প্রথম ও দ্বিতীয় দিন
------------------
এদিকে গুরুগণ বইমেলা- বইপত্তর নিয়ে নানারকম প্ল্যান প্রোগ্রাম, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে চরম ব্যস্ত। আমার বাড়িতেও তুমুল ব্যস্ততা। রাত-দিন ফোনাফুনি, মেলা-মেলি, টাইপা-টাইপি। ওফফ্ফ ... গুরু পাঁচ নামি নামি করছে, প্রেসে যাবে কে? আমার ভদ্রলোকটি দৌড়ুলেন বইয়ের খোঁজে, হাতে নিয়ে এক্কেবারে মেলায় যাবেন! ততক্ষণ হাতে যা আছে সম্বল তাই নিয়ে আমি গুটি গুটি পায়ে মেলার পথে। সেখানে আবার এক ডাগদারবাবু আসিবেন বলিয়া জানাইয়াছিলেন। আসবে স্যান বালিকা, টিম্ভাই। মেলার গেটে দাঁড়িয়ে বইয়ের ব্যাগ হাতে বাবাই।
প্রেসিডেন্সি আর নন্দন দু জায়গাতেই বেশ সহজেই কা গু জাঁকিয়ে বসেছিল প্রথম দিন থেকেই। চেনা জানা সব লোকজন এসেছেন, পত্রিকা নিয়ে গেছেন, চন্ডালেরা এসেছেন, জোর আড্ডা হয়েছে ক'দিন। কেডি দশ হাতে সব সামলেছেন। রং বেরঙা জামা পরে মেলা ঘুরে, বুকের পরে কাগুজে গুরুর পোস্টার সাঁটিয়ে লোক পর্যন্ত ডেকে এনে বই বিক্রি করেছেন। এতসব কান্ড করতে গিয়ে খানিকটা কাবু হয়ে পড়েছেন শরীরের হাতে। প্রেসিডেন্সি-নন্দনের মেলা শেষ হতে না হতেই আবার অসুস্থ শরীর নিয়ে জুটে গেছেন নিখিল বিশ্ব বঙ্গ ভাট সম্মেলনের আয়োজনে। সেটাকেও সম্পন্ন করেছেন সফলভাবে। কিন্তু শরীর বলে, বাবাজী। মেলা হয়েছে, এবার একটু আরাম দাও আমাকে। ব্যস। কাবলিবাবু কাবু! ফলে যা হল, কলকাতা বইমেলায় গুরুচন্ডা৯ যাত্রা শুরু করল কাবু কাবলি মুখার্জীকে ছাড়াই।
কোথায় মমার্ত কোথায় কী। মেলায় শুধু ধুলো আর ধুলো। দু মাস লাল রঙের চোখ রাঙানি সহ্য করে সদ্য সেরে ওঠা চোখে আমার তুমুল জ্বালা ধুলোর ঝাপটা খাওয়ামাত্রই। উবুদশ খুঁজে পাবো না আমি জেনেও ডান-বাঁ কিছুই না বুঝে শুধু ঘুরে বেড়াই বেদিশার মতো। সাথে ঘোরে বেচারা বাবাই, যে কিনা আমার থেকেও বড় বেদিশা : -( না পাওয়া যায় মমার্ত, না উবুদশ। সামনে দিয়ে কে বেরিয়ে যায়? সেও কি যেন খুঁজছে। মমার্ত কি? ঠিক! স্যানও মমার্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেখানেই ডাগদার্বাবু আমাদের সঙ্গীতাকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন যে! এগলি ওগলি সেগলি কোথাও নেই কাঙ্খিত মমার্ত। অগত্যা ডাগদারবাবুই এগিয়ে আসেন মেক্সিকোর পতপত করে উড়তে থাকা রঙীন কাপড়ের বিশাল ঘেরের প্যাভিলিয়ন পেরিয়ে।
বহুদিন বাদে দেখা সঙ্গীতার সাথে। ছোট্ট করে খানিক আড্ডা। আবার খোঁজ। উবুদশ। ভর্সা আছে মনে, পেয়েই যাব। তবে আমার ভাগ্য খুব ভাল কিনা তাই তখনও মেলায় পৌঁছননি অসিতদা। একমাত্র ভর্সা যাঁর পরে, মেলায় খানিকটা জায়গা তাঁর হাত ধরেই করে নেবে গুরুচন্ডা৯। ভাটুরেগণ ঢুকে যায় বইয়ের দেশে, বইয়ের ব্যাগ নিয়ে আমি উবুদশে, অসিতদা কখন আসবেন। আমার বেজার মুখ দেখেই হয়ত উবুদশের জাঁদরেল সম্পাদকের খানিকটা মায়া হয়, তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান লিটল ম্যাগ কর্নারে, যেখানে পরবর্তী ১২দিন অধিষ্ঠান করবে কাগুজে গুরু। অসিতদার ব্যবস্থামত গুরুচন্ডা০ খানিকটা জায়গা পেয়ে যায় কণিকার টেবিলে। সহদৃয় অরিজিত বলেন, আপনি বসুন এই টেবিলেই, যতক্ষণ-যদ্দিন আপনাদের টেবিলের ব্যবস্থা না হয়। মনে প্রচন্ড ভয় তখন, যদি আদৌ টেবিল না পাওয়া যায়? অরিজিত বলেন, না পেলে এখানেই বসবেন আর কি। খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে আবার সন্ধান, এবার ডাগদারবাবুগো। তাদের যদিবা পাওয়া যায় পাওয়া যায় না চায়ের কোনো দোকান। আবার খোঁজ। এদিক সেদিক। আসলে কোনো দিকেই নয়। প্রায় একই জায়গায় ঘুরপাক। অগত্যা চায়ের আশা বাদ। আমি ৬৭নম্বর টেবিলে এবং জনতা আবার বইয়ের দেশে।
Sunday, February 07, 2010
কাগুজে গুরুর বইমেলা অভিযান
Posted by
বিবর্ণ কবিতা
at
12:22:00 AM
2
comments
Labels: গুরুচন্ডা৯, বইমেলা
Tuesday, January 05, 2010
হারানো হাঁস ম্লান মুর্গী ০৩
লোটা ভইরা শীতল জল দিল খরম পানি।
পাঁচ ভাইয়ের বউয়ে রান্ধে পরম রান্ধুনি।।
মানকচু ভাজা আর অম্বল চালিতার।
মাছের সরুয়া রান্ধে জিরার সম্বার।।
কাইট্টা লইছে কৈ মাছ চরচরি খারা।
ভালা কইরে রান্ধে বেনুন দিয়া কাল্যাজিরা।।
একে একে রান্ধে সব বেনুন ছত্রিশ জাতি।
শুকনা মাছ পুইড়া রান্ধে আগল বেসাতি।।
- মলুয়া, মৈমনসিংহ গীতিকা
আব্বার ভীষণ পছন্দ শুটকি মাছ। সে যে কোন মাছেরই শুটকি হোক না কেন। খাবারের টেবিলে একটা শুটকির পদ না থাকলে আব্বার খাওয়া হয় না। বাজারে যত রকমের শুটকি পাওয়া যায়, আমাদের বাড়িতে সব রকমের শুটকিই আসত। বঙ্গোপসাগরে যে সব সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ে জেলেদের জালে, তার বেশির ভাগই শুকিয়ে শুটকি করা হয়। নদী নালা, পুকুর আর বিলের মাছ খেয়ে অভ্যস্ত আমরা বাঙালিরা, সচরাচর সমুদ্রের মাছ কিনি না। লাক্কা মাছ তেমনি একটি মাছ। আড়াই থেকে তিন ফুট লম্বা, দেখতে অনেকটা হাঙরের মত। জেলেরা সেই মাছ বাজারে এমনকী বিক্রির চেষ্টাটুকুও না করে ল্যাজার দিক থেকে মাছটাকে তিন ফালিতে ফাঁক করে কেটে দিত কুড়ুল দিয়ে। দুপাশে মাছের শরীর, মাঝখানে ইয়া মোটা কাঁটা। সেই চওড়া শরীরটা আবার সরু সরু করে চিরে দেওয়া, ভাল মতন শুকানোর জন্য। ঠিক যেমন মাংসের ফালি করা হয় কাবাবের জন্য। এই তিনফালি মাছ জোড়া লেগে থাকত মাথার সাথে। তিনফালি মাছকে জাষ্ট কাপড় মেলার দড়ি বা তারে মেলে দেয় জেলেরা, ঠিক যেমন জামা-কাপড় শুকোয় গৃহস্থ বাড়িতে।
তো লাক্কা মাছের শুটকি প্রথম যেদিন এল, সে দেখে ভয়েই অস্থির আমরা। অত বড় একটা শুকনো মাছ, মরা শুকনো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে আর শুকনো দাঁত সর্বক্ষণ খিঁচিয়েই আছে যেন! গোটা একটা লাক্কা মাছের শুটকি দেখে আম্মা প্রথমেই একপ্রস্থ চেঁচিয়ে নেয় আব্বার পরে, কেন অতবড় একটা গোটা শুটকি মাছ কেনা হল। আব্বা ততক্ষণে লেগে পড়েছে কুড়ুল দিয়ে সেই শুটকি মাছ কাটায়। কুপিয়ে কয়েক ভাগে ভাগ করে আব্বা বলে, একলা খামু নিহি, হগ্গলেরে দেওন লাগত না!
