ফ্রিজে একটা পান পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে।
সাজা পান। মিষ্টি পাতা, ভেজা সুপুরি, চমন বাহার, অল্প মৌরী, আর সামান্য ঝিরিকাটা
সুপুরি। টুকরো খবরের কাগজে মোড়া, পলিথিনের ছোট্ট পাউচে ঢোকানো। কতদিন আগেকার পান?
হবে হয়ত সাত-আটদিন বা তারও আগে-পরের। মনে নেই। মনে করার চেষ্টাও নেই অবশ্য।
সবকিছুই মনে রাখতে এমন তো কোনো কথা নেই..পানটা
পড়ে আছে কারণ খেতে ভুলে গেছি। মনেও পড়েনি পান খাওয়ার কথা। পান যে আছে, এটাও মাথায়
ছিল না, অথচ খাব বলে বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যত্ন নিয়ে সাজিয়ে আনা পান..
এখন, কী একটা বার করতে গিয়ে পানটা চোখে
পড়ল। পানটা চোখে পড়ামাত্র কত যে ছবি অদৃশ্য এক আয়নায় ফুটে উঠল.. কিছু ছবি পুরনো, সময়ের ধুলো জমে জমেও যা একটুও ঝাপসা বা আবছা নয় আর কিছু সদ্য-নতুন,
একেবারে টাটকা। নতুনেরা বরং থাক মনের তাকে,পুরনো হোক, জমুক কিছু ধুলো, সময়ের, বয়সের।
ধুলোর আস্তরণ যখন পুরু হবে, ভেতরের পাতাগুলো হবে হলদে, তখন না হয়
নামিয়ে আনব তাক থেকে, পালকের বুরুশ দিয়ে ধুলো সরিয়ে খুলব একটা একটা করে পাতা..আমার
নাড়াচাড়া তো পুরনো নিয়েই..
বেশ কিছুকাল হবে বোধ হয়, মাঝে সাঝে পান খেতে শুরু করি, ঠিক কবে সে আর মনে
পড়ে না। আমাদের বাড়িতে আম্মা পান খায় না,
দাদি খেত, বড়ফুফু, মেজফুফুরা খায়। যদ্দিন দাদির দাঁত ছিল সরু-মিহি করে কাটা
সুপুরি, চুন-খয়ের দিয়ে পান সেজে খেত। পেতলের পানের বাটা ছিল দাদির। বড়ফুফু যখন
বাপের বাড়ি আসত, বড় কৌটো ভর্তি করে দাদির জন্যে সুপুরি কেটে রেখে যেত। কি ভীষণ
মিহি করে সুপুরি কাটত বড়ফুফু! গোটা গোটা সুপুরি রাতভর জলে ভিজিয়ে রাখা হত, কাটার
সময় যেন গুড়ো গুড়ো না হয়ে যায়। পান মুখে দিয়ে বারান্দায় গুছিয়ে বসত সুপুরি কাটার
জন্যে। গল্প করার জন্যে একে একে অনেকেই জুটে যেত, যে বসত, তাকেই পাশে রাখা দাদির
বাটা থেকে এক খিলি পান সেজে দিত ফুফু, এমনিতে যে পান খায় না, সেও খেত সেই সময়। পানের
খিলি মুখে নিয়ে যে বসত সেও একসময় হাঁক দিত, কই গো, আরেকখান ছরতা দ্যাও দেহি। এক
সময় দেখা যেত, আট-দশজনায় বসে সুপুরি কাটছে। পাশেরজন কেমন কাটছে সেদিকে খেয়াল থাকত
সকলেরই, নিজের কাটা সুপুরি যেন মোটা না হয়ে যায়। সমস্ত সুপুরি কাটা হয়ে গেলে বেতের
ডালায় করে রোদে শুকিয়ে নিয়ে কৌটোয় ভরে রাখা। এখন চলবে কয়েকমাস এই সুপুরি দিয়ে,
বড়ফুফু আরেকবার বাপের বাড়ি বেড়াতে আসা অব্দি..
