Sunday, August 26, 2018

নজর লাগল বলে

সাতদিন হাসপাতাল আর সাতদিন কন্যার বাড়িতে কাটিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরার পথে ভদ্রলোক দেখলেন, নরসিংদীর পর থেকে রাস্তার ধারের ছোট ছোট সব বাজারগুলোতে কাঁঠাল রাখা আছে একটার উপর একটা চাপিয়ে। সে যেন ছোটখাটো এক একটা পাহাড়। হলদেটে সবুজ কাঁঠালের পাহাড়। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে লোক বসে রয়েছে লটকন নিয়ে, সেও আর এক পাহাড়। লটকনের পাহাড়। হাট ফিরতি মানুষের কাঁধে কাঁঠাল, হাতে ঝোলা ভর্তি হলদে হলদে লটকন। 

আস্তে আস্তে গাড়ি চলে ভীড় কাটিয়ে। একে একে সব বাজার পেরিয়ে যায় গাড়ি, নরসিংদী, মাধবদী, বারুইচা, বেলাব। ভৈরব আসতে দেখা গেল আরও বড় বাজার। ভদ্রলোক আর চুপ করে থাকতে পারলেন না, বলে উঠলেন, একটা কাঁঠাল কেনো আর লটকন আনো কিছু। বাজার পেরিয়ে রাস্তার ধার ধরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার শিপন চলে যায় কাঁঠাল আর লটকন কিনতে। মিনিট কুঁড়ি বাদে শিপন ফিরে আসে কাঁধে -দশ কিলো ওজনের বিশালাকারের এক কাঁঠাল চাপিয়ে, এক হাতে বেড় দিয়ে সেই কাঁঠাল ধরা অন্য হাতে কোলের কাছে ধরা পাঁচ কিলো লটকনের এক বস্তা

সেই সব বাজারগুলোতে আর যা ছিল তা হচ্ছে কচু। বিশাল বিশাল আকারের কচু জোড়ায় জোড়ায় বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছে কাঁঠাল, লটকনের ফাঁকে ফাঁকে। আর সেও পাহাড়প্রমাণ। কচুর পাহাড়। নরসিংদী এলাকার কচু অত্যন্ত সুস্বাদু আর খেলে একটুও গলা কুটকুটি করে না। এই কচু দেখে মনে যে খোলায় ভাজা শুকনো শিমের বিচি দিয়ে কচুর ডগা দিয়ে কচুশাক আর গোড়া দিয়ে চাকা চাকা টুকরোয় মশলার গা মাখা মাখা বিরান- যেরকমটা আম্মা আগে করতসেরকমটি খাওয়ার বাসনা হয়নি তা বলতে পারব না, কারণ সে অসত্য কথন হবে। 

তো সঙ্গে দুই দুইজন রোগী আছে বলে খাওয়া নিয়ে আর আহ্লাদ না করে কোনও কথা না বলে চুপ করে বসেই ছিলাম। মনের কথা বোধ হয় ভদ্রলোক বুঝতে পারলেন, শিপনকে বলে দিলেন একজোড়া কচু আনতে। কিন্তু কাঁদ্গে অত বড় একখান কাঁঠাল আর হাতে লটকনের বোঝা নিয়ে শিপন কচুর কথা ভুলে মেরে দিল। অতএব কচুর 'চাক বিরান' আর 'ছইআলি দিয়া কচু হাক' এযাত্রায় আর হল না। মেঘনা পেরিয়ে বিশ্বরোডের উপর রাজমণি রেস্টুরেন্টে পরোটা আর খাসির গোশ্ত ভুনা খাওয়ার কথা ছিল কিন্তু অসুস্থ ভদ্রলোক ততক্ষণে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছুনোর জন্যে অস্থির হয়ে পড়েছেন, গাড়িতে আর বসে থাকতে পারছেন না অতএব পরোটা-মাংসও ভোগে..