ভীষন শক্ত সেই লাক্কা শুটকির টুকরোকে রাতভর ভিজিয়ে রাখে আম্মা। তারপর আবার খানিকটা সেদ্ধ মতনও করে নেয় নুন আর হলুদ দিয়ে, বোঁটকা গন্ধ ছাড়ানোর জন্য। টুকরো টুকরো শুটকিকে শিলে হালকা করে থেঁতো করে নিয়ে অনেকটা ঝুরো ঝুরো করে দেয়। সে কি বড় বড় রোয়া মাছের, যেন বুড়ো কোন ষাঁড়ের মাংসের রোয়া। খুব বেশি করে পেঁয়াজ, রশুন কেটে নিয়ে তেলে ভাজে আম্মা, আর তারপর ওতে মশলা দেয়, বাটা রশুন, ধনে আর বেশি করে লাল মরিচ। মশলা কষে এলে থেতো করা শুটকি দিয়ে দেয় আর তারপর খানিক বাদে বাদেই নাড়তে থাকে। খানিকটা জলও দেয় মশলা ভাল করে শুটকির ভেতরে ঢোকার জন্যে। ততক্ষণের আশে-পাশের বাড়িতেও ঢুকে পড়েছে লাক্কা শুটকির ভাজি'র গন্ধ! শুকনো ঝুরো মতন দেখতে, তেলে মশলায় প্রায় ডুবু ডুবু লাক্কা, অনেকটা যেন মাংসের ঝুরি কাবাব, ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় লালে হলুদে মেশানো এক অদ্ভুত রং ধরা রশুনের কোয়া। গরম ভাতের সাথে, পোলাওয়ের সাথে এমনকি গরম গরম সেঁকা রুটির সাথেও দুদ্দাড় চলে লাক্কা ভাজি।
আব্বার শুটকি প্রীতি এমনই যে তিনি খুঁজে পেতে বের করেন নোনা ইলিশ। ইলিশের শুটকি। যদিও দুষ্পাপ্য আর দুর্লভ কিন্তু ইলিশপ্রেমীরা জানেন কোথায়, কোন জেলার কোন বাজারে পাওয়া যায় নোনা ইলিশ। ইলিশ যখন প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ে আর সেই ইলিশ সব বিক্রি হয় না, উপযুক্ত স্থান-ব্যবস্থার অভাবে যখন ইলিশের পাহাড় জমে থাকে জেলেদের কাছে তখন তারা বড় বড় চাকা চাকা করে কেটে নিয়ে নুন মাখিয়ে দেয় ইলিশে। নুন মাখানো না বলে বলা ভাল নুনে ডুবিয়ে দেওয়া হয় ইলিশকে। কয়েকদিন ধরে চলে এই নুন মাখানো। যখনই গায়ের মাখানো নুনের উপরদিকটা ভিজে আসে তখনই আবার আরো নুন দেওয়া হয় ঐ ভেজা নুনের উপরে। তারপরে বিশালাকারের মাটির মটকায় থাকে থাকে সাজানো হয় নুনে চোবানো ইলিশকে। মাটির সরা মুখে দিয়ে মটকার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় টাইট করে। তারপর মাটির মটকা কোন একটা ঘরে একপাশে রেখে দেওয়া হয়। কোন একটা ঘরে হয়ত এরকম সব সার সার মাটির মটকাই শুধু থাকে। তিন থেকে চার মাস পরে ব্যাপারীকে বিক্রি করে দেওয়া হয় মটকা সহ ইলিশ। ততদিনে তৈরি নোনা ইলিশ বা লোনা ইলিশ । সোজা কথায় ইলিশের শুটকি।
খুব বেশি করে পেঁয়াজ রশুন কেটে নিতে হয় নোনা ইলিশ খেতে হলে। পেঁয়াজ রশুন নিয়ে কার্পণ্য করলে নোনা ইলিশের মন খারাপ হয়, সে তার স্বাদকে গুটিয়ে ফেলে। কাজেই ইচ্ছে মতন পেঁয়াজ রশুন কেটে নিতে হবে আগেই। খুব ভাল করে নুন মাখানো ইলিশ ধুয়ে নিতে হয়। খুব মানে খুব ভাল করে। তেল গরম করে চাকা ইলিশ বা টুকরো করে কেটে নেওয়া ইলিশ অল্প ভেজে নিতে হয় তেলে। বাজার থেকে আগে থেকেই কিনে আনতে হবে স্বাস্থ্যবান যুবক নরসিংদীর শিঙনাথ বেগুন। না পেলে অগত্যা লাফা বেগুন। বড় বড় মোটা মোটা যে বেগুনগুলো বাজারে পাওয়া যায় তাই আর কি। এতে করে যদিও নোনা ইলিশের মানহানি হয় কিন্তু কী আর করা যাবে! সেই বেগুন ডুমো ডুমো করে কাটা বেগুন তেলে হালকা সোনালি করে ভাজতে হবে। ভাজা বেগুন তেল থেকে তুলে থালায় সাজিয়ে রেখে এবার কড়ায় ঢালা হোক বেশুমার পেঁয়াজ আঅর রশুন। পেঁয়াজ যখন সোনালি হয়ে এল তখন একটু মশলা দেওয়া যাক। মশলা বলতে লাল মরিচ বাটা আর ধনে বাটা। ঝাল খেতে আপত্তি না থাকলে মরিচবাটাও ইচ্ছে মতন কিন্তু ঝাল নিয়ে সমস্যা থাকলে একটু বুঝে শুনে। একটুশখানি জল দিয়ে মশলা কষে এলে ভেজে রাখা ইলিশেরা উঠবে কড়ায়। মশলা আর পেঁয়াজের সাথে ইলিশের সখ্যতা যখন মাখো মাখো তখন টুক করে ঢুকে পড়বে বেগুন। ইলিশের সাথে বেগুনের বন্ধুত্ব চিরকালীন কাজেই ওদের একটু নিরালায় ভাব করতে দেওয়া হোক কড়ায় ঢাকনা চাপা দিয়ে। খুব বেশিক্ষণ নয় যদিও। বেগুন আবার ভীষণ সংবেদনশীল কিনা, বড় অল্পেতেই রুষ্ঠ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় কাজেই খুব একটা নাড়া-ঘাঁটা একদমই নয়। শুধু আলতো করে একটু এদিক ওদিক করে দেওয়া। বেগুন আর ইলিশ এক হয়ে যখন তেলকে আলাদা করে দেবে তখন কুচানো ধনে পাতা আর চেরা লংকা দিয়ে নামিয়ে নেওয়া। আর হ্যাঁ। বলতে ভুলে গেছি, ভুল করেও নুন দেওয়া চলবে না নোনা ইলিশে। আগে থেকেই এত নুন খাওয়ানো হয় রাজকুমারীকে যে আর নুন তার সইবে না মোটেও। শালি ধানের লালচে সোঁদা সোঁদা গন্ধ ওঠা গরম ভাতের সাথে জমাটি প্রেম এই বেগুন আর ইলিশের।
মাইনি্কয়া বলে "এমন কথা না কহিও তুমি।
চাইড়া যাইতে মন না চলে সোনার বাড়ী জমি।।
সানে বান্ধা পুষ্করিনী গলায় গলায় জল।
পাইক্যা আইছে সাইলের ধান সোনার ফসল।।
তা দিয়া কুটিয়া খাইয়াম সালি ধানের চিরা।
এই দেশ না ছাইরো ভাইরে আমার মাথায় কিরা।।'
- মহুয়া, মৈমনসিংহ গীতিকা
যা হয়, দেশ ছাড়ার সাথে আস্তে আস্তে খাওয়া দাওয়া পাল্টে যেতে থাকে। মাঝে সাঝে বাংলাদেশ গেলেও সিলেট আর যাওয়া হয়নি। কাজেই তামাবিলের পাখি যে বছর শেষে ঠিক সাইবেরিয়া ফিরে যায় এমন কথা বলতেও পারি না। আমি নাই বা থাকলাম দেশে, খাদ্যরসিকদের নিশ্চয় অভাব বাংলাদেশে পড়েনি। দেশে ফিরলে দাওয়াত্ অনেক পাই বটে কিন্তু সেই স্বাদ আর গন্ধ ফিরে পাই না। বছর দুই আগে দেশে গিয়ে দাওয়াত্ খেতে যাই ভাইয়ের শ্বশুর বাড়িতে। ভাই বিয়ে করেছে এক বার্মিজ মেয়ে। বেশ কয়েক বছর আগে বার্মা থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত টেকনাফে এসে ঘর বাঁধে তাদের পরিবার। কেবল এক পুরুষেই বাংলাদেশে বাস। জীবিকা ও বসবাসের সুবিধার জন্য তারা চলে আসে চট্টগ্রাম শহরে। নিজেদের মধ্যে এখনও বার্মিজ ভাষায় কথা বলে। শাড়িকে দু'টুকরো করে একটা অংশকে, নিচের অংশ কোমরের নীচে সার-ংএর মত করে পরে । উপরের অংশটা কোমর থেকে গুঁজে নিয়ে শরীরে জড়িয়ে রাখে ওড়নার মত। গায়ে পড়ে কোমর পর্যন্ত ঝুল সেমিজের মত জামা। বর্তমান প্রজন্ম বেশ আধুনিক। তাদের বাড়ি দাওয়াত্ খেতে গিয়ে বারোটি চেয়ারের ডাইনিং টেবিলে স্তূপীকৃত খাওয়ারের রাশি দেখে তো ভির্মি খাওয়ার যোগাড়। মিষ্টি দিয়ে খাওয়া শুরু হল। সেটাই তাদের রীতি। খাওয়ার পরিবেশন করতে এল ভায়ের শালিকা। যে ক'জন নিমন্ত্রিত ছিলাম, ছয়- সাতজন মত, তাদের প্রত্যেকের প্লেটে দেওয়া হল "দুরস্ত কুড়া', নাম শুনে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, ডিপফ্রাই করা এক গোটা মুর্গী, কড়া করে ভাজা। বিশাল বড় ট্রেতে করে নিয়ে এসেছিল, প্রত্যেকের পাতে একটি করে ধরিয়ে দিয়ে গেল। সেই মাংস এত কড়া করে ভাজা যে মাড়ি ছিঁড়ে পড়ার জোগাড়। শক্তপোক্ত দাঁত ছাড়া হাত না বাড়ানৈ ভাল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি, গোটা কুড়াটাই খেতে হবে? তাহলে বাদ বাকি জিনিসেরই বা কী হবে? মিষ্টি হেসে সুন্দরী শ্যালিকা জবাব দেয়, "যেটুকু পারেন খান, খাইতে না পারলে পাশের প্লেটে তুলি রাখি দিবেন'। চেষ্টা চরিত্র করে মুরগীর দুটো ঠ্যাংই খাওয়া গেল কেবল। নুন, আদার রস, আর লেবুর রসে জারিয়ে রাখা "দুরুস্ত কুড়া' খেতে দিব্য। টেবিলে সাজিয়ে রাখা অন্যান্য খাদ্যের দিকে চোখ না গেলে "দুরুস্ত কুড়া' মন দিয়ে খাওয়া যেত। এরপরে যে বস্তুটি এল সেটিও ভেতর থেকে ট্রেতে চেপেই এল, এই ট্রে আকারে কিঞ্চিত ছোট। সেদিকে চোখ পড়তেই সবার চোখ গোলগোল। মাঝারি আকারের ট্রের মধ্যে একরাশ ইলিশ তাও সব গোটাগোটা। সেই ট্রে থেকে জাস্ট আস্তে করে খাওয়ার প্লেটে ঢেলে দিল গোটা একটা ইলিশ। আকারে বেশি বড় নয়, কিন্তু তাও তো গোটা! ধরার সময়ই তারা ছিল ছয়শ-সাতশ গ্রামের, তখনও মশলার কাপড়জামা সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা তাদেরও ছিলনা, আমাদেরও ছিলনা! হাসিমুখ শ্যালিকাটি বলল, "ছুরি দিয়ে কাটি কাটি খান।' অবাক দৃষ্টিতে তাকালাম, ছুরি দিয়ে কেটে! ইলিশ মাছ! পরিবেশনকারিনী তখন একটু বিবরণ দিলেন, ইলিশ রান্নার। "এটা আমাদের রেঙ্গুনের রান্না, এ মাছ খাইতে আপনাদেরকে কাঁটা বাছি খাইতে হবে না! চাবাই খায়্যি ফেলেন, কোনো কাঁটা লাগব না।' খানিকটা মাছ ভেঙে ভয়ে ভয়ে মুখে পুরতে জ্বীভে যেন আপনা থেকেই সব গলে গেল। হালকা টক স্বাদ পেলাম। শুনলাম রাতভোর সিরকায় ডুবিয়ে রাখার পর ঘন্টা দুই সময় লেগেছে একেকটি ইলিশ রান্না করতে! মশলা বলতে, আদা, রসুনের রস আর খানিকটা পিষে নেওয়া টমেটো। তরিবত্ আর এমনই মেহনত্ করে রান্না করা যে তাতে কোন কাঁটাই আর অবশিষ্ট নেই। তারও তিন ভাগের একভাগ মত খাওয়া হল। গ্রেভি আর খুশবু ওঠা পোলাও তখনও পড়ে, পড়েই রইল সেগুলো, পড়ে ভুনা মুর্গীর গোশত আর চট্টগ্রামের লংকা সহযোগে গরুর মাংস ইয়া বড় টেবিল জুড়ে। পোলাও বা অন্য কিছু নেওয়ার ইচ্ছে তখন নেই। তাদের ইস্পেশাল রান্না শুনে, মুর্গী কে সাইড করে অল্প একটু পোলাওএর সাথে লাল রঙের গোশত পাতে নিলাম। প্রচুর গ্রেভির মধ্যে লুকোচুরি খেলা মাংসের ছোট ছোট টুকরো, খুব ছোট ছোট সেই সব টুকরো দেখলে খেতে ভরসা হয়। ইয়া মস্ত মস্ত মুর্গীকে ঠিক চার টুকরো করে কেটে রান্না করা ভুনা দেখে যখন একেবারেই ভরসা হয়নি। গোশতের রঙ দেখে ভয়ের কিছু নেই। যাদের চাট্গাই লঙ্কা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা আছে, তারা জানেন। যারা জানেন না, সেই লঙ্কার আকার সত্যি বড়, কাশ্মিরী লঙ্কার চাইতেও, ফুট খানিক লঙ্কা যখন গাছে ধরে তখন গাছের ওজনের থেকে প্রতিটা লঙ্কার ওজন অনেক বেশি হয়। সেই লঙ্কার রঙ ঘোরতর লাল, আর শুকিয়ে যাওয়ার পর দেখতে হয় কালচে লাল, সাইজে বড় আমপাতার মতন। কত কেজি মাংসে ঠিক কতটা লঙ্কা পড়েছে তা আল্লাহ জানেন! তবে ঐ যে গ্রেভির সাম্রাজ্য তার সিংহ ভাগই লঙ্কার দখলে। কালনেমির মত সেই লঙ্কায় ভাগ বসিয়েছে স্বল্প পেঁয়াজ, রসুন ও আদা। লঙ্কার বর্ণনা শুনে যাদের গলা শুকিয়ে এসেছে, তাদের এবার জানিয়ে দেওয়া ভালো, ঐ নাগরা জুতোর সাইজের লঙ্কায় ঝাল কিন্তু মোটেও নেই, বরঞ্চ মিষ্টি। ঝালের জন্য দেওয়া হয় অন্য লঙ্কা!
