আশ্বিনে আম্বিকা পূজা করে জনে জনে।।
ছাগল মহিষ মেষ দিয়া বলি দানে।।
উত্তম বসনে বেশ করয়ে বনিতা।।
অভাগী ফুল্লরা করে উদরের চিন্তা।।
মাংশ কেহ না আদরে মাংশ কেহ না আদরে।।
দেবীর প্রসাদ-মাংশ প্রতি ঘরে ঘরে।।
কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ।।
জগজনে করে শীত-নিবারণ বাস।।
নিযুক্ত করিলা বিধি সভার কাপড়।।
অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের ছড়।।
( চন্ডীমঙ্গল কাব্য / কালকেতু উপাখ্যান/ কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী/ সম্পা-মুহম্মদ আব্দুল হাই/ পৃ-৫৫)
মেয়েরা শার্ট পরে না। ঘোষণাটা দিলেন আমার দাদী জোবায়দা খাতুন চৌধুরানী। সে এক ঈদের সময়। নতুন জামা আসছে আসছে করছে, নেহাত আব্বার অফিস থেকে ফিরতে মেলা রাত হয়ে যায় বলে বন্দর বাজারে গিয়ে কেনাটা হয়ে উঠছে না, তবে আব্বা বলেছে, ধরে নাও কেনা হয়ে গেছে আর আমিও তাই ধরেই নিয়েছি। যদিও প্রতিদিনই অপেক্ষায় থাকি, এই কেনা হয়ে গিয়েছে ধরে নিয়ে রাখা জামা-কাপড়-জুতোগুলো আসলেই কেনা হবে কবে।
কাকা নিয়ে আসে দু'খানা শার্ট, একটা আমার আর একটা ভাইয়ার। শার্ট! আমার জন্যে! তাও একেবারেই একই রকম দুটো শার্ট শুধু ভাইয়ারটা হলুদ আর আমারটা গোলাপী। আনন্দে আমি ধেই ধেই করে নেচে উঠতে পারিনি শুধুমাত্র আমার দাদীর ভয়ে। আমার দাদী এক জমিদারকন্যা, সপ্তগ্রাম, যা কিনা লোকমুখে হয়ে উঠেছে সাত্গাঁও। সেই সাত্গাঁওয়ের জমিদার সাহেবের ছোটমেয়ে পাকে চক্রে আর তাঁর ভাগ্যদোষে আমাদের বাড়িতে এসে পড়েছিলেন, নেহাতই সাধারণ এক ঘরে। যে ঘরের না ছিল জৌলুস না ছিল কোনো রোয়াব। কিন্তু তাতে কী? চৌধুরানী বলে কথা। আমার বড়াআব্বা মানে দাদীর বাবার শুধু আওয়াজ শুনেই নাকি বাঘে গরুতে একঘাটে পানি খেত। তো সে সব তো শোনা কথা কিন্তু আমার দাদীর হুকুমে সক্কলে যে দিনকে রাত আর রাতকে দিন এই সেদিন পর্যন্ত মেনে এসেছে এ তো আমার দেখে দেখেই বড় হওয়া। সেই সব হুকুম পালন করে করেই, দাদীর ইচ্ছে-অনিচ্ছে মেনে নিয়েই বড় হয়ে ওঠা।
শার্ট দুটো নিয়ে কাকা চুপটি করে আমার হাতে ধরে দেয়, সামি, এটা তোর! আমি অনেকক্ষণ কথা বলতে পারিনি সেই শার্ট হাতে পেয়ে। প্রথমত বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, আমি ঈদের দিনে শার্ট পরব! কাক্কু, কাক্কু, আমার প্যান্ট? মেয়েদের প্যান্ট তো রেডিমেড পাওয়া যায় না, বানাইতে হইব, তোরে লইয়া গিয়া অর্ডার দিয়া দিমু। মেয়েদের প্যান্ট বলতে সাইডে চেইন লাগানো প্যান্ট। তখন ওরকমই চলত।
কথাটা গোটা বাড়িময় ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি যে আমার জন্যে শার্ট এসেছে! আমি তখন হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে শুধু শার্টটাই দেখছি। স্বপ্নেও তো কোনোদিন আমাকে শার্ট পরতে দেয়নি কেউ, আর আজকে কাক্কু নিয়ে এলো! কি সুন্দর দেখতে! ফুলহাতা গোলাপী রঙের শার্ট, সামনে দু'পাশে দু'খানা পকেট, বুকের কাছটিতে। কত বয়েস তখন আমার? সাত কি আট হবে। যদিও তখন থেকেই দাদী বলতে শুরু করেছিল, এই মাইয়া হাফপ্যান্ট পিন্দা ঘুইরা বেড়ায় কিয়ের লাইগ্যা। পায়জামা কই, পায়জামা?
