Sunday, November 15, 2009

নৈব নৈব চিতই


তোরা আয়লো দিদি পিঠা ভাজি
আমরা দুই জনা।
তুই দে গোলা গুলে
আমি দেই খোলা তুলে।
ইরি বলে উঠলে ফুলে দেখবে নয়নে
তোরা আয়লো দিদি পিঠা ভাজি
আমরা দুই জনা।
(ধুয়া গান/ বাংলা একাডেমী ফোকলোর সংকলন-৬৮/ ঢাকা)

টোনা কহিল, টুনি পিঠা খাইব। টুনি কহিল, আতপ চাল আনো, মাটির খোলা আনো, মাটির ছোট সরা আনো তবে তো পিঠা হইবে!

টোনা চাল তো আনিল কিন্তু মাটির খোলা বা সরা খুঁজিয়া না পাইয়া বুকিং দিয়া আসিল, খোলা-সরা বাজারে আসিবামাত্রই যেন মোবাইল ফোনে জানান দেওয়া হয়! মাটির খোলা-সরা তো আসিল না কিন্তু তাই বলিয়া কী পিঠা হইবে না!

পিঠা হইল, মাটির খোলা আর সরার বদলে লোহার চাটু আর ষ্টিলের ঢাকনা দিয়া তৈরিও হইল চিতই পিঠা। পিঠা তো হইল কিন্তু খাওয়া হইবে কি দিয়া? এই জঙ্গলে না পাওয়া যায় বক আর না ধনেশ! নিদেনপক্ষে একখান হাঁস! সেও পাওয়ার যো নাই। কিন্তু তাতেই বা কী।। চিতই খাওয়া যেতেই পারে মুর্গীর ভুনা বা মাছের ঝাল ঝাল বিরান দিয়া। সে মাছের বিরান হতে পারে কৈ বা পাবদার। নিদেনপক্ষে রুই-কাতলা।

বুগো বাড়ি গেছিলাম
চিতই পিঠা খাইছিলাম
ভাডা মাছের প্যাডাডু
কলমি হাগের ডাডাডু।
(মেয়েলি ছড়া/ মোমতাজী/ বরিশাল/ ১৩৭৪)

যদি গাঁও-গেরামের নিয়ম মেনে চিতই খেতে হয় তবে অবশ্যই কচি লাউ আগের দিন রাতে রেঁধে রাখতে হবে পুষ্করনি বা বিলের মাঝখানের ডোবা থেকে তুলে আনা শ্যাওলা পড়া পোক্ত শোল মাছের মাথা দিয়ে। মাথার সঙ্গে অবশ্যই থাকবে ঘাড়ের অংশটুকুও। মশলা বলতে সেই লাউয়ে পড়বে অল্প তেল, নুন-হলুদ বাটা-ধনেবাটা আর খুব অল্প পরিমাণে শুকনো মরিচ বাটা। লাউয়ে যদিও মরিচবাটা দেওয়ার নিয়ম নেই কিন্তু শোলের মাথা আবার একটু মরিচবাটা চায়, অগত্যা নেসেসিটি ব্রেকস দ্য রুল। মাথাখানি তেলে-নুনে-মশলায় কষা হয়ে গেলে ইঞ্চিখানেক পুরু টুকরোয় কেটে রাখা লাউ ছেড়ে দিতে হয় শোলের মাথার উপরে, অত:পর ঢাকনা। ভুল করেও পানি দেওয়া যাবে না। চুলোর কাঠের জ্বাল টেনে রেখে দিতে হবে চুলোর মুখে, ভিতরে জ্বলতে থাকা কয়লার তাপেই রান্না হবে লাউ, মাঝে মাঝে শুধু একটু নেড়ে দেওয়া, তলায় ধরে না যায়। নিজের গায়ের পানি ছাড়বে লাউ, শোলের মাথার সঙ্গে মিশবে, নুন মশলা ঢুকবে এক ইঞ্চি পুরু লাউয়ের টুকরায়, ঢাকনা আধখানা খুলে রেখে দিতে হবে লাউয়ের তরকারির, পুরো ঢাকা দিলে লাউয়ের সবজে রঙ নষ্ট হয়ে যায়। ঝোল ফোটার শব্দ শুনে রাঁধুনি বুঝতে পারেন, রান্না হয়ে গেছে। বাড়ির পেছন দিক থেকে তুলে আনা ধনে পাতা হাত দিয়ে টেনে টেনে ছিঁড়ে দিতে হয় লাউয়ের উপরে, কুচনো ধনেপাতা কদাপি নয়, গুরুর মানা। সাথে কলপাড়ের গাছ থেকে তুলে আনা কাঁচামরিচ, গোটা গোটা। মরিচও কাটা বা চেরা চলবে না। আধখোলা ঢাকনাসহ লাউয়ের তরকারি গিয়ে ঢুকবে কাঠের জালি আলমারিতে, থাকবে পরদিন সকাল পর্যন্ত। এবং সকাল বেলায় এই আগের দিনের রান্না করা লাউ গরম করা চলবে না, গরম চিতই আর ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাওয়া সবুজে-হলুদে মেশানো লাউ, ধনে পাতা আর কাঁচামরিচের সুবাস, অহো:!

এইবার জেনে নিন সঠিক লাউখানি কি রূপে চিনিবেন। গোয়ালের খড়ের চালের উপরে বিছিয়ে থাকা লাউগাছের লতা-পাতার ফাঁক-ফোকরে শুয়ে থাকা অনেকগুলি নধর লাউয়ের ভেতর থেকে খুঁজে নিতে হবে সবচেয়ে কচি লাউখানি। চিনবেন কী করে? লাউখানির ল্যাজার দিকে তাকালে দেখতে পাবেন, ফুলখানি তখনো ঝরে যায়নি, শুকিয়ে এইটুকুনি হয়ে গেলেও এখনো লেগে রয়েছে লাউয়ের ল্যাজায়। তারপরেও যদি বুঝতে না পারা যায় তবে কড়ে আঙুলের নখ দিয়ে হালকা আঁচড় দিতে হবে লাউয়ের গায়ে, নখের আলতো আঁচড়েই লাউয়ের গায়ে দাগ পড়ে গিয়ে স্বচ্ছ কষ বের হয়ে এলেই আপনি বুঝতে পারবেন, একদম ঠিক লাউখানি আপনি পেয়ে গিয়েছেন!