বারান্দায় বসে কয়েকটা লটকনের খোসা ছাড়িয়ে দিলে আব্বা চুষে চুষে লটকন খায় আর লটকনের গুনকীর্তন করে। আম্মা ততক্ষণে সারা বাড়ির কচি-কাঁচাদের ডেকে ডেকে মুঠো মুঠো লটকন দেয়। তবুও টেবিলে পড়ে থাকে ঢের লটকন। বেলুচির তর সয় না, সে বটি দিয়ে কাঁঠালের শক্ত খোসা কেটে কোয়া ছাড়িয়ে টেবিলে দেয়। ইয়াব্বড় বড় সোনা রঙা কাঁঠালের কোষ, খাজা কাঁঠাল, আমরা যাকে বলি 'চাউলা কাডল' 

কাঁঠাল আমার সহ্য হয় না। খেলেই পেট ব্যথা করে, পেটে গুড়্গুড় শব্দে বাতাস নড়াচড়া করে। আমি তাই কাঁঠাল খাই না। সে যত সুন্দর-মিষ্টি আর চাউলাই হোক। কিন্তু মাঝে মধ্যে লোভে পড়ে দু-একটা কোয়া খেয়েই ফেলি। বচ্ছরকার ফল, দু-একবার না খেলে চলে? লোকেই বা বলবে কী...! সেই ভেবে আমি বেশি না, মাত্র দুটো কোয়া খেয়েছি, আহা.. অই আধপাকা কাঁঠালই মিষ্টি রসে টুপটুপ আর কচকচে। কিন্তু অই যে, আমার কাঁঠাল সহ্য হয় না। খানিক পরেই শুরু হয় পেটব্যথা। 

বিকেল থেকে পেটে বালিশ চেপে শুয়ে আছি দেখে আম্মা জিজ্ঞেস করে, 'তিনসন্ধ্যার সমিয় শুয়ে আছ কেন ?' বললাম, কাঁঠাল আমার সহ্য হয় না, পেটে ব্যথা করছে। আম্মা বলল, 'নজর লেগেছে' সাতটা শুকনো লঙ্কা নিয়ে আম্মা সারা গায়ে বুলিয়ে বুলিয়ে নজর ঝেড়ে দেয়, সর্ষের তেল হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পেটে হাত বুলিয়ে দেয় আমার ডিমেনশিয়ায় সব ভুলে যাওয়া মা। রান্নাঘরে গিয়ে উনুন জ্বালিয়ে নিজেউ সেই লঙ্কা পোড়ায়ার বলে, কি পরিমান নজর  লেগেছে দেখো, মরিচে একটুও ঝাঁজ নাই! যদিও লঙ্কার ঝাঁজে তখন সকলেই হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো। পাশ ফিরে শুই আমি। আম্মা এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে ব্যথা কমেছে?..  

খানিক এপাশ ওপাশ করতে করতে এক সময় একটু আরাম মনে হলে ঘুম নেমে আসে চোখে, ভর সন্ধেবেলায় আমি ঘুমিয়ে পড়ি... আব্বার ডাকে গভীর এক ঘুম থেকে জেগে উঠি রাত সাড়ে নটার দিকে, রাতের খাওয়ার জন্যে আব্বা ডাকছে। পেটে তখন আর একটুও ব্যথা নেই.. 