কাকা বলে গেল, সন্ধের পরে নিয়ে গিয়ে প্যান্টের অর্ডার দিয়ে আসবে, দর্জি দিয়ে দেবে ঈদের আগেই। তখন এ'রকম রোজা আসার আগেই অর্ডার নেওয়া ক্লোজ হয়ে যেত না। দিব্যি ঈদের দু'দিন আগে কাপড় দিলেও ঠিক চাঁদরাতে বানিয়ে দিয়ে দিত। ভাইয়া'র তর সয় না, সে সাথে সাথেই শার্টের বোতাম খুলে সেটা গায়ে চাপিয়ে গোটা বাড়ি এক চক্কর দিয়ে দেয়, মুখে গাড়ির ভোঁ ভোঁ শব্দ। দাদী প্রায় চেঁচিয়েই ওঠে, নতুন শার্ট পিন্দা কই যাস। খবরটা ভাইয়াই দাদীকে দেয়, সামির লাইগাও তো কাক্কুয় শার্ট আনসে। তারপর মুহূর্তেই আমার হাতের শার্ট, যা কিনা তখনও ভাঁজও খোলা হয়নি, চলে যায় দাদীর হাতে। শার্ট? সামি শার্ট পিনব? দাদী চলে যায় নিজের ঘরে সঙ্গে যায় আমার শার্ট।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি দাদীর ঘরের দরজায়, মুখ ফুটে একবারও বলা হয় না, কেন? কেন সামি শার্ট পরবে না? ভাইয়া তো নিজের শার্ট পরে বেড়িয়েও এলো আর আমি পরতেই পাব না? না। এসব প্রশ্ন দাদীকে আমার করা হয়নি তখন। আমি শুনতে পেলাম, এমনিতেই তো মেয়েমানুষকে শয়তানে বশ করে সহজে, শয়তানের দেওয়া কুবুদ্ধিগুলো তো মেয়েরাই আগে মেনে নেয়, এই শার্ট-প্যান্ট পরে তো জিন্দা শয়তান হয়ে যাব আমি আর তারপর পরকালে দোজখের দারোয়ান হওয়া ছাড়া আমার আর কোনো গতি থাকবে না। ইফতার করতে এসে আব্বা শুনল শার্ট আসার খবর আর সেই শার্ট যে আমাকে পরতে দেওয়া হবে না সেই ফরমানও জারী হল। কাকা দাদীকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করল, এইটুকু মেয়ে, শার্ট পরলে কি অসুবিধে? সারাজীবন তো সেই শাড়ীই পরবে, এখন পরুক না ক'দিন, যদ্দিন বড় না হচ্ছে! শেষমেশ কাকা পাড়ার দর্জিকাকুর কাছ থেকে শার্টের পকেটও খুলিয়ে আনল, এটা এখন আর ছেলেদের শার্ট নয়, জামা হয়ে গেছে শুধু লম্বায় একটু খাটো! কোনো লাভ হল না। সেই শার্টও ভাইয়াই পরল, গোলাপী রঙের পকেট বিহীন শার্ট। সেবারও আব্বা চাঁদরাতে বন্দর বাজারে নিয়ে গিয়ে জামা জুতো ক্লিপ কাঁটা কিনে দিল যেমন প্রতিবারে দেয়।