এবার চেনা চাই ঠিকঠাক মাছটি। বর্ষার পানি যখন ক্ষেত-খামার থেকে নেমে যায়, কিছু পানি তখনো জমে থাকে নিচু জমি বা ডোবায়। এই ডোবাগুলি নিজেদের ক্ষেতে আগে থেকেই কেটে রাখেন ক্ষেতমালিকেরা, অনেকটা ছোটো পুকুরের মতো। পঞ্জিকার নিয়ম মেনে এই বাংলাদেশ থেকে কদাপি বর্ষা বিদায় হয় না শরতে। সে থেকে যায় হেমন্ত পর্যন্ত। মাছেরা সব ভেসে যাওয়া ক্ষেত-খামারে ঘুরে বেড়ায়, খায় দায় আর স্বাস্থ্যবান হয়। কিন্তু এক সময় বিদায় লইতেই হয় বর্ষার পানিকে। রাজার মেজাজে ঘুরে বেড়ানো শোল-গজার-শি-ংমাগুর-কৈ-বোয়াল-পুটি-কাইক্যা-বাইন আর আরও হাজার রকমের মাছেরা তখন পানির টানে গিয়ে পড়ে ডোবায়। পানি চলে যায়, গেরস্থ ফসল বোনে পলি পড়া জমিতে। এবার শীত এসে পড়ল বলে। সরু ধান সব এখনই বোনার সময়।

ক্ষেতে ধান বোনা হয়, সেই ধান পেকে সোনালী হয়ে আসে, আর একসময় কাটাও হয়ে যায়। ঘরে ঘরে তখন নতুন ধানের গন্ধ, ধান ভাঙিয়ে প্রথম যে চাল হয়, সে রেখে দেওয়া হয় পিঠা খাওয়ার তরে। প্রথম পিঠা অবশ্য "পুলি', নারকোল দেওয়া "মিঠে পুলি' তারপর গুড়ের পিঠে "পোয়া' আর তারপর চিতই, ছিটে ইত্যাদি ইত্যাদি ক্রমে আসিতেছে। তবে এই পিঠেপর্ব শুরু হওয়ার আগে প্রথম ঘরে ওঠা চাল দিয়ে অবশ্য অবশ্যই শিন্নি রেঁধে যে মসজিদে দেওয়া হয় এবং পাড়ার কচি-কাঁচাদের খাওয়ানো হয় সেকথা বলা বাহুল্য।

শীতের শুরুতে ধান কাটা ঝাড়াই বাছাই শেষ হওয়ার পর নজর দেওয়ার সময় আসে ডোবার দিকে, ডোবায় এসে আটকা পড়া মাছেদের দিকে। গভীর রাতে শীতের কাঁথা মুড়ি দিয়ে গ্রাম যখন ঘুমোয়, বাড়ির মুনিষ তখন জাল-সড়কি-লম্বা বাঁশের এক মাথায় গোল করে লাগানো সরু সরু লোহার তীক্ষ্ম ফলাওলা চল আর একটা হ্যারিকেন নিয়ে রওয়ানা দেয় ক্ষেতের ভেতরকার ডোবার উদ্দেশ্যে। ডোবা সেচার সরঞ্জাম সেখানে রেখে আসা ও সেচার লোকের ব্যবস্থা সে দিনের বেলাতেই করে এসেছে, তারা সেখানে হয় অপেক্ষা করছে নয় এই পৌঁছুলো বলে। হুকা-তামুকের ব্যবস্থা করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এখন শুধু পানি তুলে ডোবা খালি করিয়া চল বল্লম ইত্যাদি দিয়া ঘাঁই দিয়া দিয়া মাছ শিকার করিয়া পাড়ে তোলার পালা। ডোবায় পানি থাকাকালীন একবার নিয়মমাফিক জাল তারা ফেলেছে বটে তবে জাল দিয়ে আর কটা মাছ ওঠে! পানির নড়াচড়ায় ওদিকে সব মাছ তখন নিজ নিজ গর্তের ভেতর মুখ-শরীর লুকিয়েছে।

ছোট মাছ, যেমন শি-ংমাগুর-কৈ-ভ্যাদা-পাবদা-ট্যাংরা এদেরকে ত খাবলা দিয়ে দিয়ে তুলে আনে ডোবা বিশারদেরা, চল-বল্লমের প্রয়োজন হয় বড় শোল-গজার-বোয়াল ইত্যাদির জন্য। খানিকটা সাবধান থাকতে হয় গর্তের ভেতর থেকে বাইন তোলার সময়, কারণ মাঝে মাঝেই বাইনের বদলে হাতে এসে পড়ে সাপ। সাপের কামড়ের ভয়কে খুব একটা তারা আমল দেয় না যদিও, বহুবার সাপের কামড় খেয়ে শিঙ্গির কাঁটা বা কাঁকড়ার দাঁড়ার চিপা খেয়েছে ভেবে ভুলে যায় সেটাকে, ব্যথাও হজম করেই নেয়, সাপে কামড়েছে বলে ভাবতেও চায় না, পাত্তাও দেয় না যতক্ষণ না সাপকে সে নিজের চোখে দেখতে পায়। একবার সাপ চোখে দেখে ফেললে তখন অবশ্য সত্যিকারের শিঙ্গির কাঁটার ব্যথাকেও সাপের কামড় ধরে নিয়ে বাবারে মারে বলে ডাক ছেড়ে চেঁচায় আর তারপর সব ছেঁড়ে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ায় গাঁওয়ের হোমিওপ্যাথের ডাক্তার কাম কম্পাউন্ডার কাম অলরাউন্ডারের কাছে। হোক না সে পানির হলদে ঢোঁড়া। যদিও হ্যারিকেন একখানি ডোবার কিনারে রাখা থাকে কিন্তু তাতে বিলের উপর জমে থাকা কুয়াশা আর আঁধার কেটে বাইরে দেখা দেয় না, ফলে হাত চলে আন্দাজ আর অভ্যাসে, কাদার ভেতরকার নড়াচড়া দেখে বুঝে নিতে হয় ঘাপটি মেরে বসে থাকা বাবাজীটি কী এবং কত বড়। সেই বুঝে ঘাঁই দেওয়া হয় চল দিয়ে। কখনওবা নিজের শরীর দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই হাত দিয়ে তুলে আনা হয় মহার্ঘ শ্যাওলা পড়া শোল! যদিও এক একটা ডোবা থেকে মণখানেক মাছ ওঠে সব মিলিয়ে কিন্তু বড় শোল বা কালী বোয়ালের ব্যপারই আলাদা! আরামসে পাঁচ-সাত সেরে দাঁড়ায় শুধু একটার ওজন।

নাহয় লোহার চাটুতে ষ্টিলের ঢাকনা দিয়ে চিতই বানিয়ে ফেললাম উপায়ান্তর না দেখে কিন্তু আসল চিতই কিভাবে বানাতে হয় সেটা একটু বলা ভাল। এমনিতে আমাগো দেশের মানুষে তো পাঊরুটি-ওমলেট খায় না, তাঁরা সকালবেলার নাশতাটা পিঠে-পুলি দিয়েই সারে। যারা নিতান্ত বারো মাস পারেন না, তারা নতুন ধান ওঠার পর যে ক'দিন পারেন, পিঠে খান আর তারপর ভাত। ভাতের পাতে শাক বা থেতো করা পেঁয়াজ-লালমরিচ দেওয়া একটু শুটকিবাটা। যে যেমন পারেন। তা বলছিলাম চিতইয়ের কথা।

সাধারণত রোজকার রান্নার জন্যে যে কোনো কাঠেই কাজ চালানো হলেও কিছু বিশেষ পদের জন্যে কাঠও থাকে বিশেষ রকমের। যেমন তেঁতুলগাছের কাঠ। বা বেলগাছ। সৌখিন মানুষে গোটা গাছ কিনে চিরে মাপমতো কেটে-কুটে রান্নাঘর-গোয়ালঘরে বানানো মাচার উপরে তুলে রেখে দেন। তেঁতুলকাঠের আগুনে ধোঁয়া হয় কম, বা হয় না বললেই চলে, ধীরে ধীরে জ্বলে, পুড়ে যাওয়া কয়লাও জ্বলে অনেকক্ষণ, ঠিক যেমনটা চাই পিঠে বানানোর জন্যে বা দুধ জ্বাল দেওয়ার জন্যে। আঁচ একটু বেশি হয়ে গেলে কাঠ টেনে চুলোর মুখে রেখে দিলেও আস্তে ধীরে পিঠে হতে থাকে একের পর এক।

