Sunday, June 25, 2006

আ মা র পি ছু ছা ড়ে না



বেড়ালদের আমি কক্ষণও বিশ্বাস করি না, ওরা হচ্ছে সব ভূতের বাহন৷ কোনটা যে বেড়াল আর কোনটা যে ভূত চেনার তো কোন উপায় নেই তাই সব বেড়ালই থাকত আমার সন্দেহের তালিকায়৷ আর সেই বেড়াল যদি কোনক্রমে একবার পায়ের তলা দিয়ে চলে যেতে পারে তাহলে মৃত্যু অনিবার্য৷ মৃত্যু যে কি করে হবে আর কখন হবে তা কেউ টেরটিও পাবে না৷ এই তো কিছুদিন আগেকার কথা , বাবার এক বন্ধুকে বিড়ালবেশী ভূত মেরেই ফেলল৷ একেবারে গলার নলী খামচে ছিঁড়ে নিল৷ আর সেই তারেকচাচা কিছুই করতে পারল না৷ পারবে কি করে? ভূত জীনদের সাথে কেউ কখনো পারে? হামদু চাচি- আমাদের হামিদ চচার বউ এসেছিল ছোটকাকার বিয়ের সময়৷ সে শিখিয়ে দিল যখনই মনে হবে ভূত আশে পাশে আছে তখনই মন্ত্রটা পড়তে হয়৷ তাহলেই নাকি ভুতেরা জেনে যাবে যে এর কাছে তো মহামন্ত্র আছে, এর কোন ক্ষতি করা যাবে না৷
ভুত আমার পুত
পেত্নি আমার ঝি৷
শাকচুন্নি সখি আমার
করবি আমার কি?

তাই আমি কোন বিড়ালকে আমার পয়ের তলা দিয়ে যাওয়ার কোন চান্স দিই না৷ খেতে বসলে দুটো পা'ই চেয়ারের উপর তুলে পা ভাঁজ করে বসি৷ কিন্তু বেড়ালও তো আমার পিছু ছাড়ে না৷ সুযোগ পেলেই কটকট করে তাকিয়ে থাকে৷ জানান দেয় যে ওরা আমার মতলব সব বুঝতে পারছে৷ ছোটবেলা থেকেই বেশ ভীতু আমি৷ সমবয়েসী বন্ধুদের বলা বিভিন্ন টুকরো টুকরো ঘটনা, রাত্রির অন্ধকারে মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ কদম গাছ, রাতের অন্ধকার, কাজের বুয়াদের বলা সত্য-মিথ্যে সব গল্প আমাকে চিরকালীন ভীতু বানিয়ে দিয়েছে৷

সেদিন অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল কাক ভিজে হয়ে বাড়ি ফিরে দেখি মা ঘুমাচ্ছে৷ বারান্দা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম দোতলার টিনের চাল বেয়ে জলপ্রপাতের মত গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি৷ মা ঘুমাচ্ছে কি না আরেকবার ভাল করে দেখে নিয়ে আমি সেই প্রপাতের তলায়৷ বাড়ির পেছনটা এমনিতেই বেশ নোংরা৷ পেছনের এই উঠোনটা বেশ বড় হলেও আবর্জনা ফেলা ছাড়া আর কোন কাজে লাগে না৷ যেখানে দাঁড়িয়ে আমি ঐ জলপ্রপাতের জলে স্নান করছি তার ঠিক পাশেই খোলা সরু ড্রেন৷ এর আগেও এই ড্রেনে পা হড়কে পড়েছি বলে জানি থকথকে ঘন নোংরা জল জমে আছে ওতে যাতে আমার হাঁটু অব্দি দুবে যায়৷ এখন এই তুমুল বৃষ্টিতে যা এক চওড়া নালার রূপ নিয়েছে৷