সঙ্গতে যে পোলাও ছিল তার কথা বোধহয় এখানে লিখে রাখা ভাল। চিনিগুড়া চাল, যা আকারে খাসা বা গোবিন্দভোগ চালেরও অর্ধেক, তা ভিজিয়ে রেখে গাওয়া ঘিতে ভেজে নেওয়া হয় দারুচিনি এলাচ আর লবঙ্গ দিয়ে। চালের উপর তিন কড়া হিসাবে জল ঢেলে অপেক্ষা কখন জল টানে। তার মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রচুর পরিমাণে আদা ও পিঁয়াজ বাটা। জল টানার পরে সেটা বসাতে হয় দমে। গোটা হাড়িকে তুলে দেওয়া হয় মস্ত গরম তাওয়ার উপর। মাঝে মাঝে নেড়ে দেওয়া চলে। হয়ে গেলে উপরে আগে থেকে ভেজে রাখা লাল মিহি করে কাটা পেঁয়াজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে স্পেশাল ব্যাপার কিছু নেই, রোজকার খাওয়ার তো!
কখনও অবশ্য মরশুমি মটরশুটি পড়ে রঙ বদলের জন্য। যা ছিল সত্যিই ইস্পেশাল তা আমাদের ছেলেবেলার পোলাও, আখনি। সিলেট ছড়ার পর আখনি না খাওয়ার আক্ষেপ ছাড়া কিছুই আর বেঁচে নেই। যে কালোজিরা চাল দিয়ে তৈরি হত আখনি তা সত্যিই রহিস ব্যপার। কুচকুচে কালো দেখতে সেই চাল তৈরি হত নিজেদের জমিতে। যেখানে উচ্চফলনশীল ধান বিঘেতে চল্লিশ মণ হয়, আমন আউশের মত সাধারন ধান হত কুড়ি মত, আর সেখানে রাজার বেটা কালোজিরা ফলত বিঘায় পাঁচ থেকে ছয় মণ। চকচকে কালো রঙের ধানের সাইজ ছিল কালোজিরের চেয়ে একটু বড়। তখনই বাজারে পাওয়া যেত না এ চাল। কাজেই ভরসা নিজেদের জমি। আমার দাদি কেবল আখনি খাওয়ার শখে করতেন এই চাষ। সেই চাল ভাঙানো হত নিজেদের বাড়িতেই। সেই ঘোলাটে সাদা চালে সত্যিই যাদু ছিল! জলের মাপে ভুলচুক হলেও সেই চালের গলার কোন ইচ্ছাই নেই! সব চাল থাকত আলাদা আলাদা পোলাও রান্নার পরেও। যাই হোক আখনি রান্নার পদ্ধতি পোলাও রান্নার মতই, কেবল তাতে যোগ হত মাংসের টুকরো। সেই মাংস একদম লঙ্কা ছাড়া আগেই রান্না করা থাকত, ছোট ছোট টুকরোর ভুনা। খাওয়া হয় খাসি বা গরুর মাংসের সঙ্গে। আগেই বলেছি, তখন আমাদের উনুনে রান্না হত, সে আবার কাঠের জ্বাল। আখনি পোলাওএর জল শুকানোর পরে যখন ভাপে বসান হত, তখন কিছু আধপোড়া কাঠ চাপিয়ে দেওয়া হত হাঁড়ির উপর। তার খুশবু ছড়িয়ে পড়ত ধীরে ধীরে।
(সমাপ্ত)
[www.guruchandali.com এর বুলবুলভাজা বিভাগে প্রকাশিত]
Posted by
বিবর্ণ কবিতা
at
10:01:00 AM
0
comments
Labels: খাদ্যকথা
Saturday, December 19, 2009
হারানো হাঁস ম্লান মুর্গী ০২
(প্রথম পর্বের পর)
পুলিপিঠা খাইল বিনোদ দুধের শিস্যায় ভরা।।
পাত পিঠা বরা পিঠা চিত চন্দ্রপুলি।
পোয়া চই খাইল কত রসে ঢলাঢলি।।
- মলুয়া, মৈমনসিংহ গীতিকা
সেই সময়, সত্তরের দশকের শেষদিকে সিলেটে তখনও প্রাকৃতিক গ্যাস বাড়ি বাড়ি পৌঁছয়নি। হরিপুর গ্যাসফিল্ডে কাজ হচ্ছে, শোনা যায়, খুব শিগগিরি গ্যাস আসবে। কেরোসিনের ষ্টোভ একটা রাখা থাকত চা করা, দুধ গরম করার জন্যে, রান্না হত মাটির চুলায় খড়ির (কাঠ) আগুনে। পাশাপাশি দুটো চুলো যার একটা দু মুখো একটা একমুখো। খড়ির আগুনে প্রচুর কালি হয় আর গোটা বাড়ি কালো হয়ে যায় বলে সব বাড়িতেই রান্না ঘর থাকত একটু আলাদা, বাড়ির পিছনদিকে। রান্নাঘরের চেহারা ছিল বিশাল, তার ঠিক আর্ধেকটা সিমেন্টের মেঝে। টুকটাক বাসনের বাইরে অন্যকিছু রাখা হত না সেই ঘরে, কালো হয়ে যাওয়ার ভয়ে। পাশেই ছিল ভাঁড়ার ঘর। পুরানো বিলিতি বিস্কুটের খালি টিনে থাকত মশলাপাতি। চাল থাকত বড় বড় সব ড্রামে। কোনোটায় শাইলের চাল, আর কোনটায় বোরো চাল, খাসার চাল, কালোজিরে চাল, কাটারিভোগ চাল, জলির চাল, বষ্যাল চাল তা লেখা না থাকলেও চেনা যায়। সব ধান আবার সেদ্ধ আর আতপ আলাদা আলাদা ড্রামে। কেবল খাসা আর কালোজিরার একমাত্র আতপ, সে শুধু পোলাও খাবার জন্য।
সিলেট ও তার আশে পাশের অঞ্চলে এক ধরণের ধান হয়, বিন্নি ধান। বেশ লম্বা দেখতে, পুরুষ্ঠু আকার আর উজ্জÄল সোনালি রঙের ধান দেখলেই চোখ যেন জুড়িয়ে যায়। কালো বিন্নিও হয়, ধানের রং কালো, আর চালের রং গাঢ় খয়েরী,নাম কালো বিন্নি, তবে সে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে, বার্মা বর্ডারের দিকে, আমাদের এদিকে নয়। আতপ বিন্নি ধান শুকিয়ে ভাঙিয়ে যখন চাল হয়ে আসে তখন তার অন্য রূপ। লম্বাটে আর বেশ মোটা ঘোলাটে দেখতে একটা চাল, সোঁদা সোঁদা একটা গন্ধে চারিদিক ভরে যায়। শীতের সকালে পোলাওয়ের মত রান্না হয় বিন্নির ভাত। আমরা সিলেটিরা যাকে বলি "বিরন ভাত'। চালে প্রচণ্ড আঠা হয়ে বলে খানিকটা খাসা'র (গোবিন্দভোগ) চাল বিন্নিতে মিশিয়ে দিত আম্মা। পোলাওয়ের জল শুকিয়ে এলে হাঁড়ির তলায় মোটা তাওয়া দিয়ে দমে বসিয়ে দিত। বাড়ি তখন ম ম করছে বিন্নির ভাতের স্বর্গীয় সুগন্ধে। বড় আকারের কইমাছের ঝাল ঝাল একটা ভুনা সহযোগে আঠালো বিন্নির ভাত। আহা ... সে যে না খেয়েছে বুঝতেই পারবে না কী জিনিসের কথা হচ্ছে।
বিরন ভাতের সাথে মাঝে মধ্যেই খাওয়া হত বকের মাংস। ছোট কানি বগা, বড় আর ধবল "টগ বগা', বিশালাকারের ধনেশও কখনও সখনও আমাদের সকালের নাশতায় যোগ হত। না। এই পাখিগুলো শরবত আলির মারফত আসত না। এগুলো আসত শিকার থেকে। আমাদের একটা দোনলা বন্দুক আছে। কবে থেকে আছে সঠিক জানি না তবে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি আছে। থানার মালখানার বন্দুক, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আব্বাও একটা কিনেছিল। ঐ বন্দুক বছরভর কালো কাঠের আলমারিতে বিশেষভাবে বানানো খোপের মধ্যেই থাকত। শুধু যখন আমার মেজর মামা ছুটিতে বাড়ি এসে আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসত তখন ঐ খোপ ছেড়ে বেরোত। মামা এসে ওটাকে পরিষ্কার করত আর আব্বাকে পটাত শিকারে যাওয়ার জন্য। পাখি শিকার যদিও তখনই নিষিদ্ধ কিন্তু লোকে আকছারই করত। আব্বা পাখি শিকারের ঘোরতর বিরোধী হওয়ায় জীবনে কোনদিন পাখি শিকারে যায়নি আর ঐ বন্দুকেও হাত দেয়নি এমনকি পরিষ্কার করার জন্যেও নয়। আব্বাকে শিকারে যেতে রাজী করাতে পারত না কিছুতেই মামা কিন্তু আব্বার বন্ধুরা ঠিক জুটে যেত। আব্বার সাথে মামার বেশ তর্ক হত, পাখি শিকারের বিরুদ্ধতা করেন তাইলে শরবত আলির পাখি কিনেন ক্যান! আব্বারও নানান যুক্তি থাকত, সেগুলো গুলি করে আকাশ থেকে নামানো নয়, জাল পেতে ধরা, আমি না কিনলে অন্য কেউ তো কিনবেই ইত্যাদি ইত্যাদি। মামা চলে যেত আব্বার বন্ধুদের সাথে পাখি শিকারে। বিকেল বিকেল বেরুলে পরদিন দুপুরের আগেই ফিরে আসত শিকার করা বালিহাঁস, কানি বগা, টগ বগা, ধনেশ আর আরো নানা রকমের পাঁচমিশালী পাখি নিয়ে। গুলি খেয়ে হাওরে পড়া পাখিটাকে ধরে এনে সঙ্গে সঙ্গে ওখানেই জবাইও করে নিত ওরা, যাতে হালাল হয়ে যায়। জবাই না করা পাখি এমনি মরে গেলে সে পাখি কেউ খায় না।
পাখির গায়ে মাংস বলতে শুধু বুকে। লম্বা লম্বা ঠ্যাং শুধু উপর দিকে একটুখানি মাংস। আলাদা আলাদা হাঁড়িতে রান্না হত সেই সব পাখি, কোনটাতে বালিহাঁস, কোনটাতে বক। ধনেশ যদিও খুব কম পাওয়া যেত কিন্তু কখনও একটা ধনেশ এলে তাতে প্রায় একটা মুর্গীর মাংসের মত মাংস পাওয়া যায় কাজেই ওটা আলাদাই রান্না হত। পাখি রান্নাতে কারিকুরি খুব বেশি কিছু নেই। ঝাল ঝাল ভুনা করে দিলেই হল, তাতেই জিভে জল আসা গন্ধে পাড়া মাতোয়ারা। প্রতিটা পাখিরই নিজস্ব স্বাদ গন্ধ আছে, বক এক রকম, বালিহাঁস এক রকম আর ধনেশ আরেক রকম। শিকার থেকে পাখি একটু বেশি এলে বিলিও করা হত, আত্মীয়-বন্ধুদের বাড়িতে দুটো করে বড় ধবল বক পাঠিয়ে দেওয়া হত। নিদেনপক্ষে একটা। আর পাখি কম এলে সকালবেলায় সবাইকে নাশতার দাওয়াত্, বাড়ি এসে বিরন ভাতের লগে শিকারের গোশত ভুনা। সাইড ডিশ হিসেবে অবশ্যই ছিটারুটি।
আমার দাদি'র পছন্দ ছিল পাকা রুই বা কাতলার 'বিরান' (ঝাল) দিয়ে বিরন ভাত । তো দাদির জন্যে বিরন ভাতের সঙ্গে অবশ্যই থাকত মাছের বিরান। কখনো হাঁসের ডিমের ঝাল ঝাল ভুনা আর সাথে অবশ্যই বেশি করে চেরা কাঁচা লংকা দেওয়া 'আলুভাজি'। দাদির আরেকটা পছন্দের খাবার ছিল সাতকরা দিয়ে গরুর ভুনা গোশত। একটু তিতকুটে স্বাদ বলে সাতকরা আমার খুব একটা পছন্দের জিনিস নয়। কিন্তু আম্মার হাতে এমনই জাদু যে ছোট আকারের বাতাবী লেবুর মত দেখতে ফিকে হলদে রঙের জিনিসটা রান্নার পরে আর মোটেও তিতকুটে লাগত না। আর কী এক অদ্ভুত উপায়ে রান্না করত আম্মা যে রান্নার পরেও ঐ সাতকরার রং একটুও বদলাত না। গাঢ় মরিচরঙা লাল ভুনা গোশতের মধ্যে ফিকে হলদে রঙের টুকরো টুকরো সাতকরা, সে এক অসাধারণ রূপ। ঘ্রাণে নাকি অর্ধভোজন হয় কিন্তু সেই স্বর্গীয় বস্তুটি চোখে দেখার পর পেটের ক্ষিদে চারগুণ চাগিয়ে উঠতে বাধ্য। হামলে পড়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না। কলকাতায় নিউমার্কেটে সাতকরা পাওয়া গেলেও তেমন জিনিসটা আর হয় না। অমন রঙ আর স্বাদ না আসার কারণ নিশ্চয় এখানকার জলের দোষ নয়, আমার মায়ের হাতের জাদু আমরা ঠিকমত কব্জা করতে পারিনি, নিশ্চিত।
তখন গুড়ো মশলার চল অত ছিল না, বাজারে যদিও পাওয়া যেত কিন্তু আমাদের বাড়িতে সেগুলো ঢুকত না। মশলা বাটার জন্যে আলাদা বুয়া থাকে, যে শুধু মশলাই বেটে দিয়ে যায় প্রতিদিন। মশলা বেটে ফ্রিজে রেখে পরদিন আবার রান্না হবে সেটিও হওয়ার যো ছিল না, ফ্রিজে মশলা রাখলে নাকি 'খাওয়ার পানিতে মশলার গন্ধ ঢুইক্কা যায়,' এটি আমার দাদির ঘোষণা কাজেই এক মাত্র খাওয়ার পানি ছাড়া আর কিছুরই ফ্রিজে ঢোকার অনুমতি ছিল না। রান্নাঘরের এক পাশে দেওয়ালে ঠেঁস দিয়ে দাঁড় করানো থাকে মশলা বাটা ইয়াব্বড় এক শিল আর তার পাশে, তারই গায়ে গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে নোড়া। পিঠের চাল বেটে দেওয়াটাও ছিল মশলা-বুয়ার কাজ। রাতে শোয়ার সময় আম্মা চাল ভিজিয়ে রেখে দিত, ভোর ভোর বুয়া হাজির চাল বাটার জন্যে। এক মগ চা আর দু'খানা ঢাকাই টোষ্ট বিস্কুট নিয়ে সে বসে যেত শিল বিছিয়ে। এদিকে ততক্ষণে চায়ের পাট চুকে আম্মা ঘর গোছাতে চলে গেছে। দাদি ফজরের নামাজের পরে জায়নামাজেই বসে থেকে সকালের চা খায় আর তারপর সেখানে বসেই তসবীহ জপ করতে থাকে। মাঝে মধ্যে উঠে অবশ্য রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যায়, বুয়া ঠিকঠাক মিহি করে চালটা বাটছে তো!
