Friday, May 17, 2019

আজি ঝড়ের দিনে...


বইপাড়া থেকে একটা অর্ডার ছিল, বইয়ের,  আজকেই পৌঁছে দিতে হবে, বই যাবে বাংলাদেশে। সকাল থেকে একবার আকাশের দিকে আর একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ১১টা নাগাদ ঘুম পেয়ে গেল। বেলা ১১টায় ঘুম পাওয়া খুবই অস্বাভাবিক, কিন্তু কিছু ওষুধপত্রের কল্যাণে আমার কিছুদিন ধরে এমনটাই হচ্ছে। যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ছি আর লম্বা লম্বাআআআ সব স্বপ্ন দেখছি (পরে অবশ্য সেসব স্বপ্নের কিছু মনে থাকে না)!

খবরের কাগজ পড়ে, ফেসবুক দেখে আর যেখানে যাই সেখানেই ফণী নিয়ে আলোচনা শুনে শুনে বিলক্ষণ ভয় ধরে আছে প্রাণে, আর সেই ভয় নিয়ে অবেলার ঘুম। পরপর কয়েকটা ফোনে ঘুম চটকে গেল আর স্বপ্নও। ইতিমধ্যে বৃষ্টিও হয়েছে খানিক। শেষমেশ উঠলাম যখন তখন আকাশ একটু পরিস্কার যদিও থম থম করছে চারপাশ। এদিকে টেলিভিশনে পুরীতে ফণীর হানার আপডেট। এমন অবস্থায় কেউ বাড়ির বাইরে বেরোয় না কিন্তু ভেতরটা খচখচ করছে, বই পৌঁছে দিতে না পারলে যদি অর্ডারটাই ক্যান্সেল হয়? কাল যদি সারাদিন বৃষ্টি থাকে?

এদিকে নিউ মার্কেটের অরোরায় দুটো ওড়না দেওয়া আছে ডাই করতে, সেটা আজকেই আনতে যাওয়ার ডেট। রোজা বোধয় সোমবার থেকেই শুরু হবে, তার জন্যে টুকিটাকি কিছু জিনিস কেনার আছে, আজ যাচ্ছি কাল যাচ্ছি করে সেটা আজ শুক্কুরবারে এসে ঠেকেছে, আজকেও যদি না যাই তবে হাতে থাকছে কালকের দিনটা, আর আগামীকালকে ভারী থেকে অতিবৃষ্টির কথা সব জায়গাতেই বলছে অতএব আমাকে আজকেই যেতে হবে!

আড়াইটে নাগাদ বেরিয়ে বিদ্যাসাগর সেতু অবধি যেতে যেতেই উতসাহ সব দমে যেতে লাগল ফাঁকা শুনসান বিদ্যাসাগর সেতু দেখে। উমাকে ফোন করলাম নিউ মার্কেটে আসতে বলার জন্যে, ওরও কিছু কেনাকাটা বাকি, একসঙ্গেই যাব সেরকম প্ল্যান আগে থাকতেই ছিল। উমা বলল, ওর বাড়ির লোকজন ওকে বারণ করে রেখেছে বাড়ি থেকে যেন আজ কিছুতেই না বেরোয়- এই বলে ফোন কেটে দিয়ে পরের মুহূর্তেই কলব্যাক করে রাম বকুনি দিল বাড়ি থেকে বেরিয়েছি বলে। বলল, এখুনি বাড়ি ফিরে যা। থমকে গিয়ে বললাম, ব্রিজের উপর তো গাড়ি ঘোরানো যাবে না, কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসছি, ভাবিস না।

যে পথ দিয়ে গেলাম, সেই পথ জনশূন্য, গাড়িশূন্য। ময়দানের ধার ঘেঁষে পরপর দাঁড়িয়ে সব দূরপাল্লার বাস, তাদের ঝাপ ফেলা, আজ আর কোথাও যাবে না তারা। আকাশের দিকে বারে বারেই তাকিয়ে মনে হয়, এখুনি বৃষ্টি নামবে না বোধ হয়।বই পৌঁছে দিয়ে মনে হল, বেরিয়েছি যখন, নিউ মার্কেট না গিয়েই ফিরব? মন সায় দিল না, এদিকে উমার কথাও মনে পড়ছে, নিউ মার্কেট গেছি জানতে পারলে আবার বকবে। কিন্তু বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করল না। এমনি দিনে ট্যাক্সিওয়ালাদের খুব পায়া ভারী থাকলেও আজকে জনশূন্য রাস্তায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজে থেকেই একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। ওরও তো সওয়ারি দরকার...। ও হ্যাঁ, ভবানীপুরে দর্জির দোকানেও কাজ ছিল, নিউ মার্কেট সেরে সেখানেই যাওয়ার ইচ্ছে।

বইপাড়া যতটা ফাঁকা, নিউ মার্কেট অঞ্চল ততটা নয় যদিও গ্র্যান্ডের সামনের ফুটপাথের সমস্ত ডালার ঝাপ ফেলা। একটিও ডালা খোলা নেই, একজন দোকানিও নেই সেখানে। নিউ মার্কেটের কাজ মিটিয়ে এবার জানবাজার, খেজুর কিনতে হবে সেখান থেকে। প্রতি বছরই রোজার আগে এখান থেকেই খেজুর কিনি আমি আর উমা। আজকে একাই কিনলাম। আমি ছাড়া আর একজন ক্রেতা ছিলেন সেখানে।

ভবানীপুরে দর্জির দোকানে যাওয়ার ইচ্ছে আজকের মতো বিসর্জন দিয়ে বাড়ি ফেরার জন্যে উবার দেখতে গিয়ে মাথায় হাত। অস্বাভাবিক একটা ভাড়া। ভাবলাম, বাস তো ফাঁকাই থাকবে আজ, k6 তো এসএন ব্যানার্জি দিয়েই যায়, এবং আমি একটা ফাঁকা k6এ উঠে বসলাম।


০৩.০৪.১৯

"জীবন গিয়াছে চলি কুড়ি কুড়ি বছরের পার"

জীবন গিয়াছে চলি কুড়ি কুড়ি বছরের পার। কিছুদিন ধরে একটা টিভি সিরিয়াল দেখছি। ইন্টারনেট টিভিতে ১৮বছর আগেকার সিরিয়াল। তখন সদ্য তালাক, তখন জীবন সংগ্রাম, তখন, পুরনো অভ্যস্ত, নিরাপদ (?)জীবন  ছেড়ে নতুন জীবন নিয়ে প্রতিদিন লড়ে যাওয়া আর রাত্তিরবেলা টিভি দেখা। কেবল টিভিতে সিরিয়াল দেখা। স্মৃতি সততই সুখের নয় তবে সবটুকু দুঃখেরও নয়। রোমন্থনে ১৮বছরের পুরনো সিরিয়াল আবার করে ফিরে দেখা বোকা বোকা বটে কিন্তু মাঝে সাঝে এরকম বোকা বোকা কিছু করাই যায়। অন্তত আমি করি আর কি।

গত পরশুদিন একটা গ্লাস ভেঙে গেল আমার হাত থেকে। মানে ভাঙেনি ঠিক, ফেটে গেল। মায়ের দেওয়া গ্লাস। আমি যখনই বাড়ি যাই, মানে যেতাম আর কি, আম্মা আমাকে কিছু একটা দিত। কখনও একটা চায়ের মগ তো কখনও দুটো কোয়ার্টার প্লেট বা একটা গ্লাস। এমনি এমনি দিত না, আমি হয়তো বললাম, এই গ্লাসটা তো বড় সুন্দর আম্মা বা এই কোয়ার্টার প্লেটগুলো তো চমতকার! তখন আম্মা নিজেই সেই জিনিসটা কাপড় টাপড়ে জড়িয়ে আমার স্যুটকেসে রেখে দিত। সেবার দিয়েছিল এই গ্লাসটা। একটা গোল মতন মোটা কাচের গ্লাস। পরশু সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে জল খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখতে গিয়ে হাত থেকে গড়িয়ে গেল টেবিলেরই উপর। আমি আবার সেটাকে তুলে সোজা করে রাখলাম। তখন বুঝতে পারিনি যে গ্লাসটাই গেল।

খানিক বাদে সুমেরু বলল, তোমার মায়ের গোল গ্লাসটা কে ফাটালো। ভীষণ কষ্ট হল ফাটা গ্লাসটা দেখে কারণ আমার মা আর হয়তো কখনও কোনওদিন আমাকে এরকম একটা গ্লাস বা একটা চায়ের মগ বা দুটো কোয়ার্টার প্লেট কাপড় মাপড়ে জড়িয়ে আমার স্যুটকেসে রাখবে না। ডিমেনশিয়ায় সব ভুলে যাওয়া মায়ের আমার পার্কিনসনস ডিজিজও হয়েছে যে। কেউ তুলে দিলে হুইল চেয়ারে বসে, কেউ ঠেলে দিলে বারান্দায় যায়...আমি আজ দু'দিন ধরে একটা ফেটে যাওয়া গ্লাসের জন্যে কাতর।

আরও কি কি সব লিখব ভেবেছিলাম, এখন আর মনে পড়ছে না। ডাক্তার অবশ্য বলেছেন ডিমেনশিয়া হওয়ার বয়স আমার হয়নি কিন্তু কত কি যে ভুলে যাই... শুধু হাসপাতালের বিছানায় ভেজিটেবলের মতো আম্মার পড়ে থাকাটা কিছুতেই ভুলতে পারি না...।

১৩.০৪.১৯

Sunday, August 26, 2018

নজর লাগল বলে

সাতদিন হাসপাতাল আর সাতদিন কন্যার বাড়িতে কাটিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরার পথে ভদ্রলোক দেখলেন, নরসিংদীর পর থেকে রাস্তার ধারের ছোট ছোট সব বাজারগুলোতে কাঁঠাল রাখা আছে একটার উপর একটা চাপিয়ে। সে যেন ছোটখাটো এক একটা পাহাড়। হলদেটে সবুজ কাঁঠালের পাহাড়। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে লোক বসে রয়েছে লটকন নিয়ে, সেও আর এক পাহাড়। লটকনের পাহাড়। হাট ফিরতি মানুষের কাঁধে কাঁঠাল, হাতে ঝোলা ভর্তি হলদে হলদে লটকন। 

আস্তে আস্তে গাড়ি চলে ভীড় কাটিয়ে। একে একে সব বাজার পেরিয়ে যায় গাড়ি, নরসিংদী, মাধবদী, বারুইচা, বেলাব। ভৈরব আসতে দেখা গেল আরও বড় বাজার। ভদ্রলোক আর চুপ করে থাকতে পারলেন না, বলে উঠলেন, একটা কাঁঠাল কেনো আর লটকন আনো কিছু। বাজার পেরিয়ে রাস্তার ধার ধরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার শিপন চলে যায় কাঁঠাল আর লটকন কিনতে। মিনিট কুঁড়ি বাদে শিপন ফিরে আসে কাঁধে -দশ কিলো ওজনের বিশালাকারের এক কাঁঠাল চাপিয়ে, এক হাতে বেড় দিয়ে সেই কাঁঠাল ধরা অন্য হাতে কোলের কাছে ধরা পাঁচ কিলো লটকনের এক বস্তা

সেই সব বাজারগুলোতে আর যা ছিল তা হচ্ছে কচু। বিশাল বিশাল আকারের কচু জোড়ায় জোড়ায় বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছে কাঁঠাল, লটকনের ফাঁকে ফাঁকে। আর সেও পাহাড়প্রমাণ। কচুর পাহাড়। নরসিংদী এলাকার কচু অত্যন্ত সুস্বাদু আর খেলে একটুও গলা কুটকুটি করে না। এই কচু দেখে মনে যে খোলায় ভাজা শুকনো শিমের বিচি দিয়ে কচুর ডগা দিয়ে কচুশাক আর গোড়া দিয়ে চাকা চাকা টুকরোয় মশলার গা মাখা মাখা বিরান- যেরকমটা আম্মা আগে করতসেরকমটি খাওয়ার বাসনা হয়নি তা বলতে পারব না, কারণ সে অসত্য কথন হবে। 