ছেলে হিসেবে ভাইয়া বরাবরই একটু পক্ষপাতিত্ব পেয়ে এসেছে দাদীর আর অনেক সময় মায়েরও। রোজার সময় ভাইয়ার ইচ্ছে না হলেই রোজা রাখে না, তখন দাদী মাঝে-মধ্যে একটু বকলেও খুব বেশি কিছু একটা বলে না কিন্তু আমি রোজা রখব না এটা দাদী ভাবতেই পারে না যেন। জ্বর হলে বা একটু শরীর খারাপ হলেই আব্বা বলে, সেহরী খাইয়া ঘুমাও, কিন্তু রোজা রাখবা না। তখনই দাদী বলে, অত আহ্লাদ দিও না, কত শইল খরাপ লইয়াও বেডি মাইনষেরে রোজা-নমাজ করন লাগে। এমনিতে রোজা রাখতে আমার ভালই লাগে, সন্ধেবেলায় অত অত ইফতার আম্মা বানায়, রোজা না রেখে সেগুলো খেতেই বরং কেমন কেমন লাগে। কিন্তু শরবতের গ্লাসের বদলে ভাইয়া যখন বড় মগে শরবত পায় আর আমি পাই গ্লাসে, আরেকটু শরবত আমাকে চেয়ে নিতে হয় যা ভাইয়া পেয়ে যায় না চাইতেই তখন অজান্তেই অভিমানে জল চলে আসে চোখে। কোনোদিনই এইসব অভিমান বা রাগ-দু:খ কাওকে দেখাই না, বলি না কিন্তু ভাইয়া দিব্যি সামান্য কিছুতেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে আর অনেক অন্যায় আব্দারও কেমন অনায়াসে আদায় করে নেয়। মুরগীর ঠ্যাং আমার সবচাইতে পছন্দের, বুকের মাংসে রোয়া থাকে বলে খেতেই পারি না, কী রকম ঘাস ঘাস লাগে খেতে আর সেটা আম্মাও জানে, বহুবার বলেছি কিন্তু তারপরেও ভাইয়া আর কাকা দু'জনের জন্যে বরাবরের বরাদ্দ থাকে ঐ ঠ্যাং। আমি মাঝে মাঝে চেয়ে নিলে কাকা তখন অন্য মাংস খায় কিন্তু ভাইয়া কখনৈ নিজেরটা ছাড়ে না। আর এ নিয়ে দাদী বা আম্মা কেউই ভাইয়াকে কিছু বলে না। এই পক্ষপাতিত্ব অনেক সময়েই আমার নীরব অশ্রুপাতের কারণ হয়েছে, বহুবার ভেবেছি, কেন আমি ছেলে হলাম না। আমার শার্ট যখন ভাইয়ার দখলে চলে যায় সে ছেলে বলে তখন আবারও সেই আফসোস হয়, কেন আমি ছেলে হলাম না!
নাকফুল দিয়া কইলা বন্ধু
রূপে যে অতুল
বাত্তি জ্বালাই চাইলাম হায় রে
বরই গাছের ফুল
বন্ধে ভারাইল রে।।
বাজু পরাই কইলা
জলের যেন্দে হীরা
বাত্তি জ্বালাই চাইলাম
ভার্গা বাঁশের গিরা
বন্ধে ভারাইল রে।।
হাতাই হাতাই চাইলাম
শাড়ি ছড়ক ছড়ক
চেরাগ জালাই চাইলাম
আঁইট্যা কেলার বরক
বন্ধে ভারাইল রে।।
(চট্টাগ্রামের আঞ্চলিক গান/ কল্যাণী ঘোষ সংকলিত/ বাংলা একাডেমী ঢাকা/ পৃ-২৯২)
ঠিক পরের বছর কাকা একটা পাঞ্জাবী নিয়ে এলো। ছাপা ভয়েলের পাঞ্জাবী। বিস্কুট রঙের জমির উপর খয়েরী, লাল, কালো লতা-পাতা, কল্কা। সামনের দিকে পাঞ্জাবীর নিচের দিকটায় চওড়া বর্ডার, বড় বড় কল্কা সেখানে। গলায় সেই কাপড়ের সরু বর্ডার, তার উপরেই ছোট্ট ছোট্ট সাদা বোতাম বসানো। পাঞ্জাবীও ছেলেদের পোষাক বলে দাদী এবারেও যথেষ্ট চেঁচামেচি করল, কিন্তু কাকা দাদীকে বুঝিয়ে ছাড়ল, এটা মেয়েদেরই জামা, পাঞ্জাবীও নয় আর ছেলেদেরও নয়। কোথায়, পকেট কোথায়? পাঞ্জাবীতে তো পকেট থাকে!