সকালবেলায় ঠাণ্ডায় হি হি করতে করতে বুয়া চাল বাটে। দু পাটা মতন বাটা হয়ে গেলে সে আওয়াজ দেয়, ভাবিসাব, আইয়েন, পাইতলা বওয়াইন যে চুলাত! দুটো হাঁড়িতে দু রকম গোলা তৈরি করে আম্মা। একটা বেশ পাতলা আর খানিকটা আদাবাটা আর পেঁয়াজবাটা দেওয়া, সেটা ছিটা রুটির জন্য। আরেকটা বেশ ঘন, চিতইয়ের জন্য। দু-মুখো চুলার একটাতে মাটির মুখ খোলা হাঁড়ি, অন্যটাতে পুরনো লোহার কড়াই। বাটিতে খানিকটা তেল নিয়ে নেয় আম্মা, ছিটারুটিতে ছিটানোর জন্যে। চিতইয়ের গোলাতে একটা বিশেষ চামচ। ভাঙা নারকোলের মালা সমান করে কেটে নিয়ে লোহার কাঠির ছুঁচালো দিকটা আগুনে গরম করে গনগনে লাল হয়ে গেলে সেটা দিয়ে নারকোলের মালার দু দিকে দুটো ছোট্ট ফুটো করে নেওয়া হয়। তারপর বাঁশের একটা সরু হাতল বানিয়ে একটা দিক বেশি সরু করে মালায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। টাইট করে বসিয়ে দেওয়া হয় হাতলটাকে, যাতে না নড়ে হাতলটা। তো সেই হাতায় করে পনিরের টুকরো ভেঙে ভেঙে দেওয়া ঘন গোলা মাটির হাড়িতে ঢেলে দিয়ে ছোট্ট ঢাকনা চেপে বসিয়ে দেয় যাতে একটুও ষ্টিম বাইরে না বেরোয়। মিনিট কয়েকের মধ্যেই চিতই ফুলে ওঠে, নিচটা হয় পোড়া পোড়া আর মুচমুচে! বেশ কয়েকটা হয়ে গেলে টেবিলে দিয়ে দেয় বড় থালায় করে, আর তারপর একের পর এক চিতই নামে আর গরম গরম পৌঁছে যায় টেবিলে, কাপড়ের ঝালর দেওয়া হাতে বোনা বাড়িতে তৈরি বেতের সরপোশে ঢেকে। সাথে আগের রাতের হাঁসের ভুনা, পনির ভেঙে দেওয়া ডিমের ওমলেট, ঝাল ঝাল আলুভাজা।
আব্বা তখনও বিছানায়। বেশ কয়েকবার ডেকে আসা সত্তেÄও উঠি উঠি করে আর উঠছে না। মাঝে মাঝেই একটা করে ফোন আসে, চোখ বন্ধ করেই আব্বা ফোনটা তোলে আর বলে, 'হুদা বলছি।' তখন আমি, দশও পেরুইনি, ভাবতাম, আব্বা সকাল সকাল খালি পেটে আছে, ক্ষিদে পেয়েছে, তাই বলছে 'হুদা বলছি।' তো ততক্ষণে ছিটারুটিও প্রায় তৈরি। চালের গোলায় হাত ডোবায় আম্মা একবার করে, হাতে যেটুকু জল জল গোলা ওঠে সেটুকু ছিটিয়ে দেয় কড়াইতে। বেশ কয়েকবার ওরকম করে চালের গোলায় হাত ডোবাতে হয়, তবে তৈরি হয় একটা ছিটারুটি। যে কেউ ঐ ছিটারুটির মধ্যে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম খুঁজে পেতেই পারেন - এমন সূক্ষ্ম জালি তৈরি হয়, আর এক একটা রুটিতে এক এক রকমের ডিজাইন। এই রুটি ওল্টানোর কোন গল্প নেই, একধার মুচমুচে হয়ে এলেই খুন্তিতে করে কড়ার মধ্যেই চার ভাঁজ করে দেওয়া আর থালায় তিনটি ভাঁজ করা রুটি কোণাকুনি করে রেখে তারপর একের পর এক থাক বানিয়ে যাওয়া মুচমুচে সোঁদা সোঁদা গন্ধের ছিটারুটি দিয়ে।
গোটা শীতকাল জুড়ে আর প্রায় গোটা বছর ধরেই চলে সকাল বেলায় পিঠে খাওয়া। কদাচিত্ রুটিও হয়, তবে সে আসলেই কদাচিত্। সকালের নাশতা রুটি মানেই সে এক 'টাউইন্যা' ( শহুরে) খানা, লগে কী একটা "আণ্ডাপোচ যেন টাউইন্যারা' খায়, সে অতি অখাদ্য জিনিস! 'রুডিডা (রুটিটা) গোশতের লগে তাও খাওন যায় তয় আডার রুডি না, চালের রুডি!' 'ছিটারুটি', আর 'চিতই' প্রায় রোজই হয়। দুটো পিঠেই মাছ, মাংস দুয়ের সাথেই চলে, কাজেই অসুবিধা কিসু নাই। আর শীতকাল মানেই তো অষ্টগ্রামের (ময়মনসিংহ জেলার একটা গ্রাম) পনির। গোটা শীতকালটা জুড়েই চলে পনিরওয়ালাদের আনাগোনা। কুয়াশায় ঢাকা ধোঁয়া ধোঁয়া সকাল বেলায়, অলস ঘুঘু ঢাকা দুপুরবেলায় কখনো বা ঝপ করে নেমে আসা সন্ধ্যেয়ও শোনা যায় হাঁক, ফনির নিবায় নি ফনির র র র ... অষ্টগ্রামের ফনির র র র র ... কাঁধে বাঁশের ভারে দু'দিকে ঝোলানো বড় সড় দু'টি বেতের ঝাঁকা, লাল রঙের কাপড় দিয়ে দুটি ঝাঁকাই ভাল করে মুড়ে রাখা। প্রায় দিনেই ছুট্টে চলে যাই পনিরওয়ালার কাছে, হাত ধরে টেনে এনে বসাই বারান্দায়। বসেই পনিরওয়ালা তার ঝাঁকার লাল কাপড় সরায়, দেখা যায়, সাদা পলিথিন দিয়ে ঢাকা থরে থরে একের পরে এক সাজানো হালকা মাখনরঙা পনির। আমার দুই হাতের আঁজলায় ধরে না এত বড় তার সাইজ, দেখতে ঠিক যেন একটা বাতাবী লেবু, যার গায়ে বাঁশের ছাঁচের দাগ। যে দাগ পনিরের গায়ে পড়েছে বাঁশের ছাঁচে কয়েকদিন ধরে ফেলে রেখে তার শরীর থেকে জল ঝরানোর সময়। টক টক একটা অদ্ভুত গন্ধ বেরোয় সাদা পলিথিন খানিকটা সরিয়ে দিতেই। পনিরওয়ালা তার লম্বা ছুরি বের করে আদ্ধেক বিক্রি হওয়া একটা পনির থেকে পাতলা একফালি পনির কেটে দেয়, 'খাইয়া দেহুইন যে আম্মা, আসল অষ্টগ্রামের পনির!' সেই একফালি পনিরের ভেতরটা জুড়ে অসংখ্য ফুটো, সরু-মোটা জালি তার সবটুকু ভেতর জুড়ে। জালি যত বেশি হয়, পনির তত বেশি স্বাদু হয়। বাতাবি লেবুর মত দেখতে পনিরের উপর-নিচ দু দিকই খানিকটা চ্যাপ্টা মতন হয়, যার একদিকে উপর থেকে প্রায় মাঝামাঝি অংশ পর্যন্ত পাশাপাশি তিনটে ফুটো করে তাতে নুন ঠেসে দেওয়া হয়, ধীরে ধীরে নোনতা একটা স্বাদ গোটা পনিরে চলে আসে, আর এই নুন দেওয়ার ফলে পনির থাকেও অনেকদিন। পনিরের ফালি হাতে করে একছুট্টে চলে যাই আম্মার কাছে, পনিরওয়ালা আইসে আম্মা! সদ্য চোখ লেগে আসা আম্মা খানিকটা বিরক্তই হয়, পনির তো আছে ঘরত, আগেরটা ঐত্ত শেষ হইছে না আবার পনির কী! না আম্মা, চলেন না, ভালা পনির। অনিচ্ছাতেও আম্মা উঠে এসে পর্দার আড়ালে দাঁড়ায়, আমি বড় সড় দেখে একটা পনির পছন্দ করে তুলে নিয়ে আম্মাকে দেখিয়েই আবার পনিরওয়ালার হাতে দেই, ওজন কর! যে কোন পনিরই দেড় সেরের (তখনো কিলোগ্রাম, মিলিগ্রাম শুধু বইয়ের পাতাতেই আছে, বিক্রিবাট্টা সব সের, পোয়া আর ছটাকে)। এট্টু বেশি আছে আম্মা! হ, হ দেও। এইবার আমার কাজের শুরু, ছুট্টে পনির নিয়ে ঘরের ভেতর আর টেবিলে রেখেই তার থেকে বড় সড় এক চাক কেটে নেওয়া।
এই পনিরেরও গল্প আছে। মোষ আর গরু, দুয়েরই দুধ দিয়ে পনির তৈরি হয়। কিন্তু দুটো পনিরের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। মোষের দুধের পনিরে জালি বেশি হয় আর ভাজার জন্যে তেলে দেওয়া মাত্র একদমই গলে যায়, ঠিক যেন মাখন। কড়া থেকে তুলে নিয়ে সেই গলে যাওয়া মাখনের মত পনির তুলে নিয়ে গরম গরম খাওয়ার যা স্বাদ সে পৃথিবীর অন্য কিছুতে নেই। আর গরুর দুধের পনিরের ভেতর জালি একটু কম আর ঘন হয় আর তেলে দিলে পনিরটা অত গলেও যায় না। গলে, টুকরো পনিরের আকার ঠিক থাকে না একদমই কিন্তু তবু সেটাকে চাকা বা টুকরো বলে চেনা যায়। রঙেও বেশ অনেকটা তফাত আছে, মোষের দুধের পনিরের রং একটু বেশি সাদা হয় অর গরুর দুধের পনিরের রং ঠিক যেন মাখন। আমার পছন্দ মোষের দুধের পনির। আমরা তো পনিরের তরকারি খাই না, সেটা এই পনিরে খাওয়াও যায় না। এটা জাষ্ট এমনি এমনি খেতে হয়। ছিটারুটির মধ্যে দিয়ে, ডিমের ওমলেটের মধ্যে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে, আর ছোট্ট ছোট্ট টুকরোয় ভেঙে দিয়ে দাও চিতইয়ে। পুরো ভোলটাই পাল্টে যাবে সব খাবারের। পিঠার নিজস্ব গন্ধের সাথে পনিরের টক টক গন্ধ মিলে মিশে সে এক অভাবনীয় জিনিস।
তো অষ্টগ্রামের পনির পাওয়া যায় সারা দেশেই। সব শহর, গ্রাম বা টাউনে যে সব গোয়ালপাড়া থাকে, তারা সেখানেই পনির বানায় আর বাঁশের ভারে বাঁশের ঝাঁকায় লাল কাপড়ে ঢেকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে অষ্টগ্রামের পনির। কিন্তু আম্মাকে ঠকানো যাবে না সেই পনির দিয়ে! ঘটনা হল, অষ্টগ্রামের কাছাকাছিই কোন একটা জায়গায় আমার মায়ের ছেলেবেলাটা কেটেছে। আম্মা তো রং দেখেই বলে দিতে পারে কোনটা অষ্টগ্রামের আর কোনটা নয়। তো আমাদেরকে যে লোকটি পনির দিয়ে যায় সে নিজে অষ্টগ্রামের লোক। মাস খানেকের মত ষ্টক নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে কোন একটা শহরের উদ্দেশ্যে। ষ্টক ফুরোল তো সেও বাড়ি ফিরে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই আবার নতুন ষ্টক নিয়ে হাজির। ফনির নিবায় নি ফনির র র র র...
চর্বির পিঠে এক মজার জিনিস। বিশেষত খাওয়া হয় কোরবানির ঈদের পর। কোরবানির সময়ে বাড়িতে যে মাংসের পাহাড় পড়ে তাতে খণ্ড খণ্ড চর্বিও নেহাত্ কম থাকে না। বেশির ভাগই যদিও বিলি করে দেওয়া হয় কিন্তু অবশিষ্ট যেটুকু থেকে যায় তাও খুব একটা কম নয়। চর্বির টুকরোগুলো ধুয়ে নিয়ে বড় কড়াইতে ফুটানো হয়। টুকরোগুলো গলতে শুরু করে একসময়ে গোটা কড়াই ভরে ওঠে তেলে। বড় বাটি হাতায় করে ফুটন্ত তেল একটু একটু করে নামিয়ে নিয়ে কোন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি বা টিনের কৌটায় রাখা হয়। ঠাণ্ডা হয়ে সেই চর্বি জমাট বাঁধে, দেখতে ঠিক যেন ডালডা । রাতে ভিজিয়ে রাখা চাল শিলে বেটে নিয়ে সেটাকে ডিম আর আদা - পেঁয়াজবাটা দিয়ে ঘন গোলা বানানো হয়। পড়ে বাটা হলুদ আর অবশ্যই লবণ। কড়ায় গরম হয় সেই ডালডার মত দেখতে চর্বি। ফুটতে শুরু করলে নারকোলের মালা দিয়ে তৈরি বাটি হাতায় করে এক হাতা পিঠের গোলা ঢেলে দেওয়া হয় কড়ায়। খানিকক্ষণের মধ্যেই ফুলে ওঠে পিঠে, ঠিক যেন একটা ফুলকো লুচি। একটু সময় নিয়ে ঝাঝরি কাটা হাতায় করে উল্টে দেয়া হয় পিঠে, মিনিট খানেক সময় দিয়ে ঝাঝরিতে করে তুলে নিয়ে ঢেলে দেয়া হয় আরেক হাতা। তেল ঝরিয়ে গরম গরম খাওয়া। ঈদের পরে একদিন সকালের নাশতা হয়ে যায় চর্বির পিঠে দিয়ে।
কোরবানির ঈদের পর বাসি মাংসের পুর দিয়ে সিঙাড়া খাওয়াটা বাধ্যতামূলক। আর এই বাধ্যতামূলক কাজটি আমরা সানন্দে, সাগ্রহে করি। সিঙাড়া বললে ঠিক হয় না জিনিসটা আসলে মাংসের সমোসা। ঈদের তিন-চার দিন পরে মাংস যখন পুরনো হয়ে আসে, রোজ দু বেলা জ্বাল দিয়ে দিয়ে মাংসে জল-ঝোল বলে কিছু থাকে না আর মাংসও ভেঙে চুরে ঝুরঝুরে হয়ে যায় তখন হাড়ি থেকে একটু হাড় ছাড়া মাংস বেছে নিয়ে সেগুলোকে বেশ ভালো করে হাত দিয়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হয়। যেন প্রতিটা রোয়া আলাদা হয়ে যায়। কড়ায় তেল গরম করে বেশ অনেকটা সরু লম্বা করে কাটা পেঁয়াজ ভাল করে ভেজে নিয়ে তাতে ঝুরো করা মাংস ছেড়ে দিয়ে বেশ ভালমতন নেড়ে চেড়ে ভাজা ভাজা করে নেওয়া হয়। আটা তৈরি যদিও বেশ একটা ঝামেলার ব্যাপার কিন্তু সে যারা জানে না তাদের জন্যে! ফুটন্ত জলে শুকনো আলোচালের গুড়ো ছেড়ে দিয়ে ভাল করে ফুটিয়ে নিতে হয়। বেশ অনেকটা সময় ধরে ফোটানোর পরে যখন মনে হবে চালের গুড়োটা ঠিকঠাক ভাপ খেয়েছে তখন ষ্টিল বা লোহার খুন্তি দিয়ে ঘেঁটে দিতে হয়। ঘেঁটে দেওয়া মানে, ঐ হাড়ির মধ্যে ঐ ফুটন্ত জলে আটা মাখানো আর তাও খুন্তি দিয়ে! ঐ সময়ে খানিকটা হলুদবাটা আর নুন দিয়ে দিতে হয়। ঢিমে আঁচে নেড়ে নেড়ে জলের মধ্যে আটা মেশানোর সময় গুটলি পাকানোর যথেষ্ট চান্স থাকে আর জলও ঠিকঠাক আন্দাজ করে দিতে হয়, একটু বেশি হলেই গেল! চুলা থেকে নামিয়ে জিনিসটা ঠাণ্ডা হলে বড় গামলায় ঢেলে তাকে হাত দিয়ে বেশ ভাল করে মালিশ দিতে হয়। হ্যাঁ মালিশ। নইলে রুটিই বেলা যাবে না। গোল গোল রুটি বেলে নিয়ে তাকে সিঙাড়ার আকারে গড়ে নিয়ে পুর ভরে ভাল করে মুখ বন্ধ করে দিতে হয়। তেকোনা নিমকির আকারেও বানানো হয় আর ভাল করে মুড়ে মুড়ে মুখ বন্ধ করতে হয় যাতে গরম তেলে পড়লে মাংস বেরিয়ে না আসে। কড়ায় চর্বি ফুটতে শুরু করলে গোটা চার-পাঁচ সমোসা একে একে ছেড়ে দিতে হয় কড়ায়। নেড়ে চেড়ে-উল্টে পাল্টে ভাজা হয়ে গেলে ঝাঝরি কাটা হাতায় করে তেল ঝরিয়ে নামিয়ে নেওয়া আর গরম গরম সমোসার প্লেট হাতে ধরিয়ে দেওয়া। একসাথে সবাই খাবে ভাবলেই যাবে সমোসা ঠাণ্ডা হয়ে আর ঠাণ্ডা হওয়া মানেই চর্বিকে জমতে দেওয়া। কিন্তু ঠাণ্ডা কেউ হতে দেয় না। গোশতের সমোসা বানাতে শুরু করলে কেউ রান্নাঘর ছেড়ে বেরুতেই চায় না, একদিকে কড়া থেকে নামে ভাজা সমোসা আর অন্যদিকে উড়ে যেতে থাকে। এই সমোসা না খেলে জীবনখানা ষোল আনাই মাটি। আর শুধু একবার খেলে হয় না। বারে বারে খেতে হয়। প্রতি বছর খেতে হয়।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
[www.guruchandali.com এর বুলবুলভাজা বিভাগে প্রকাশিত]
Posted by
বিবর্ণ কবিতা
at
2:18:00 PM
0
comments
Labels: খাদ্যকথা
Thursday, December 17, 2009
হারানো হাঁস, ম্লান মুর্গী
হাঁস মারলাম কইতর মারলাম বাচ্যা মারলাম টিয়া।
ভাল কইরা রাইন্দো বেনুন কাল্যাজিরা দিয়া।।
- মহুয়া, মৈমনসিংহ গীতিকা
শীতকালটা সিলেটে বেশ লম্বা। অক্টোবরের প্রথম থেকে শুরু হয়ে টানা চলে একেবারে সেই মার্চ পর্যন্ত। সিলেটের আশে পাশে তামাবিল, জৈন্তা, জাফলংএ প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। আসে হয়তো শীতের সবগুলো দেশ থেকেই কিন্তু আমরা জানি সবই আসে সাইবেরিয়া থেকে। ছোট বড় নানা রকমের হাঁসই বেশি থাকে। সেগুলোর নাম এখন আর মনে নেই, বা হয়তো আমাদের হাঁস-মুর্গী আর পাখি সাপ্লাইকারী শরবত আলি জানতও না সব পাখির নাম। কালো, লম্বা আর পেটানো স্বাস্থ্যের শরবত আলি, সারা মুখে, গলায় আর হাতগুলোতে সাদা সাদা ছোপ ছোপ দাগ ধরা শরবত আলি সব হাঁসকেই "সাইবেরিয়ান ডাক' বলে চালিয়ে দিত। শরবত আলিকে সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি। কবে প্রথম দেখি, সে আর এখন মনে নেই। নির্দিষ্ট কোন দোকান ছিল না তার, লম্বা বাঁশের দু মাথায় দুটি হাঁস-মুর্গীর খাঁচা নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত সে ঐ সাইবেরিয়ান ডাক। বালিহাঁসগুলো ছোটো সাইবেরিয়ান, আর বড়গুলো "আসল এবং অরজিনিয়াল সাইবেরিয়ান ডাক' । বালিহাঁসগুলো দেখিয়ে আমি ওকে জিজ্ঞেস করতাম, এগুলো এত্ত ছোডো কিয়ের লাই? শরবত আলি তার পান খাওয়া ছোপ ছোপ দাঁত বত্রিশখানি বের করে জবাব দিত, "আফা, ইতানে এখুনো ছোডু আছুইন যে, বড় হইন নাই, হইলে ইতানেই হইয়া যইবাইন ""আসল, অরজিনিয়াল'' সাইবেরিয়ান ডাক।'
প্রথম প্রথম শরবত আলি আব্বার অফিসে আসত। আব্বা অফিস থেকেই রকমারি হাঁস কিনে পায়ের দিক থেকে ধরে হাঁস ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতেন। পরে শরবত আলি আব্বার সাথে সাথে নিজেও এসে হাজির হত, আব্বার হাত থেকে যদি হাঁস পালিয়ে যায়! যদিও সেই হাঁসের পায়ের সাথে সাথে ডানা দুটিও শরবত আলি সরু সুতলি দিয়ে বেঁধে দিত, তবুও বলা তো যায় না, সাইবেরিয়ান ডাক তো, যে কোনো সময় আব্বার হাত ছাড়িয়ে উড়ে পালিয়ে যেতেই পারে! আর উড়ে যাওয়া মানে সটান সাইবেরিয়া, আর সে যদি গিয়ে সব খবর দিয়ে দেয় তাহলে সামনের বছর শরবত আলির ব্যবসাও বন্ধ আর আমাদের বিলাতি হাঁস খাওয়ারও ইতি। তো শরবত আলি সন্ধেবেলায় দু-দুটি ঝাঁকা সহ হাজির হত আব্বার সাথে। আর সেই হাঁসও সে নিজেই কেটে দিয়ে যেত, বলা তো যায় না, আব্বা বা অন্য কেউ সেই হাঁস জবাই করতে গেলে সেই সময়ে যদি হাঁস পালিয়ে যায়! আমরা ভাই বোনেরা, পর্দার ওপাশ থেকে আম্মা, দাদি আর পাড়ারও সব ছেলে মেয়েরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জিভে একরাশ জল নিয়ে দেখতাম আসল, অরজিনিয়াল সাইবেরিয়ান ডাকের জবাই হওয়া। গোটা কয়েক হাঁস পরপর সাফ করে ফেলে দিয়ে শরবত আলি আর তারপর হাঁসের দামের ডবল টাকা আসল নিয়ে,অরজিনিয়াল সাইবেরিয়ান ডাকের জন্যে, টাকা ট্যাঁকে গুঁজে দিন কতকের জন্য হাওয়া হত। বলে যেত, সে এখন আবার যাচ্ছে তামাবিল সুনামগঞ্জের হাওর থেকে হাঁস ধরে আনতে, ধরেই আবার নিয়ে আসবে।
পর্দার ওপাশ থেকে মাঝে মধ্যেই আম্মা বলত, ওগুলো সব দেশী হাঁস, শরবত আলি ধান্দা করে সেগুলোকে সাইবেরিয়ান বলে চালিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথেই শরবত আলি চার আঙুল জিভ কেটে কসম খেতে শুরু করত, আল্লাহ'র কসম, রসুলের কসম, বাবা "শাজলালের' (শাহজালাল) কসম আর আরও একশো ছত্তিরিশ জনের কসম খেয়ে শরবত আলি বলত, আম্মা, আমি মিছা কথা কই হাঁস বেচি গেলে আমার পুলা-পুরি ( ছেলে-মেয়ে) সব মরি যাইব! আম্মা সাথে সাথেই বলত, থাক থাক শরবত আলি, অত কসম খাইও না, অত মিছা কথা আল্লায় না সইলে পুলা পুরি না মরুক তুমি ঠিক মরি যাইবা।
আমাদের ছোটবেলায় শরবত আলির ভূমিকা ছিল সেলিম আলির চাইতে কিছু বেশি। সে পাখির ছবি দেখানোর চেয়ে আসল জিনিস নিয়ে হাজির হত। বালিহাঁস দেখলেই চেনা যায়। হালকা বাদামি আর সাদায় চিত্রিত শরীর, পেটের দিকটা সাদা আর কালচে ছড়ানো পা । সেগুলো শরবত আলির কাছ থেকে কিনতে কোন আপত্তি বাড়ির কারোরই হত না কিন্তু একটু বড় যে অরজিনিয়াল সাইবেরিয়ান ডাকগুলি সে নিয়ে আসত সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ হাঁসই হত দেশী। আম্মা অবশ্য হাঁসের পা দেখেই বলে দিত, কোনটা উড়ে আসা পাখি আর কোনটা মাটিতে চরে বেড়ানো হাঁস। চরে বেড়ানো হাঁসেদের পা হলুদ হয়, উজ্জÄল হলুদ আর পাখিদের পা হয় কালচে। যদিও শরবত আলি আম্মার এই মতবাদকে সবসময়েই উড়িয়ে দিত এক ফুত্কারে। সে বলত, "এই দেশে আসি পাখিরা তো পানিতই থাকইন, আর পানিত থাকতে থাকতে তাইনেগো পাও হইলদা হই গ্যাসে!' একটু বড় সাইজ দেখে, আর দেখতে ভাল এবং একটু আনকমন রঙের হাঁসগুলোকে ও সাইবেরিয়ান ডাক বলে চালাত। সব সময় সেগুলোকে দেখে বোঝা যেত না সেগুলো দেশী হাঁস নাকি আসল এবং অরজিনিয়াল সাইবেরিয়ান ডাক। কিন্তু ঐ হাঁস পরিষ্কার করার সময়ও ধরা পড়ে যেত কোনটা দেশী হাঁস আর কোনটা সেই সুদূর সাইবেরিয়া থেকে উড়া আসা পরিযায়ী পাখি। উড়ে আসা পাখিগুলোর পেটের ভেতরকার ময়লা একদম সবুজ। গাঢ় সবুজ রঙের ঘাস-পাতা বেরুতো ওদের পেটের ভেতর থেকে আর ওদের পেটের ভেতরকার খাদ্য জমিয়ে রাখার থলেগুলিও হয় খুব ছোট। দাদি বলত, ওরা বিদেশী, সাহেবদের দেশের পাখি, ওরা কি আমাদের হাঁস-মুর্গীদের মতন খুঁদ-কুড়া খায় নাকি, ওরা হল গিয়ে ভদ্রপাখি!
এই প্রক্রিয়া চলাকালীন (এই শরবত আলির "অরজিনিয়াল' পারফরমেন্স সহযোগে মাংস কাটাকাটি-বাছাবাছি'র সময়) সেখানে সবাই থাকত মুন্না ছাড়া। মুন্না হাঁস-মুর্গী মেরে ফেলতে চাইত না, সে সেগুলো পুষবে। কিন্তু এই হাঁসগুলো তো জবাই করা ছাড়া কোনো উপায়ই নেই, শীত শেষ হলেই উড়ে যাবে যে! অগত্যা সেগুলো কাটাকাটি-বাছাবাছি'র সময় আপত্তি থাকা সত্তেÄও কান্নাকাটি খুব একটা করত না কিন্তু সেই জায়গায় থাকতূ না। আম্মার একটা ছোট্ট হাঁস-মুর্গীর খামার আছে বাড়ির পিছনদিকে। ছোট্ট দু'টি কাঠের ঘর, তার মাথায় দু'চালা টিনের চাল। ছোট্ট সেই ঘরে কাঠের দরজা। একটিতে থাকে হাঁসেরা অন্যটিতে মোরগ-মুর্গীরা। বাড়ির পিছনদিকের দেওয়ালের ওপাশে দু-তিনটি ডোবার মতন পুকুর আছে কচুরিপানায় ভর্তি, সকালে আম্মা হাঁস-মুর্গীর ঘরের দরজা খোলার সাথে সাথে পেছনদিককার দেওয়ালের ছোট গেটও খুলে দেয়, হাঁসেরা থপথপিয়ে গেট পেরিয়ে চলে যায় পুকুরে। সারাদিন ওখানেই থাকে শুধু যখন পুকুরের পানা আর শামুক খেয়ে বিরক্ত হয়ে যায় তখন আবার থপথপিয়ে ফিরে আসে বাড়িতে কোয়্যাক কোয়্যাক করে পাড়া মাতিয়ে। বারান্দার নিচেই রাখা থাকে ওদের খাবার, পুরনো একটা হাঁড়িতে ধানের মিহি তুষ ভাতের ঘন মাড় দিয়ে মাখিয়ে রাখা, যাতে আম্মা আবার দিয়ে দেয় দু মুঠো চালও। ভরপেট খেয়ে দেয়ে তারা আবার ধীর পায়ে চলে জলের দিকে।
ঐ ঘরদুটিতে আমি জন্মের পর থেকেই আসছি, এখন সেই ঘরের মালিক চার বছরের ছোট্ট মুন্না। সে এমনকি হাঁস-মুর্গীর খাবারও মাখিয়ে দেয়। হাঁসেদের খাবার আলাদা, মুর্গীর খাবার আলাদা। মুর্গীদের ঘরে "রাতা' ( ঝুঁটিওয়ালা বড় মোরগ) খুব বেশি রাখে না আম্মা। গোটা দশ-বারো মুর্গীর জন্যে একটা বড় রাতা হলেই নাকি চলে। ডিম ফুটিয়ে যে ছানাগুলো বেরোয়, তারা খানিক বড় হলে বেছে বেছে মোরগগুলিকে জবাই করে দিত আম্মা। ওরা নাকি বড্ড হাঙ্গামা করে, পাড়ায় অন্য মুর্গীদের পেছনে বেরিয়ে চলে যায়, আর বাড়ি ফেরার নাম করে না। সন্ধেবেলায় তাদের খুঁজে আনাটা প্রায় নিত্য ঘটনা আর একটা হুলুস্থুলু ব্যাপারও বটে। হাঁসেরা সেই তুলনায় অনেক ভাল, ওদেরকে যদি কেউ ধরে না নিয়ে যায় তাহলে ওরা ঠিক সন্ধে-সন্ধেয়ই বাড়ি ফিরে আসে, থপ থপিয়ে, কোয়্যাক কোয়্যাক করতে করতে। ছোট্ট মুন্না যখন তখন হাঁস মুর্গীদের ধরে ধরে কলতলায় গোসল করায়, ওদের সর্দি হবে, নাক দিয়ে পানি পড়বে, সে সব কথায় একদম কান না দিয়ে ও ওদেরকে গোসল করায়। নেহাত সাবানের তাক অব্দি ওর ছোট্ট হাত দুটি পৌঁছায় না তাই সাবানটা মাখাতে পারে না।
আমাদের সৌভাগ্য যে শরবত আলির হাঁস খামারে ঢোকানোর চাইতে বাকি সকলেই প্লেটে দেখতেই বেশি ভালবাসত। তাই শরবত আলি বিদায় নেওয়ার পরও হুলুস্থুলুর কমতি পড়ত না। আমরা সব জিভে জল নিয়ে তখনো সার সার দাঁড়িয়ে। আর সন্ধেবেলায় বারান্দায় সেই হাঁস পরিস্কার করতে বসত আম্মা, মোড়ায় বসে থাকত দাদি, হাঁস ছাড়ানোর ডিরেকশন দিতে, আর আমরা ছোটরাও সেই জায়গা ছেড়ে নড়তাম না। হাঁসের পেটের দিকটা আগেই খানিকটা কেটে নিয়ে তার পেটের সব নাড়ি-ভুড়ি আর ময়লা বের করে নিতে বলত দাদি আর তারপর পাশে রাখা গামলায় ফুটন্ত গরম জলে সেই হাঁস ডুবিয়ে সাথে সাথেই তুলে নিত আম্মা। পেটের ময়লা সুদ্ধু গরম জলে ডোবালে হাঁসের মাংস "মাকরুহ' হয়ে যাবে আর কে না জানে, মাকরুহ হল হারামের অর্ধেক ষ্টেজ। ক্ষেতের কালোজিরে চালের পোলাও আর ভুনা সাইবেরিয়ান ডাকের মাংস। আহা ... কতকাল যে চোখেও দেখি না ...