তাই তাই তাই
মামার বাড়ি যাই
মামি দিল দুধভাত
পেট ভরে খাই
মামা আইল গদা লইয়া
পলাই পলাই৷
কখন যে দোতলার রেলিংএর কার্ণিশে এসে দাড়িয়েছে এক অচেনা বেড়াল খেয়ালই করিনি৷ চোখ পড়া মাত্রই আমি বৃষ্টি জলপ্রপাত স্নান সব ভুলে ষ্ট্যাচু৷ বেড়ালের দিকে অপলক তাকিয়ে আমি আর বেড়ালও তার ঠান্ডা চোখে একদৃষ্টিতে আমাকেই দেখছে৷ সম্বিত ফিরতেই আম্মা বলে চেঁচিয়ে ছুটব বলে পা বাড়াতেই এক পা সোজা সেই ড্রেনে৷ মা সেই চীৎকার শুনেছে আর পড়ে যাওয়ার শব্দও৷ ছুটে এসে কাওকে দেখতে না পেয়ে কেডা রে? কি হইসে, বলে জোরে আওয়াজ দিল৷ আমি কোনমতে বলতে পারলাম 'আমি আম্মা'৷ ততক্ষণে বেড়াল উধাও৷ ড্রেনে পা হড়কে পড়ে গিয়ে চোটও লেগেছে বেশ, তার উপর মা আগে পিঠে দু ঘা বসিয়ে তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেল কলতলায়৷

মেয়েদের খোলা চুল নাকি বদ জীনেদের খুব প্রিয়৷ দাদী বলেছে তিন সন্ধ্যের সময়,  সূর্য ডোবার আগে ও পরে সব জীন ভূত চলাচল করে৷ তাই বিকেলের পর থেকে যেন কক্ষণও খোলা চুল করে বাইরে না যাই৷ খোলা চুল দেখতে পেলেই বদ জীন এসে বাসা বাঁধে৷ আর যদি জীনের সেই মেয়েকে পছন্দ হয়ে যায় তাহলে তো আরও বেশি সমস্যা৷ জীন সেই মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে, তার সাথে সংসার করে৷ মানুষে তো জীনকে চোখে দেখতে পায় না৷ জীন যাকে দেখা দিতে চায় শুধু সেই দেখতে পায়৷ সেই মেয়েটা জীনের সাথে কথা বলে, হাসে৷ তার জন্যে রান্না করে৷ সবার মাঝে থেকেও জীন থাকে অদেখা, তাই লোকে ভাবে সে পাগল হয়ে গেছে৷ ব্যস৷ শুরু হয়ে গেল সেই মেয়েটার পাগলামো সারানোর ব্যবস্থা৷ মৌলভী সাহেব আসেন৷ একগাদা তাবিজ পরিয়ে দেন৷ সূরা ফাতিহা পড়ে পানি ফুঁকে দেন৷ আলহাম্দুলিল্লা হিরাব্বিল আলামিন...৷আস্তাগফার পড়ে কালো কারে ফুঁকে ফুঁকে ন'খানা গিট দিয়ে বেঁধে দেন জীনে ধরা মেয়েটির হাতে৷ যাতে জীন আর মেয়েটির কাছে না আসতে পারে৷


আস্তাগ ফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বি ওয়াতুবু ইলাইকা লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লা হিল আলিউল আজীম৷

সেই পানিপড়া খেয়েও মেয়েটা ভাল হয় না৷ জীন তো তাকে ছেড়ে যাবে না কিছুতেই৷ অনেক জীন আবার পছন্দের মেয়েকে তুলে নিয়ে চলে যায়৷ তাদেরকে আর কোনদিনও খুঁজে পাওয়া যায় না৷