সন্ধেবেলায় কাকা আমাকে নিয়ে বেরুলো প্যান্টের অর্ডার দেবে বলে। সাদা রঙের সিক্সটি-ফাইভ থার্টি ফাইভ কাপড় কিনে প্যান্টের অর্ডার দিলো, দু-দিকে পকেট আর সাইডে জিপ। ঠিক দু'দিনেই প্যান্ট দিয়ে দেবে অঙ্গীকারও করল জিন্দাবাজারের বিখ্যাত স্যুট-সাফারি'র টেইলার মাস্টার ইউনুস । এর পর জুতো। বাটার দোকানের বিশাল বোর্ডে হাঁটু অব্দি শাড়ি পরা একটা মেয়ে, যে দৌড়ুচ্ছে মাঠের উপর দিয়ে, সামনে রাখা একজোড়া জুতোর দিকে, বাটার জুতো! বাটার জুতো আমার পছন্দ হলো না, আমার এ'রকম নিচু নিচু চ্যাপ্টা মতন দেখতে জুতো চাই না। সাদার উপর বাদামী কোনাকুনি বেল্ট বসানো একজোড়া খড়ম কেনা হল। আমি তো সেখানে, সেই দোকান থেকেই জুতো পরে বাসায় ফিরব, কিছুতেই জুতো প্যাকেট করতে দেব না। আব্বা তো বারণ করে না দোকান থেকেই নতুন জুতো পায়ে বাড়ি যেতে! কাকা বোঝালো, তোর আব্বু তো চাঁদরাতে জামা-জুতো কিনে দেয়, পরদিন সকালে ঈদ, তোর জুতূ পুরোনো হয় না আর রাতে রাস্তায়-পাড়ায় লোক থাকে না বলে কেউ দেখতেও পায় না। কিন্তু এখন তো ঈদের দেরি আছে, পুরনো হয়ে যাবে না জুতো? অত সুন্দর পাঞ্জাবী আর প্যান্ট পরবি পুরানো জুতো পায়ে? ঠিক! প্যাকেটবন্দী হয় খড়ম, আমি অপেক্ষা করি ঈদের।
পাঞ্জাবীটা আমি কাওকেই দেখাই না, যদিও অনেকেই জানতে চেয়েছে, কি কিনেছি কাকার সাথে গিয়ে? আমরা, বন্ধুরা একে অন্যকে কক্ষনো ঈদের কাপড় দেখাই না। দেখালেই তো পুরনো হয়ে গেল। মজাটা হল ঈদের দিন। প্রায় সারা রাত জেগে দেশলাইয়ের কাঠিতে করে শিলে বাটা মেহেদী যতটা সম্ভব সুক্ষ ডিজাইনে হাতে পরে মেহেদী হাতেই ঘুমিয়ে পড়ি বরাবরের মত। লাল মেহেদীর গাঢ় রঙে রাঙানো দুই হাত, জামা-জুতোর সাথে কেনা পুঁতির মালা-দুল, সরু সরু ঝকঝকে লাল-কালো-সবুজ রেশমী চুড়ি রঙ মিলিয়ে মিলিয়ে পরে আর সঙ্গে সিলেটের ট্র্যাডিশনাল রঙ বাহারী &হয়ষঢ়;রুকের বালা' পরে সকালে বেরুতেই দেখা গেল পাশের বাড়ির লীনা আপুও ঠিক একই রকম পাঞ্জাবী পরে বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে! একই রঙ, একই ছাপা শুধু লীনা আপুর পাঞ্জাবীটা সাইজে বড়। লীনা আপুর বেশ মন খারাপও হল, ঐ একই পাঞ্জাবী আমিও পরেছি বলে!