Saturday, April 07, 2018

আনন্দবাজার পত্রিকায় পুবালি পিঞ্জিরা-র পুস্তক সমালোচনা

তাঁরাই বোনেন সমাজকাপড়ের টানাপড়েন
যশোধরা রায়চৌধুরী

কাউয়া কো কো, আমাগো বাড়িতে আজ শুভ নবান্ন।’ জীবনের একেবারে শুরুর দিকে কলকাতা শহরের কাঠখোট্টা বাতাবরণেই ছাতে উঠে নবান্নর চাল-ফলমাখা খাওয়াতে শিখিয়েছিলেন কাকেদের ডেকে, আমার দিদা। সেই সব দিদা, সেই সব মা-মাসিমারা, যাঁরা নিজেদের জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে, একেবারে প্রকৃতির বুকে, একটি ভরভরন্ত সমাজে। গ্রাম-শহরের দুর্লঙ্ঘ্য দূরত্ব তৈরি হয়নি তখনও। নিজেদের গ্রামীণ, কৃষি-কৃষ্টির শিকড় তখনও জলজ্যান্ত। কোথাও কোনও বিচ্ছেদ নেই, আম্বিলিকাল কর্ড কাটা মাতৃ-ছিন্নতার বোধ নেই।

তারপর আসে তাঁদের জীবনের ঝড়বিধ্বস্ত সময়গুলি। আসে দেশভাগ। মনের ভেতর শুধু থেকে যায় প্রাচীন সেই যুগবাহিত কৃষি ঐতিহ্য, জলজ ঐতিহ্য।

স্মৃতি মানুষের সংস্কৃতি। আত্মবিস্মৃত মানুষ পাষাণের মতো। আর এই স্মৃতিকথনের মধ্যে দিয়েই তাই রচিত হয় ইতিহাস। রাজারাজড়ার ইতিহাস নয়, ব্যক্তি-মানুষের, বিন্দু বিন্দু বেঁচে থাকার ইতিহাস। বহু আগে পড়েছিলাম আইকন হয়ে যাওয়া বই কল্যাণী দত্তর থোড়-বড়ি-খাড়া। কিছু দিন আগেই পড়েছি সুনন্দা শিকদারের দয়াময়ীর কথা। পড়েছি শান্তা সেনের পিতামহী।

মেমোয়ার নামের একটি খাঁচায় ঠিক আটকে রাখা যায় না এই গ্রন্থদের। মূল সুর অবশ্যই অতীতযাপন। কোন অতীত? সেই যে, সুস্বাদ কথ্যতার যে আবহমানতা আমাদের ছোটবেলায় ছিল, নারীপ্রজন্মগুলিতে, যাদের আজকের কেউ কেউ ‘পূর্বপুরুষ’-এর আদলে ‘পূর্বনারী’ও বলে থাকেন। ইতিহাসের বড় বড় অক্ষরে তাঁদের কথা লেখা হয় না। অথচ তাঁরাই বয়ন করেন সমাজকাপড়ের টানাপড়েন। তাঁরাই সুতো হয়ে ধরে থাকেন।

ইতিহাস এখন ধরা থাকে গোষ্পদে। রাজারাজড়াদের ইতিহাস বিগত এখন। সাধারণ মানুষের ইতিহাসের অঞ্চলটিতে আলো পড়ছে। যে ভাবে ছোট ছোট মানুষের অঞ্চলে, সে ভাবেই মানুষীদের অঞ্চলেও জমে থাকা জলগুলিতে মুখের ছায়া দেখে নিজেদের খুঁজে পাওয়ার সময় এখন। এমনই দুই প্রান্ত থেকে দু’টি বই এসে বেঁধে দিল গিঁট। সাধারণ মানুষের জীবনের ছোট ছোট কথার ভেতর দিয়ে একটা গোটা সময় উঠে আসছে। দুই বইতেই। দু’ভাবে।

পুবালি পিঞ্জিরা-র মধ্যে পাই বহুস্তরীয় একটি কথন। এক দিকে খুঁটিনাটিতে ক্লোজ-আপ দেখি মুসলিম অন্তঃপুরের এক জটিল সূক্ষ্ম ছবি। পরনের কাপড়, ব্যবহার্য আসবাব এবং অনেক তৈজসপত্রের বিবরণের পাশাপাশি পাই, মুরগির ডিম রক্ষা করে, মুরগিকে তা দিতে প্ররোচিত করে ফুটিয়ে বাচ্চা করানোর অথবা পোষা মেনি জরিনা বিবির ইতিবৃত্ত। একটা পরিবারে মানুষের সঙ্গে গাছপালার, মানুষের সঙ্গে পশুপাখির জড়াজড়ি করে থাকার নিখুঁত ছোট ছোট আঁচড়।