আমি তাই বিকেল হলেই আঁট করে চুল বেঁধে রাখি৷ সন্ধ্যের পরে বারান্দায়ও যেতে চাই না৷ বারান্দা থেকে পরিষ্কার দেখায় মাঠের কোণের ঐ কদম গাছটাকে৷ চাপচাপ অন্ধকার দানা বেঁধে থাকে ঐ কদম গাছে৷ যদি কোন কারণে বারান্দায় যেতে হয় তো জোর করে চোখ ফিরিয়ে রাখি ঐ কদম গাছ থেকে৷ সবসময় মনে হয় ওখান থেকে কেউ আমাকে দেখছে৷ লাল দুটি চোখ৷ তাতে পলক পড়ে না , তাকিয়ে আছে যেন আমার দিকে, আমি তাকালেই সে হাতছানি দিয়ে ডাকবে আমায়৷ রাতের পর রাত অমি চোখ ফিরিয়ে থাকি ঐ কদম গাছের থেকে৷ ঘরের জানালা বন্ধ করে দেই বিকেল হলেই ৷ দিনের বেলা যে বেড়ালটা মিউ মিউ করে আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, খাওয়ার টেবিলের তলায় ঢুকে বসে থাকে, সেই যেন রাতে ঐ কদম গাছে চড়ে বসে থাকে৷ তখন তার চোখ লাল৷ অপলক তাকিয়ে থাকে সে আমার দিকে৷

অথচ বর্ষায় যখন কদম ফোটে, আমি তখন প্রায় দিন হেনা, মিলি, সেতুদের নিয়ে সেই কদম কুড়াতে যাই৷ সেতুটাও কদম ফুল খুব ভালবাসে৷ মিলিরা সুর করে ছড়া কাটে৷

চান্দ উঠছে
ফুল ফুটছে
কদমতলায় কেডা?
খুকুমণির বিয়া হইব
ঘোমটা মাথায় দিয়া৷


কখনো আমি একা ও যাই৷ কদম গাছটা আমাকে খুব টানে৷ সকালে আমি যখন ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় যাই প্রথম চোখ পড়ে ঐ কদম গাছটার উপর ৷ তখন আর ঐ লাল চোখদুটো দেখতে পাই না৷ তখন আর সে কোন বদ জীনের বাসা নয়৷ তখন সে শুধুই কদম গাছ৷ বাতাসে নড়ে তার ডাল, পাতা৷ টুপটুপ বৃষ্টি পড়ে ফুলভর্তি ঝাঁকড়া কদম গাছে৷ কোন কোনদিন সকালবেলাতেই আমি একা চলে যাই ছোট্ট ঐ মাঠ পেরিয়ে কদম গাছের তলায়৷ ভয়ে দুরুদুরু করে বুক৷ তবু যাই৷ না গিয়ে পারি না৷ আমাকে ভীষণ টানে ঐ কদমগাছ৷

ননীর বাপ বলে, আফাজান, রাইতে একদম ঘরের তেন বাইর হইয়েন না৷ আমি রোজ রাইতে তাইনে গো দেহি৷ আমি ননীর বাপকে জিজ্ঞেস করি, বুড়ো মিঞা, তোমাকে তারা কিছু বলে না? ননীর বাপ, আমাদের বুড়ো দারোয়ান উত্তর দেয়, আমি যে দোয়া পইড়া শরীরে ফুঁক দিয়া শরীর বন্ধ কইরা রাখি ৷ তাই হেরা আমারে কিসু করতে পারে না ৷ নইলে তো কুন কালেই আমারে শ্যাষ কইরা ফ্যালাইত ! বুড়ো মিঞাকে অনুরোধ করি সে যেন আমাকেও শিখিয়ে দেয় শরীর বন্ধ করা ৷ আমিও রাতে বাইরে বেরুতে চাই৷ কুল গাছটার তলায় যেতে চাই৷ সফেদা গাছের সরু লিকলিকে ডাল থেকে ঐ বড় সফেদাটা পেড়ে আনতে চাই৷ দোতলার রেলিংএ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখতে চাই৷ বুড়ো মিঞা যদি শরীর বন্ধ করা না শেখা তবে তো আমি বেরুতেই পারবো না ৷ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে এখন যেমন জোর করে চোখে বন্ধ করে গুটি সুটি মেরে পড়ে থাকি সব সময়েই তাই থাকতে হবে৷ বুড়ো মিঞা কেমন মাথায় পাগড়ি বেঁধে হাতে তার লাঠিটা নিয়ে সারা রাত বাড়িতাকে পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়৷ গভীর রাত্রে সে সুর করে দরুদ পড়ে,


নূর মুহম্মদ সাল্লাল্লাহ্‌
মাফি কালফি গায়রুল্লাহ্‌
পড়ো সবে সাচ্চা দিলে
লা ইলা হা ইল্লাল্লাহ্‌৷


আমার ঘুম ভেঙে যায়, চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি৷ বুড়ো মিঞা কি এখুনি তাদেরকে দেখল?