শীতকাল পিঠে-পুলি খাওয়ার সময়। গোলায় নতুন ধান, শীতের আমেজ দুইয়ের সাথে যোগ হয় নতুন গুড়, শীতকালীন সব্জী। এই সময়টাতে মেলা বসে জায়গায় জায়গায়, গ্রামে গ্রামে। বাড়িতে আসে মাটির হাঁড়ি-বাসন-খোলা-সরা-কলসী। বছরকার মতো কিনে নিজেদের মতো করে আগুনে আবারো পুড়িয়ে আরো খানিকটা পোক্ত করে রাখেন পোড়খাওয়া গিন্নিরা। বিশেষ করে কেনা হয় চিতইয়ের খোলা। যদিও বাজারে বছরভর পাওয়া যায় সবই। দরকার পড়লেই কিনে আনা যায় কিন্তু তবুও মেলা থেকেই কেনা হয় যতটা পারা যায়।

ওরে আমার সোনা
এতখানি রাতে কেন বেহন ধান ভানা?
বাড়িতে মানুষ এসেছে তিন জনা
বাম মাছ রেধেলি শোল মাছের পোনা।
(ছেলে ভুলানো ছড়া/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা/ ১৩০১)

আগের দিন সন্ধেবেলায় আতপ চাল ভিজিয়ে রেখে দেওয়া হয় রাতভর। যত শীতই পড়ুক আর কুয়াশায় যতই অন্ধকার থাকুক দেশ-গাঁয়ে সকাল হয় ভোরের প্রথম মোরগের বাগ শুনে। উঠে ঘুম ঘুম চোখে ভিজিয়ে রাখা চাল শিলে বাটা হয় মিহি করে, পানি একেবারেই না দিয়ে। ভেজানো চাল এমনিতেই পানি খেয়েছে সারারাত। আঠালো চালবাটায় অল্প পানি দিয়ে তৈরি হয় গোলা। ঘন গোলায় ডোবানো থাকে নারকোলের মালা দিয়ে তৈরি লম্বা ডাঁটির চুয়োর, এক এক চুয়োর চালের গোলায় একটা করে চিতই। মাটির খোলা গরম হয়ে গেলে একবার শুধু একটু তেল ন্যাতায় করে বুলিয়ে নেওয়া, প্রথম পিঠেটা যাতে লেগে না যায় খোলায়। পিঠের থেকে একটু বড় মাটির সরা বসে যায় পিঠের উপর, এমনভাবে বসানো হয় যাতে একটুও ভাপ সরার ভেতর থেকে বাইরে না বেরোয়। হাতে করে খানিকটা পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয় সরার উপর, খানিকটা পানি আলাদা করে দেওয়া হয় সরার উপরকার ছোট্ট গোলাকার বাটির মত জায়গাটিতে, মূলত সরার হ্যান্ডেল ওটি। এই পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয় খোলার নিচের ঢিমে আগুনের সাথে উপর থেকেও যাতে পিঠে ভাপ পায়। পিঠে হতে হতে এই ছিটিয়ে দেওয়া পানি টেনে নেয় সরা। মিনিট ৩-৪ সময় লাগে এক একটা পিঠে হতে, হয়ে গেলে পিঠের নিচের দিকটা হালকা মুচমুচে হয়ে গিয়ে নিজে থেকেই খোলাকে ছেড়ে দেয়, লোহার খুন্তির আলতো খোঁচায় পিঠে উঠে আসে খোলা ছেড়ে। সোঁদা গন্ধ বেরোতে থাকে রিতিমতো এয়ারটাইট সরার ভেতর থেকে, ধপধপে সাদা চিতইয়ের উপর দিকটা দেখতে হয় ফুলকো লুচির মতো, ফোলা অংশের এক পরত নিচেই থাকে অসংখ্য সূক্ষ্ম ফুটোর জালি।

যদিও চিতই খাইবার নিয়ম কাঠের উনুনের পাশে গোল হইয়া বসিয়া, একটার পর একটা পিঠা নামবে আর পাতে আসিবে। লোকসংখ্যা বেশি হইলে একের পর এক পিঠা যাইতে থাকিবে গোল হইয়া বসিয়া থাকা রসিকের পাতে, যার পিঠা শেষ হইয়া গিয়াছে সে অপেক্ষা করিবে, কখন আবার তার পালা আসে, গরম চিতই পাতে আসিবার।


১৫ ই নভেম্বর, ২০০৯

[লেখাখানি গুরুচন্ডা৯র বুলবুলভাজা বিভাগে প্রকাশিত। গুরুচন্ডা৯তে লেখাটি পড়তে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে http://www.guruchandali.com/?portletId=20&porletPage=1&pid=wpgc:///2009/11/15/1258262406029.html
]

Tuesday, October 20, 2009

আমি বরং ব্লগ লিখি..

একদিন একরাত টানা ঘুমিয়ে আর তারপর গত দিনটিও আধো ঘুম আর জাগরণের মধ্যে কাটিয়ে গতরাতটি কাটল প্রায় নির্ঘুম। বহু বহুদিন নাকি বহু বহু কাল, কতদিন, কতকাল পর এমন বেভুল ঘুম সে আমার মনেও নেই আর তারপর এই চেনা জেগে থাকা। এই জেগে থাকাটাই নিত্যকার রুটিন কাজেই এ নিয়ে চিন্তা নেই। আমি বরং ব্লগ লিখি..

দীপান্বিতার রাত, কালো রাত আলোয় আলোয় ঝকমক ঝকমক। নানারকমের বাজি ফাটছে মুহুর্মুহু, বাড়িগুলো সেজে আছে আলোর মালায়, জানালায় জানালায় টুনিবাল্বের ঝোলানো-প্যাচানো মালাগুলো জ্বলছে নিভছে, জ্বলছে নিভছে ঝিকমিক ঝিকমিক। ছাদভর্তি ফাটানো বাজির খোলা, আধফাটা না ফাটা ছোটোখাটো বাজিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোটা ছাদময়। নিচের খালি গ্যারাজঘর সদ্য আবারও খালি হয়েছে প্রতিমা নিরঞ্জনের পর, সেখানেই লাল প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে ফ্ল্যাটবাড়ির লোকজন সব, মহিলামহল একজায়গায়, পুরুষেরা এদিক-ওদিক, কেউ সিগারেট, কেউ বা রাতের পানের ব্যবস্থায় ব্যস্ত, কেউ বা খুঁজছে আগের রাতে ছাদে ফেলে আসা আইসট্রেটি, সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না যদিও। মাঝের একতলা লালবাড়িটির বারান্দা জুড়ে বালতি আর গামলায় রাখা খাবার সব, এখুনি খাওয়া শুরু হলো বলে, বাচ্চাগুলো এদিক ওদিক, মায়েরা ব্যস্ত পড়শি বউটির কেন লালরং অত পছন্দ তা আবিষ্কারে। এরই মধ্যে ইলেক্ট্রিশিয়ান হাজির বাড়ির সামনেটায় যা আলো লাগানো হয়েছে সেগুলো খুলে নিতে, তাকে অনেক বলেও বোঝানো যায় না, যে আরেকটু থাক, মা চলে গেছেন তো কী হয়েছে, ভক্তদের খাওয়া-দাওয়াটা অন্তত হোক!

ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দারা, এমনিতে যারা চুড়ান্ত ভদ্রলোক, বাড়ির পুজোর নামে চাঁদা তোলায় তারাই খড়গহস্ত। মোটা অংকের চাঁদা বাধ্যতামূলক দিতে কারই বা ভালো লাগবে, আমার অন্তত লাগেনি, কে কত দিয়েছেন সে সমস্ত শোনা হয়ে যায় আমার বেশ কয়েকবার করে। রাতের বিসর্জন পরবর্তী গেটটুগেদারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রন বা নিমন্ত্রন কতটা আন্তরিক সে বিচারে আমি আর যাই না। ইতিমধ্যে বারকতক আমার শোনা হয়ে যায়, গতবার যেমন পালিয়ে গিয়েছিলাম, এবার যেন আর তেমনটি না হয়। আমি বুঝে যাই, পালাবার পথ নেই, ভাটন আর খ্যাটনে হাজির থাকতেই হবে, চাঁদার মতই এও বাধ্যতামূলক!

চ্যানেলে চ্যানেলে রিয়্যালিটি শো, কোথাও চান্স পে ডান্স তো কোথাও দাদাগিরি, একফাঁকে বালিকা বধু আর ফাঁকে ফাঁকেই ডান্স বাংলা ডান্সের প্রোমো। আজও দুমদাম ফাটছে শব্দবাজি, আকাশ চিরে দিয়ে উড়ে যায় রকেট আর আতস, খানিকটা আলোকিত থাকে বাজির আলোয় আবার সেই ল্যাম্পপোষ্টের মরা আলো। মশারা সব আজ বাড়ির ভেতরে, এমনিতেই জঙ্গল সাফাই আর বোজানো পুকুরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা চারতলা সব বাড়ির উৎপাতে ওরা ঘর-বাড়িহীন তার উপর বাইরের অত আলো আর শব্দে ওরাও বেভুল, বাজির শব্দের সাথে সাথে শোনা যায় মশা তাড়ানোর শব্দও।

আজ ভাইফোঁটা ছিল। সকাল সকাল এক ভুলে যাওয়া নাকি হারিয়ে যাওয়া নম্বর থেকে ক্ষুদ্র বার্তা আসে, ফোঁটা নিয়ে নিলাম, আর আশীর্বাদও চেয়ে নিলাম, দিদি আমার শতায়ু হোক! নম্বর দেখে মনে করতে পারি না, কে হতে পারে? তবে ঠাউর হয়, কে হতে পারে, প্রতিবারেই আমি ভুলে যাই বলে ঠিক একইভাবে সে আমার কাছ থেকে ফোঁটা নিজে নিজেই নিয়ে নেয়.. মনে পড়ে গেল, একজনকে বলেছিলাম ফোঁটা দেব, মন থেকেই বলেছিলাম দেব কিন্তু গতবার কলকাতা থেকেই পালিয়ে গেছিলাম আর ফোঁটার কথা বেমালুম ভুলে গেছিলাম বলে আমাকে 'ব্লাডি ফাকিং মুসলিম' উপাধি পেতে হয়েছিল.. এখনও মাঝে মাঝেই প্রায় একই ভাষায় চিঠি-মন্তব্য চলে আসে আমার বিভিন্ন ঠিকানায়..যার মধ্যে যোগ হয়েছে আরো হাজার খানেক অভিযোগ, বিশেষণ!! আমার অবশ্য কোনো অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে..সত্যিই নেই..

মাঝরাতে চকোলেটের ক্ষিদে মেটাতে ফ্রীজের ভেতরটা আতিপাতি খুঁজেও পাওয়া যায় না চকোলেট, অগত্যা রমজানের লেফটওভার খেজুর। খুঁজে পাওয়া যায় না ফিলিপিন্সের ড্রাই ম্যাঙ্গোর প্যাকেটটিও। মেজাজ চরম খারাপ। আমার ভালুকজ্বর আবার বাড়ছে বেশ বুঝতে পারি..

Wednesday, October 07, 2009

পরকীয়া প্রেমের মতো লেপ্টে থাকে জ্বর

মাঝে মাঝেই জ্বর হয় আমার।
পরকীয়া প্রেমের মতো
লেপ্টে থাকে বহুদিন ধরে
মাঝে মাঝে ছাড়াতে চাই, মাঝে মাঝে চাই না..
জ্বর লেগে থাকে, পরকীয়া প্রেমের মতো
আদরে, ভালবাসায় জড়িয়ে রাখে
কানে কানে কতো কথা কয়, বলে
আমিও তো তোকে ভালবাসিরে পরী!

জ্বরের ঘোরে বা জ্বর ছড়াও স্বপ্ন দেখি
গোল গোল আলোর মালা
চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়
আলো ঠিকরোয়
নানান রঙের
ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি
জ্বর লেগে থাকে প্রেমের মতো
পরকীয়া প্রেমের মতো..

এই জনমে আমি রাধা হতে চাই না,আর
পরজনমে তোমাকেও রাধা হতে বলবো না
আমি কখনোই গাইবো না,
শ্রীকৃষ্ণ বিরহে রাধার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া
আসলে আমি তো গাইতেও জানি না!

তুমি বরং পরজনমে এমুপরী হইও
বা এমু পাখি, যে কিনা উড়তে জানে না
কিন্তু ওড়ার স্বপ্ন দেখে
তার যে দুটি ডানা আছে
ছোট্ট দুটি ডানা
তবুও সে উড়তে জানে না, পারে না
ডানা দুটি যে ভীষণ ছোট!
তার শুধু জ্বর আছে
পরকীয়া প্রেমের মতো জ্বর
লেপ্টে থাকে, জড়িয়ে রাখে
ছাড়ে না, ছাড়তে চায় না

আমি গান গাইতে জানি না
লোপামুদ্রার মতো, আমি তাই কখনও গাইনি,
দয়ানী..
কখনো ভেসে উঠিনি টিভির পর্দায়
বা তোমার মনিটরে
বা সায়েন্স সিটির অডিটোরিয়ামে
কখনো তাই সিডির ভেতরে ঢুকে
তোমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াইনি
মাঠে-ঘাটে বা তেপান্তরে
কখনো না.. কখনো না..

খানিক আগে, নারকোল ছাড়াতে গিয়ে
ছুরির ফলাটা ঢুকে গেলো হাতে
তীক্ষ্ণ ফলা, ছুরির
রক্তে ভেসে গেল ওয়াশ বেসিন, কালচে সবুজ পাথর আর মেঝে
কী আশ্চর্য, এই রক্তের রঙ লাল
গাঢ়, টকটকে লাল
গোলাপী নয়, তবে বুঝি স্বপ্নের রক্তই শুধু গোলাপী হয়...




