবে নাম,ঠিকানা ও কাজের সন্ধানে ৷ এখানে কি শেষ হয় সিনেমাটা? খুব ভাল লেগেছে আবহ সঙ্গীত ৷ যতবার সুধা,রেহানা, পিরানী এসেছে, গেছে কোথাও, মৃদু লয়ে বেজেছে, কোন বা দ্যাশে শে যাও গো কন্যা, কোন বাতাসে যাও ৷ যতবার পিরানী, রেহানা, সুধা কোন পুরুষের কাছে আশ্রয়ের জন্যে গেছে ততবার বেজেছে, চাঁদবরনী কন্যারে তোমরা গোসল করাও রে ...৷ 'গোসল' একটা মানুষকে তিনবার দেওয়ানো হয় ৷ একবার জন্মের পর ৷ একবার বিয়ের সময় ৷ আর একবার মৃত্যুর পর ৷ অভিজিত বসুর কথা ও সুর মনকে ভারী করে তোলে ৷ গোটা সিনেমায় আশ্চর্য সুন্দর সব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায় ৷ খুব ভাল লেগেছে প্রবীন সেই গ্রামবাসীর চরিত্রে প্রদীপবাবুর অভিনয় ৷ অসাধারণ অভিনয় করেছেন রুদ্রনীল ৷ সহকারীর ভূমিকায় ৷ শ্রীলেখা পারফেক্ট ৷ পিরানীর রূপ-যৌবন যথার্থ ফুটে উঠেছে শ্রীলেখার মাঝে ৷ উকিলবাবুর চরিত্রে নিমাই ঘোষ এককথায় অসাধারণ ৷ 'কাঁটাতার' শুধু হলে বসে সোয়া দু ঘন্টায় দেখেই শেষ হয়ে যায়না ৷ আর এখানেই বাপ্পাদিত্যবাবুর কৃতিত্ব ৷ তার সিনেমা ভাবতে বাধ্য করে ৷ ভাবায়৷

1 comment: