Saturday, October 07, 2006

এ ও আমার গোপনকথা

এবারের গল্পের ও দুই দুস্কৃতির একজন হচ্ছেন আমার মেজদি ৷ আমাদের দুজনের ই মেয়ে দুটি তখন সবে স্কুল যেতে শুরু করেছে। মেজদির মেয়ে আর আমার মেয়ে প্রায় একই বয়েসি ৷ দুজনে মহা উত্সাহে তাদের স্কুলে দিতে যাই, আনতে যাই৷ স্কুলের প্রয়োজনীয় যে কোনো জিনিস কিনতে দুজনে প্রায় রোজই নিউ মার্কেটে যাই ৷ সে প্রয়োজন যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন ৷ স্কুল থেকে ফিরে দুটি ক্ষুদেই খেয়ে দেয়ে ঘুমায়, আমরা সেই ফাঁকে বাইরের কাজটা সেরে আসতাম ৷ তেমনি এক বিকেলে বাড়ির সামনে থেকে দুজনে রিক্সায় চেপেছি, হেঁটে গেলে বড়জোর দশ মিনিট লাগে, কিন্তু আমি তখনো হাঁটাতে ততটা অভ্যস্ত নই, তাই রিক্সা  ৷

রিক্সা এই গলি ঐ ঘুঁজি দিয়ে ঘুরে চলেছে, একটা ছোট্ট লেন পেরিয়ে রিক্সা সদর স্ট্রিট এ ঢুকবে ৷ লেন এর শেষ মাথায় রাস্তারপাশে একটা ছোট্ট শিবমন্দির, ওখানটায় পৌছুতে সামনে থেকে একটা ট্যাক্সি এসে সোজা ঠুকে দিলো আমাদের রিক্সাকে ৷ট্যাক্সিটি সদর স্ট্রিট থেকে ঐ লেনে ঢুকছিল, আমাদের বেচারা রিক্সাওয়ালা অনেক চেষ্টা করে সোজা উল্টে না দিয়ে বাম দিকেপাশ ফিরিয়ে রিক্সাটিকে ফেললো !!


আমি বসেছিলাম বাঁয়ে, কাজেই আমি পড়লাম আগে, আমার ওপরে মেজদি৷ ফুটপাথ এর নীচে জমা ছিলো কিছু নোংরা জল, সেই জলের ওপরে আমি,আমার ওপরে মেজদি, আর আমাদের দুজনেরওপরে রিক্সা ! মেজদি চটপট আমার ওপর কনুই আর হাঁটু চেপে উঠে পড়েছে, কিন্তু আমি চেষ্টা করেও উঠতে পারছি না, মেজদি আমার হাত ধরে টানাটানি করছে, কিন্তু ঐ ঢালমত জায়গায় তোবড়ানো রিক্সায় আমি আটকে গেছি৷ সাহায্যের জন্যে চারপাশ থেকে ততক্ষনে বেশ কিছু হাত এগিয়ে এসেছে ৷ মেজদি আমায় ধমাকচ্ছে, চেষ্টা তো কর উঠে আসার ! শেষমেষ আমি উঠে এলাম ! রিক্সাওয়ালা তখন বিষম ব্যস্ত, তার যে কোনো দোষ নেই এটা চারপাশের লোকজনকে বোঝানোতে ৷ মেজদি ততক্ষণে আমার হাত ধরে আমাকে প্রায় হিঁচড়ে বাড়ির ফিরতি পথ ধরেছে, লোকজনের সাহায্যের হাত উপেক্ষা করে৷ আমি তখনো কথা বলার মত অবস্থায় নেই, কিন্তু মেজদির শাসানিগুলো কানের ভেতর গরম সীসের মত ঢুকছে, ম্যাডাম হাঁটতে পারেন না, রিক্সা চাই, বাড়িতে গিয়ে যদি কাওকে কিচ্ছুটি বলেছিস, তো জীবনে তোকে নিয়ে আর কোত্থাও যাবো না !


বাড়ি গিয়ে কাওকে কিছু বলার মনোবাসনা আমারো ছিলো না ৷ তাই বলিওনি কাওকে৷ হাতের ২/৩ জায়গায় বিভিন্ন রঙের উপস্থিতি দেখে কর্তা জিজ্ঞেস করেছেন, তুমি কি রানী'র- মেজদির নাম রানী, সাথে
পাঞ্জা লড়েছিলে নাকি ? লাগলো কি করে ? মেজদির আবার পাঞ্জা লড়ার সখ ছিল, সকলের সাথেই পাঞ্জা লড়ে বেড়াতো,  আমি প্রবল প্রতিবাদ করেছি, যে আমি মোটেও পাঞ্জা  লড়িনি, রাতে অন্ধকারে দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছিলাম, তাই লেগে গিয়েছে ! বলা বাহুল্য যে কথাটি তিনি বিশ্বাস করেননি ৷

এর পর বেশ কিছুদিন শুধু স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও যাইনি, আর সেই থেকে রিক্সা চাপাও বন্ধ! কিন্তু আমাদের গোপন কথাটি রহিলো না গোপন! প্রায় এক বছর পরে, সেই রিক্সাওয়ালা অভিযোগ করেছে মেয়ের বাবার কাছে, সেদিনকার সেই দুর্ঘটনায় তার নাকি কোন দোষ ছিলো না, ট্যাক্সি এসে বেমক্কা ধাকা মেরে রিক্সা উল্টে দিলো, কিন্তু তারপর থেকে ভাবীরা কেও আর তার রিক্সায় ওঠেন না ! একথা শুনে তিনি তো হা ! কবে ওল্টালো রিক্সা ? তখন জেরা করে জানতে পারলেন যে প্রায় বছরটাক আগেকার ঘটনা এটা ৷ রাতে দুই ভাই মিলে আমাদের দুজনের ক্লাস নিলেন ! আর কত এরকম ঘটনা আমরা লুকিয়ে রেখেছি ??? কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারিনি, যে আর কিচ্ছু লুকানো নেই!

গোপন কথাটি

আমি তখন সবে কলকাতা এসেছি এক বছর হল, মেয়ে খুব ছোট, তাই বাইরে খুব কম বেরুনো হত, ডিসেম্বরের শেষ সেটা, বড়দিন পেরিয়ে গেছে, এখানে বড়দিনের হল্লা আমি বাড়িতে বসেই টের পেয়েছি, মেজ জা, যাকে আমি মেজদি বলতাম, তার কাছে গল্প শুনি, পড়শী হিন্দুস্থানী মেয়েটা এসে নানা গল্প শোনায়, আমি তার আদ্ধেক বুঝি, আদ্ধেক বুঝি না, কিন্তু আমার মন চঞ্চল হয় বাইরে বেরুনোর জন্যে, দেখার জন্যে !

মেজদির কাছ থেকে শুনেছি, গোটা পার্ক স্ট্রিট নাকি খুব সুন্দর করে সাজে,আর ঐ সেন্ট পল চার্চ, সেও নাকি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়৷ দেখার ইচ্ছে তীব্র হতে থাকে, কিন্তু কারো সময় নেই, যে আমাকে নিয়ে একটু বেরোয়, মেজ ভাশুরকে বললাম, বায়না টায়না গুলো মেজ ভাশুরের কাছেই হত আমার,  আমি দেখতে যাব, সেন্ট পল চার্চ, চৌরঙ্গী, পার্ক স্ট্রীট! তখন মেজদা বললেন, খুব ভীড় হয় যে, আচ্ছা ঠিক আছে, সময় পেলে নিয়ে যাব, কিন্তু সময় আর হয়নি ৷

একত্রিশের রাত সেদিন, দুপুর বেলাতেই ভাশুর বলে গেছেন, ফিরতে রাত হবে, বাইরেই খেয়ে আসবেন, ছোট কর্তাও তাই জানিয়েছেন ৷ আমার ভীষণ মন খারাপ, মেজদিকে বললাম, তুমি তো নিয়ে চল... ! মেজদি বললে কিন্তু বাচ্চা দুটো ? শাশুড়ী বললেন, দু দুটো কাজের লোক আছে, অসুবিধে হবে না, তোমরা যাও ৷

পাশের বাড়ির এক ভাবী ও সঙ্গ নিলেন, আমরাও একটু সাহস পেলাম ! দুই এর থেকে তো তিন ভালো ! পাঁচ মিনিটের হাঁটা রাস্তা পার্ক স্ট্রিট, সেখানেই যাওয়া হবে, চৌরঙ্গী, চার্চ পরে কখনও! ঠিক হল হেঁটেই যাব৷ সন্ধ্যে সন্ধ্যে বেরুবো, খাব কিছু, আর সাড়ে আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরব৷ সাজগোজ করার জন্যে নীচতলায় মেজদির ঘরে গেলাম, মেজদি বলল, গয়নাগাটি পরে বেরোস না, ওগুলো খুলে ইমিটেশন গয়না পরে নে, আর দুজনের হাতে পার্স রাখার দরকার নেই, একজনের হাতে পার্স থাকলেই হবে ! তো যা গয়নাপত্র দুজনে পরেছিলাম, সবগুলো খুলে একটা পার্সের মধ্যে রেখে দিলাম, মেজদির পার্সে টাকা পয়সা ঢোকানো হল আর আমার পার্সে গয়না ! বেরুনোর সময় একটা পার্স মেজদি নিজের আলমারিতে ঢোকালেন, আর একটা হাতে নিলেন ৷ বলতে ভুলে গেছি, দুজনের হাতে ছিল একই রকমের একই রঙের পার্স ! ভাবী ও ততক্ষনে রেডি হয়ে দাঁড়িয়েই ছিলেন আমাদের জন্যে ৷ তিন জনে মিলে মহা আনন্দে পার্ক স্ট্রিট অভিযানে চললাম ৷

গল্প করতে করতে ঐ ঝলমলে রাস্তায় খানিক হেঁটে নিয়ে এবার খাওয়ার পালা, আমি বললাম, চাইনিজ খাব, মেজদি বলল,  এটা কী তোর বাংলাদেশ নাকি? সব জিনিস হালাল পাবি সব জায়গায়? এখানে চাইনিজ মানে চাইনিজ! মুরগী-শুয়োর সব একই হাঁড়িতে-কড়াইতে একের পর এক রান্না হয়, আর মুরগীও তো জবাই করা নয়, কোপানো, সব হারাম। কাজেই চাইনিজ খেতে হলে বাড়িতে বানিয়ে খাবি, এখানে নয়।  কিন্তু আমি জেদ ধরলাম, খাবই খাব !

এখানে এসে অবধি একবারও চাইনিজ খওয়া হয়নি ৷ অগত্যা মেজদি বলল, চ ! কিন্তু কোথাও টেবিল খালি নেই! সব নাকি বুক করা ! মহ ঝামেলা তো ! অবশেষে এক জায়গায় টেবিল পাওয়া গেল, কিন্তু আটটার মধ্যে খালি করে দিতে হবে৷ আটটা থেকে বুক করা আছে৷ তখন সবে ছ'টা বাজে৷ আমরা বসে পড়লাম৷ চারপাশে সবাই দেখলাম রঙিন শরবত খাচ্ছে । অদ্ভুত এক অচেনা উৎকট গন্ধ গোটা রেস্তোরা জুড়ে।  মেজদি জ্ঞান দিল, শরবত না রে হাঁদা, মদ খাচ্ছে সব!! আর জানান দিল, এখানে সব এরকমই !!

আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল ৷ মেজদি আরো বলল, এজন্যেই তোর ভাশুর বারণ করে ! মদ খেয়ে সব কে কেমন করে কোনো ঠিক আছে! মদ খেয়ে কে কেমন করে সে আমি জীবনে দেখিনি, কিন্তু বইতে তো পড়েছি আর সেই সব মনে পড়ে গিয়ে আমার ততক্ষণে হয়ে গিয়েছে ! কেউ বসে মদ খাচ্ছে, সেটা সেই প্রথম দেখা ৷ খাবারের অর্ডার গেলো, খাবার এলো৷ চুপচাপ খেলাম ৷ সমস্ত এক্সাইটমেন্ট শেষ ! এবার বিল দেবার পালা, বিল এলো, মেজদি দেখে নিয়ে পার্স খুলে পয়সা বার করতে গিয়ে দেখে, একটা একটা করে চুড়ী, বালা, গলার হার, কানের দুল বেরুচ্ছে পার্স থেকে !! নো পয়সা !! মেজদিকে দেখলাম চুপ করে পার্স নিয়ে বসে আছে, জানতে চাইলাম, কি হয়েছে ? তখন আমার হাতে দিলো পার্সটা,  দেখে তো আমার হাত পা ঠান্ডা ৷


ভুল করে টাকার ব্যাগ আলমারিতে রেখে গয়নার ব্যাগ নিয়ে এসেছে মেজদি ! মেজদি তখন আমার উপর রিতীমত ক্ষেপে গেছে, বারণ করলে শুনবে না, পার্ক স্ট্রিট ঘুরতে যাবে, চাইনিজ খাবে, এবারে সামলাও ! বিলক্ষণ ঘাবড়েছি ৷ হঠাৎ  সেই পড়শী ভাবী বলল, এই তো রাস্তার ঐ পারে আমাদের দোকান, আমি গিয়ে টাকা নিয়ে আসছি, তোমরা বসে গল্প কর ! বসে তখন এক নি:শ্বাষে আল্লাহর নাম জপে যাচ্ছি ৷ মেজদি গুম ! ঐ শীতের রাতেও ঘেমে সারা দুজনে ! কাঁচের দেয়াল দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ভাবী হেঁটে রাস্তা পার করল, দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, এবার টাকা নিয়ে ফিরে আসছে...

বাড়ি ফিরে কাউকে বলিনি ঐ ঘটনা বহুদিন, ভাশুর পরদিন জিজ্ঞেস করেছেন, কেমন হল তোমাদের বেড়ানো? বলেছি খুব ভাল! চাইনীজ খেয়েছি তাও বলেছি, ফেরার পথে মেজদি পান খাওয়ায়নি সেই অভিযোগ ও করেছি !! কিন্তু স্পিকটি নট about the bill...

Sunday, September 17, 2006

সব কটা জানালা খুলে দাও না

সড়ক পথে ভারত থেকে বাংলাদেশ যাওয়াটা বেশ মনোরম৷ প্রচুর বাস হয়েছে, মাশুলও নগন্য, আর চারপাশ দেখতে দেখতে বেশ যাওয়া যায়৷ বর্ডারে আগে বেশ ঝামেলা করত কাষ্টমস কিন্তু এখন বাসওয়ালারাই সামলে নেয় সবকিছু,কিছু প্যাকেজ হয়ে থাকবে৷ সকালে এখানে বাসে উঠে পড়ো আর তারপর ওরাই সব দেখে-শুনে নেবে৷ ভোর ছটায় কোলকাতা থেকে বাস ছেড়েছে আনুমানিক সন্ধ্যে ছ'টায় ঢাকায় নামিয়ে দেবে, বাসে ওঠার আগে থাকতেই সেটা জানা৷ বেনাপোল বর্ডারে পৌঁছাতে যা সময় লাগে তার আধ ঘন্টা আগেই পৌঁছালো বাস, ইমিগ্রেশন কাষ্টমস সেরে নিয়ে বাস আবার চটপট ঢাকার পথ ধরলো দেড় ঘন্টার মাথায়৷ বাসে যিনি অ্যাটেন্ড্যান্ট, তিনি বললেন আজ সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি মিটে গেল, বিকেল পাঁচটার মধ্যেই ঢাকায় পৌঁছে যাব ইন্শাল্লাহ৷ আমি পেট্রাপোল থেকে চট্টগ্রামে বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম যে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাব, আর জানতে চাইলাম তারপরে কিভাবে চট্টগ্রামে যাওয়া হবে? বাবা বললেন বাসষ্টপে লোক থাকবে আর ওখান থেকেই বি আর টি সি'র বাস ধরে সোজা আবার বেরিয়ে যাবে দেশের বাড়ির পথে, তোমার মা ওখানে অপেক্ষা করছেন৷

সাভার অব্দি বাস ঠিকঠাক গেছে, সাভার মানে ঢাকা আর এক ঘন্টা দূর, জাতীয় স্মৃতিসৌধের জন্য খ্যাত, বি-টিভিতে প্রত্যেকটা খবরের আগে মুখ দেখায় যে স্মৃতিসৌধ, সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিনের সেই বিখ্যাত গান, সব কটা জানালা খুলে দাও না ৷ চমত্কার রাস্তা আর ফাঁকা, ভালো স্পিডে যাচ্ছে,বিদেশি ভলভো-গাড়ি,কাজেই সময়ের আগেই পৌঁছাচ্ছে৷ এটাই সবাই আলোচনা করছে,ক্রমশ ঢাকা এসে পড়ছে কলকাতার আরো কাছে৷ যাত্রীদের মোবাইল ফোন ঘনঘন বাজছে, কে কোথায় নামবেন, গাড়ি যেন থাকে অমুক জায়গায়, সেই মত সব নির্দেশ,অনুরোধ যাচ্ছে৷ আমিও "খোলা' মনে "জানালা' দিয়ে শোভা দেখছি৷ সাভারে রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিং , "শহীদ জিয়া আমরা তোমায় ভুলিনি ভুলবো না'৷ হঠাত্ খেয়াল হল আজ তো তিরিশে মে৷ জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী! রাস্তা দেখতে দেখতে যাচ্ছি, গাড়ির গতি ক্রমশ স্লো হচ্ছে৷ বিশাল বিশাল সব হোর্ডিং , ংযাতে মরহুম জিয়া আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি৷ ইতিমধ্যে বাসের অ্যাটেন্ড্যান্ট ভদ্রলোকের কাছে ফোন, বাস যেন রোজকার নিয়মিত পথ ধরে না যায়, কুলটি মহাসড়ক ধরে যেন ঢাকায় ঢোকেন, অর্থাত্ ঢাকা আরো একটু দূরে৷ ৷ আর যাত্রীদেরকে জানানো হ'ল, একটু দেরী হবে কারণ ঢাকায় ঢোকার পথে প্রচন্ড জ্যাম৷ যে রাস্তায় বাস চলতে আরম্ভ করল সেটি তখনও পুরো তৈরি হয় নি৷ কোথাও শুধু ইট বিছানো কোথাও বা পিচ ঢালা হচ্ছে৷ বেশ ভালমতন ঝাঁকুনি টের পাচ্ছি ভলভো বাসে বসে থেকেও৷ বড় রাস্তা ছেড়ে বাস চললো অলি-গলি ধরে৷ কিন্তু একটা সময়ে বাসকে বড় রাস্তায় পড়তেই হল আর তখন টের পাওয়া কাকে বলে যানজট৷ ঢাকার উপকন্ঠে বাস পৌঁছে গেছিলো সাড়ে চারটের সময় আর তারপর হাঁটি হাঁটি পা পা করতে করতে রাত সাড়ে আটটায় কমলাপুরে পোঁছালো বাস, ঘন্টা খানেকের পথ চার ঘন্টায়৷ কাছে মোবাইল ছিল না যে ফোন করে জানিয়ে দেব, এই দেরীর কথা৷ একে তো ভোর থেকে সারাদিন বাসে বসে থেকে বেশ অসুস্থ বোধ করছি, এদিকে রাতেই আবার আরও একশ কিলোমিটার জার্নি করে মায়ের কাছে যাওয়ার কথা৷ বি আর টি সির শেষ বাসটি ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় সাড়ে সাতটায়৷ প্রচন্ড অস্থিরতা ,অথচ কারও সাথে যোগাযোগ করব সেই উপায়ও নেই ৷ আশে পাশে অনেকের হাতেই মোবাইল আছে কিন্তু সংকোচ! ভাইয়া, একটা কল করব! বাস কমলাপুরে পৌঁছালে ষ্টপে ভাইকে দেখতে না পেয়ে বাবাকে ফোন করলাম পরিবহনের অফিস থেকে, বাবা বললেন ভাই তিন ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে এই মাত্র ঢাকায় আমার এক বোনের বাসায় গেছে৷ ছোট বোনের বাড়ি কাছেই, ভাইকে আবার ডাকবো ? তার থেকে নিজেই চলে যাই সি এন্ড জি নিয়ে৷ এই ভেবে সি এন্ড জির সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল ৫ মিনিটের দুরত্বে তারা যেতে রাজী নয় এই বিশাল যানজটের ভেতর৷ অগত্যা রিকশা নিয়ে সেই যান্জটের ভেতর, চেনা রাস্তা ছেড়ে গলি, তস্য গলি৷ যেটা বাকি ছিলো সেটা হলো, পথ হারালাম৷ ঐ গলি গলি তস্য গলির ভেতরে যানজট ঠেলে ঠেলে আধ ঘন্টা ঘুরে অবশেষে রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফোনে করে বোনকে জানালাম যে পথ হরিয়েছি! ভাই বেরিয়ে গিয়ে এক মাইক্রো বাস ভাড়া করে নিয়ে এল যে কিনা ৪ গুণ বেশি দক্ষিণা নিয়ে আমাদের দেশের বাড়ি পৌছে দেবে৷ কিন্তু ঢাকার যা অবস্থা,নিজেও বেশ কাহিল বেরিয়ে আবার কি চক্করে পড়ি এই ভেবে বেরোতে সাহস পাচ্ছিলাম না৷ কিন্তু মা অপেক্ষা করছে! বসে থেকেই সে রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরবেলায় উঠেই বাড়ির পথে৷ রাস্তা বিদেশী বন্ধুদের সহায়তায় বেগম জিয়া যা বানিয়েছেন, আর মেঘনার ব্রীজ হয়ে যাওয়াতে একশ কিলোমিটার রাস্তা দু ঘন্টায় পার করে বেলা আটটায় মায়ের কাছে৷

বাবা খবরের কাগজ দেখালেন, আগেরদিন দশ কোটি টাকা খরচ করে কাঙালী ভোজন করিয়েছেন বেগম জিয়া স্বামীর মৃত্যুদিবসে৷ যার মধ্যে চার কোটি টাকার গরু আর বাদবাকি ছ'কোটি টাকার চাল এব ংঅন্যান্য দ্রব্যাদি৷কাল ঢাকাতে সকলেরই দাওয়াত ছিল তাই এত যানজট! বেশ, দশ কোটি টাকা বেশ বড় সড় ব্যপার,বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় সেটা আরো আরো বড় ৷ প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতও তো বেশ বড় ব্যপার৷ সব কাগজই ফলাও করে লিখেছে,কত লোক এসেছিল, কত দীর্ঘকালীন যনাজট, বেশ গর্বের ব্যাপার, এমনটা আগে হয়নি৷ জানি না নিজের টাকায়, না চাঁদা তুলে, না জনগনের ট্যক্সের সরকারী টাকায়, না স্পনসরশিপের টাকায় একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী তার প্রয়াত স্বামীর পরকালীন মঙ্গলের জন্য কাঙালী ভোজন করান,কিন্তু এমনটা আগে হয়নি৷ প্রতিটা দৈনিকে শিরোনাম পেয়েছেন, রিপোর্টারা বড় বড় কপি লিখেছে, অনেকগুলো সাইড স্টোরি,চাল নিয়ে, গরু নিয়ে, যানজট নিয়ে, মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঢাকা এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন,"শহীদ জিয়া আমরা তোমায় ভুলিনি ভুলবো না'৷ অবিশ্যি কাগজের স্পেস আনেক দামী সব কথা লেখা যায় না ৷ আর সব কিছুর খোঁজ রাখাও সম্ভব নয়৷ আমাদের ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা আমরা মনে রাখি ব্যক্তিগত কারণেই,খবরের আগে দেখানো স্মৃতিসৌধের মত, আমার অসুস্থ মা ঐদিন সারারাত জেগে অপেক্ষা করেছিলেন মেয়ের জন্যে, আরো একটু অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্যে নয়৷

Sunday, September 10, 2006

যা হারিয়ে যায়

যা হারিয়ে গেছে? বরং বলতে পারি সবই হারিয়ে গেছে৷ সব, সব কটা বই, ছেলেবেলা, ছেলেবেলা থেকে জমানো সমস্ত কিছু, বই আমার৷ হারিয়ে গেছে৷ কি যে ছিল আর কি ছিল না, হারিয়েছে সেই স্মৃতিও৷ হারিয়েছে প্রায় সব নাম৷ চরিত্র৷
পড়তাম দস্যু বনহুর সিরিজের বই৷ সুদর্শন সুপুরুষ বনহুর৷ যাকে দস্যু বলে কেউ বুঝতেই পারতনা৷ থাকে সে কান্দাইয়ের জঙ্গলে৷ অসংখ্য ঘোড়া তার আস্তাবলে৷ রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে সে শহরে আসে তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে৷ তার সেই প্রেমিকার নামও হারিয়েছে৷ মাকে লুকিয়ে পড়তে হত সে সব বই৷ মা একবার দেখল কি বাজেয়াপ্ত৷ হারিয়েছে সব কটি বনহুর৷ বনহুরের বই প্রথম হাতে আসে দাদার মারফত৷ প্রথম বইটি সে পায় তার কোন এক বন্ধুর কাছ থেকে, আর তারপরের বইটি সে কিনে আনে৷ আমি তখন বেশ ছোট, বই কেনার মত বড় হইনি তখনও কিন্তু পড়া শুরু হয়ে গেছে দাদার কল্যাণে৷ অপেক্ষা করে থাকতাম কখন তার পড়া হলে আমি হাতে পাব বইটি৷ আর বইয়ের জন্য দাদাকে বেশ খোসামোদি করতে হত৷ পড়া হয়ে গেলেই সে বইয়ের আর কোন মুল্য থাকেনা তার কাছে, কিন্তু যেই আমি পড়ব বলে নিতাম অমনি হয়ে যেত সেই বইটা মহামুল্যবান৷ কোন কারণে তার রাগ হলেই কেড়ে নিত সে বইটি৷ আর সেই রাগ তার হরবখতই হত৷