Sunday, October 04, 2009

উত্তম বসনে বেশ করয়ে বনিতা

আশ্বিনে আম্বিকা পূজা করে জনে জনে।।
ছাগল মহিষ মেষ দিয়া বলি দানে।।
উত্তম বসনে বেশ করয়ে বনিতা।।
অভাগী ফুল্লরা করে উদরের চিন্তা।।
মাংশ কেহ না আদরে মাংশ কেহ না আদরে।।
দেবীর প্রসাদ-মাংশ প্রতি ঘরে ঘরে।।
কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ।।
জগজনে করে শীত-নিবারণ বাস।।
নিযুক্ত করিলা বিধি সভার কাপড়।।
অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের ছড়।।
( চন্ডীমঙ্গল কাব্য / কালকেতু উপাখ্যান/ কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী/ সম্পা-মুহম্মদ আব্দুল হাই/ পৃ-৫৫)

মেয়েরা শার্ট পরে না। ঘোষণাটা দিলেন আমার দাদী জোবায়দা খাতুন চৌধুরানী। সে এক ঈদের সময়। নতুন জামা আসছে আসছে করছে, নেহাত আব্বার অফিস থেকে ফিরতে মেলা রাত হয়ে যায় বলে বন্দর বাজারে গিয়ে কেনাটা হয়ে উঠছে না, তবে আব্বা বলেছে, ধরে নাও কেনা হয়ে গেছে আর আমিও তাই ধরেই নিয়েছি। যদিও প্রতিদিনই অপেক্ষায় থাকি, এই কেনা হয়ে গিয়েছে ধরে নিয়ে রাখা জামা-কাপড়-জুতোগুলো আসলেই কেনা হবে কবে।

কাকা নিয়ে আসে দু'খানা শার্ট, একটা আমার আর একটা ভাইয়ার। শার্ট! আমার জন্যে! তাও একেবারেই একই রকম দুটো শার্ট শুধু ভাইয়ারটা হলুদ আর আমারটা গোলাপী। আনন্দে আমি ধেই ধেই করে নেচে উঠতে পারিনি শুধুমাত্র আমার দাদীর ভয়ে। আমার দাদী এক জমিদারকন্যা, সপ্তগ্রাম, যা কিনা লোকমুখে হয়ে উঠেছে সাত্গাঁও। সেই সাত্গাঁওয়ের জমিদার সাহেবের ছোটমেয়ে পাকে চক্রে আর তাঁর ভাগ্যদোষে আমাদের বাড়িতে এসে পড়েছিলেন, নেহাতই সাধারণ এক ঘরে। যে ঘরের না ছিল জৌলুস না ছিল কোনো রোয়াব। কিন্তু তাতে কী? চৌধুরানী বলে কথা। আমার বড়াআব্বা মানে দাদীর বাবার শুধু আওয়াজ শুনেই নাকি বাঘে গরুতে একঘাটে পানি খেত। তো সে সব তো শোনা কথা কিন্তু আমার দাদীর হুকুমে সক্কলে যে দিনকে রাত আর রাতকে দিন এই সেদিন পর্যন্ত মেনে এসেছে এ তো আমার দেখে দেখেই বড় হওয়া। সেই সব হুকুম পালন করে করেই, দাদীর ইচ্ছে-অনিচ্ছে মেনে নিয়েই বড় হয়ে ওঠা।

শার্ট দুটো নিয়ে কাকা চুপটি করে আমার হাতে ধরে দেয়, সামি, এটা তোর! আমি অনেকক্ষণ কথা বলতে পারিনি সেই শার্ট হাতে পেয়ে। প্রথমত বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, আমি ঈদের দিনে শার্ট পরব! কাক্কু, কাক্কু, আমার প্যান্ট? মেয়েদের প্যান্ট তো রেডিমেড পাওয়া যায় না, বানাইতে হইব, তোরে লইয়া গিয়া অর্ডার দিয়া দিমু। মেয়েদের প্যান্ট বলতে সাইডে চেইন লাগানো প্যান্ট। তখন ওরকমই চলত।

কথাটা গোটা বাড়িময় ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি যে আমার জন্যে শার্ট এসেছে! আমি তখন হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে শুধু শার্টটাই দেখছি। স্বপ্নেও তো কোনোদিন আমাকে শার্ট পরতে দেয়নি কেউ, আর আজকে কাক্কু নিয়ে এলো! কি সুন্দর দেখতে! ফুলহাতা গোলাপী রঙের শার্ট, সামনে দু'পাশে দু'খানা পকেট, বুকের কাছটিতে। কত বয়েস তখন আমার? সাত কি আট হবে। যদিও তখন থেকেই দাদী বলতে শুরু করেছিল, এই মাইয়া হাফপ্যান্ট পিন্দা ঘুইরা বেড়ায় কিয়ের লাইগ্যা। পায়জামা কই, পায়জামা?

কাকা বলে গেল, সন্ধের পরে নিয়ে গিয়ে প্যান্টের অর্ডার দিয়ে আসবে, দর্জি দিয়ে দেবে ঈদের আগেই। তখন এ'রকম রোজা আসার আগেই অর্ডার নেওয়া ক্লোজ হয়ে যেত না। দিব্যি ঈদের দু'দিন আগে কাপড় দিলেও ঠিক চাঁদরাতে বানিয়ে দিয়ে দিত। ভাইয়া'র তর সয় না, সে সাথে সাথেই শার্টের বোতাম খুলে সেটা গায়ে চাপিয়ে গোটা বাড়ি এক চক্কর দিয়ে দেয়, মুখে গাড়ির ভোঁ ভোঁ শব্দ। দাদী প্রায় চেঁচিয়েই ওঠে, নতুন শার্ট পিন্দা কই যাস। খবরটা ভাইয়াই দাদীকে দেয়, সামির লাইগাও তো কাক্কুয় শার্ট আনসে। তারপর মুহূর্তেই আমার হাতের শার্ট, যা কিনা তখনও ভাঁজও খোলা হয়নি, চলে যায় দাদীর হাতে। শার্ট? সামি শার্ট পিনব? দাদী চলে যায় নিজের ঘরে সঙ্গে যায় আমার শার্ট।

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি দাদীর ঘরের দরজায়, মুখ ফুটে একবারও বলা হয় না, কেন? কেন সামি শার্ট পরবে না? ভাইয়া তো নিজের শার্ট পরে বেড়িয়েও এলো আর আমি পরতেই পাব না? না। এসব প্রশ্ন দাদীকে আমার করা হয়নি তখন। আমি শুনতে পেলাম, এমনিতেই তো মেয়েমানুষকে শয়তানে বশ করে সহজে, শয়তানের দেওয়া কুবুদ্ধিগুলো তো মেয়েরাই আগে মেনে নেয়, এই শার্ট-প্যান্ট পরে তো জিন্দা শয়তান হয়ে যাব আমি আর তারপর পরকালে দোজখের দারোয়ান হওয়া ছাড়া আমার আর কোনো গতি থাকবে না। ইফতার করতে এসে আব্বা শুনল শার্ট আসার খবর আর সেই শার্ট যে আমাকে পরতে দেওয়া হবে না সেই ফরমানও জারী হল। কাকা দাদীকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করল, এইটুকু মেয়ে, শার্ট পরলে কি অসুবিধে? সারাজীবন তো সেই শাড়ীই পরবে, এখন পরুক না ক'দিন, যদ্দিন বড় না হচ্ছে! শেষমেশ কাকা পাড়ার দর্জিকাকুর কাছ থেকে শার্টের পকেটও খুলিয়ে আনল, এটা এখন আর ছেলেদের শার্ট নয়, জামা হয়ে গেছে শুধু লম্বায় একটু খাটো! কোনো লাভ হল না। সেই শার্টও ভাইয়াই পরল, গোলাপী রঙের পকেট বিহীন শার্ট। সেবারও আব্বা চাঁদরাতে বন্দর বাজারে নিয়ে গিয়ে জামা জুতো ক্লিপ কাঁটা কিনে দিল যেমন প্রতিবারে দেয়।