আমি কাউকে বলতে পারি না আমার এই ভয়, উৎকন্ঠার কথা৷ সকাল সাড়ে ন'টা বাজলেই সেতু এসে দাঁড়ায়৷ স্কুলে যাওয়ার সময় হল৷ আমি আর সেতু একই স্কুলে পড়ি৷ সাদা সালোয়ার কামিজ , কোমরে চওড়া সবুজ বেল্টে গুঁজে দিয়ে পরা ভাঁজ করা সাদা ওড়না৷ ঝটপট রেডি হয়ে মায়ের কাছ থেকে টিফিনের পয়সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷ সাইকেল রিকশায় আমি আর সেতু স্কুলে যাই৷ আমার সবচাইতে প্রিয় ক্লাস, রুবিনা আপার ক্লাস৷ রুবিনা আপা বাংলা পড়ান৷ বেশির ভাগ মেয়েদেরই সেই ক্লাসে পানির পিপাসা পায়৷ রুবিনা আপা যে খুব ভাল৷ কোন মেয়েকে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করান না৷ মেয়েরা যতবার পড়া বিষয়ে প্রশ্ন করে তিনি ততবার পড়া বুঝিয়ে দেন৷

'বাড়ি তো নয়, পাখির বাসা, ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি৷
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারই তলে আসমানীরা থাকে বছরভরে৷
পেটটি ভরে পায় না খেতে বুকের ক'খান হাড়
সাক্ষী আছে অনহারে ক'দিন গেছে তার৷
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপরাশি
থাপড়েতে নিভিয়ে গেছে দারুন অভাব আসি৷
পরনে তার শতেক তালি শতেক ছেঁড়া বাস
সোনালী তার গা'র বরনে করছে উপহাস৷
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি৷'- জসীমুদ্দীন

পড়ার ছলে গল্প করেন৷ যে গল্পটা অথবা কবিতাটা পড়ালেন সেই গল্পের হাত ধরে চলে যান আরও অনেক গল্পের দেশে৷ কবির কথা বলেন৷ লেখকের কথা বলেন ৷ আমার মনে প্রশ্ন জাগে এত সুন্দর দেখতে রুবিনা আপা, তাকে কোন জীনের পছন্দ হয়নি? রুবিনা আপা তো মাথায়ও কাপড় দেন না৷ তাহলে কি রুবিনা আপা জানেন কি করে শরীর বন্ধ রাখতে হয়? আমি সেতুকে জিজ্ঞাসা করি৷ সেতু বলে, তোরে একদিন জীনে ঠিক লইয়া যাইব!

প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে বুড়ো মিঞা তাদেরকে দেখে৷ চার-পাঁচ জন নাকি থাকে তারা৷ ইয়া লম্বা লম্বা দেখতে৷ বিশাল বড় বড় পা ফেলে তারা আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে পেছনের টিলার দিকে চলে যায়৷ সে রাতে বারে বারে আমার ঘুম ভাঙে৷ ফ্যানের বাতাসে ঘরের পর্দা নড়লেও আমার মনে হয় ঘরে কেউ আছে৷ আমি আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিই৷

আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাআ হুয়াল হাইয়ুল ক্কাইয়ুম৷ লা তা'খুজু হু সিনা তু ওয়ালা নাউম৷ লাহু মা ফিস সামা ওয়াতি ওয়ামা ফীল আরদ্‌...৷

রাতকে আমার ভীষণ লম্বা আর বড় বলে মনে হয়৷