বরই ফুলের থামি
আর একখান গোলবাহার
যদি পাইতাম আঁই পিনতাম
আনা ধরি চাইতাম
আঁরে ক্যান সোন্দর লাগে।
(চট্টাগ্রামের আঞ্চলিক গান/ কল্যাণী ঘোষ সংকলিত/ বাংলা একাডেমী ঢাকা/ পৃ-১৭)
পাশের লন্ডনী বাসার আম্বিয়া আপু কেমন সুন্দর ম্যাক্সি পরে, স্কার্ট পরে। ছেলেবেলায় আম্বিয়া আপু লন্ডনে থাকত, তার জন্মও সেখানেই। একদম মেমসাহেবদের মত দেখতে আম্বিয়া আপুকে। তার বাবা তো এখনো সেখানেই থাকে, এখানে আম্বিয়া আপু থাকে তার ডাক্তার ভাইয়া-ভাবীর সাথে। আন্টি বছরে ছ'মাস থাকে লন্ডনে আর ছ'মাস সিলেটে, ছেলে-মেয়ের কাছে। প্রত্যেকবারেই সিলেটে আসার সময় নিয়ে আসে সব লম্বা লম্বা স্কার্ট, ম্যাক্সি। আমারও খুব ইচ্ছে করে অমন লং ড্রেস পরতে, কিন্তু বলি বলি করেও বলতে পারি না, যদি আব্বা না করে দেয়! না করবে বলে মনে হয় না, কিন্তু যদি না করে? কাকাকেই বলি, কাক্কু, আম্বিয়ার আপুর ম্যাক্সি কত সুন্দর না? কাকা বুঝতে পারে, একটা চোখ টিপে দিয়ে বলে, ম্যাক্সি গুলি এতো সুন্দর না, কিন্তু স্কার্টগুলি খুব সুন্দর, তোর চাই? মাথা শুধু একটু উপর-নিচ করে বুঝিয়ে দেই, চাই! উজ্জÄল কমলা রঙের বিশাল ঘেরের স্কার্ট আর সাদার উপর সাদা লেস আর সাদা সুতোর কাজ করা তিন কোয়ার্টার হাতার ছোট ঝুলের কুর্তা যা কাকা আর আমি মিলে কিনলাম শাহ্জালাল মার্কেটের নতুন লন্ডনী দোকান থেকে সে দেখে আমারই বিশ্বাস হতে চায় না যে এ আমারই! বহুদিন অব্দি যে কোনো বিয়েবাড়ি বা নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়ার আমার একমাত্র পোষাক ছিল এই লং স্কার্ট আর সাদা কুর্তা। যদিও আমি লম্বা হয়ে যাওয়ায় খুব তাড়াতাড়িই খাটো হয়ে গিয়েছিল সেই লং স্কার্ট। আর লম্বাও তো আমি হয়েছি দিনে আধ আঙুল আর রাতে এক আঙুল করে (এটা আমার কাকিমার হিসেবমতে) ।
খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি আমাকে শার্ট-প্যান্ট পরার জন্যে। দাদীর এককথায় আমার শার্ট যখন ভাইয়ার হয়ে যায় তখন একটিও কথা না বলে চুপ করে থাকা আব্বাই এনে দেয় শার্ট আর সাথে প্যান্টও! বরাবরই দেখেছি দাদী কোনো কিছু নিয়ে রাগারগি করলে বা আম্মাকে বকলে আব্বা কখনৈ এর মাঝে পড়ে না। দাদীকে তো কখনৈ কিছু বলে না সে দাদী ন্যায়ই বলুক বা অন্যায়, কারো সামনে আম্মাকেও কিছু বলে না। আমাদের কোনো কথা নিয়ে দাদী কোনো ফরমান জারী করলে আব্বা সেখানেও দাদীকে কিছু বলে না কিন্তু নিজে যা করার সেটা ঠিকই করে যায় দাদীকে মুখের উপর কিছু না বললেও। দাদী অখুশি হয় কিন্তু আব্বাকে ঘাঁটায় না কখনৈ। আমাকে নাকি বেশি আহ্লাদ দেয় আব্বা, অন্তত দাদীর তাই মনে হয়, মাইয়া মাইনষেরে বেশি আহ্লাদ দিতে নাই, কেডায় জানে বিয়া-শাদী কই হইব, কুন দ্যাশে যাইব, কফাল কেমন হইব। ভালা হইলে তো ভালই, কিন্তু আল্লায় না করুক যদি খারাপ হয়, তখন আহ্লাদী মাইয়া সহ্য করতে পারত না, কাইন্দা কূল পাইত না! এই সমস্ত জ্ঞানের কথা আকছারই শুনতে হত আমাদেরকে।