আমরা, ছোটরা দাদির মুখের চিবুনো পান খেতাম।
অনেকক্ষণ ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে পান খেত না দাদি। খানিকক্ষন চিবিয়ে রসটা খেয়ে নিয়ে পানটা
হাতে নিয়ে আওয়াজ দিত, পান কেডা খাইবি আয় বলে। ততক্ষণে পানের রসে টুকটুকে লাল হয়ে
যেত দাদির দুই ঠোঁট আর ঠোঁটের কষ। একটা দুটো হাত সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে যেত সেই
চিবুনো পান খাওয়ার জন্যে। সকালের নাশ্তা বা দুপুরের খাওয়া বা বিকেলের চায়ের পরে
আব্বা যখন বারান্দায় দাদির বেতের সোফার পাশে দ্বিতীয় সোফাখানিতে গিয়ে বসত, তখন
একখিলি করে পান এগিয়ে দিত দাদি। মায়ের পাশে বসে গল্প করতে করতে পান চিবুতো আব্বা..
একটা সময় এল, যখন দাদি আর সাজা পান চিবিয়ে
খেতে পারে না। হামানদিস্তায় থেঁতো করে নিত। মজাটা হল, আব্বার তো দাঁত ছিল কিন্তু
আব্বাও নিজের পান হামানদিস্তাতেই দিয়ে দিত, ছেঁচা পান দুজনে মিলে ভাগ করে খেত।
দাদি নেই, এখন আর আব্বা পান খায় না কিন্তু মাঝে মধ্যেই দাদির পেতলের পানের বাটা আর
সেই হামানদিস্তার খোঁজ করে। বলে, বাটা আর হামানদিস্তাখান থাকলে পান খাওন যাইত! যেন
অন্য কোনো বাটা-হামানদিস্তায় থেঁতো করা পান খাওয়ারই যোগ্য নয়..
আজ সকালে আব্বার সঙ্গে কথা হল। অনেকদিন পরে কথা হল আব্বার
সঙ্গে। আজকাল আমি বেশি ফোন করি না আব্বাকে। ফোন করলেই জানতে চাইবে কেমন আছি, কী বৃত্তান্ত।
অসুখের কাহিনী বলে আব্বার চিন্তা বাড়াতে চাই না কিন্তু ভাল আছি বলে কাটিয়ে দিতে চাইলেও
আব্বা ঠিক ধরে ফ্যালে তাই ফোনই করি না এখন আর। বোন জানায় আম্মা নাকি অসুস্থ। খানিক এটা
সেটা গল্প করে আব্বা বলে, বাড়ি চলে এস মাস কতকের জন্যে, আমার কাছে এসে থাক, চাঙ্গা
হইয়া যাইবা, এখন তো ব্যারাইম্যা মুরগির মতন ঝিমাইতাছ। বলি, আব্বা, কয়েক মাসের জন্যে
চলে গেলে আমার পোলায় কী করবে? প্রায় রেগে গিয়েই আব্বা বলে, পোলায় বড় হইসে না? তুমি
আইয়া পড়। বোঝানোর চেষ্টায় ক্ষ্যামা দিই, বলি, হ, মিষ্টি আইয়া
ফেরত গেলে পরে দেখি যাইতে পারি কিনা..
বেশিদিন হয়নি বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছি কিন্তু আব্বার এই বাড়ি যেতে
বলার বেশ আগে থেকেই মন বড় অস্থির হয়ে আছে, কয়েকমাস না হোক, কিছুদিনের
জন্যে অন্তত যেতে পারলে সত্যিই ভাল হত.. সবকিছু, সমস্তকিছু থেকে
দূরে, অনেকটা দূরে, বাপ আর মায়ের কাছে, বারান্দায় আব্বার হাতলওয়ালা চেয়ারের পাশে
মোড়ায় বসে পানের বাটা আর হামানদিস্তা নিয়ে আব্বার আর নিজের জন্যেও পান থেঁতো করে খেতে
খেতে গল্প করলে হয়ত এই অ-সুখও সেরে যেত..
ছবি-গুগল হইতে
ছবি-গুগল হইতে