আব্বা যে শুধু খেতে ভালোবাসে তা নয়, খাওয়াতেও ভীষণ ভালোবাসে। এদিকে শরবত আলি হাঁস দিয়ে যায় ওদিকে একের পর ফোন চলে যায় আব্বার বন্ধুদের কাছে। সাতটা না বাজতে বাজতে এক এক জনা হাজির, হাজির দশ বারোজন মানুষ। কেউ আসেন সস্ত্রীক কেউ বা একা। কোথাও কিস্সু নেই হয়ে গেল একটা দাওয়াত্। এরকম দাওয়াত্ মাঝে মধ্যেই হত, হয় আমাদের বাড়িতে। কম করে হলেও মাসে দু-তিনবার তো হয়ই।
শরবত আলি যে শুধু সাইবেরিয়ান ডাক দিয়ে যেত তা নয়, সে দেশি হাঁস-মুর্গীও দিয়ে যেত। তার ঐ হাঁস, মুর্গী বিক্রি করাটা একটা দর্শনীয় ব্যাপার বটে। বারান্দায় বসে সে যখন তার খাঁচার পাখি বিক্রি করে তখন মাঝে মধ্যেই ভেতরবাড়ি থেকে বাইরের দিকে এসে পড়ে আম্মার পোষা মুর্গীরা। কোনটা আবার সাথে ডজনখানেক ছানা নিয়ে গর্র্ গর্ করতে করতে ঘুরে বেড়ায় রাগী ভঙ্গীতে। কাজেই শরবত আলির জানা হয়ে যায় যে এই বাড়িতে মুর্গী পোষা হয়। কখনো সে একটা বেশ রূপসী দেখতে মুর্গী খাঁচা থেকে বের করে আমাকে বলে, "আম্মা, মুর্গীডা ন্যান, নুয়ারি মুর্গী, একবারও ডিম পাড়ে নাই, কালি-পরশুর থনে আণ্ডা দেওন শুরু করব, আমার ঘরত তন আনছি আপনের লাই।' অন্য কেউ মুর্গীর দিকে হাত বাড়ালে সে কিছুতেই তার হাতে মুর্গী দেবে না, মুর্গীর পেটের ভেতরকার আণ্ডা ভেঙে যাবে বলে। আণ্ডা নাকি একদম পেটের বাইরের দিকেই আছে, হাত দিলেই আণ্ডার এমনকি সাইজও বোঝা যাচ্ছে আর সেই আণ্ডা সে আম্মাকে দেখিয়েও দেয়। আম্মার ঘোরতর সন্দেহ থাকা সত্তেÄও মুর্গীটি নেয়, তার চেহারা রং আর রূপ দেখে। কয়েকদিন মুর্গীকে একটু আটকে আটকে রাখে, যাতে বাইরে কোথাও গিয়ে হারিয়ে না যায়। মুর্গী বাড়ি চিনে যায় দু-চার দিনেই। সারাদিন যেখানেই থাকুক সে ঠিক সন্ধেবেলায় ছোট্ট ঐ কাঠের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে হাজির হয়। মজার ব্যপার এই যে, মুর্গী ডিম আর পাড়ে না কিছুতেই! কালকেই ডিম পাড়বে বলে যে মুর্গী শরবত আলি দিয়ে গেছে সে মুর্গীর ডিম দেওয়া শেষ হওয়ার পরেই শরবত আলি সেই মুর্গী দিয়ে যায় কিংবা মুর্গীটি সবে বড় হয়েছে কিন্তু এখনও ডিম দিতে আরো মাস কয়েক লাগবে এমন মুর্গীই দিয়ে যায় আমাদের শরবত আলি।
মাঝে মধ্যেই সে অবশ্য একেবারে বুড়ো মুর্গী গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের পা দেখে আম্মা চিনে ফেলে যে মুর্গীটি বুড়ো। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পর শরবত আলি আর বুড়ো মুর্গী দেওয়ার চেষ্টা অন্তত করে না! একবার সে নিয়ে এলো চীনা হাঁস। সে হাঁস নাকি সাংহাই থেকে এসেছে। সাংহাই থেকে কী করে এলো জানতে চাইলে সে বলে, "ক্যামনে আবার, উড়ি উড়ি! পাঙ্খা দেখছইন নি হাঁসের? কি বড় বড় পাঙ্খা!' সাধারণ পোষা হাঁসের প্রায় দ্বিগুণ আকারের অসম্ভব সুন্দর সেই হাঁস দেখে যে কেউ মুহূর্তেই প্রেমে পড়ে যাবে সেই হাঁসের। নানা রঙে চিত্রিত তার গোটা শরীর, কী রং নেই সেখানে! পেটের দিকটা একদম সাদা, যত রং তার ডানায় আর পিঠে। ময়ূরের উজ্জÄল নীল রং থেকে নিয়ে সবুজ, কালো, হলুদ, লাল। সে এক রঙের মেলা। সবচেয়ে বেশি সুন্দর তার ঝুঁটি। ঠোঁটের উপর থেকে নিয়ে মাথার বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে টকটকে লাল ঝুঁটি কিন্তু সেই ঝুঁটি মোরগদের মত নয়। যেন বেশ অনেকখানি টকটকে লাল চামড়া এক জায়গায় লম্বা করে জড়ো করা আর সে একদমই এলোমেলো ভাবে। এত লাল যে মনে হয় টোকা দিলেই রক্ত ঝরে পড়বে।
সেদিন রবিবার ছিল আর আব্বাও বাড়িতেই ছিল। তখনও সেখানে রবিবারই ছুটির দিন ছিল। শরবত আলি যেন শুনতে না পায় সেভাবে আব্বা আস্তে করে বলে, এগুলো কোথাকার হাঁস তা জানি না তবে এই হাঁসের চাষ হয় সরকারি ফার্মে। ব্যাটা কোনভাবে সেখান থেকে বের করে নিয়ে এসেছে! সেই হাঁসের ডানা বাঁধা, শরবত আলির ভাষায় "পাঙ্খা'। আম্মা জানতে চায় এই হাঁস পোষা যাবে? কান মাথা চুলকে শরবত আলি বলে, "পাইলতে পাইরবেন তয় পাঙ্খা জানি খুলি দিয়েন না, উড়ি যাইব! পাঙ্খা সব সম বান্ধি রাইখবেন!' আম্মা বুঝে যায়, এ হাঁস উড়বে না, তাইলে শরবত আলি এগুলোকে জবাই করেই দিয়ে যেত। গোটা ছয় হাঁস ছিলো খাঁচায়, সব কটাই আম্মা রেখে দেয়। কয়েকদিন ডানা দুটি সত্যিই বেঁধে রাখে আম্মা তারপর একদিন একটা হাঁসকে খানিক ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা করা হল, সে কতটা উড়তে পারে বা আদৌ পারে কিনা। সেই হাঁস ওড়ে। তবে খুব বেশিদূর যেতে পারে না । সাত আট হাত দূরে গিয়ে মাটিতে ধপ করে বসে পড়ে আর উঁচুতে তো একদমই উড়তে পারে না। বড়জোর এক মানুষ সমান উচ্চতা পর্যন্ত ওড়ে সে। আরও কিছুদিন তাদের ওভাবেই রাখা হয়, কখনো ছেড়ে দিয়ে, কখনো বেঁধে রেখে। এক সময় ওরা চিনে যায়, এটাই এখন তাদের বাড়ি। সাংহাই এখান থেকে বহুদূর, অতদূর তারা যেতেই পারবে না উড়ি উড়ি!
(চলবে)
[www.guruchandali.com এর বুলবুলভাজা বিভাগে প্রকাশিত]
Posted by
বিবর্ণ কবিতা
at
9:24:00 PM
1 comments
Labels: খাদ্যকথা
Sunday, November 15, 2009
নৈব নৈব চিতই
তোরা আয়লো দিদি পিঠা ভাজি
আমরা দুই জনা।
তুই দে গোলা গুলে
আমি দেই খোলা তুলে।
ইরি বলে উঠলে ফুলে দেখবে নয়নে
তোরা আয়লো দিদি পিঠা ভাজি
আমরা দুই জনা।
(ধুয়া গান/ বাংলা একাডেমী ফোকলোর সংকলন-৬৮/ ঢাকা)
টোনা কহিল, টুনি পিঠা খাইব। টুনি কহিল, আতপ চাল আনো, মাটির খোলা আনো, মাটির ছোট সরা আনো তবে তো পিঠা হইবে!
টোনা চাল তো আনিল কিন্তু মাটির খোলা বা সরা খুঁজিয়া না পাইয়া বুকিং দিয়া আসিল, খোলা-সরা বাজারে আসিবামাত্রই যেন মোবাইল ফোনে জানান দেওয়া হয়! মাটির খোলা-সরা তো আসিল না কিন্তু তাই বলিয়া কী পিঠা হইবে না!
পিঠা হইল, মাটির খোলা আর সরার বদলে লোহার চাটু আর ষ্টিলের ঢাকনা দিয়া তৈরিও হইল চিতই পিঠা। পিঠা তো হইল কিন্তু খাওয়া হইবে কি দিয়া? এই জঙ্গলে না পাওয়া যায় বক আর না ধনেশ! নিদেনপক্ষে একখান হাঁস! সেও পাওয়ার যো নাই। কিন্তু তাতেই বা কী।। চিতই খাওয়া যেতেই পারে মুর্গীর ভুনা বা মাছের ঝাল ঝাল বিরান দিয়া। সে মাছের বিরান হতে পারে কৈ বা পাবদার। নিদেনপক্ষে রুই-কাতলা।
বুগো বাড়ি গেছিলাম
চিতই পিঠা খাইছিলাম
ভাডা মাছের প্যাডাডু
কলমি হাগের ডাডাডু।
(মেয়েলি ছড়া/ মোমতাজী/ বরিশাল/ ১৩৭৪)
যদি গাঁও-গেরামের নিয়ম মেনে চিতই খেতে হয় তবে অবশ্যই কচি লাউ আগের দিন রাতে রেঁধে রাখতে হবে পুষ্করনি বা বিলের মাঝখানের ডোবা থেকে তুলে আনা শ্যাওলা পড়া পোক্ত শোল মাছের মাথা দিয়ে। মাথার সঙ্গে অবশ্যই থাকবে ঘাড়ের অংশটুকুও। মশলা বলতে সেই লাউয়ে পড়বে অল্প তেল, নুন-হলুদ বাটা-ধনেবাটা আর খুব অল্প পরিমাণে শুকনো মরিচ বাটা। লাউয়ে যদিও মরিচবাটা দেওয়ার নিয়ম নেই কিন্তু শোলের মাথা আবার একটু মরিচবাটা চায়, অগত্যা নেসেসিটি ব্রেকস দ্য রুল। মাথাখানি তেলে-নুনে-মশলায় কষা হয়ে গেলে ইঞ্চিখানেক পুরু টুকরোয় কেটে রাখা লাউ ছেড়ে দিতে হয় শোলের মাথার উপরে, অত:পর ঢাকনা। ভুল করেও পানি দেওয়া যাবে না। চুলোর কাঠের জ্বাল টেনে রেখে দিতে হবে চুলোর মুখে, ভিতরে জ্বলতে থাকা কয়লার তাপেই রান্না হবে লাউ, মাঝে মাঝে শুধু একটু নেড়ে দেওয়া, তলায় ধরে না যায়। নিজের গায়ের পানি ছাড়বে লাউ, শোলের মাথার সঙ্গে মিশবে, নুন মশলা ঢুকবে এক ইঞ্চি পুরু লাউয়ের টুকরায়, ঢাকনা আধখানা খুলে রেখে দিতে হবে লাউয়ের তরকারির, পুরো ঢাকা দিলে লাউয়ের সবজে রঙ নষ্ট হয়ে যায়। ঝোল ফোটার শব্দ শুনে রাঁধুনি বুঝতে পারেন, রান্না হয়ে গেছে। বাড়ির পেছন দিক থেকে তুলে আনা ধনে পাতা হাত দিয়ে টেনে টেনে ছিঁড়ে দিতে হয় লাউয়ের উপরে, কুচনো ধনেপাতা কদাপি নয়, গুরুর মানা। সাথে কলপাড়ের গাছ থেকে তুলে আনা কাঁচামরিচ, গোটা গোটা। মরিচও কাটা বা চেরা চলবে না। আধখোলা ঢাকনাসহ লাউয়ের তরকারি গিয়ে ঢুকবে কাঠের জালি আলমারিতে, থাকবে পরদিন সকাল পর্যন্ত। এবং সকাল বেলায় এই আগের দিনের রান্না করা লাউ গরম করা চলবে না, গরম চিতই আর ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাওয়া সবুজে-হলুদে মেশানো লাউ, ধনে পাতা আর কাঁচামরিচের সুবাস, অহো:!
এইবার জেনে নিন সঠিক লাউখানি কি রূপে চিনিবেন। গোয়ালের খড়ের চালের উপরে বিছিয়ে থাকা লাউগাছের লতা-পাতার ফাঁক-ফোকরে শুয়ে থাকা অনেকগুলি নধর লাউয়ের ভেতর থেকে খুঁজে নিতে হবে সবচেয়ে কচি লাউখানি। চিনবেন কী করে? লাউখানির ল্যাজার দিকে তাকালে দেখতে পাবেন, ফুলখানি তখনো ঝরে যায়নি, শুকিয়ে এইটুকুনি হয়ে গেলেও এখনো লেগে রয়েছে লাউয়ের ল্যাজায়। তারপরেও যদি বুঝতে না পারা যায় তবে কড়ে আঙুলের নখ দিয়ে হালকা আঁচড় দিতে হবে লাউয়ের গায়ে, নখের আলতো আঁচড়েই লাউয়ের গায়ে দাগ পড়ে গিয়ে স্বচ্ছ কষ বের হয়ে এলেই আপনি বুঝতে পারবেন, একদম ঠিক লাউখানি আপনি পেয়ে গিয়েছেন!