কুয়াশা, যে ছিল এক গোয়েন্দা৷ দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াত সে৷ রাতের অন্ধকারে কালো আলখাল্লা পরে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের কাজ করত সে৷ সমাধান করত নানা সমস্যার৷ সেই বয়সে বেশ হিরো হিরো একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল৷ পেপার ব্যাক এর পাতলা পাতলা বই৷ একশর উপর বই ছিল কুয়াশা সিরিজের৷ সব কটা তো ছিলনা, তবে ছিল বেশ কিছু৷ হারিয়েছে সব৷ তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি৷ স্কুলের লাইব্রেরী থেকে এনে পড়ি আমলকীর মৌ, স্তব্ধতার কানে কানে৷ দিলারা হাশেমের বই৷ বই দেওয়ার আগে লাইব্রেরী স্যার জানতে চাইতেন অত মোটা বই নিয়ে তো যাচ্ছ, পড়বে তো? স্যারকে অনুরোধ করতাম যেন দুটি বই দেন, কিন্তু একটির বেশি বই পেতাম না হাতে৷ লাইব্রেরী ক্লাসে যাওয়া ছিল বাধ্যতামুলক৷ ক্লাসের অনেক মেয়েই ছিল যাদের অনিচ্ছা সত্বেও যেতে হত, সেরকমই দুটি মেয়ে ছিল আমার বন্ধু, তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল তারা বই নিয়ে আমায় দিয়ে দেবে৷ এভাবে একদিনে তিনটি বই পেয়ে যেতাম৷ এক সপ্তাহের জন্য৷ বাড়ি ফিরে সেদিন আর খেলতে না গিয়ে সেই বই নিয়ে সোজা পড়ার টেবিলে৷ উপরে পড়ার বই নিচে গল্পের বই৷ এই চালাকিটুকু করতে হত মায়ের জন্য৷

আমলকীর মৌ বইটি আমি পরে কিনেছিলাম৷ ঐ সময়টাতে আমি এমন সব আত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে বেশি যেতাম যাদের বাড়িতে বই আছে৷ একবার বই আনা আবার ফেরত দেওয়া৷ প্রায় প্রতিবারই একটা করে বই রেখে দিতাম৷ পরে খোঁজ হলে অবশ্য ফেরত দিতে হত৷ সে বড় দু:খের ব্যাপার হত৷ ঈদ সংখ্যা বিচিত্রায় প্রকাশিত উপন্যাস মিউরাল এর শুধু নামটুকুই আছে৷ হারিয়েছে গল্প,চরিত্ররা৷ ইমদাদুল হক মিলনের হে প্রেম৷ চরিত্রের নাম চেষ্টা করেও মনে পড়ছেনা৷ তখন, সেই ৮০ সালে বেশ অভিনব ষ্টাইলে লেখা হে প্রেম মুগ্ধ করেছিল৷ হারিয়েছে সেটি এবংপরপর কিনে ফেলা মিলনের সবকটি বই৷

সাপ্তাহিক বিচিত্রা৷ প্রতিটি সংখ্যা কি যত্নে জমিয়ে রাখতাম৷ ঈদের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল ঈদসংখ্যাগুলো৷ জন্মদিনে পাওয়া রুশদেশের উপকথা৷ ইভানের ছেলেবেলা৷ কাকার কাছ থেকে পেয়েছিলাম শেষের কবিতা৷ রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের সবকটি খন্ড৷ শরত্ রচনাবলী৷ হারিয়েছে সব৷ তিনগুণ বেশি দাম দিয়ে কেনা সব পুজোসংখ্যা৷ ভারতীয় লেখকদের লেখা বইয়ের আকর্ষণ ছিল অন্যরকম৷ বেশি দাম দিয়ে কিনতে হত বলে বেশ অনেকদিন ধরে টাকা জমাতে হত আর তারপরে রাত জেগে সে বই পড়া৷ বিয়ের পরে বরের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম উপহার,বই৷ উত্তরাধিকার, সোনার হরিণ নেই, বাবলি৷ সেই প্রথম পড়ি বুদ্ধদেব গুহর লেখা৷ তারপর পরপর পড়েছি তার বেশ কিছু বই৷ ওর লেখা বেশ খানিকটা যেন মেলে আমাদের সেলিনা হোসেনের লেখার সাথে৷ উল্টোটাও হতে পারে৷ বইয়ের নাম,চরিত্রের নাম,গল্প কিছুই ঠিকঠাক মনে নেই তাই সঠিকভাবে বলতে পারছি না৷

ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কাকিমার বাপের বাড়ি থেকে এনেছিলাম অশনী সংকেত৷ বইটি পড়ে এমন মনে হচ্ছিল যেন আমিও আছি এক দুর্ভিক্ষের দেশে৷ খাবার দেখে ভেবেছি, খাবার? কোথা থেকে এলো? দুর্ভিক্ষ চলছেনা! পিসির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পেয়েছিলাম "এক রমনীর যুদ্ধ'৷ পিসতুতো ভাইয়ের ছিল সেটি৷ পড়ব বলে চেয়ে এনে আর ফেরত দেওয়া হয়নি৷

প্রথমবার কলেজ স্ট্রিট যাই বাংলাদেশ থেকে আসা এক আত্মীয়ের সাথে৷ তাদের কিছু বই কেনার ছিল,রঙ কেনার ছিল৷ মনে আছে আমার সেদিন, সারাটা দিন আমার কেটেছে ঐ বইপাড়ায়৷ এ দোকান, ও দোকান ঘুরে ঘুরে৷ বই দেখে৷ নতুন বই৷ পুরনো বই৷ বেশ কিছু বই কিনেছিলাম৷ বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা৷ মেয়ে তখন ছোট, তাকে তার জ্যাঠিমার কাছে রেখে সারাদিন বই দেখে বেড়ানো৷ হারিয়েছি সেই বই এমনকি বইয়ের নামও৷হারিয়েছে বিয়ের পরে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সব চিঠিপত্র৷ সেগুলো রাখা ছিল একটা বন্ধ আলমারীতে অন্য বেশ কিছু দরকারী কাগজ-পত্রের সাথে৷ বেশ কিছুদিন পর পরিষ্কার করার জন্যে আলমারী খুলতে দেখা গেল উইয়ে খেয়েছে ভেতরকার যাবতীয় কাগজ৷ চিঠি কি কেবলই চিঠি৷ চিঠি যায়, সঙ্গে নিয়ে যায় আরো অনেক কিছু৷

ধীরে ধীরে বই পড়া কমতে লাগল সময়ের সাথে সাথে৷ বাড়ি যখন যেতাম, প্রায় সব বই'ই নিয়ে যেতাম সাথে করে৷ রেখে আসতাম আমার অন্য সব বইয়ের সাথে৷ একটা সময় এমন এলো আমার পড়া বলতে শুধুই খবরের কাগজ৷ দেশে আলমারীতে সাজানো আমার সব বই,ম্যাগাজিন৷ বহু বছর তারা ছিল আমার অনুপস্থিতি সত্বেও৷ এখন আর নেই৷ প্রায় চার বছর বিবিধ কারণে দেশে যাওয়া হয়নি, যখন গেলাম, গিয়ে দেখি সবকিছুই তেমনি আছে নেই শুধু আমার বই৷ যে আলমারীতে আমার বই থাকত এখন সেখানে বিভিন্ন জিনিসপত্র৷

Thursday, September 07, 2006

বইমেলা ২০০৬



আজ সক্কাল সক্কাল রান্নাবাটি সেরে নিয়েছিলাম বইমেলা যাব বলে ৷ তাও খাওয়া সেরে বেরোতে বেরোতে দুটো বেজেই গেল ৷ লম্বা লাইন দিয়ে মেলায় ঢুকতে বেলা তিনটে পার ৷ বারবার মনে হচ্ছিল, এত্তো দেরী করলাম !

মেলায় ঢুকে প্রথম ষ্টলটিতে ঢুকেই যেন চেনামুখ দেখলাম বলে মনে হল৷ ডালিয়াদি ৷ চেঁচালাম ৷ ডালিয়াদি, বলে ৷ পেছন থেকে কার যেন গলা শুনতে পেলাম,এখানে আবার কে ডালিয়াদি করছে? একগাল হেসে ডালিয়াদি এগিয়ে এসেই সোজা জড়িয়ে ধরলেন ৷ খানিক গপ্প হল দাঁড়িয়ে ৷ ডালিয়াদি বেরুচ্ছিলেন ৷ আমি সবে এসেছি শুনে বললেন, তুমি তাহলে দেখ ৷ ষ্টলের বাইরে এসে দুজনের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন, একজন দাদা ( ডালিয়াদির বর) আরেকজন ডালিয়াদির দাদা ৷ ওরা এগুলেন বেরুনোর পথে, আমি মেলার ভিতর দিকে পা বড়ালাম ৷

প্রশান্ত মেলায় এসেছে "অলিন্দ' নিয়ে, জানা ছিল৷ ওকে ফোন করে জেনে নিলাম কোথায় সে এখন ৷ আমি তখন সেই ষ্টলের সামনে দাঁড়িয়ে, যাদের সহযোগিতায় বের হয়েছে -অলিন্দ, সেই দীপ প্রকাশনের দোরগোড়ায় ৷ প্রশান্ত বলল সে বাংলালাইভের ষ্টলে আছে, আমাকে দাঁড়াতে বলল ওখানেই ৷ মিনিট দশ লাগল, প্রশান্ত'র এসে পৌঁছুতে ৷ সাথে করে নিয়ে গেল যেখানে যেখানে অলিন্দ দেওয়া হয়েছে ৷ আলাপ করিয়ে দিল সেখানকার লোকজনের সাথে, আমিও 'অলিন্দ'এর একজন বলে ৷ আবার আসব বলে বেরিয়ে এলাম খানিক গল্প করে ৷ এবার প্রশান্ত বিদায় নিল ৷ তার অন্য কোথাও যাওয়ার কথা আছে ৷

ঘন্টা খানেকমত ঘোরাফেরা করে খুঁজে বের করলাম বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন ৷ মেলায় ঢুকতেই এক ভদ্রলোক ধরিয়ে দিয়েছিলেন মেলার ম্যাপ ৷ কিন্তু ওখানে কিছুতেই বাংলাদেশকে খুঁজে পেলামনা ৷ তাহলে কি বাংলাদেশের কোন ষ্টল নেই? কিন্তু ঐ যে৷ বারবার বাংলায়, হিন্দিতে, ইংরেজীতে ঘোষণা হচ্ছে কোন কোন দেশ এসেছে বইমেলায়৷ তাতে তো তারা বাংলাদেশের নামও বলছে ৷ মেলারই একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম ৷ কিন্তু সে বলল, জানেনা বাংলাদেশের ষ্টল কোথায় ৷ খানিকটা এগোতেই দূরে চোখে পড়ল বড় বড় অক্ষরে লেখা 'বাংলাদেশ' ৷ ছোট ছোট ষ্টলে সাজিয়ে এ যেন এক আলাদা মেলা ৷ কলকাতা বইমেলা নয় ৷ শুধুই বাংলাদেশ ৷ মনে হচ্ছিল যেন ঢাকার বাংলাবাজার কিংবা চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় পৌঁছে গেছি, প্যাভিলিয়নের ঐ একটি দরজা পেরোতেই ৷ মানচিত্রে যেমন গোটা দেশটা ছড়িয়ে পড়ে জেলায় জেলায় ছোট্ট ছোট্ট সব রেখার টানে, তেমনি আমার বাংলাদেশ জুড়ে আছে ছোট্ট ছোট্ট সব ষ্টল, একটা সরু পার্টিশন অথচ দুই পাশে দুই হয়ত চিরপ্রতিদ্বন্দী ব্যবসায়ী ৷ আর তাতে সব বাংলাদেশী বই ঠাসা ৷ ভাবা যায় !প্রায় সবকটি ষ্টলেই ছেয়ে আছেন হূমায়ুন আহমেদ ৷ অগুনতি, অসংখ্য বই তার ৷ অন্য বই ও আছে প্রচুর ৷ এমন সব বই দেখলাম, এখন যেগুলো বাংলাদেশেই সব জায়গায় পাওয়া যায় বলে জানি না ৷ সব রকমের বই ৷ গল্প৷ উপন্যাস ৷ কবিতা ৷ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ৷ ধর্ম বিষয়ক বই ৷ প্রবন্ধ ৷ সব, সব রকমের বই ৷একটি ছেলেকে দেখলাম একসাথে আট/দশটি হূমায়ুন আহমেদ'এর বই কিনতে ৷ দেখলাম জাহির রায়হান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, নির্মলেন্দু গুণ একগাদা সব বাঘাবাঘা নাম ৷ চেনা সব ৷ প্রায় সবকটি ষ্টলেই চোখে পড়ল একটি বই ৷ 'বিষাদ সিন্ধু'৷ চোখ আটকাল সেলিনা হোসেনের 'বাংলাদেশের মেয়ে-শিশুরা' বইটির উপর ৷ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহের কবিতার বই হাতে নিয়ে পড়ে ফেললাম দুটি কবিতা ৷ কোন কবিতারই নাম নেই ৷ কবিতার নিচে শুধু সন,তারিখ আর জায়গার নাম লেখা ৷ 68,69,70,71সালের পরপর সব তারিখ ৷ প্রায় কবিতাই মংলা থেকে লেখা ৷ আমি দোকানি ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, ও ভাই মংলা টা সিলেটে না ? দোকানি বললেন, না না মংলা তো খুলনায়! আমি যতই বলি যে, মংলা সিলেট যেতে পড়ে তিনি কিছুতেই মানতে চাইলেননা, অবশেষে বললেন, মংলাতে যে পোর্ট আছে দিদি ৷ তখন চুপ করলাম আমারই হয়ত ভুল হচ্ছে এই ভেবে ৷ পরে মনে পড়েছে, সত্যি তো! মংলা পোর্টের কথা ভুললাম কি করে! কিন্তু এখনও মনে হচ্ছে যে, সিলেট যেতেও একটা ছোট্ট ষ্টেশন পড়ে মংলাবাজার নামে ৷

সব কটি ষ্টলে ঘুরে ঘুরে বই দেখে, দোকানিদের সাথে গল্প গুজব করে, কি কি বই কিনব সেগুলো মনে মনে ঠিক করে নিয়ে যখন প্যাভিলিয়ন থেকে বেরোলাম বাইরে তখন রাত ৷ হেঁটে হেঁটে বেশ ক্ষিদে পেয়ে গেছে ৷ ক্ষিদেটা আরো বেড়ে গেল যখন চোখে পড়ল এক ষ্টলের পাশে এক ভদ্রমহিলা কাগজের প্লেটে করে চিকেন ফ্রাই খাচ্ছেন ৷ কিন্তু কোথা হতে তিনি ঐ চিকেন ফ্রাই যোগাড় করেছিলেন তা আর কিছুতেই খুঁজে পেলামনা৷ অগত্যা ক্ষিদে ভুলতেই হল ৷ আবার খানিক ঘোরাফেরা করে গেলাম অসীম কাকুর ষ্টলে ৷ ডালিয়াদির কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলাম ষ্টল নম্বর ৷ সেখানে গিয়ে অসীম কাকুকেই জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কি অসীম গুপ্ত আছেন ? তিনি হ্যাঁ বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে বললাম, সামরান ৷ ব্যাস ৷ লহমায় আলাপ জমে গেল৷ কথা কেবল শুরু হয়েছে চেনা গলার আওয়াজ শুনে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি মণিকুন্তলাদি ৷ সাথে তার দাদা ৷ ওরা এসেছেন অসীম কাকুর সাথে দেখা করতে ৷ হাসিমুখ মণিদির হাসি আরও বিস্তৃত হল আমাকে দেখে ৷ খানিক তাদের সাথে গল্প চলল৷ মণিদির দাদা দেখালেন তাদের বাবার লেখা একটা বই ৷ যার এটা তৃতীয় সংস্করন বেরিয়েছে বিকল্প থেকে৷ কি বই ? ও মা , পরিমল রায় নাকি মণিদির বাবা ৷ উনি রম্যরচনা লিখতেন জানি, কিন্তু কখনও পড়া হয়নি ৷ উনি মারা গিয়েছেন বহুকাল আগে ৷ মণিদির মা বের করেছিলেন দ্বিতীয় সংস্করন ৷ আর এবার এরা বের করলেন তৃতীয় সংস্করনটি ৷ একটি বই হাতে করে মণিদি নিয়ে এসেছিলেন, যা অসীম কাকুকে দিলেন ৷

আমরা বেরিয়ে এসে আবার যে যার পথে৷ আমি আবার মেলায় ঘুরছি ৷ আবার চোখে পড়ল বড় বড় হরফে লেখা, 'বাংলাদেশের বই' ৷ ঢুকে পড়লাম৷ বেশ বড় একটি ষ্টল ৷ যেখানে প্রচুর বই ৷ বেশিরভাগই পুরনো ৷ চোখে পড়ল 'সোজন বাদিয়ার ঘাট'৷ রকমারী সব বই৷ এক কর্নারে একটা লম্বা টেবিলে রাখা ছিল কিছু পশ্চিমবঙ্গের বই ৷ চোখ আটকে গেল একটি বইয়ে, 'থিয়েটার আরম্ভ সাড়ে সাতটায়' লোকনাথ ভট্টাচার্যের লেখা ৷ বেশ, বেশ পুরনো বই ৷ ধুলোমাখা ৷ পাতাগুলো হলুদ হয়ে এসেছে ৷ প্রথম পাতা খুলে দেখলাম প্রকাশকাল মে,1983৷ চারদিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম আর একটিমাত্র কপি দেখা যাচ্ছে৷ পরদিন কিনতে এসে যদি আর না পাই ? অতএব আজকে ' বই কিনবনা, শুধু ঘুরে দেখব' পণটি ত্যাগ করে চটজলদি মূল্য দেখলাম ৷ 16 টাকা ! বই নিয়ে সোজা কাউন্টারে৷ ডিসকাউন্ট বাদ দিয়ে দাম দাড়াল সাড়ে চৌদ্দ টাকায় ৷ এই মুক্তধারার ষ্টলেই দেখলাম এক লেখিকা বান্ধবীর চারখানা বই ৷ নাসরীনের ( জাহান ) বই আগেও চোখে পড়েছে প্যাভিলিয়নের ভেতরকার ষ্টলগুলিতে ৷ তসলিমা নাসরীনের বই দেখলাম শুধু একটি ষ্টলে ৷ এখানে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বেরুনো নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য ও আরও কয়েকটি বই যা ওখানেও ছাপা হয়েছে এবং এসেছে এই মেলায় ৷ কিন্তু ঐ বইগুলোর জায়গা কোন তাকে হয়নি ৷ বইগুলো রাখা আছে ফ্লোরের উপর, এক কোণে ৷ বাইরে থেকে দেখাও যায়না ৷ ভেতরে ঢুকে বই ঘাটছিলাম বলে চোখে পড়ল ৷

আজকের মত যথেষ্ট ঘোরা হয়েছে বলে যখন মনে হল তখনও বাকি বাংলালাইভের ষ্টলে যাওয়া ৷ অতএব বাংলালাইভের ষ্টলের খোঁজে মেলার গেটের দিকে যখন এগুচ্ছি ৷ আবার দেখা অসীম কাকুর সাথে ৷ এবার সাথে কাকিমা ৷ দুজনে বাড়ি ফিরছেন ৷ বলতে ভুলে গেছি, অসীম কাকুর কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলাম বাংলালাইভের ষ্টলের হদিস ৷ ওরা টা টা বলে এগুলেন গেটের দিকে৷ আমি গুটিগুটি পায়ে আইটির ষ্টলগুলোতে উঁকি দিচ্ছি তখন ৷ কাঙ্খিত ষ্টলটিতে ঢুকতেই একটি মেয়ে এগিয়ে এলেন৷ খানিক গল্পগাছা হল তার সাথে ৷ বাংলা চ্যাট কি, কিভাবে করতে হয় সেটা তিনি বুঝিয়ে দিলেন ৷ একটি ছেলে বসে কম্প্যুটারে বাংলা চ্যাট করছিল তাকে তুলে দেওয়া হল আমি বসব বলে ৷ আমিও বিসমিল্লাহ বলে বসে পড়ালম ৷ মিনিট পাঁচ চ্যাটও করলাম ৷ টাইপো হচ্ছিলো, তাই উঠে পড়লাম ৷ ফেরার তাড়াও ছিল ৷ আমি গিয়েছিলাম বাংলা সফটওয়ারের খোঁজে ৷ সেটার হদিস নিয়ে বেরিয়ে এলাম ৷ প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা মেলায় ঘুরে প্রচুর ধুলো খেয়ে হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো করতে করতে একমাত্র বইটি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত ন'টা ( আজ বাংলাদেশী টাইম লিখলাম)৷ 'থিয়েটার আরম্ভ সাড়ে সাতটায়' নিয়ে বসার আগে এই চিঠি লিখছি আর সমানে হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো করছি৷

Monday, September 04, 2006

বিসর্জন জন্ম


ABORTION DIALOGUES
==================


এক বিশাল হলঘর টিউবলাইটের সাদাটে আলোয় ফ্যাকাসে হয়ে আছে, ঘরের মাঝামাঝি সার সার ঝুলছে কতগুলো সাদাকালো ছবি, শুধু মুখের ছবি, প্রথম দেখে মনে হবে যেন শুন্যে ঝুলছে, ভালো করে দেখলে বোঝা যায় রূপোলি সুতোয় ঝুলছে ছবিগুলো, এক অদ্ভুত অনুভূতি হল ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে, অদ্ভুত এক গা ভূছমছমে অনুভতি, বলে বোঝাতে পারব না ঠিক কেমন। সবকটা ছবিতে একটি করে মেয়ের মুখ, কোন কোন ছবিতে মেয়েটি পেছন ঘুরে দাড়িয়ে আছে, শুধু তার মাথার চুলের ছবি, একদৃষ্টিতেই মনে হল, পৃথিবীর মুখ দেখতে চায়না বলে সে পেছন ফিরে দাড়িয়ে আছে,কিংবা উল্টোটও হতে পারে, সার সার মুখের ছবি, মাথার ছবি ৷

দেওয়ালের দিকে চোখ পড়তে দেখলাম হাতে লেখা কতগুলো কাগজ সাঁটানো আছে কাছে গিয়ে পড়ে দেখলাম, বিভিন্ন হাতের লেখায় একটি করে গল্প, অ্যাবরশনের গল্প, ছবির ঐ মুখগুলোর গল্প, পুরো দেওয়াল জুড়ে এরকম পঁচিশ/তিরিশটি মেয়ের গল্প, ছবির ঐ মুখগুলোর গল্প, তাদেরই হাতের লেখায় তাদেরই গল্প ৷

এই ছবিগুলো যার তোলা তার নাম, কোলেট কোপল্যান্ড, আমেরিকার মেয়ে, নিজের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন, ঐ ঝুলন্ত ছবিগুলোর একটা ছবির মুখ কোলেটের নিজের৷ কোলেট পনেরো বছর বয়েসে ধর্ষিতা হয়ে গর্ভবতী হন, মা বাবা তাকে নিয়ে যান গর্ভপাত করাতে, গর্ভস্থ সন্তানের সাথে সাথে কোলেট হারান আবার মা হবার ক্ষমতা, কোলেট আর মা হতে পারেননি৷ দেওয়ালে সাটানো একটি কাগজে লেখা কোলেটের ও গল্প ৷

সুতোয় ঝোলানো ঐ ছবিগুলো এরকমই সব মেয়ের,যাদের কেউ কেউ ধর্ষণের পর গর্ভপাতের শিকার, কেউ বা নিজের আর্থিক অক্ষমতার জন্যে গর্ভপাত করাতে বাধ্য হন, তো কারো প্রেমিক প্রেম তো করেন কিন্তু সন্তানের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন -যার ফলে গর্ভপাত ৷


কোলেট, ছোটখাটো দেখতে মিষ্টি এক মেয়ে, এক অসম্ভব মিষ্টি হাসি তার মুখে সারাক্ষন, শুধু চোখদুটি ছলছল করে ওঠে যখন সে তার নিজের মা হতে না পারার দু:খ প্রকাশ করে, গভীর এক বেদনার ছাপ তার নীল চোখে, পনেরো বছর বয়েসে পাওয়া আঘাতকে আজও সে বয়ে বেড়াচ্ছে৷ যে সব মায়েরা নিজের অনিচ্ছা সত্বেও সন্তান বিসর্জন দিয়েছেন জন্ম দেওয়ার আগেই, তেমনই কিছু মায়ের কথা, তাদের ছবি নিয়ে কোলকাতায় এসেছিলেন কোলেট ৷


********************

ঠিক এরকম না হলেও অনেকটা একই রকম এখানকার এক মেয়ের গল্প ৷ সুবর্ণা, বাইশ বছর বয়েসে যে দুই সন্তানের মা, তৃতীয়বার সন্তান সম্ভাবনা হয় যখন তার ছোট ছেলের বয়স মাত্র আট মাস, আগের দুই সন্তানেরই জন্ম হয়েছিল সিজারিয়ান অপারেশনে, সুবর্ণা তৃতীয়বার গর্ভবতী হয় তার নিজের স্বামী দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে৷ সুবর্ণার স্বামীর মত ছিল না গর্ভপাতে, আরো একটি পুত্রের আকাংখা ছিল তার, কিন্তু সুবর্ণা নিজের ও দুই সন্তানের কথা ভেবে নিজেই যায় গর্ভপাত করাতে, স্বামীটিও ছিলেন সঙ্গে অবশ্য। শারিরীক কিছু জটিলতা ছিলই, কিছুটা হয়ত ডাক্তারের অসাবধানতাও ছিল, ডাক্তার ব্যর্থ হন, প্রাণসংশয় হয় সুবর্ণার, প্রাণ বাঁচানোর জন্যে আবার অপারেশন হয়, কেটে বাদ দেওয়া হয় সুবর্ণার জরায়ু, তার অজ্ঞাতে। পরে তাকে জানানো হয়, কিছুটা জটিলতা দেখা দেওয়াতে একটা ছোট অপারেশন করতে হয়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসার মাস দুই পরে সুবর্ণা জানতে পারে তার অঙ্গহানির কথা, মানসিক ভারসাম্য হারায় সুবর্ণা ৷ সুবর্ণার বয়স তখন বাইশ৷

দীর্ঘকালের চিকিত্সায় কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে সুবর্ণা,হয়ত বেঁচে থাকার প্রবল আকাংখায় কিংবা সন্তানের মায়ায়৷ চেতনে অবচেতনে আজো সে বয়ে বেড়ায় সেই কষ্টকে, নিজের স্বামী কতৃক ধর্ষিতা হওয়ার কষ্ট, গর্ভস্থ সন্তানকে জন্ম দেওয়ার আগেই মেরে ফেলার কষ্ট, নিজের অঙ্গহানির কষ্ট ৷

********************

রুহিনা, ছোটবেলা থেকেই মায়ের হাত ধরে কাজ করতে আসত পাশের বড়বাড়িতে, ঐ বাড়িতে কাজ করেই সে বড় হয়, একদিন তার বিয়েও হয়ে যায়, কিন্তু ছ'মাসের মাথায়ই সে ফিরে আসে তার মায়ের কাছে, তার বর তাকে ফেলে পালিয়ে যায়৷ রুহিনা আবার কাজ করতে থাকে ঐ বড়বাড়িতে৷ সেই বাড়ির বড়মেয়ে রত্না যখন প্রথমবার সন্তানসম্ভবা হয়, রুহিনা আসে আতুঁড় সামলাতে রত্নার শশুরবাড়িতে। দুজনে প্রায় একই বয়েসী, একসাথেই খেলাধুলো করে বড় হয়েছে, রত্না সন্তানের জন্ম দিতে হাসপাতালে যায়, বেশ কিছুদিন তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, ছেলে কোলে রত্না বাড়ি ফিরে আসে, মাস দুই পরে রত্না বুঝতে পারে রুহিনা সন্তানসম্ভবা ৷ স্বামীর পরে অটল বিশ্বাস রত্নার, স্বামীকেই বলে, রুহিনার বোধ হয় বাচ্চা হবে ! রুহিনাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে রত্না তাকে নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন, রুহিনার পেটে তিন মাসের বাচ্চা! প্রচুর জেরা করেও রত্না জানতে পারেনা, কে এই সন্তানের পিতা।

রুহিনা মুখ বুঝে থাকে, রত্নার শশুরবাড়িরে লোকেরা রত্নাকে বোঝান, এ তোমার বাপের বাড়ির লোক, কি মুখ দেখাবে বাপের বাড়ি গিয়ে? শশুরবাড়ির বদনাম হবে! আঙ্গুল উঠবে তোমার স্বামী-ভাশুরের দিকে, কাজেই অ্যাবর্শন করিয়ে দাও৷ সদ্য মা হওয়া রত্না কিছুতেই মেনে নিতে পারে না এই ঘটনা, অশান্তি শুরু হয় রত্নার সংসারে, স্বামী- ভাশুর তাকে বাধ্য করেন রুহিনার গর্ভপাতে মত দিতে। রত্নার স্বামী নিজেই নিয়ে যায় রুহিনাকে হাসপাতালে, রুহিনা একটিও কথা না বলে গর্ভস্থ সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে আসে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর রুহিনা রাজকীয় আতিথেয়াতা পায় রত্নার শশুরবাড়ির সবার কাছ থেকে। রত্না কাকে সন্দেহ করবে? স্বামীকে ? ভাশুরকে ?  রুহিনার কাছ থেকে রত্না কোনভাবেই কথা বার করতে পারেনি, কে ছিল ঐ সন্তানের পিতা, রত্না কোনদিনই তা জানতে পারেনি, নিজের সংসার বাঁচানোর প্রচেষ্টায় রত্না রুহিনাকে পাঠিয়ে দেয় তার বাড়ি ৷

এর পরের ঘটনা আমার জানা নেই, কারণ রত্নারা এখন আর এখানে থাকেনা, রুহিনার কি হল সে কেমন আছে তা জানার ইচ্ছে থাকলেও আমি আর কোন খোঁজ পাইনি ওর ৷

'কাঁটাতার'


বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায়ের সিনেমা 'কাঁটাতার'৷ সিনেমাটি দেখে এসে অব্দি মাথায় ঘুরছে, হাওয়া অফিস৷ সুধা৷ রেহানা ৷ পিরানী ৷ একদিনে তিনটি জীবনের কাহিনী৷ কাঁটাতার৷ বেড়া৷ আর বেড়া ডিঙানোর গল্পো তো নতুন নয়৷ নদী, শাখা বিস্তারের ডালপালা তাদের কাছে এই অতিক্রম কত অনায়েস আর প্রাচীন৷ এক ভূখন্ডকে ভাগ করে কে দুই দেশ বানায়? মাথার উপরে একই আকাশ ৷ পায়ের তলার মাটিও এক ৷ মাঝখানে কাঁটাতার ৷ দুপাশে দুই দেশ৷ কাঁটাতার পেরিয়ে ওপারের মানুষ এপারে আসে, এপারের মানুষ ওপারে যায়৷ জীবিকার সন্ধানে ৷ নামের সন্ধানে ৷ পরিচয়ের সন্ধানে ৷ আশ্রয়ের সন্ধানে ৷

গ্রামের একপাশে নদী৷ সেখানে এক হাওয়া অফিস ৷ অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য ৷ তার উপর যেন অপারেশনের দাগের মত পড়ে আছে কয়েক ছড়া কাঁটা তার ৷ কত কষ্টে এই জীবনযাপন সীমান্তবর্তী পটাশপুরের৷ গাছেরা সব দাঁড়িয়ে বুকজলে ৷ চলাচলের রাস্তাটি যেন সরু সিঁথিটির মত পড়ে থাকে প্লাবনের জলে ৷ হাওয়ার দিক নির্ণয়ের কাজ করে বিনোদ ৷ আছে এক সহকারী ৷ যে বেলুনে গ্যাস ভরে আর উড়িয়ে দেয় আকাশে ৷ বিনোদ কাগজে লিখে দেয় সেদিনকার বাতাসের গতিবেগ, ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস ৷ সহকারীটি সেই কাগজ নিয়ে পোষ্ট অফিসে গিয়ে টেলিগ্রাম করে আসে শহরে ৷ আসা যাওয়ার পথে সে দেখে জীবন ৷কোর্ট ৷ সেখানে ঠিকানা বিহীন ছিন্নমূল নারী অনুনয় করে উকিলবাবুকে ৷ উকিলবাবু উচ্চমূল্যে তাকে পরামর্শ দান করেন, সে যেন আগে নাম ঠিকানা যোগাড় করে আনে৷ ধর্ম ও ৷ রোকসানা খাতুনের বদলে কোন হিন্দু নাম ৷ যাতে করে রীশন কার্ড বানানো সহজ হবে ৷ ভোটের ছবি তোলা যাবে৷ ওগুলো ছাড়া করে প্রমাণ হবে সে কে ? ঝড় ওঠে ৷ তামাম পৃথিবীর দস্তাবেজ উড়ে বেড়ায় কোর্ট চত্ত্বরে ৷ মুহুর্তের ঝড়ে সব একাকার ৷

গ্রামের রাস্তায় মিলিটারি ট্রাকের কনভয় চলাচল করতে থাকে ৷ ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা চাই ৷ পাথর ফাটিয়ে, বোল্ডার ভেঙে কর্কশ শব্দে তৈরী হতে থাকে রাস্তা ৷ এক প্রবীন গ্রামবাসী তার অতি পূরাতন বন্দুকটির লাইসেন্স নবীকরণের জন্যে একের পর এক চিঠি লিখিয়ে যান পোষ্ট অফিসের সামনের টাইপিষ্টকে দিয়ে ৷ টাইপিষ্ট বিরক্ত ৷ কত চিঠি সে টাইপ করবে? কিন্তু বন্দুকের মালিকটি বিরক্ত নন৷ তিনি কি পারিশ্রমিক দেন না? সব পুষিয়ে দেবেন তিনি ৷তার কাছে বরং কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা অনেক জরুরী হয়ে পড়েছে ৷ তিনি একের পর এক চিঠি টাইপ করিয়ে যান বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ৷ অক্লান্ত ৷

হাওয়া অফিসের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে একদিন এসে হাজির হয় সুধা ৷ রান্না করে দেয় বিনোদ ও তার সহকারীর জন্যে ৷ সহকারীটি ভয় পায়, রান্নার লোক রাখলে তো মাইনে দিতে হবে ৷ তারা মাইনে কোথা থেকে দেবে? সুধা মাইনে চায়না ৷ সুধা সুন্দরী ৷ যৌবনবতী৷ বিনোদ ক্রমশ জড়িয়ে যেতে থাকে সুধার সাথে শরীরী সম্পর্কে৷ সুধা নিশ্চিন্ত হয় ৷ সে গল্প করে, তার তিনটি জীবন ৷ সকালে একটি,দুপুরে একটি আর রাতে আরেকটি ৷ ধর্মও তাই ৷নদীর পারে বিনোদ হাওয়ার গতি দেখে যন্ত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে৷ সহকারী বেলুন ওড়ায় ৷ বিনোদ কাগজে লিখে দেয় হাওয়ার গতিবেগ ৷ সহকারী সাইকেলে চেপে গ্রামে যায় ৷ পোষ্ট অফিস, কোর্টচত্তর ঘুরে আসে৷ সেখানে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে মাঝে মাঝে কিছু উপরি মেলে তার ৷ বোরখাপরা এক মহিলাকে কোমরে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে আসে পুলিশ৷ তার কোলে শিশু৷ সে নাকি দেশের গোপন খবর পাচার করে কাঁটাতারের ওপারে ৷ প্রশ্ন জাগে মনে, ঐ শিশুটির কি হবে? সে কি করে জেলে থাকবে ?

ট্রাকে চেপে গণিকারা আসে গ্রামে৷ গ্রামে যে মিলিটারি এসেছে৷ তাদের শরীরের ক্ষিদে মেটাতে হলে যে মেয়ে চাই ৷ এত মেয়ে আসবে কোথা থেকে? হাস্যে লাস্যে শরীর প্রদর্শন করতে করতে গ্রামে ঢোকে গণিকারা ৷ হৈ চৈ এলাকা জুড়ে, সরগরম কোর্টরুম চত্ত্বর ৷ বোল্ডার - মেশিন এখন আরও দ্রুত চলে ৷ প্রবীন সেই গ্রামবাসী এবার টাইপিষ্টকে নিয়ে আসেন নদীতীরে ৷ যেখানে বসে নিশ্চিন্তে চিঠি লেখানো যাবে কখনো প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তো কখনো অর্থমন্ত্রীকে৷ টাইপিষ্ট যেহেতু টাকা পায় তাই অনিচ্ছা সত্বেও বসে বসে সকাল হতে সন্ধ্যে অব্দি চিঠি টাইপ করে৷ বিনোদ আর সুধার শরীরী প্রেম দেখে চঞ্চল হয় সহকারীটি ৷ রাতে সে যায় গণিকালয়ে৷ টাকার বিনিময়ে সে নারীসঙ্গ কিনতে যায়৷ কিন্তু মিলিটারি এসে পড়ায় তাকে ফিরে আসতে হয় ৷ রাতের অন্ধকারে মিলিটারি হানা দেয় গ্রামে ঘরে ৷ মেয়েরা দৌড়োয় সম্ভ্রম বাঁচাতে৷ পালিয়ে বাঁচতে চায় মিলিটারির হাত থেকে৷ বুটের শব্দে রাতের নিস্থব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে মিলিটারি তাড়া করে গ্রামের মেয়ে-বৌদেরকে৷ প্রবীন গ্রামবাসিটি তার অকেজো বন্দুক তাক করেন তার ঘুমন্ত বৌর মাথায় ৷ হানাদারের কবলে পড়ার আগে তিনি নিজেই মেরে ফেলতে চান বৌকে৷ কিন্তু বন্দুক যে অকেজো ৷ জং ধরানো ৷ আওয়াজ করে কিন্তু গুলি বেরোয়না ৷

উকিলবাবু হাওয়া অফিসে আসেন বিনোদের সহকারীকে ডাকার জন্যে, তাকে দিয়ে কোর্টে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়াবেন তিনি ৷ সুধাকে দেখে তিনি চিনতে পারেন ৷ জিজ্ঞাসা করেন বিনোদ কোথায়? বিনোদকে না পেয়ে তিনি তার সহকারীকে বলে যান, ও সুধা নয়, ও রেহানা ৷ ও পিরানী ৷ ওর যতগুলো নাম ততগুলো ধর্ম ৷ ভীত, সন্ত্রস্ত সুধা বিনোদকে শোনায় তার তিনটি জীবনের গল্প ৷ এর পরের অংশ ফ্ল্যাশব্যাক ৷ কিন্তু বাপ্পাদিত্য কি দেখাবেন, সহস্র যুগের প্রেম ভালোভাসার দর্পণ? কাঁটাতার তো তার জন্যে নয় ৷ ছিল সে পিরানী ৷ ক্ষিদে, অভাব তাকে নিয়ে যায় কোলিয়ারীতে ৷ ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন পুরুষের লালসার আঁচ পাওয়া পিরানী কোলিয়ারীতে কাজ করতে এসেই নজরে পড়ে ঠিকাদারের৷ ঠিকাদার স্বপ্ন দেখায়৷ ঘর বাঁধার৷ নিজের ঘরনী ও তিন সন্তানকে ফেলে ঠিকাদার পিরানীকে নিয়ে পালায় ৷ এক পরিত্যাক্ত প্রাসাদের এক অংশে পিরানী তার গেরস্থালী সাজায় ৷ ডগমগ পিরানী মহানন্দে বৃষ্টিতে ভেজে ছাদবিহীন সেই ঘরে ৷ একদিন সেখানে আসে মজিদ৷ মতিবিবির খোঁজে৷ পিরানী জানায় মতিবিবিরা এখানে নেই, চলে গেছে অন্য কোথাও৷ মজিদ টাকার বিনিময়ে একটি কাগজে মোড়ানো প্যাকেট রাখতে দেয় পিরানীকে৷ অভাবের সংসার চালাতে গিয়ে ইতিমধ্যেই ঠিকাদারের সাথে মনোমালিন্যে ব্যাতিব্যস্ত পিরানী টাকার লোভে মজিদের চোরাচালানের সঙ্গী হয়ে পড়ে৷ ঠিকাদার যখন বাড়িতে থাকেনা তখন আসে মজিদ৷ নিজের কথা বলে৷ প্যাকেট রাখে, নিয়ে যায়৷ পিরানী টাকা পায় ৷ এভাবে বেশিদিন চললনা৷ পিরানী ধরা পড়ে যায় ঠিকাদারের হাতে৷ পিরানী পালায় তার পুঁটুলিটি হাতে করে৷ মজিদ তাকে সাথে করে নিয়ে যায়৷ সেও পিরানীর যৌবনে আকৃষ্ট ছিল ৷ পিরানী নতুন নাম পায় ৷ রেহানা ৷ সে এখন রেহানা৷ এক বোরখা পরা মুসলিম নারী ৷ মজিদ আর রেহানা দুজনে একসাথে কাজ করে৷ কাঁটাতারের ওপার থেকে প্যাকেট নিয়ে আসে ৷ নিয়ে আসে বিদেশী টাকা ৷ চড়াদামে বিক্রি কিরে এপারে ৷ একদিন ধরা পড়ে যায় মজিদ৷ বন্দি হয় জেলে ৷ রেহানা বহু চেষ্টা করেও মজিদকে ছাড়াতে পারেনা জেল থেকে, যদিও মজিদ রেহানাকে আগেই বলেছিল, কোন জেলেই নাকি তাকে দু/তিন দিনের বেশি থাকতে হয়না ৷ জামিন পেয়ে যায় ৷ কিন্তু এবারে আর জামিন পেলনা ৷ কারন মজিদের কেস কোর্টেই তুললনা থানার দারোগা ৷ সে টাকা খেল, রেহানার যৌবন খেল, কিন্তু মজিদকে ছাড়লনা ৷ একদিন মজিদকে কোথাও চালান করে দেওয়া হল কিন্তু থানার খাতায় মজিদের নাম এন্টি হ্লনা ৷ রেহানা আবার পথে ৷ আবার সে নিরাশ্রয় ৷ পথ চলতে গিয়ে সে বহু পুরুষের লালসার শিকার হল৷ কারও সাথে সে গেল, কারও সাথে গেলনা ৷ হাঁটতে হাঁটতে সে পৌছুলো নদীর ধারের ঐ হাওয়া অফিসে৷

এবার সে সুধা ৷ লাল শাড়ি কুঁচিয়ে পরা ৷ দু হাতে কাঁচের চুড়ি ৷ বিহ্বল বিনোদ সুধাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়৷ সুধা রাজী হয়না ৷ সেখানে যে রেহানা এসে পড়বে ৷ সুধার অতীত ৷ বিনোদ সুধাকে অনুরোধ করে সে যেন না যায় ৷ পরদিন সকালে মিলিটারি জিপ এসে দাঁড়ায় হাওয়া অফিসের পাশে ৷ উর্দিপরা একটি লোক এসে জিজ্ঞাসা করে ছড়ি উঁচিয়ে, এই মেয়েটি কে? বিনোদ জবাব দেয়, ও সুধা ৷ তাবুর ভেতর তল্লাশী চালিয়ে পাওয়া যায় একতাড়া বিদেশী টাকা৷ মিলিটারিরা নিশ্চিন্ত হয়, তাদের পাওয়া খবর সঠিক ছিল ৷ সুধাকে জিপে বসিয়ে নিয়ে যায় তারা ৷ যথারীতি বেলুন ওড়ে আকাশে, বিনোদের ইচ্ছের বাইরে ঘটে আবহাওয়ার সুক্ষ পরিবর্তন ৷

বোরখা পরা একটি মেয়ে হেঁটে আসে কাঁটাতারের ওপার হতে ৷ কাঁটাতার পেরিয়ে সে এপারে আসবে নাম,ঠিকানা ও কাজের সন্ধানে ৷ এখানে কি শেষ হয় সিনেমাটা? খুব ভাল লেগেছে আবহ সঙ্গীত ৷ যতবার সুধা,রেহানা, পিরানী এসেছে, গেছে কোথাও, মৃদু লয়ে বেজেছে, কোন বা দ্যাশে শে যাও গো কন্যা, কোন বাতাসে যাও ৷ যতবার পিরানী, রেহানা, সুধা কোন পুরুষের কাছে আশ্রয়ের জন্যে গেছে ততবার বেজেছে, চাঁদবরনী কন্যারে তোমরা গোসল করাও রে ...৷ 'গোসল' একটা মানুষকে তিনবার দেওয়ানো হয় ৷ একবার জন্মের পর ৷ একবার বিয়ের সময় ৷ আর একবার মৃত্যুর পর ৷ অভিজিত বসুর কথা ও সুর মনকে ভারী করে তোলে ৷ গোটা সিনেমায় আশ্চর্য সুন্দর সব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায় ৷ খুব ভাল লেগেছে প্রবীন সেই গ্রামবাসীর চরিত্রে প্রদীপবাবুর অভিনয় ৷ অসাধারণ অভিনয় করেছেন রুদ্রনীল ৷ সহকারীর ভূমিকায় ৷ শ্রীলেখা পারফেক্ট ৷ পিরানীর রূপ-যৌবন যথার্থ ফুটে উঠেছে শ্রীলেখার মাঝে ৷ উকিলবাবুর চরিত্রে নিমাই ঘোষ এককথায় অসাধারণ ৷ 'কাঁটাতার' শুধু হলে বসে সোয়া দু ঘন্টায় দেখেই শেষ হয়ে যায়না ৷ আর এখানেই বাপ্পাদিত্যবাবুর কৃতিত্ব ৷ তার সিনেমা ভাবতে বাধ্য করে ৷ ভাবায়৷

দ্বীপের মধ্যে দাড়িয়ে


আমাদের গ্রামের বাড়িটা এমন একটা জায়গায় যে বর্ষার জল এলে বাড়িটা একটা দ্বীপের মধ্যে দাড়িয়ে আছে বলে মনে হয় ৷

বাড়ির তিনপাশে জল ৷

যেমন পৃথিবীর চারপাশে থেকেও ভাগের হিসেবে তিনভাগ ৷

সে এক অদ্ভুত সুন্দর ৷

বছরের মোটামুটি চার মাস ঐ জল থাকে ৷

ইউনিয়ন বোর্ডের কাঁচা রাস্তার সাথে যে সাঁকোটি আমাদের বাড়ির যোগসুত্র রক্ষা করে, আমার ছেলেবেলায় সেই সাঁকোটি ছিল না, যদিও সাঁকো অনেকগুলি ছিল সারা ছেলেবেলা জুড়ে ৷

তখন ' সুদিন 'এ  খাল পেরিয়ে রাস্তায় উঠতে হত আর বর্ষায় নৌকো করে সেই খাল পেরুনো ৷ যে বছর বন্যা হয়-
যদিও প্রতিবারই হয়, সে বছর ইউনিয়ন বোর্ডের ঐ রাস্তাটিও ডুবে যেত, তখন প্রায় এক কিলোমিটার মত রাস্তা নৌকোতেই যাওয়া, তারপর বড় রাস্তা৷ সি এন্ড বি'র পাকা সড়ক৷ এশিয়ান হাইওয়ে৷ যত বন্যাই হোক, ঐ রাস্তার বেশ নিচেই থাকত জল ৷

প্রতি সপ্তায় বাবার বাড়ি যাওয়া বাঁধা ছিল, প্রায়শই সঙ্গে থাকতাম আমি, বন্যাই হোক আর বর্ষার জলই জমুক, বাবার বাড়ি যাওয়া আটকাত না আমার ও না ৷

তেমনই এক বন্যার সময়৷আমরা তখন সিলেটে, বাবা বাড়ি এসেছেন সপ্তাহান্তে সাথে আমি আর ভাইয়া৷ ছোটফুপুকে নিয়ে আমরা ফিরে যাব সিলেটে৷ সিলেট থেকে আমাদের গ্রামের দুরত্ব একশ পাঁচ মাইল, সবচেয়ে কাছের রেলষ্টেশনটি গ্রাম থেকে
ঠেরো মাইল দুরে৷ ট্রেন থেকে নেমে আমাদের এক আত্বীয়ের বাড়িতে দুপুরের খাওয়া সারার পর খোঁজ নিয়ে জানা গেল রাস্তা অর্ধেকেরও বেশি জলে ডুবে, কোন গাড়ি চলছে না, নৌকো করে যেতে হবে ঐ আঠেরো মাইল৷ বাবা বেরিয়ে নৌকোর ব্যবস্থা করে এসে আমাদের দুই ভাই-বোনকে নিয়ে নৌকোয় বসলেন৷ গ্রামের ভেতর ভেতর দিয়ে মাঝি নৌকো চালাল, বাবা বারণ করে দিয়েছিলেন বিলের ওপর দিয়ে যেন না যায়, আগাই নামে এক বিল আছে, যাতে ঢেউ থাকে খুব, নৌকোয় উঠেই আমি ঘুম৷ বাবা যখন ডেকে ঘুম ভাঙালেন, তখন বাড়ির ঘাটে নৌকো৷ বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, তখনো  গ্রামে ইলেকট্রিসিটি পৌছয়নি, টিমটিমে হ্যারিকেন বাতি জ্বলে সবার ঘরে ঘরে৷ দাদু বেশ রাগ করলেন বাবার ওপর, এই বন্যায় কেন আমাদের নিয়ে এলেন ৷

মাঝে একদিন থেকে তার পরদিন ফেরা, এবার সাথে ফুপু৷ বাবা আগের দিন গিয়ে নৌকো ঠিক করে এলেন তিতাস থেকে, সেখানে পানসিরা সব অপেক্ষা করে দূরে যাওয়ার জন্য৷ ভোর ভোর উঠে চাচি
ম্মা ভুনা খিচুড়ি আর ভুনা মুর্গী রেঁধে দিল দুপুরে খাওয়ার জন্যে৷ আমি ছোটফুপুকে বললাম, কেন চাচিম্মা রান্না করে দিচ্ছে? তুমি তো যাচ্ছ সাথে, মাঝিরা যেমন নৌকোয় রেঁধে খায়, তেমন করে আমরা কেন খাব না? ফুপু বোঝাল, ওরা নৌকোতেই থাকে তাই রাঁধে, আমরা একবেলার জন্য নৌকোয় রাঁধব? খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে নৌকোয় রেঁধে খাওয়ার বায়না ছাড়তে হয়েছিল কিন্তু পরক্ষণেই আবার খুশি, রান্না হবে না তো কি হয়েছে? খাওয়া তো হবে! ফুপু একটা ঝুড়িতে খাওয়ার জল, থালা, বাটি গেলাস নিয়ে নিল আর টিফিন ক্যারিয়ারে চাচিম্মার দেওয়া খাবার৷ আমরা বেশ পিকনিক পিকনিক মুডে নৌকোয় চাপলাম৷ দাদু বড়কাকাকে বললেন আমাদেরকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসতে৷ দাদু, দাদী, চাচিম্মা ও আর সবাই বেশ চিন্তিত, উদ্বিগ্ন মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বাড়ির ঘাটে ৷ যতদুর দেখা যায় ওরা দাঁড়িয়েই ছিল ৷

আমি আর ভাইয়া ফুপুকে বললাম গল্প শোনাও, ফুপু গল্প শোনাল বেশ কয়েকটা, এরই মাঝে কানে আসছিল মাঝির সাথে বাবা, কাকার কথা-বার্তা৷ নৌকো আগাই বিলের পথ ধরে যাচ্ছিল, আমাদের বিকেলের ট্রেন ধরার কথা৷ আমরা শুধু বাবার কাছে গল্প শুনেছি এই বিলের, বর্ষায় যা নাকি সমুদ্রের চেহারা নেয়৷ প্রতি বছরই বেশ কিছু নৌকাডুবি হয়, বাতাস ছিল না সেদিন, আকাশের কোথাও মেঘের কোন চিহ্ন ও ছিল না, তবু বাবা বেশ চিন্তিত মুখে বসেছিল ৷ আমরা ছই এর ভেতরে মাঝিদের পেতে দেওয়া বিছানায় শুয়ে বসে গল্প করছিলাম, হাল্কা ঢেউএর দুলুনি বেশ সুন্দর এক আমেজ তৈরি করেছে৷ বাইরে তাকালে দূর দূর পর্যন্ত কোথাও কোন গ্রাম কিংবা গাছপালার চিহ্ন ও চোখে পড়ছে না, মাঝি জানান দিল আগাইয়ের কাছে এসে পড়েছি, আপনারা খাওয়া দাওয়া সেরে নিন তার আগে৷ মাঝি এ ও জানান দিল বেশ হাওয়া উঠেছে ৷ ততক্ষণে বাবার মুখ থমথমে হয়ে উঠছে ৷

আমরা ও চুপ করে গেছি, ঢেউ এর দুলুনি বাড়ছে, এতক্ষণে ভয় করতে শুরু করল, নৌকোতে পাল ছিল, বাবা মাঝিকে বলল পাল নামিয়ে দিতে, নৌকো যত এগুচ্ছে, ঢেউ তত বাড়ছে, আকাশ তখনও পরিষ্কার কিন্তু জোর হবাতাস! , প্রচন্ড ঢেউয়ে নৌকো ততক্ষণে একটা খেলনা ৷ ফুপু সজোরে দরুদ পড়ছে, কাকা ভেতরে এসে আমাকে কোলে নিয়ে বসেছে, কারণ আমি কান্না আরম্ভ করেছি, ভাইয়া
ফুপুকে জড়িয়ে ধরে ফুপুর কোলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে ৷

আমাদের যেদিকে যাওয়ার কথা, ঢেউটা আসছিল সেদিক থেকেই, যে কোন মুহুর্তে নৌকো উল্টানোর সম্ভাবনা ৷ বাবা মাঝিকে বলল, উল্টোদিকে নৌকো ঘুরিয়ে দিতে, মাঝি তখনও বলছে, তাহলে আজকে আর পৌছুতে পারবেন না, বাবা চেঁচিয়ে উঠে বলল বচ্চাদুটো আছে সাথে, তুমি নাউ ঘোরাও ৷ বাবা গিয়ে হাল ধরে বসল, আর প্রাণপণে সেই হাল ধরে বসে রইল ৷ দুই ঘন্টা ধরে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ চলল, আমরা ভেতরে মৃতবৎ৷ অনেকক্ষণ নাকি অনন্তকাল পর শুধু অনুভব করলাম ঢেউয়ের ঐ উন্মাদনা একটু যেন কমল ৷ মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম, জল একটু শান্ত, আর এই দুঘন্টায় বাবা এই প্রথম কথা বলল, এমু, আমরা আগাই পার করে এসেছি, আর কাঁদে না ৷

দূরে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে, বাবাও জানে না যে ঐ বাতাস আর ঢেউ আমাদের নৌকোকে কোথায় নিয়ে এসেছে, মাঝিকে জিজ্ঞেস করে বাবা জানল, যে গ্রামটি দেখা যাচ্ছে তার নাম নর্‌হা৷ কাকা বলল এখানে আমাদের এক আত্মীয় বাড়ি আছে, সেখানে যাওয়া যেতে পারে ৷

দুজন মাঝি আর বাবার জামা কাপড় কিছুই শুকনো ছিল না, ফুপু তোয়ালে বের করে দিল বাবাকে, বাবা বলল, আগে নামি তারপর ৷ হাঁটুজলে নেমে বাবা একে একে আমাকে আর ভাইয়াকে কোলে করে নামাল ৷ ফুপু নিজেই নামল কাপড় ভিজিয়ে ৷

যে বাড়িটিতে আমরা গেলাম, সেটা কাকিমার এক দিদির বাড়ি, তারা আমাদেরকে দেখে ভীষণ অবাক, বাবা এই বাড়ির বড়দের কাছে আর একপ্রস্থ বকুনি খেল কেন এই ভরা বর্ষায় ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরুল আর সাথে সাথেই বাবা প্রচুর বাহবা ও পেল, ঐ বাতাস আর ঢেউ এর মাঝে নৌকো বাঁচিয়ে তীরে নিয়ে এসেছে বলে, মাঝিরা তো পরিষ্কার বলে দিল,  আজ সাহেব হাল না ধরলে তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না নাউ নিয়ে বেঁচে ফেরার ৷

ঐ বাড়িতে খানিক বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার বেরুলাম, গৃহকর্তা অনুরোধ করছিলেন আমরা যেন রাতটা থেকে পরদিন রওয়ানা হই৷বিকেলের ট্রেন ততক্ষণে চলে গেছে, উল্টোদিকে এসে পড়ার দরুন এখন বেশ অনেকটা পথ আবার নৌকোয় গিয়ে রাতের মেল ট্রেন ধরে সিলেট পৌছুতে পরদিন সকাল হবে ৷ তাই আর দেরী না করে আমরা আবার নৌকোয়৷ এবার আর নৌকোয় চাপতে চাইছিলাম না, বাবা বুঝিয়ে শুনিয়ে কোলে করে নৌকোয় তুলল ৷

  ভাইয়া তখন বাহাদুরি দেখাচ্ছে সে একটুও ভয় পায়নি এই বলে, ফুপু ও বলছে, সেও নাকি ভয় পায়নি কিন্তু আমি কান্নার ফাঁকে ঠিক দেখেছিলাম ফুপুও কাঁদছে ৷ সন্ধ্যে হয়ে গেল ষ্টেশনে পৌছুতে পৌছুতে ৷ ট্রেন আসবে রাত এগারটায়, ওয়েটিং রুমের বেঞ্চেবাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ঘুমচোখে আমি, পরের বার বাবা বাড়ি আসার সময় আমাকে সাথে করে নিয়ে আসবে কিনা মাথায় সেই চিন্তা ৷ কারণ বাবা দু বার বকুনি খেয়েছে আমাদের সাথে নিয়ে এসেছে বলে ৷ কানে কানে ফুপুকে জিজ্ঞেসও করে ফেললাম কথাটা৷ ফুপু তখন বলল, অত ঘাবড়াস না ৷ ঠিক নিয়ে আসবে তোকে ৷ নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়েই ঘুম ৷

ট্রেন কখন এসেছে, কখন বাবা কোলে করে ট্রেনে তুলে সিটে শুইয়ে দিয়েছে, কখন কাকা চলে গেছে কিছুই জানতে পারিনি৷ ঘুম ভেঙেছে সকালে বাবা যখন ডেকে তুলেছে, ট্রেন তখন সিলেট ষ্টেশনে ঢুকছে ৷

আলাদা কিছু ছিল বলে


গত দু দিন কিছু পড়া হয়নি, নানা অকাজে কি করে সময় বয়ে যায় বুঝতেই পারি না, কিছুদিন ধরেই এটা হচ্ছে, কি যে করছি নিজেও জানি না, অথচ সময় পাচ্ছি না এমনকি মজলিশ পড়ার জন্যেও! যা পড়তে সময়ই লাগে না ৷

আজ যত রাতই হোক পড়বই এই পণ নিয়ে বসেছি বেশ কিছু পাতা নিয়ে, যে সব পাতায় কদিন শুধু চোখ বুলিয়ে গেছি, পড়া হয়নি। বেশ রাত হয়ে গেছে, মন দিয়ে পড়ছি সঙ্গীতা, শ্রেয়া, কৌস্তুভ, জয়তী ও আরো সবার লেখা৷ শ্রেয়ার একটা চিঠি পড়ে এক পুরনো ঘটনা লিখেও ফেললাম, এমন সময়ে এসএমএস৷ নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে এক বন্ধুর বার্তা ৷

পাশের ঘরে মেয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে বন্ধুদের ফোন করার জন্যে, কিন্তু নেটওয়ার্ক জ্যাম, তাই সে বাধ্য হয়ে মন দিয়েছে পড়ার বইয়ে ৷ বাইরে একের পর এক হাউই ছুটেছে আকাশের দিকে, সশব্দে৷ আলোয় আলোয় আলোকিত আকাশ, রাতের আকাশ৷আবার এসএমএস, সায়ন্তন৷ সে একঝাঁক হাসিমুখ তারা পাঠিয়েছে আমার জানালার বাইরে , শুভেচ্ছাবার্তা দিয়ে ৷

মেয়ের ফোন জ্যান্ত, বন্ধুরা সব শুভেচ্ছা বিনিময়ে ব্যাস্ত৷ মনে করার চেষ্টা করছিলাম আমার ছোটবেলার নতুন বছরের দিনের কথা,যা মনে পড়ছে সে সব পয়লা বৈশাখের স্মৃতি ৷

একত্রিশে ডিসেম্বর কিংবা ফার্ষ্ট জানুয়ারি বলে আলাদা কিছু ছিল বলে এখন অন্তত কিছু মনে পড়ছে না ৷ হ্যাঁ৷ বাবার ব্যবসার সুত্রে তার বিদেশী ব্যবসায়ী বন্ধুদের কাছ থেকে কার্ড আসত আর আসত তাদের ক্যালেন্ডার৷ রঙ-বেরঙের ঝকঝকে, অপূর্ব সুন্দর সব ক্যালেন্ডার৷ বেশিরভাগই প্রাকৃতিক দৃশ্যের, কিছু কিছু থাকত মেয়েদের ছবি দেওয়া তাদের প্রোডাক্টের ছবি ৷ নভেম্বর মাসেই সেসব কার্ড আর ক্যালেন্ডার এসে যেত, নতুন বছরে শুধু সেই ক্যালেন্ডার টাঙিয়ে দিতাম৷ কার্ডগুলো ও আমার দখলে আসত ৷

ডিসেম্বরে বাৎসরিক পরীক্ষার পর স্কুল ছুটি থাকত ক'দিন, আর ছুটি মানেই দেশের বাড়িতে দাদা-দাদীর কাছে বেড়াতে যাওয়া ৷ সেখানে ধোঁয়া ধোঁয়া শীত, উঠোনে কাটা ফসলের পাহাড়, সদ্য ঘরে ওঠা নতুন চালে সকালে চিতই, বিকেলে ভাপা পিঠে, আজ পুলি তো কাল  শুটকির ভর্তার পুর দিয়ে ভর্তাপিঠে ৷ পুকুরের হিম ঠান্ডা জলে ঠকঠক কাঁপুনি সহ স্নান, কাকিমার বকুনি, উঠোনের মিঠে রোদে বসে চুল শুকোতাম হাতভর্তি কুল নিয়ে ৷ পাশের বাড়ির দাদী কে পটিয়ে তার গাছ থেকে পেড়ে আনা পাকা পাকা হলুদ হলুদ কুল৷ সন্ধ্যেবেলা খড়ের আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে হাত সেঁকা আর কাজের বুয়াদের কাছে গল্প শোনা, গফুর বাদশাহ আর বানেসা পরীর গল্প, কাঞ্চনমালার গল্প, রকমারি সব জ্বীনের গল্প, পরীদের গল্প, কাকে যেন জ্বীনে তুলে নিয়ে চলে গিয়েছিল সেই পরীস্থানে, সে কি করে ফিরে এলো, সেই গল্প৷ রাতে খাওয়ার পাট আমার ছিল না, সন্ধ্যেবেলাতেই তো পিঠে খেয়ে রাতের খাওয়া হয়ে যেত, দাদী রাতের নামাজ , খাওয়া সেরে যখন ঘুমোতে আসতেন, আমি তখন লেপের তলায়, তার জন্যে অপেক্ষা করছি, সেই পরীদের দেশ থেকে ফিরে আসা মেয়েটির গল্প দাদীকে শোনাব বলে৷ রাতে কখ্‌খনো খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাতাম না, যদি জ্বীন কিংবা পরী দেখে ফেলি সেই ভয়ে৷ লেপের ভেতরে মুখ গুঁজে ঘুমোতাম, জ্বীন,পরী যদি ঘরে এসে ঢোকে, তাহলেও যেন দেখতে না হয়, কিন্তু একটা সান্ত্বনা ছিল, ওরা নাকি ঘরে ঢোকে না !

ডিসেম্বর আর জানুয়ারির হিসেব রাখতাম পরীক্ষা শেষ হলে দেশে যাব বলে..

Sunday, June 25, 2006

আ মা র পি ছু ছা ড়ে না



বেড়ালদের আমি কক্ষণও বিশ্বাস করি না, ওরা হচ্ছে সব ভূতের বাহন৷ কোনটা যে বেড়াল আর কোনটা যে ভূত চেনার তো কোন উপায় নেই তাই সব বেড়ালই থাকত আমার সন্দেহের তালিকায়৷ আর সেই বেড়াল যদি কোনক্রমে একবার পায়ের তলা দিয়ে চলে যেতে পারে তাহলে মৃত্যু অনিবার্য৷ মৃত্যু যে কি করে হবে আর কখন হবে তা কেউ টেরটিও পাবে না৷ এই তো কিছুদিন আগেকার কথা , বাবার এক বন্ধুকে বিড়ালবেশী ভূত মেরেই ফেলল৷ একেবারে গলার নলী খামচে ছিঁড়ে নিল৷ আর সেই তারেকচাচা কিছুই করতে পারল না৷ পারবে কি করে? ভূত জীনদের সাথে কেউ কখনো পারে? হামদু চাচি- আমাদের হামিদ চচার বউ এসেছিল ছোটকাকার বিয়ের সময়৷ সে শিখিয়ে দিল যখনই মনে হবে ভূত আশে পাশে আছে তখনই মন্ত্রটা পড়তে হয়৷ তাহলেই নাকি ভুতেরা জেনে যাবে যে এর কাছে তো মহামন্ত্র আছে, এর কোন ক্ষতি করা যাবে না৷
ভুত আমার পুত
পেত্নি আমার ঝি৷
শাকচুন্নি সখি আমার
করবি আমার কি?

তাই আমি কোন বিড়ালকে আমার পয়ের তলা দিয়ে যাওয়ার কোন চান্স দিই না৷ খেতে বসলে দুটো পা'ই চেয়ারের উপর তুলে পা ভাঁজ করে বসি৷ কিন্তু বেড়ালও তো আমার পিছু ছাড়ে না৷ সুযোগ পেলেই কটকট করে তাকিয়ে থাকে৷ জানান দেয় যে ওরা আমার মতলব সব বুঝতে পারছে৷ ছোটবেলা থেকেই বেশ ভীতু আমি৷ সমবয়েসী বন্ধুদের বলা বিভিন্ন টুকরো টুকরো ঘটনা, রাত্রির অন্ধকারে মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ কদম গাছ, রাতের অন্ধকার, কাজের বুয়াদের বলা সত্য-মিথ্যে সব গল্প আমাকে চিরকালীন ভীতু বানিয়ে দিয়েছে৷

সেদিন অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল কাক ভিজে হয়ে বাড়ি ফিরে দেখি মা ঘুমাচ্ছে৷ বারান্দা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম দোতলার টিনের চাল বেয়ে জলপ্রপাতের মত গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি৷ মা ঘুমাচ্ছে কি না আরেকবার ভাল করে দেখে নিয়ে আমি সেই প্রপাতের তলায়৷ বাড়ির পেছনটা এমনিতেই বেশ নোংরা৷ পেছনের এই উঠোনটা বেশ বড় হলেও আবর্জনা ফেলা ছাড়া আর কোন কাজে লাগে না৷ যেখানে দাঁড়িয়ে আমি ঐ জলপ্রপাতের জলে স্নান করছি তার ঠিক পাশেই খোলা সরু ড্রেন৷ এর আগেও এই ড্রেনে পা হড়কে পড়েছি বলে জানি থকথকে ঘন নোংরা জল জমে আছে ওতে যাতে আমার হাঁটু অব্দি দুবে যায়৷ এখন এই তুমুল বৃষ্টিতে যা এক চওড়া নালার রূপ নিয়েছে৷


তাই তাই তাই
মামার বাড়ি যাই
মামি দিল দুধভাত
পেট ভরে খাই
মামা আইল গদা লইয়া
পলাই পলাই৷
কখন যে দোতলার রেলিংএর কার্ণিশে এসে দাড়িয়েছে এক অচেনা বেড়াল খেয়ালই করিনি৷ চোখ পড়া মাত্রই আমি বৃষ্টি জলপ্রপাত স্নান সব ভুলে ষ্ট্যাচু৷ বেড়ালের দিকে অপলক তাকিয়ে আমি আর বেড়ালও তার ঠান্ডা চোখে একদৃষ্টিতে আমাকেই দেখছে৷ সম্বিত ফিরতেই আম্মা বলে চেঁচিয়ে ছুটব বলে পা বাড়াতেই এক পা সোজা সেই ড্রেনে৷ মা সেই চীৎকার শুনেছে আর পড়ে যাওয়ার শব্দও৷ ছুটে এসে কাওকে দেখতে না পেয়ে কেডা রে? কি হইসে, বলে জোরে আওয়াজ দিল৷ আমি কোনমতে বলতে পারলাম 'আমি আম্মা'৷ ততক্ষণে বেড়াল উধাও৷ ড্রেনে পা হড়কে পড়ে গিয়ে চোটও লেগেছে বেশ, তার উপর মা আগে পিঠে দু ঘা বসিয়ে তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেল কলতলায়৷

মেয়েদের খোলা চুল নাকি বদ জীনেদের খুব প্রিয়৷ দাদী বলেছে তিন সন্ধ্যের সময়,  সূর্য ডোবার আগে ও পরে সব জীন ভূত চলাচল করে৷ তাই বিকেলের পর থেকে যেন কক্ষণও খোলা চুল করে বাইরে না যাই৷ খোলা চুল দেখতে পেলেই বদ জীন এসে বাসা বাঁধে৷ আর যদি জীনের সেই মেয়েকে পছন্দ হয়ে যায় তাহলে তো আরও বেশি সমস্যা৷ জীন সেই মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে, তার সাথে সংসার করে৷ মানুষে তো জীনকে চোখে দেখতে পায় না৷ জীন যাকে দেখা দিতে চায় শুধু সেই দেখতে পায়৷ সেই মেয়েটা জীনের সাথে কথা বলে, হাসে৷ তার জন্যে রান্না করে৷ সবার মাঝে থেকেও জীন থাকে অদেখা, তাই লোকে ভাবে সে পাগল হয়ে গেছে৷ ব্যস৷ শুরু হয়ে গেল সেই মেয়েটার পাগলামো সারানোর ব্যবস্থা৷ মৌলভী সাহেব আসেন৷ একগাদা তাবিজ পরিয়ে দেন৷ সূরা ফাতিহা পড়ে পানি ফুঁকে দেন৷ আলহাম্দুলিল্লা হিরাব্বিল আলামিন...৷আস্তাগফার পড়ে কালো কারে ফুঁকে ফুঁকে ন'খানা গিট দিয়ে বেঁধে দেন জীনে ধরা মেয়েটির হাতে৷ যাতে জীন আর মেয়েটির কাছে না আসতে পারে৷


আস্তাগ ফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বি ওয়াতুবু ইলাইকা লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লা হিল আলিউল আজীম৷

সেই পানিপড়া খেয়েও মেয়েটা ভাল হয় না৷ জীন তো তাকে ছেড়ে যাবে না কিছুতেই৷ অনেক জীন আবার পছন্দের মেয়েকে তুলে নিয়ে চলে যায়৷ তাদেরকে আর কোনদিনও খুঁজে পাওয়া যায় না৷

আমি তাই বিকেল হলেই আঁট করে চুল বেঁধে রাখি৷ সন্ধ্যের পরে বারান্দায়ও যেতে চাই না৷ বারান্দা থেকে পরিষ্কার দেখায় মাঠের কোণের ঐ কদম গাছটাকে৷ চাপচাপ অন্ধকার দানা বেঁধে থাকে ঐ কদম গাছে৷ যদি কোন কারণে বারান্দায় যেতে হয় তো জোর করে চোখ ফিরিয়ে রাখি ঐ কদম গাছ থেকে৷ সবসময় মনে হয় ওখান থেকে কেউ আমাকে দেখছে৷ লাল দুটি চোখ৷ তাতে পলক পড়ে না , তাকিয়ে আছে যেন আমার দিকে, আমি তাকালেই সে হাতছানি দিয়ে ডাকবে আমায়৷ রাতের পর রাত অমি চোখ ফিরিয়ে থাকি ঐ কদম গাছের থেকে৷ ঘরের জানালা বন্ধ করে দেই বিকেল হলেই ৷ দিনের বেলা যে বেড়ালটা মিউ মিউ করে আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, খাওয়ার টেবিলের তলায় ঢুকে বসে থাকে, সেই যেন রাতে ঐ কদম গাছে চড়ে বসে থাকে৷ তখন তার চোখ লাল৷ অপলক তাকিয়ে থাকে সে আমার দিকে৷

অথচ বর্ষায় যখন কদম ফোটে, আমি তখন প্রায় দিন হেনা, মিলি, সেতুদের নিয়ে সেই কদম কুড়াতে যাই৷ সেতুটাও কদম ফুল খুব ভালবাসে৷ মিলিরা সুর করে ছড়া কাটে৷

চান্দ উঠছে
ফুল ফুটছে
কদমতলায় কেডা?
খুকুমণির বিয়া হইব
ঘোমটা মাথায় দিয়া৷


কখনো আমি একা ও যাই৷ কদম গাছটা আমাকে খুব টানে৷ সকালে আমি যখন ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় যাই প্রথম চোখ পড়ে ঐ কদম গাছটার উপর ৷ তখন আর ঐ লাল চোখদুটো দেখতে পাই না৷ তখন আর সে কোন বদ জীনের বাসা নয়৷ তখন সে শুধুই কদম গাছ৷ বাতাসে নড়ে তার ডাল, পাতা৷ টুপটুপ বৃষ্টি পড়ে ফুলভর্তি ঝাঁকড়া কদম গাছে৷ কোন কোনদিন সকালবেলাতেই আমি একা চলে যাই ছোট্ট ঐ মাঠ পেরিয়ে কদম গাছের তলায়৷ ভয়ে দুরুদুরু করে বুক৷ তবু যাই৷ না গিয়ে পারি না৷ আমাকে ভীষণ টানে ঐ কদমগাছ৷

ননীর বাপ বলে, আফাজান, রাইতে একদম ঘরের তেন বাইর হইয়েন না৷ আমি রোজ রাইতে তাইনে গো দেহি৷ আমি ননীর বাপকে জিজ্ঞেস করি, বুড়ো মিঞা, তোমাকে তারা কিছু বলে না? ননীর বাপ, আমাদের বুড়ো দারোয়ান উত্তর দেয়, আমি যে দোয়া পইড়া শরীরে ফুঁক দিয়া শরীর বন্ধ কইরা রাখি ৷ তাই হেরা আমারে কিসু করতে পারে না ৷ নইলে তো কুন কালেই আমারে শ্যাষ কইরা ফ্যালাইত ! বুড়ো মিঞাকে অনুরোধ করি সে যেন আমাকেও শিখিয়ে দেয় শরীর বন্ধ করা ৷ আমিও রাতে বাইরে বেরুতে চাই৷ কুল গাছটার তলায় যেতে চাই৷ সফেদা গাছের সরু লিকলিকে ডাল থেকে ঐ বড় সফেদাটা পেড়ে আনতে চাই৷ দোতলার রেলিংএ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখতে চাই৷ বুড়ো মিঞা যদি শরীর বন্ধ করা না শেখা তবে তো আমি বেরুতেই পারবো না ৷ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে এখন যেমন জোর করে চোখে বন্ধ করে গুটি সুটি মেরে পড়ে থাকি সব সময়েই তাই থাকতে হবে৷ বুড়ো মিঞা কেমন মাথায় পাগড়ি বেঁধে হাতে তার লাঠিটা নিয়ে সারা রাত বাড়িতাকে পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়৷ গভীর রাত্রে সে সুর করে দরুদ পড়ে,


নূর মুহম্মদ সাল্লাল্লাহ্‌
মাফি কালফি গায়রুল্লাহ্‌
পড়ো সবে সাচ্চা দিলে
লা ইলা হা ইল্লাল্লাহ্‌৷


আমার ঘুম ভেঙে যায়, চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি৷ বুড়ো মিঞা কি এখুনি তাদেরকে দেখল?

আমি কাউকে বলতে পারি না আমার এই ভয়, উৎকন্ঠার কথা৷ সকাল সাড়ে ন'টা বাজলেই সেতু এসে দাঁড়ায়৷ স্কুলে যাওয়ার সময় হল৷ আমি আর সেতু একই স্কুলে পড়ি৷ সাদা সালোয়ার কামিজ , কোমরে চওড়া সবুজ বেল্টে গুঁজে দিয়ে পরা ভাঁজ করা সাদা ওড়না৷ ঝটপট রেডি হয়ে মায়ের কাছ থেকে টিফিনের পয়সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷ সাইকেল রিকশায় আমি আর সেতু স্কুলে যাই৷ আমার সবচাইতে প্রিয় ক্লাস, রুবিনা আপার ক্লাস৷ রুবিনা আপা বাংলা পড়ান৷ বেশির ভাগ মেয়েদেরই সেই ক্লাসে পানির পিপাসা পায়৷ রুবিনা আপা যে খুব ভাল৷ কোন মেয়েকে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করান না৷ মেয়েরা যতবার পড়া বিষয়ে প্রশ্ন করে তিনি ততবার পড়া বুঝিয়ে দেন৷

'বাড়ি তো নয়, পাখির বাসা, ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি৷
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারই তলে আসমানীরা থাকে বছরভরে৷
পেটটি ভরে পায় না খেতে বুকের ক'খান হাড়
সাক্ষী আছে অনহারে ক'দিন গেছে তার৷
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপরাশি
থাপড়েতে নিভিয়ে গেছে দারুন অভাব আসি৷
পরনে তার শতেক তালি শতেক ছেঁড়া বাস
সোনালী তার গা'র বরনে করছে উপহাস৷
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি৷'- জসীমুদ্দীন

পড়ার ছলে গল্প করেন৷ যে গল্পটা অথবা কবিতাটা পড়ালেন সেই গল্পের হাত ধরে চলে যান আরও অনেক গল্পের দেশে৷ কবির কথা বলেন৷ লেখকের কথা বলেন ৷ আমার মনে প্রশ্ন জাগে এত সুন্দর দেখতে রুবিনা আপা, তাকে কোন জীনের পছন্দ হয়নি? রুবিনা আপা তো মাথায়ও কাপড় দেন না৷ তাহলে কি রুবিনা আপা জানেন কি করে শরীর বন্ধ রাখতে হয়? আমি সেতুকে জিজ্ঞাসা করি৷ সেতু বলে, তোরে একদিন জীনে ঠিক লইয়া যাইব!

প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে বুড়ো মিঞা তাদেরকে দেখে৷ চার-পাঁচ জন নাকি থাকে তারা৷ ইয়া লম্বা লম্বা দেখতে৷ বিশাল বড় বড় পা ফেলে তারা আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে পেছনের টিলার দিকে চলে যায়৷ সে রাতে বারে বারে আমার ঘুম ভাঙে৷ ফ্যানের বাতাসে ঘরের পর্দা নড়লেও আমার মনে হয় ঘরে কেউ আছে৷ আমি আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিই৷

আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাআ হুয়াল হাইয়ুল ক্কাইয়ুম৷ লা তা'খুজু হু সিনা তু ওয়ালা নাউম৷ লাহু মা ফিস সামা ওয়াতি ওয়ামা ফীল আরদ্‌...৷

রাতকে আমার ভীষণ লম্বা আর বড় বলে মনে হয়৷