ছেলে হিসেবে ভাইয়া বরাবরই একটু পক্ষপাতিত্ব পেয়ে এসেছে দাদীর আর অনেক সময় মায়েরও। রোজার সময় ভাইয়ার ইচ্ছে না হলেই রোজা রাখে না, তখন দাদী মাঝে-মধ্যে একটু বকলেও খুব বেশি কিছু একটা বলে না কিন্তু আমি রোজা রখব না এটা দাদী ভাবতেই পারে না যেন। জ্বর হলে বা একটু শরীর খারাপ হলেই আব্বা বলে, সেহরী খাইয়া ঘুমাও, কিন্তু রোজা রাখবা না। তখনই দাদী বলে, অত আহ্লাদ দিও না, কত শইল খরাপ লইয়াও বেডি মাইনষেরে রোজা-নমাজ করন লাগে। এমনিতে রোজা রাখতে আমার ভালই লাগে, সন্ধেবেলায় অত অত ইফতার আম্মা বানায়, রোজা না রেখে সেগুলো খেতেই বরং কেমন কেমন লাগে। কিন্তু শরবতের গ্লাসের বদলে ভাইয়া যখন বড় মগে শরবত পায় আর আমি পাই গ্লাসে, আরেকটু শরবত আমাকে চেয়ে নিতে হয় যা ভাইয়া পেয়ে যায় না চাইতেই তখন অজান্তেই অভিমানে জল চলে আসে চোখে। কোনোদিনই এইসব অভিমান বা রাগ-দু:খ কাওকে দেখাই না, বলি না কিন্তু ভাইয়া দিব্যি সামান্য কিছুতেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে আর অনেক অন্যায় আব্দারও কেমন অনায়াসে আদায় করে নেয়। মুরগীর ঠ্যাং আমার সবচাইতে পছন্দের, বুকের মাংসে রোয়া থাকে বলে খেতেই পারি না, কী রকম ঘাস ঘাস লাগে খেতে আর সেটা আম্মাও জানে, বহুবার বলেছি কিন্তু তারপরেও ভাইয়া আর কাকা দু'জনের জন্যে বরাবরের বরাদ্দ থাকে ঐ ঠ্যাং। আমি মাঝে মাঝে চেয়ে নিলে কাকা তখন অন্য মাংস খায় কিন্তু ভাইয়া কখনৈ নিজেরটা ছাড়ে না। আর এ নিয়ে দাদী বা আম্মা কেউই ভাইয়াকে কিছু বলে না। এই পক্ষপাতিত্ব অনেক সময়েই আমার নীরব অশ্রুপাতের কারণ হয়েছে, বহুবার ভেবেছি, কেন আমি ছেলে হলাম না। আমার শার্ট যখন ভাইয়ার দখলে চলে যায় সে ছেলে বলে তখন আবারও সেই আফসোস হয়, কেন আমি ছেলে হলাম না!

নাকফুল দিয়া কইলা বন্ধু
রূপে যে অতুল
বাত্তি জ্বালাই চাইলাম হায় রে
বরই গাছের ফুল
বন্ধে ভারাইল রে।।

বাজু পরাই কইলা
জলের যেন্দে হীরা
বাত্তি জ্বালাই চাইলাম
ভার্গা বাঁশের গিরা
বন্ধে ভারাইল রে।।

হাতাই হাতাই চাইলাম
শাড়ি ছড়ক ছড়ক
চেরাগ জালাই চাইলাম
আঁইট্যা কেলার বরক
বন্ধে ভারাইল রে।।
(চট্টাগ্রামের আঞ্চলিক গান/ কল্যাণী ঘোষ সংকলিত/ বাংলা একাডেমী ঢাকা/ পৃ-২৯২)


ঠিক পরের বছর কাকা একটা পাঞ্জাবী নিয়ে এলো। ছাপা ভয়েলের পাঞ্জাবী। বিস্কুট রঙের জমির উপর খয়েরী, লাল, কালো লতা-পাতা, কল্কা। সামনের দিকে পাঞ্জাবীর নিচের দিকটায় চওড়া বর্ডার, বড় বড় কল্কা সেখানে। গলায় সেই কাপড়ের সরু বর্ডার, তার উপরেই ছোট্ট ছোট্ট সাদা বোতাম বসানো। পাঞ্জাবীও ছেলেদের পোষাক বলে দাদী এবারেও যথেষ্ট চেঁচামেচি করল, কিন্তু কাকা দাদীকে বুঝিয়ে ছাড়ল, এটা মেয়েদেরই জামা, পাঞ্জাবীও নয় আর ছেলেদেরও নয়। কোথায়, পকেট কোথায়? পাঞ্জাবীতে তো পকেট থাকে!

সন্ধেবেলায় কাকা আমাকে নিয়ে বেরুলো প্যান্টের অর্ডার দেবে বলে। সাদা রঙের সিক্সটি-ফাইভ থার্টি ফাইভ কাপড় কিনে প্যান্টের অর্ডার দিলো, দু-দিকে পকেট আর সাইডে জিপ। ঠিক দু'দিনেই প্যান্ট দিয়ে দেবে অঙ্গীকারও করল জিন্দাবাজারের বিখ্যাত স্যুট-সাফারি'র টেইলার মাস্টার ইউনুস । এর পর জুতো। বাটার দোকানের বিশাল বোর্ডে হাঁটু অব্দি শাড়ি পরা একটা মেয়ে, যে দৌড়ুচ্ছে মাঠের উপর দিয়ে, সামনে রাখা একজোড়া জুতোর দিকে, বাটার জুতো! বাটার জুতো আমার পছন্দ হলো না, আমার এ'রকম নিচু নিচু চ্যাপ্টা মতন দেখতে জুতো চাই না। সাদার উপর বাদামী কোনাকুনি বেল্ট বসানো একজোড়া খড়ম কেনা হল। আমি তো সেখানে, সেই দোকান থেকেই জুতো পরে বাসায় ফিরব, কিছুতেই জুতো প্যাকেট করতে দেব না। আব্বা তো বারণ করে না দোকান থেকেই নতুন জুতো পায়ে বাড়ি যেতে! কাকা বোঝালো, তোর আব্বু তো চাঁদরাতে জামা-জুতো কিনে দেয়, পরদিন সকালে ঈদ, তোর জুতূ পুরোনো হয় না আর রাতে রাস্তায়-পাড়ায় লোক থাকে না বলে কেউ দেখতেও পায় না। কিন্তু এখন তো ঈদের দেরি আছে, পুরনো হয়ে যাবে না জুতো? অত সুন্দর পাঞ্জাবী আর প্যান্ট পরবি পুরানো জুতো পায়ে? ঠিক! প্যাকেটবন্দী হয় খড়ম, আমি অপেক্ষা করি ঈদের।