এবার চেনা চাই ঠিকঠাক মাছটি। বর্ষার পানি যখন ক্ষেত-খামার থেকে নেমে যায়, কিছু পানি তখনো জমে থাকে নিচু জমি বা ডোবায়। এই ডোবাগুলি নিজেদের ক্ষেতে আগে থেকেই কেটে রাখেন ক্ষেতমালিকেরা, অনেকটা ছোটো পুকুরের মতো। পঞ্জিকার নিয়ম মেনে এই বাংলাদেশ থেকে কদাপি বর্ষা বিদায় হয় না শরতে। সে থেকে যায় হেমন্ত পর্যন্ত। মাছেরা সব ভেসে যাওয়া ক্ষেত-খামারে ঘুরে বেড়ায়, খায় দায় আর স্বাস্থ্যবান হয়। কিন্তু এক সময় বিদায় লইতেই হয় বর্ষার পানিকে। রাজার মেজাজে ঘুরে বেড়ানো শোল-গজার-শি-ংমাগুর-কৈ-বোয়াল-পুটি-কাইক্যা-বাইন আর আরও হাজার রকমের মাছেরা তখন পানির টানে গিয়ে পড়ে ডোবায়। পানি চলে যায়, গেরস্থ ফসল বোনে পলি পড়া জমিতে। এবার শীত এসে পড়ল বলে। সরু ধান সব এখনই বোনার সময়।
ক্ষেতে ধান বোনা হয়, সেই ধান পেকে সোনালী হয়ে আসে, আর একসময় কাটাও হয়ে যায়। ঘরে ঘরে তখন নতুন ধানের গন্ধ, ধান ভাঙিয়ে প্রথম যে চাল হয়, সে রেখে দেওয়া হয় পিঠা খাওয়ার তরে। প্রথম পিঠা অবশ্য "পুলি', নারকোল দেওয়া "মিঠে পুলি' তারপর গুড়ের পিঠে "পোয়া' আর তারপর চিতই, ছিটে ইত্যাদি ইত্যাদি ক্রমে আসিতেছে। তবে এই পিঠেপর্ব শুরু হওয়ার আগে প্রথম ঘরে ওঠা চাল দিয়ে অবশ্য অবশ্যই শিন্নি রেঁধে যে মসজিদে দেওয়া হয় এবং পাড়ার কচি-কাঁচাদের খাওয়ানো হয় সেকথা বলা বাহুল্য।
শীতের শুরুতে ধান কাটা ঝাড়াই বাছাই শেষ হওয়ার পর নজর দেওয়ার সময় আসে ডোবার দিকে, ডোবায় এসে আটকা পড়া মাছেদের দিকে। গভীর রাতে শীতের কাঁথা মুড়ি দিয়ে গ্রাম যখন ঘুমোয়, বাড়ির মুনিষ তখন জাল-সড়কি-লম্বা বাঁশের এক মাথায় গোল করে লাগানো সরু সরু লোহার তীক্ষ্ম ফলাওলা চল আর একটা হ্যারিকেন নিয়ে রওয়ানা দেয় ক্ষেতের ভেতরকার ডোবার উদ্দেশ্যে। ডোবা সেচার সরঞ্জাম সেখানে রেখে আসা ও সেচার লোকের ব্যবস্থা সে দিনের বেলাতেই করে এসেছে, তারা সেখানে হয় অপেক্ষা করছে নয় এই পৌঁছুলো বলে। হুকা-তামুকের ব্যবস্থা করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এখন শুধু পানি তুলে ডোবা খালি করিয়া চল বল্লম ইত্যাদি দিয়া ঘাঁই দিয়া দিয়া মাছ শিকার করিয়া পাড়ে তোলার পালা। ডোবায় পানি থাকাকালীন একবার নিয়মমাফিক জাল তারা ফেলেছে বটে তবে জাল দিয়ে আর কটা মাছ ওঠে! পানির নড়াচড়ায় ওদিকে সব মাছ তখন নিজ নিজ গর্তের ভেতর মুখ-শরীর লুকিয়েছে।
ছোট মাছ, যেমন শি-ংমাগুর-কৈ-ভ্যাদা-পাবদা-ট্যাংরা এদেরকে ত খাবলা দিয়ে দিয়ে তুলে আনে ডোবা বিশারদেরা, চল-বল্লমের প্রয়োজন হয় বড় শোল-গজার-বোয়াল ইত্যাদির জন্য। খানিকটা সাবধান থাকতে হয় গর্তের ভেতর থেকে বাইন তোলার সময়, কারণ মাঝে মাঝেই বাইনের বদলে হাতে এসে পড়ে সাপ। সাপের কামড়ের ভয়কে খুব একটা তারা আমল দেয় না যদিও, বহুবার সাপের কামড় খেয়ে শিঙ্গির কাঁটা বা কাঁকড়ার দাঁড়ার চিপা খেয়েছে ভেবে ভুলে যায় সেটাকে, ব্যথাও হজম করেই নেয়, সাপে কামড়েছে বলে ভাবতেও চায় না, পাত্তাও দেয় না যতক্ষণ না সাপকে সে নিজের চোখে দেখতে পায়। একবার সাপ চোখে দেখে ফেললে তখন অবশ্য সত্যিকারের শিঙ্গির কাঁটার ব্যথাকেও সাপের কামড় ধরে নিয়ে বাবারে মারে বলে ডাক ছেড়ে চেঁচায় আর তারপর সব ছেঁড়ে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ায় গাঁওয়ের হোমিওপ্যাথের ডাক্তার কাম কম্পাউন্ডার কাম অলরাউন্ডারের কাছে। হোক না সে পানির হলদে ঢোঁড়া। যদিও হ্যারিকেন একখানি ডোবার কিনারে রাখা থাকে কিন্তু তাতে বিলের উপর জমে থাকা কুয়াশা আর আঁধার কেটে বাইরে দেখা দেয় না, ফলে হাত চলে আন্দাজ আর অভ্যাসে, কাদার ভেতরকার নড়াচড়া দেখে বুঝে নিতে হয় ঘাপটি মেরে বসে থাকা বাবাজীটি কী এবং কত বড়। সেই বুঝে ঘাঁই দেওয়া হয় চল দিয়ে। কখনওবা নিজের শরীর দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই হাত দিয়ে তুলে আনা হয় মহার্ঘ শ্যাওলা পড়া শোল! যদিও এক একটা ডোবা থেকে মণখানেক মাছ ওঠে সব মিলিয়ে কিন্তু বড় শোল বা কালী বোয়ালের ব্যপারই আলাদা! আরামসে পাঁচ-সাত সেরে দাঁড়ায় শুধু একটার ওজন।
নাহয় লোহার চাটুতে ষ্টিলের ঢাকনা দিয়ে চিতই বানিয়ে ফেললাম উপায়ান্তর না দেখে কিন্তু আসল চিতই কিভাবে বানাতে হয় সেটা একটু বলা ভাল। এমনিতে আমাগো দেশের মানুষে তো পাঊরুটি-ওমলেট খায় না, তাঁরা সকালবেলার নাশতাটা পিঠে-পুলি দিয়েই সারে। যারা নিতান্ত বারো মাস পারেন না, তারা নতুন ধান ওঠার পর যে ক'দিন পারেন, পিঠে খান আর তারপর ভাত। ভাতের পাতে শাক বা থেতো করা পেঁয়াজ-লালমরিচ দেওয়া একটু শুটকিবাটা। যে যেমন পারেন। তা বলছিলাম চিতইয়ের কথা।
সাধারণত রোজকার রান্নার জন্যে যে কোনো কাঠেই কাজ চালানো হলেও কিছু বিশেষ পদের জন্যে কাঠও থাকে বিশেষ রকমের। যেমন তেঁতুলগাছের কাঠ। বা বেলগাছ। সৌখিন মানুষে গোটা গাছ কিনে চিরে মাপমতো কেটে-কুটে রান্নাঘর-গোয়ালঘরে বানানো মাচার উপরে তুলে রেখে দেন। তেঁতুলকাঠের আগুনে ধোঁয়া হয় কম, বা হয় না বললেই চলে, ধীরে ধীরে জ্বলে, পুড়ে যাওয়া কয়লাও জ্বলে অনেকক্ষণ, ঠিক যেমনটা চাই পিঠে বানানোর জন্যে বা দুধ জ্বাল দেওয়ার জন্যে। আঁচ একটু বেশি হয়ে গেলে কাঠ টেনে চুলোর মুখে রেখে দিলেও আস্তে ধীরে পিঠে হতে থাকে একের পর এক।
শীতকাল পিঠে-পুলি খাওয়ার সময়। গোলায় নতুন ধান, শীতের আমেজ দুইয়ের সাথে যোগ হয় নতুন গুড়, শীতকালীন সব্জী। এই সময়টাতে মেলা বসে জায়গায় জায়গায়, গ্রামে গ্রামে। বাড়িতে আসে মাটির হাঁড়ি-বাসন-খোলা-সরা-কলসী। বছরকার মতো কিনে নিজেদের মতো করে আগুনে আবারো পুড়িয়ে আরো খানিকটা পোক্ত করে রাখেন পোড়খাওয়া গিন্নিরা। বিশেষ করে কেনা হয় চিতইয়ের খোলা। যদিও বাজারে বছরভর পাওয়া যায় সবই। দরকার পড়লেই কিনে আনা যায় কিন্তু তবুও মেলা থেকেই কেনা হয় যতটা পারা যায়।
ওরে আমার সোনা
এতখানি রাতে কেন বেহন ধান ভানা?
বাড়িতে মানুষ এসেছে তিন জনা
বাম মাছ রেধেলি শোল মাছের পোনা।
(ছেলে ভুলানো ছড়া/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা/ ১৩০১)
আগের দিন সন্ধেবেলায় আতপ চাল ভিজিয়ে রেখে দেওয়া হয় রাতভর। যত শীতই পড়ুক আর কুয়াশায় যতই অন্ধকার থাকুক দেশ-গাঁয়ে সকাল হয় ভোরের প্রথম মোরগের বাগ শুনে। উঠে ঘুম ঘুম চোখে ভিজিয়ে রাখা চাল শিলে বাটা হয় মিহি করে, পানি একেবারেই না দিয়ে। ভেজানো চাল এমনিতেই পানি খেয়েছে সারারাত। আঠালো চালবাটায় অল্প পানি দিয়ে তৈরি হয় গোলা। ঘন গোলায় ডোবানো থাকে নারকোলের মালা দিয়ে তৈরি লম্বা ডাঁটির চুয়োর, এক এক চুয়োর চালের গোলায় একটা করে চিতই। মাটির খোলা গরম হয়ে গেলে একবার শুধু একটু তেল ন্যাতায় করে বুলিয়ে নেওয়া, প্রথম পিঠেটা যাতে লেগে না যায় খোলায়। পিঠের থেকে একটু বড় মাটির সরা বসে যায় পিঠের উপর, এমনভাবে বসানো হয় যাতে একটুও ভাপ সরার ভেতর থেকে বাইরে না বেরোয়। হাতে করে খানিকটা পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয় সরার উপর, খানিকটা পানি আলাদা করে দেওয়া হয় সরার উপরকার ছোট্ট গোলাকার বাটির মত জায়গাটিতে, মূলত সরার হ্যান্ডেল ওটি। এই পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয় খোলার নিচের ঢিমে আগুনের সাথে উপর থেকেও যাতে পিঠে ভাপ পায়। পিঠে হতে হতে এই ছিটিয়ে দেওয়া পানি টেনে নেয় সরা। মিনিট ৩-৪ সময় লাগে এক একটা পিঠে হতে, হয়ে গেলে পিঠের নিচের দিকটা হালকা মুচমুচে হয়ে গিয়ে নিজে থেকেই খোলাকে ছেড়ে দেয়, লোহার খুন্তির আলতো খোঁচায় পিঠে উঠে আসে খোলা ছেড়ে। সোঁদা গন্ধ বেরোতে থাকে রিতিমতো এয়ারটাইট সরার ভেতর থেকে, ধপধপে সাদা চিতইয়ের উপর দিকটা দেখতে হয় ফুলকো লুচির মতো, ফোলা অংশের এক পরত নিচেই থাকে অসংখ্য সূক্ষ্ম ফুটোর জালি।
যদিও চিতই খাইবার নিয়ম কাঠের উনুনের পাশে গোল হইয়া বসিয়া, একটার পর একটা পিঠা নামবে আর পাতে আসিবে। লোকসংখ্যা বেশি হইলে একের পর এক পিঠা যাইতে থাকিবে গোল হইয়া বসিয়া থাকা রসিকের পাতে, যার পিঠা শেষ হইয়া গিয়াছে সে অপেক্ষা করিবে, কখন আবার তার পালা আসে, গরম চিতই পাতে আসিবার।
১৫ ই নভেম্বর, ২০০৯
[লেখাখানি গুরুচন্ডা৯র বুলবুলভাজা বিভাগে প্রকাশিত। গুরুচন্ডা৯তে লেখাটি পড়তে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে http://www.guruchandali.com/?portletId=20&porletPage=1&pid=wpgc:///2009/11/15/1258262406029.html]
Posted by
বিবর্ণ কবিতা
at
7:53:00 PM
1 comments
Labels: খাদ্যকথা

.jpg)