তো সঙ্গে দুই দুইজন রোগী আছে বলে খাওয়া নিয়ে আর আহ্লাদ না করে কোনও কথা না বলে চুপ করে বসেই ছিলাম। মনের কথা বোধ হয় ভদ্রলোক বুঝতে পারলেন, শিপনকে বলে দিলেন একজোড়া কচু আনতে। কিন্তু কাঁদ্গে অত বড় একখান কাঁঠাল আর হাতে লটকনের বোঝা নিয়ে শিপন কচুর কথা ভুলে মেরে দিল। অতএব কচুর 'চাক বিরান' আর 'ছইআলি দিয়া কচু হাক' এযাত্রায় আর হল না। মেঘনা পেরিয়ে বিশ্বরোডের উপর রাজমণি রেস্টুরেন্টে পরোটা আর খাসির গোশ্ত ভুনা খাওয়ার কথা ছিল কিন্তু অসুস্থ ভদ্রলোক ততক্ষণে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছুনোর জন্যে অস্থির হয়ে পড়েছেন, গাড়িতে আর বসে থাকতে পারছেন না অতএব পরোটা-মাংসও ভোগে..

বারান্দায় বসে কয়েকটা লটকনের খোসা ছাড়িয়ে দিলে আব্বা চুষে চুষে লটকন খায় আর লটকনের গুনকীর্তন করে। আম্মা ততক্ষণে সারা বাড়ির কচি-কাঁচাদের ডেকে ডেকে মুঠো মুঠো লটকন দেয়। তবুও টেবিলে পড়ে থাকে ঢের লটকন। বেলুচির তর সয় না, সে বটি দিয়ে কাঁঠালের শক্ত খোসা কেটে কোয়া ছাড়িয়ে টেবিলে দেয়। ইয়াব্বড় বড় সোনা রঙা কাঁঠালের কোষ, খাজা কাঁঠাল, আমরা যাকে বলি 'চাউলা কাডল' 

কাঁঠাল আমার সহ্য হয় না। খেলেই পেট ব্যথা করে, পেটে গুড়্গুড় শব্দে বাতাস নড়াচড়া করে। আমি তাই কাঁঠাল খাই না। সে যত সুন্দর-মিষ্টি আর চাউলাই হোক। কিন্তু মাঝে মধ্যে লোভে পড়ে দু-একটা কোয়া খেয়েই ফেলি। বচ্ছরকার ফল, দু-একবার না খেলে চলে? লোকেই বা বলবে কী...! সেই ভেবে আমি বেশি না, মাত্র দুটো কোয়া খেয়েছি, আহা.. অই আধপাকা কাঁঠালই মিষ্টি রসে টুপটুপ আর কচকচে। কিন্তু অই যে, আমার কাঁঠাল সহ্য হয় না। খানিক পরেই শুরু হয় পেটব্যথা। 

বিকেল থেকে পেটে বালিশ চেপে শুয়ে আছি দেখে আম্মা জিজ্ঞেস করে, 'তিনসন্ধ্যার সমিয় শুয়ে আছ কেন ?' বললাম, কাঁঠাল আমার সহ্য হয় না, পেটে ব্যথা করছে। আম্মা বলল, 'নজর লেগেছে' সাতটা শুকনো লঙ্কা নিয়ে আম্মা সারা গায়ে বুলিয়ে বুলিয়ে নজর ঝেড়ে দেয়, সর্ষের তেল হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পেটে হাত বুলিয়ে দেয় আমার ডিমেনশিয়ায় সব ভুলে যাওয়া মা। রান্নাঘরে গিয়ে উনুন জ্বালিয়ে নিজেউ সেই লঙ্কা পোড়ায়ার বলে, কি পরিমান নজর  লেগেছে দেখো, মরিচে একটুও ঝাঁজ নাই! যদিও লঙ্কার ঝাঁজে তখন সকলেই হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো। পাশ ফিরে শুই আমি। আম্মা এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে ব্যথা কমেছে?..  

খানিক এপাশ ওপাশ করতে করতে এক সময় একটু আরাম মনে হলে ঘুম নেমে আসে চোখে, ভর সন্ধেবেলায় আমি ঘুমিয়ে পড়ি... আব্বার ডাকে গভীর এক ঘুম থেকে জেগে উঠি রাত সাড়ে নটার দিকে, রাতের খাওয়ার জন্যে আব্বা ডাকছে। পেটে তখন আর একটুও ব্যথা নেই..