দ্বিতীয় এক তলে, মিড শটে ইতিহাস-কথা-গল্প-কিংবদন্তির তিতাসপাড় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথা, চট্টগ্রামের কথা। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ধর্মভীরু মুসলমানের অত্যন্ত ধীর, নিরুচ্চার, মানবিক, যাপিত জীবন। তার অন্তঃপুরের কথা এক অদ্ভুত ছলাচ্ছল জলের মতো গদ্যবাংলায়।

তৃতীয় তলে, এক লোক সংস্কৃতির যাত্রাপালার পাশাপাশি, অন্ত্যজ গানে-গল্পে বুনে তোলা বিয়ে-শাদি-সন্তানজন্ম-প্রেম-ধর্মাচরণ-রান্নাবান্নায় গাঁথা সমাজের বয়ান, হেঁশেলনামা, পাখিশিকার, মাছধরা, মেয়েলি পাঠের বই ছাড়াও এ এক বিপুল বিচ্ছেদ-বেদনার বইও। ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে যেন ধরা রইল, যে সমাজ আর ফিরে আসে না, আশির দশকের পরবর্তী পাল্টে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশি সমাজের প্রেক্ষিত থেকে পিছনে তাকানো এক সবুজ, নরম, অতি করুণ, আপাতস্বাধীন, সচ্ছল অতীতকথন। যা হারায়, তা কেবলই হারায়। আর পাশাপাশি চিরমানবিক সে সব বেদনাগাথাও লিখে রাখে। সন্তান হারানো মায়ের কান্না অথবা শ্বশুরঘরে মেয়েকে ছেড়ে আসা পাগলিনী মায়ের কষ্ট।

‘‘সমাজ অন্তঃপুরবাসিনীর সামনে যত বড় আয়নাই আঁকতে পছন্দ করুক তার পটে এখনো খেলা করে জিন-পরীদের আসর, অন্তরমহলের কানাকানি, পাগল পড়শি, মাজারে নেশাড়ুদের গানবাজনা, যাত্রাদলে পালানো যুবক, নিজের শরীর চেনা, শিশুমৃত্যু, দাই...ওঝা...ধর্মান্ধতা...’’ (প্রথম ভেতর-প্রচ্ছদের একাংশ)। আর সেই কথাই পুরনো ছাপাই ছবি আর নতুন লিনোকাটের সাজে সাজে মুখর করে উপহার দেওয়া হয়েছে ২৭৯ পাতার বইতে। ছাপাই ছবিগুলোর পাশাপাশি গম্ভীরা গান, তালুকদারের গীত, সিরাজগঞ্জের মেয়েলি গীত, ময়মনসিংহের পালাগান। এই সব মণিমুক্তো তুলে আনার পাশাপাশি ঘরোয়া আসবাব, তৈজসপত্রের বিবরণ মুহূর্তে টেনে নেয় অতীতের বসবাসে। দূরের বসবাসেও।

এই বই থেকেই জানি, হিন্দু ঘরে মা-ষষ্ঠীর ব্রতপালনের জন্য পোষা বেড়ালের প্রতি মায়া-মমতার মতোই মুসলিম ঘরেও সন্তানবতী নারীর পশু সংরক্ষণের ঐতিহ্য। প্রচলিত স্টিরিওটাইপের বাইরে দেখতে শিখি কত না যত্নময় শাশুড়িকে, বউমার প্রতি স্নেহবশ। (মূল লেখার অংশ)

পুবালি পিঞ্জিরা। সামরান হুদা। গাঙচিল, ৪৫০.০০
শনিবার, ৯ জুলাই, ২০১৬ । আনন্দবাজার পত্রিকা