প্রত্যেক বছর রোজার মাস আসার অনেক আগে থেকেই ঈদের কাপড়ের চিন্তা শুরু হয়ে যেত আমার কারণ আমার বন্ধুদের সক্কলের কাপড় কেনা হয়ে যেত রোজা শুরু হওয়া মাত্রই। সবাই একটু একটু করে বলত, আমার এক নম্বর জামাটা অমুক রঙের, দু নম্বর জামাটা তমুক রঙের। আর তারপর তিন নম্বর, চার নম্বর জামারও রঙ আর ডিজাইনের বর্ণনা আমাকে শুনতে হতো। আমার শুধু থাকে গম্ভীর মুখে অপেক্ষা, কবে আব্বা নিয়ে যাবে, কিন্তু মনে মনে এও ঠিক জানি, সন্ধেবেলায় চাঁদ বেরুলে তবেই আব্বা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এসে বাজার করতে বেরুবে। সে'বার ব্যাঙ্কের কাজে ঢাকা গেল আব্বা আর কি মনে করে কে জানে আগে আগেই জামা-কাপড় কিনে নিয়ে এলো। আর কী অদ্ভুত কান্ড, আব্বা আমার জন্যে একটা শার্ট-প্যান্টের সেট কিনে আনল ঢাকা থেকে! তাও কিনা ঢাকা নিউ মার্কেট থেকে! আমাদের সিলেটে তো কোনো নিউ মার্কেটই নেই। সেই এক বন্দর বাজারের ঘিঞ্জি মার্কেট, যার কোনো নামই নেই আর ঐ তো কয়েকটি মাত্র দোকান নিয়ে ছোট্ট একখানি শাহ্জালাল মার্কেট। ব্যস! ঢাকা নিউ মার্কেট থেকে কেনা চওড়া কলারের খয়েরী রঙের শার্ট আর ঘিয়ে রঙের বেল বটম প্যান্ট নিয়ে আসে আব্বা আসছে উত্সবের জন্যে। আর সব চাইতে বেশি অবাক লাগে যখন দেখি একটা শব্দও করেন না আমার দাদী জোবায়দা খাতুন চৌধুরানী! সন্মন্ধ এনেছে বাপে সামনের ফাল্গুনেই পরের ঘরে চলে যাবে মেয়েটা।
আইল চৈত্রিরে মাস আকাল দুর্গাপূজা।
নানা বেশ করে লোকে নানা রঙ্গের সাজা।।
ঢাক বাজে ঢোল বাজে পূজার আঙ্গিনায়।
ঝাক ঝাক শঙ্খ বাজে নটী গীত গায়।।
মন্ডপে মায়ের মুর্তি দেখিতে সুন্দর।
কারুয়া টাঙ্গাইয়া করে ঘর মনোহর।।
পাড়া-পড়সি সবে সাজে নূতন বস্ত্র পরি।
ঘরের কোণায় লুকাইয়া আমি কান্দ্যা মরি।।
মায়ে-ঝিয়ে কান্দি ঘরে গলা ধরাধরি।
বৈদেশী হইল পিতা অন্ধকার পুরী।।
(কমলা/ মৈমনসিংহ-গীতিকা/ দ্বিজ ঈশান/সঙ্ক- শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন/ পৃ-১৪৫)
[এই লেখাখানি গুরুচন্ডা৯-র পুজো ইস্পেশাল ২০০৯ এ প্রকাশিত।
http://www.guruchandali.com/guruchandali.Controller?portletId=21&porletPage=1 এই সুতোটি ধরে পৌঁছে যাওয়া যাবে গুরুচন্ডা৯-র পুজো ইস্পেশালে ]