পাঞ্জাবীটা আমি কাওকেই দেখাই না, যদিও অনেকেই জানতে চেয়েছে, কি কিনেছি কাকার সাথে গিয়ে? আমরা, বন্ধুরা একে অন্যকে কক্ষনো ঈদের কাপড় দেখাই না। দেখালেই তো পুরনো হয়ে গেল। মজাটা হল ঈদের দিন। প্রায় সারা রাত জেগে দেশলাইয়ের কাঠিতে করে শিলে বাটা মেহেদী যতটা সম্ভব সুক্ষ ডিজাইনে হাতে পরে মেহেদী হাতেই ঘুমিয়ে পড়ি বরাবরের মত। লাল মেহেদীর গাঢ় রঙে রাঙানো দুই হাত, জামা-জুতোর সাথে কেনা পুঁতির মালা-দুল, সরু সরু ঝকঝকে লাল-কালো-সবুজ রেশমী চুড়ি রঙ মিলিয়ে মিলিয়ে পরে আর সঙ্গে সিলেটের ট্র্যাডিশনাল রঙ বাহারী &হয়ষঢ়;রুকের বালা' পরে সকালে বেরুতেই দেখা গেল পাশের বাড়ির লীনা আপুও ঠিক একই রকম পাঞ্জাবী পরে বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে! একই রঙ, একই ছাপা শুধু লীনা আপুর পাঞ্জাবীটা সাইজে বড়। লীনা আপুর বেশ মন খারাপও হল, ঐ একই পাঞ্জাবী আমিও পরেছি বলে!

বরই ফুলের থামি
আর একখান গোলবাহার
যদি পাইতাম আঁই পিনতাম
আনা ধরি চাইতাম
আঁরে ক্যান সোন্দর লাগে।
(চট্টাগ্রামের আঞ্চলিক গান/ কল্যাণী ঘোষ সংকলিত/ বাংলা একাডেমী ঢাকা/ পৃ-১৭)


পাশের লন্ডনী বাসার আম্বিয়া আপু কেমন সুন্দর ম্যাক্সি পরে, স্কার্ট পরে। ছেলেবেলায় আম্বিয়া আপু লন্ডনে থাকত, তার জন্মও সেখানেই। একদম মেমসাহেবদের মত দেখতে আম্বিয়া আপুকে। তার বাবা তো এখনো সেখানেই থাকে, এখানে আম্বিয়া আপু থাকে তার ডাক্তার ভাইয়া-ভাবীর সাথে। আন্টি বছরে ছ'মাস থাকে লন্ডনে আর ছ'মাস সিলেটে, ছেলে-মেয়ের কাছে। প্রত্যেকবারেই সিলেটে আসার সময় নিয়ে আসে সব লম্বা লম্বা স্কার্ট, ম্যাক্সি। আমারও খুব ইচ্ছে করে অমন লং ড্রেস পরতে, কিন্তু বলি বলি করেও বলতে পারি না, যদি আব্বা না করে দেয়! না করবে বলে মনে হয় না, কিন্তু যদি না করে? কাকাকেই বলি, কাক্কু, আম্বিয়ার আপুর ম্যাক্সি কত সুন্দর না? কাকা বুঝতে পারে, একটা চোখ টিপে দিয়ে বলে, ম্যাক্সি গুলি এতো সুন্দর না, কিন্তু স্কার্টগুলি খুব সুন্দর, তোর চাই? মাথা শুধু একটু উপর-নিচ করে বুঝিয়ে দেই, চাই! উজ্জÄল কমলা রঙের বিশাল ঘেরের স্কার্ট আর সাদার উপর সাদা লেস আর সাদা সুতোর কাজ করা তিন কোয়ার্টার হাতার ছোট ঝুলের কুর্তা যা কাকা আর আমি মিলে কিনলাম শাহ্জালাল মার্কেটের নতুন লন্ডনী দোকান থেকে সে দেখে আমারই বিশ্বাস হতে চায় না যে এ আমারই! বহুদিন অব্দি যে কোনো বিয়েবাড়ি বা নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়ার আমার একমাত্র পোষাক ছিল এই লং স্কার্ট আর সাদা কুর্তা। যদিও আমি লম্বা হয়ে যাওয়ায় খুব তাড়াতাড়িই খাটো হয়ে গিয়েছিল সেই লং স্কার্ট। আর লম্বাও তো আমি হয়েছি দিনে আধ আঙুল আর রাতে এক আঙুল করে (এটা আমার কাকিমার হিসেবমতে) ।

খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি আমাকে শার্ট-প্যান্ট পরার জন্যে। দাদীর এককথায় আমার শার্ট যখন ভাইয়ার হয়ে যায় তখন একটিও কথা না বলে চুপ করে থাকা আব্বাই এনে দেয় শার্ট আর সাথে প্যান্টও! বরাবরই দেখেছি দাদী কোনো কিছু নিয়ে রাগারগি করলে বা আম্মাকে বকলে আব্বা কখনৈ এর মাঝে পড়ে না। দাদীকে তো কখনৈ কিছু বলে না সে দাদী ন্যায়ই বলুক বা অন্যায়, কারো সামনে আম্মাকেও কিছু বলে না। আমাদের কোনো কথা নিয়ে দাদী কোনো ফরমান জারী করলে আব্বা সেখানেও দাদীকে কিছু বলে না কিন্তু নিজে যা করার সেটা ঠিকই করে যায় দাদীকে মুখের উপর কিছু না বললেও। দাদী অখুশি হয় কিন্তু আব্বাকে ঘাঁটায় না কখনৈ। আমাকে নাকি বেশি আহ্লাদ দেয় আব্বা, অন্তত দাদীর তাই মনে হয়, মাইয়া মাইনষেরে বেশি আহ্লাদ দিতে নাই, কেডায় জানে বিয়া-শাদী কই হইব, কুন দ্যাশে যাইব, কফাল কেমন হইব। ভালা হইলে তো ভালই, কিন্তু আল্লায় না করুক যদি খারাপ হয়, তখন আহ্লাদী মাইয়া সহ্য করতে পারত না, কাইন্দা কূল পাইত না! এই সমস্ত জ্ঞানের কথা আকছারই শুনতে হত আমাদেরকে।

প্রত্যেক বছর রোজার মাস আসার অনেক আগে থেকেই ঈদের কাপড়ের চিন্তা শুরু হয়ে যেত আমার কারণ আমার বন্ধুদের সক্কলের কাপড় কেনা হয়ে যেত রোজা শুরু হওয়া মাত্রই। সবাই একটু একটু করে বলত, আমার এক নম্বর জামাটা অমুক রঙের, দু নম্বর জামাটা তমুক রঙের। আর তারপর তিন নম্বর, চার নম্বর জামারও রঙ আর ডিজাইনের বর্ণনা আমাকে শুনতে হতো। আমার শুধু থাকে গম্ভীর মুখে অপেক্ষা, কবে আব্বা নিয়ে যাবে, কিন্তু মনে মনে এও ঠিক জানি, সন্ধেবেলায় চাঁদ বেরুলে তবেই আব্বা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এসে বাজার করতে বেরুবে। সে'বার ব্যাঙ্কের কাজে ঢাকা গেল আব্বা আর কি মনে করে কে জানে আগে আগেই জামা-কাপড় কিনে নিয়ে এলো। আর কী অদ্ভুত কান্ড, আব্বা আমার জন্যে একটা শার্ট-প্যান্টের সেট কিনে আনল ঢাকা থেকে! তাও কিনা ঢাকা নিউ মার্কেট থেকে! আমাদের সিলেটে তো কোনো নিউ মার্কেটই নেই। সেই এক বন্দর বাজারের ঘিঞ্জি মার্কেট, যার কোনো নামই নেই আর ঐ তো কয়েকটি মাত্র দোকান নিয়ে ছোট্ট একখানি শাহ্জালাল মার্কেট। ব্যস! ঢাকা নিউ মার্কেট থেকে কেনা চওড়া কলারের খয়েরী রঙের শার্ট আর ঘিয়ে রঙের বেল বটম প্যান্ট নিয়ে আসে আব্বা আসছে উত্সবের জন্যে। আর সব চাইতে বেশি অবাক লাগে যখন দেখি একটা শব্দও করেন না আমার দাদী জোবায়দা খাতুন চৌধুরানী! সন্মন্ধ এনেছে বাপে সামনের ফাল্গুনেই পরের ঘরে চলে যাবে মেয়েটা।

আইল চৈত্রিরে মাস আকাল দুর্গাপূজা।
নানা বেশ করে লোকে নানা রঙ্গের সাজা।।
ঢাক বাজে ঢোল বাজে পূজার আঙ্গিনায়।
ঝাক ঝাক শঙ্খ বাজে নটী গীত গায়।।
মন্ডপে মায়ের মুর্তি দেখিতে সুন্দর।
কারুয়া টাঙ্গাইয়া করে ঘর মনোহর।।
পাড়া-পড়সি সবে সাজে নূতন বস্ত্র পরি।
ঘরের কোণায় লুকাইয়া আমি কান্দ্যা মরি।।
মায়ে-ঝিয়ে কান্দি ঘরে গলা ধরাধরি।
বৈদেশী হইল পিতা অন্ধকার পুরী।।
(কমলা/ মৈমনসিংহ-গীতিকা/ দ্বিজ ঈশান/সঙ্ক- শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন/ পৃ-১৪৫)



[এই লেখাখানি গুরুচন্ডা৯-র পুজো ইস্পেশাল ২০০৯ এ প্রকাশিত।
http://www.guruchandali.com/guruchandali.Controller?portletId=21&porletPage=1 এই সুতোটি ধরে পৌঁছে যাওয়া যাবে গুরুচন্ডা৯-র পুজো ইস্পেশালে ]



Tuesday, September 22, 2009

অদ্ভুত আঁধার এক..

গতকাল একটা অদ্ভুত দিন গেল..

মাথাটা কী রকম ফাঁকা, কী রকমও নয়, একদম ফাঁকা..
ঠিক যেমম ফাঁকা ছিল টানা সতেরোটা বছর..

আচ্ছা, সতেরো বছর কাকে বলে তুমি কী জানো?

কোনো ভাবনা নেই..
চিন্তা নেই..
একদম ফাঁকা ..
খালি..
শূণ্য..
অভ্যেসসশত দৈনন্দিন কাজ সব করে যাই একের পর এক, সেই আগের মতো
যখন আমি অবসাদের ওষুধ খেয়ে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ফাঁকা মাথায় শুধু অভ্যেসবশে করে যেতাম একের পর খুঁটিনাটি সব কাজ, সংসারের কাজ হাত চলত হাতের মতো, পা চলতো পায়ের মতো, আমার কোনো ইচ্ছে-অনিচ্ছের ধার তারা ধারতো না আসলে কোনো ইচ্ছে-অনিচ্ছে তো অনুভবও করতাম না
'মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরী বানাইয়াছে/ একখান চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া জনম ভইরা চলতে আছে..'
তো আমাকেও সেই চাবিই চালিয়ে নিয়ে যেত, আমাকে ভাবতেও হতো না, এরপর কী করব, কেন করব, কী করা দরকার.. আমি শুধু করে যেতাম..সকালে, দুপুরে আর রাত্তিরে ওষুধ খেতাম আর আমার হাত-পা-শরীর চলত, আমিই শুধু চলতাম না, একটা জায়গায় থমকে ছিলাম, আটকে ছিলাম, আমার শৈশবে, আমার ছেলেবেলায়..

গতকাল আবার সেই রকম একটা দিন গেল, কাল ঈদ ছিল, রোজার ঈদ প্রতি ঈদে আমার খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায়, আপনা থেকেই, কালও ভেঙেছিল, আপনা থেকেই প্রতি ঈদে আমি ভোর ভোর উঠে ঘর গোছাই, বিছানা-বালিশের কভার বদলাই, ধোপার বাড়ি থেকে সদ্য কেচে আসা কড়কড়ে ইস্তিরি করা
পর্দার ভাঁজ ভেঙে টানিয়ে দিই দরজা-জানালায়, সব কটা দরজায় সামনে পেতে দিই নতুন পাপোষ, কালও দিয়েছি, নিতান্তই অভ্যেসবশে, আমার কোনো হাত ছিল না এই কাজগুলোতে কালকেও কী আমি আটকে গেছিলাম আমার ছেলেবেলায়?

না কালকে আমি আটকে গেছিলাম ঝড়ের পরের নিস্তব্ধতায়, জলোচ্ছাসে সব ভেসে যাওয়া গ্রাম দেখেছ তুমি? কিছুই থাকে না যেখানে? তুমি কী দেখেছ কখনো ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার, পোষা গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, হাঁড়ি-বাসন, খড়ের গাদা আর জমানো গোবর সব, সব যখন ভেসে যায় আর পড়ে থাকে শুধু থকথকে কাদা? পা দিলে যেখানে ডুবে কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমর অব্দি? সেই কাদার মধ্যে এখানে ওখানে আধখানা ডুবে থাকে মরে পড়ে থাকা গাভীন গাই, সদ্য ডিম থেকে বেরিয়ে আসা মুরগীর ছানা আর ইতি-উতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গেরস্থালী আর দু'চোখের গহীনে বসত করা সীমাহীন স্বপ্ন? যেখানে কোনো রঙ নেই, ধূসর ছাড়া, এমনকি সাদা-কালোও নেই, দেখেছ কখনো?

আমি কাল সেই বিরান হয়ে যাওয়া জনপদে একলা বসেছিলাম.. বসে আছি..

থমকে ছিলাম, আটকে ছিলাম..

আটকে আছি..

একটি স্বপ্নের ভ্রুণ সাথে নিয়ে অবিরাম শুধু বয়ে যাচ্ছিল গোলাপী রঙের রক্ত ..

আর তারপর থেকে বয়েই যাচ্ছে আমাকে ক্রমশ রক্তশূণ্য করতে করতে...